রংপুর বিভাগের উত্তর সীমান্তের জেলা লালমনিরহাটের আলুচাষিরা ২০২৬ সালের মার্চের মাঝামাঝি টানা দ্বিতীয় বছরের লোকসানের মুখে পড়েন। আগের বছর আলুতে লোকসান গুনেছিলেন জেলার অনেক ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষক। সেই ক্ষত শুকানোর আগেই তারা আবার ধার-দেনা করে, চড়া দামে সার ও বীজ কিনে নতুন করে আলু লাগান। উর্বর মাটিতে এবার বাম্পার ফলনও হয়। কিন্তু ২০২৬ সালের ১৫ মার্চ জাগো নিউজ ২৪ জেলা থেকে যে প্রতিবেদন প্রকাশ করে, তাতে কৃষকেরা জানান, বাজারে যে দাম মিলছে তাতে খরচই উঠছে না; তার ওপর এক রাতের ভারী বৃষ্টিতে ভিজে গেছে খেতে তুলে স্তূপ করে রাখা আলু, যা তখনও হিমাগারে পাঠানো যায়নি।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, একদিকে ন্যায্যমূল্য না পাওয়া, অন্যদিকে হঠাৎ বৃষ্টির হানা, সব মিলিয়ে দুশ্চিন্তায় নির্ঘুম রাত কাটছিল লালমনিরহাটের হাজারো আলুচাষির। গত মৌসুমের ঋণ এবার শোধ করার আশা করেছিলেন যারা, তারা জানান, ঋণ উল্টো আরও বেড়েছে। বাম্পার ফলনই যেন এবার তাদের জন্য কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে।
কেজিতে খরচ প্রায় ১৫ টাকা, বাজারে দাম ৮ থেকে ১০ টাকা
কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ মৌসুমে লালমনিরহাট জেলায় ৭ হাজার ১৬০ হেক্টর জমিতে আলুর চাষ হয়। হাড়ভাঙা খাটুনি আর চড়া দামের কৃষি উপকরণের কারণে প্রতি কেজি আলু উৎপাদনে কৃষকের খরচ পড়েছে প্রায় ১৫ টাকা, এমনটাই জানান কৃষকেরা। অথচ প্রতিবেদনের সময় জেলার পাইকারি বাজারে প্রতি কেজি আলু বিক্রি হচ্ছিল মাত্র ৮ থেকে ৯ টাকায়, কোথাও কোথাও ১০ টাকায়।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ভরা মৌসুমেও ব্যবসায়ীদের আলু কেনায় তেমন আগ্রহ ছিল না। একদিকে দাম নেই, অন্যদিকে ক্রেতার অভাব; ফলে খেত থেকে সময়মতো আলু সরানো যাচ্ছিল না, আর এতে পরবর্তী ফসল আবাদেও দেরি হয়ে যাচ্ছিল কৃষকদের।
কৃষকদের এই হিসাব আগের মৌসুমের সরকারি হিসাবের কাছাকাছি। দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের ২০২৫ সালের অক্টোবরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, কৃষি বিপণন অধিদপ্তর তখন প্রতি কেজি আলুর উৎপাদন খরচ ধরেছিল ১৪ থেকে ১৭ টাকা। একই মাসে দ্য ডেইলি স্টার জানায়, সরকারি হিসাবে গড় উৎপাদন খরচ কেজিপ্রতি ১৪ টাকা। ২০২৬ সালের মার্চের শুরুতে বার্তা সংস্থা ইউএনবি উত্তরাঞ্চলে কেজিপ্রতি উৎপাদন খরচ ১৪ থেকে ২২ টাকা বলে জানায়; রাজশাহী, বগুড়া, রংপুর ও পাবনার কৃষকেরা নিজেদের খরচ ধরেন ১৮ থেকে ২২ টাকা।

রাতের বৃষ্টিতে ভিজল তুলে রাখা আলু
ন্যায্যমূল্য না পাওয়ার এই তীব্র হতাশার মধ্যেই কৃষকের জন্য মরার উপর খাঁড়ার ঘা হয়ে আসে এক রাতের ভারী বৃষ্টি। বৃষ্টির পানিতে জেলার নিচু এলাকার আলুখেত তলিয়ে যায়। অনেকে হাড়ভাঙা পরিশ্রমে আলু তুলে খেতেই জড়ো করে রেখেছিলেন; হিমাগারে নেওয়ার আগেই সেই আলু বৃষ্টিতে ভিজে কাদামাখা হয়ে খেতে পড়ে থাকে। ব্যাপকভাবে আলু পচে যাওয়ার শঙ্কায় দিশাহারা হয়ে পড়েন চাষিরা।
