সুন্দরবনের দুবলার চর এলাকার আলোর কোলে পাওয়া পটকা-জাতীয় একটি মাছকে বিশ্বের জন্য নতুন প্রজাতি হিসেবে শনাক্ত করেছেন বাংলাদেশ ও দক্ষিণ কোরিয়ার একদল গবেষক। শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক কাজী আহসান হাবীবের নেতৃত্বে এই দলে দক্ষিণ কোরিয়ার মেরিন ইকোসিস্টেম রিসার্চ সেন্টারের তিনজন গবেষক যুক্ত ছিলেন। ২০১৯ সালের ২৬ ডিসেম্বর প্রথম আলো এ খবর জানায়। মাছটির বৈজ্ঞানিক নাম রাখা হয়েছে বঙ্গোপসাগরের নামে, Chelonodontops bengalensis (চেলেনোডনটপস বেঙ্গালেনসিস); বাংলা নাম ‘বড় জালি পটকা’।
দেখতে কেমন, নাম এল কোথা থেকে
প্রতিবেদন অনুযায়ী, সাধারণ পটকা মাছের চেয়ে এটি আকারে বড়। গায়ের রং কালচে, তাতে জালের মতো ছোপ ছোপ দাগ; এ কারণেই বিজ্ঞানীরা এর বাংলা নাম দিয়েছেন ‘বড় জালি পটকা’। মাছের তথ্যভান্ডার ফিশবেস প্রজাতিটিকে Bengal reticulated puffer নামে তালিকাভুক্ত করেছে; সেখানে একে উষ্ণমণ্ডলের সামুদ্রিক, তলদেশবাসী মাছ বলা হয়েছে, বিস্তার বাংলাদেশ, আর বর্ণনায় আছে বাদামি জালের মতো নকশা ও সাদা ফোঁটার কথা। ফিশবেসের হিসাবে নমুনার সর্বোচ্চ দৈর্ঘ্য ৩১.২ সেন্টিমিটার (স্ট্যান্ডার্ড লেংথ)।
সুন্দরবনের জেলেরা প্রথম আলোকে জানান, তাঁদের জালে কালেভদ্রে মাছটি উঠত। তাঁরা একে ‘বড় পটকা’ বলতেন, কিন্তু খেতেন না; ধরার পর ফেলে দিতেন। গবেষকদের এ আবিষ্কারের সময় প্রজাতিটি কেবল সুন্দরবনের দুবলার চর এলাকা থেকেই জানা ছিল।

দেড় বছরের মাঠ গবেষণা ও জার্নালে প্রকাশ
২০১৬ সালের মে থেকে ২০১৭ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে সুন্দরবনে বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধান চালিয়ে গবেষকেরা মাছটি খুঁজে পান। প্রথম আলোর তথ্যমতে, এতে আর্থিক সহায়তা দেয় দক্ষিণ কোরিয়ার ইয়সু কোরিয়া ফাউন্ডেশন আর কারিগরি সহায়তা দেয় কোরিয়া ইনস্টিটিউট অব ওশান সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি।
গবেষণাপত্রটি প্রকাশিত হয় সমুদ্রবিজ্ঞানবিষয়ক আন্তর্জাতিক জার্নাল ওশান সায়েন্স জার্নালে। প্রকাশকের তথ্য অনুযায়ী, এটি অনলাইনে আসে ২০১৮ সালের ১৭ অক্টোবর এবং ছাপা হয় জার্নালের ৫৪তম খণ্ডের ৭৯ থেকে ৮৬ পৃষ্ঠায়। লেখক কাজী আহসান হাবীব, অমিত কুমার নিয়োগী, জিনা ওহ, ইউন-হো লি ও চুং-গন কিম। শিরোনাম অনুযায়ী, প্রজাতিটি আলাদা করা হয়েছে দেহের গঠন (মরফোলজি) ও ডিএনএ বারকোড বিশ্লেষণের ভিত্তিতে।
শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকোয়াকালচার অ্যান্ড মেরিন সায়েন্স অনুষদের ডিন অধ্যাপক কাজী আহসান হাবীব প্রথম আলোকে বলেন, ‘মাত্র দেড় বছর মাঠপর্যায়ে কাজ করে আমরা সুন্দরবনের জন্য তো বটেই, বিশ্বের জন্য নতুন একটি প্রজাতি খুঁজে পেলাম। নতুন এই আবিষ্কার বিশ্বের মৎস্যবিজ্ঞান গবেষণায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও মৎস্য গবেষক মো. নিয়ামুল নাসের প্রথম আলোকে বলেন, ‘বাংলাদেশের মাছের তালিকায় নতুন একটি নাম যুক্ত হলো, এটা অবশ্যই একটি সুসংবাদ। এর আগেও দেশের পাহাড়ি ও উপকূলীয় এলাকায় বেশ কয়েকটি নতুন মাছের সন্ধান আমরা পেয়েছি। তবে সুন্দরবনের ক্ষেত্রে এটা অবশ্যই নতুন একটি ঘটনা।’

দুবলার চর, সুন্দরবন ও পটকা মাছ
দুবলার চর বাগেরহাট জেলায়, সুন্দরবনের দক্ষিণ প্রান্তে বঙ্গোপসাগরের কাছে একটি দ্বীপ। মাছ ধরার মৌসুমে এখানে জেলেদের অস্থায়ী বসতি গড়ে ওঠে, আর শুঁটকি তৈরির জন্য জায়গাটি পরিচিত। সুন্দরবন পৃথিবীর বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন; এর ৬ হাজার ১৭ বর্গকিলোমিটারের বেশি অংশ বাংলাদেশের খুলনা বিভাগে। বাংলাদেশের সুন্দরবন ১৯৯৭ সালে ইউনেসকোর বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকায় ওঠে।
পটকা মাছ টেট্রাওডনটিডি গোত্রের মাছ। বিপদ টের পেলে এরা পাকস্থলীতে পানি ভরে বলের মতো ফুলে ওঠে। অনেক প্রজাতির দেহে টেট্রোডোটক্সিন নামে মারাত্মক বিষ থাকে, মূলত ডিম্বাশয় ও যকৃতে, অল্প পরিমাণে অন্ত্র ও চামড়ায়। এ কারণে বাংলাদেশে সাধারণত পটকা মাছ খাওয়া হয় না। তবে জাপান, কোরিয়া ও চীনে বিশেষ প্রশিক্ষণ পাওয়া রাঁধুনির হাতে প্রস্তুত পটকা মাছ বিশেষ খাবার হিসেবে খাওয়া হয়, কারণ তাঁরা জানেন মাছের কোন অংশ নিরাপদ।
বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের গবেষকদের ২০১৭ সালের এক প্রকাশনা অনুযায়ী, দেশে স্বাদুপানির মাছের ২৬৫টি প্রজাতির কথা জানা ছিল। আর বিজ্ঞানীদের ২০১১ সালের এক হিসাবে, পৃথিবীতে সুকেন্দ্রিক (ইউক্যারিওট) জীবের প্রজাতি আনুমানিক ৮৭ লাখ, যার বেশির ভাগের তখনো বৈজ্ঞানিক বর্ণনা হয়নি।

ছবি: Fuadctg009 / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
সূত্র: প্রথম আলো, ওশান সায়েন্স জার্নাল (স্প্রিংগার), ফিশবেস, প্লস বায়োলজি, ইন্টারন্যাশনাল জার্নাল অব ফিশারিজ অ্যান্ড অ্যাকুয়াটিক স্টাডিজ, উইকিপিডিয়া





মন্তব্য
(০)