এশিয়াটিক সোসাইটি অব বাংলাদেশের জাতীয় জ্ঞানকোষ বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী, বাংলাদেশে আলু তোলা হয় হাতে, কোদাল বা এ ধরনের যন্ত্র দিয়ে, আর বেশির ভাগ জাতের আলু তোলা হয় ফেব্রুয়ারি ও মার্চে। গাছের পাতা প্রথমে হলদে, পরে বাদামি হয়ে গাছ মরে এলে বোঝা যায় কন্দ পূর্ণতা পেয়েছে; এই লক্ষণ দেখা দেওয়ার পর আলু তোলাই ভালো। ফলে মার্চের মাঝামাঝি আলু তোলা এই ফসলের স্বাভাবিক মৌসুম।
আলু তোলার পর কোন রোগ ও পোকা কন্দের ক্ষতি করে, বাংলাপিডিয়া তারও বিবরণ দিয়েছে। আলুর সবচেয়ে মারাত্মক ও বিস্তৃত রোগ হিসেবে বর্ণিত নাবি ধসা বা লেট ব্লাইট, যার কারণ Phytophthora infestans, খেতে থাকা অবস্থায়, তোলার সময় কিংবা সংরক্ষণে থাকা কন্দকে আক্রমণ করতে পারে। ব্যাকটেরিয়াজনিত ব্ল্যাকলেগ রোগ বাড়ন্ত গাছ ও গুদামে রাখা কন্দ দুটিরই ক্ষতি করে, আর আলুর সুতলি পোকা সবচেয়ে বেশি ক্ষতি করে অরক্ষিতভাবে সংরক্ষিত আলুতে; কোনো কোনো এলাকায় কৃষকের ঘরে রাখা আলুর ৮০ শতাংশ পর্যন্ত নষ্ট হওয়ার নজির আছে বলে জ্ঞানকোষটি জানায়। হিমাগারে না রেখে যেসব ক্ষুদ্র কৃষক ঘরে আলু রাখেন, তাদের আলুর একটি বড় অংশ শুকিয়ে, পোকার আক্রমণে ও রোগে নষ্ট হয়। ভেজা আলু বাছাই ও সংরক্ষণের বিষয়ে কৃষকেরা উপজেলা কৃষি অফিসের পরামর্শ নিতে পারেন।
চাষিদের কথা: টানা দ্বিতীয় বছরের ঋণ
মাঠপর্যায়ে কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে প্রতিবেদক জানান, তাদের অবস্থা দুর্বিষহ। মহেন্দ্রনগরের আলুচাষি জালাল উদ্দিন বলেন, "১৫-১৬ জন লোক নিয়ে আলু তুলছিলাম। ১৫ শতক জমির আলু হিমাগারে পাঠিয়েছি। বাকি জমির আলু গুছিয়ে রাখার আগেই হঠাৎ বৃষ্টিতে ভেসে গেছে। কাদামাখা আলু বাজারে নিচ্ছে না, দামও অনেক কম। গতবার ঋণ করে আলুচাষ করে লস খেয়েছিলাম, ভেবেছিলাম এবার সেই ঋণ শোধ করবো। কিন্তু পারলাম না, উল্টো ঋণ আরও বেড়ে গেলো।"
আলুচাষি বেলাল উদ্দিন বলেন, "এমনিতেই আলুর দাম নেই, বাজারে ১০ টাকা কেজি। যে পরিমাণ খরচ করেছি, তাতে লাভ তো দূরের কথা, পুরো লস অবস্থায় আছি। ঋণ করে চাষ করেছিলাম, এখন ফসল বেচে সেই ঋণ শোধ হবে না। কৃষকরা এভাবে লসে পড়ে যাচ্ছে, সরকারের উচিত আমাদের দিকে একটু নজর দেওয়া।"
আমবাড়ির আলুচাষি সোবেদ আলী বলেন, "আলুচাষ করে আমাদের একেবারে 'মার্ডার' হওয়ার মতো অবস্থা। সার কেনার জন্য লাইনে দাঁড়িয়ে চড়া দামে সার কিনেছি। সেই ফসলের আজ কোনো দাম নেই। কীভাবে এই ধার-দেনা শোধ করবো, কিছুই বুঝে উঠতে পারছি না।" জাগো নিউজের প্রতিবেদনের শিরোনামে কৃষকদের এই কথাটিই উঠে আসে: "গতবারের ধারই শোধ হয়নি, এবারও লস"।
প্রথম কৃষকের এলাকা মহেন্দ্রনগর লালমনিরহাট সদর উপজেলার নয়টি ইউনিয়নের একটি, আর মহেন্দ্রনগর হাট উপজেলার পরিচিত হাটগুলোর একটি, বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী। জ্ঞানকোষটি সদর উপজেলার প্রধান ফসলের তালিকায় আলুর নাম রেখেছে; দেশের অন্যান্য এলাকায় পাঠানো প্রধান পণ্যের মধ্যেও তামাক, আখ, সুপারি, পেঁপে, ভুট্টা ও সবজির সঙ্গে আলু আছে।
কৃষি বিপণন অধিদপ্তর: চাহিদার চেয়ে উৎপাদন বেশি
এ বিষয়ে লালমনিরহাট কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের মাঠ ও বাজার পরিদর্শক হিমাংশু চন্দ্র বর্মন জাগো নিউজকে জানান, চাহিদার তুলনায় উৎপাদন বেশি হওয়ার কারণেই মূলত বাজারে আলুর দাম কমে গেছে।
তিনি বলেন, জেলায় গড়ে ৩০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে। তবে ততদিনে অর্ধেকের বেশি জমির আলু ঘরে তোলা হয়ে গিয়েছিল। আলুখেতের পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা ভালো থাকায় বড় ধরনের ক্ষতির আশঙ্কা কিছুটা কম বলে তিনি জানান।
কৃষকদের লোকসানের হাত থেকে বাঁচাতে বিকল্প পথের পরামর্শ দিয়ে তিনি আরও জানান, কৃষকেরা যদি শুধু আলুর ওপর নির্ভর না করে গম, সরিষা, সূর্যমুখীসহ অন্যান্য ফসলের আবাদ করেন, তবে এমন লোকসানের মুখে পড়তে হবে না। এ ছাড়া আলু দিয়ে বিভিন্ন ধরনের খাদ্যপণ্য তৈরির মাধ্যমে এর বহুমুখী চাহিদা বাড়ানো সম্ভব; অধিদপ্তর সে বিষয়ে উদ্যোক্তাদের প্রশিক্ষণ দিচ্ছে বলে তিনি জানান।
কৃষি বিপণন অধিদপ্তর কৃষি মন্ত্রণালয়ের অধীন সরকারি সংস্থা, যা কৃষিপণ্যের বিপণনের দায়িত্বে রয়েছে। প্রতিবেদনে জেলার আলুর আবাদি জমির হিসাব যে কৃষি বিভাগের, সেই কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর মন্ত্রণালয়ের কৃষি সম্প্রসারণ সংস্থা।
আলুর ব্যবহার তরকারির হাঁড়ির বাইরেও অনেক। বাংলাপিডিয়া জানায়, বাংলাদেশে আলু মূলত মাছ, মাংস ও ডিমের সঙ্গে রান্না করা সবজি হিসেবে খাওয়া হয়; তবে আলুর চপ, সিঙাড়া, চিপস ও ফ্রেঞ্চ ফ্রাইও প্রচলিত, আর সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বেকারি ও ফাস্টফুডের দোকানে আলু দিয়ে নানা ধরনের খাবার তৈরি হচ্ছে। ইউরোপে প্রতিবছর লাখ লাখ টন আলু প্রক্রিয়াজাত করে স্টার্চ, অ্যালকোহল, আলুর গুঁড়া, আটা, ডেক্সট্রোজসহ নানা পণ্য তৈরি হয় বলেও জ্ঞানকোষটি উল্লেখ করেছে।
লোকসানে শেষ হয়েছিল ২০২৪-২৫ মৌসুম
কৃষকেরা যে "গতবার"-এর কথা বলছেন, সেটি ২০২৪-২৫ মৌসুম, যখন দেশে আলুর উৎপাদন হয়েছিল অস্বাভাবিক বেশি। দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড ২০২৫ সালের অক্টোবরে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের বরাতে জানায়, ৪ দশমিক ৬৭ লাখ হেক্টরের লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে সে মৌসুমে আলুর আবাদ হয়েছিল ৫ দশমিক ২৪ লাখ হেক্টর জমিতে, আর উৎপাদন হয়েছিল প্রায় ১ দশমিক ৩ কোটি টন। দ্য ডেইলি স্টার বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর প্রাক্কলনের বরাতে সে মৌসুমের উৎপাদন ধরে রেকর্ড ১ দশমিক ১৫ কোটি টন; বিপরীতে দেশের চাহিদা প্রায় ৯০ লাখ টন, আর বীজের জন্য লাগে প্রায় ১০ লাখ টন। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে আলু রপ্তানি হয়েছিল ৬২ হাজার টন।
দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের প্রতিবেদনে বাংলাদেশ কোল্ড স্টোরেজ অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য উদ্ধৃত করে বলা হয়, দেশে আলুর বার্ষিক চাহিদা ৯০ লাখ টন আর হিমাগারের ধারণক্ষমতা ৪৫ লাখ টন। ২০২৫ সালের অক্টোবরের মাঝামাঝি দেশের ৩৪০টি হিমাগারে তখনও প্রায় ২০ লাখ টন আলু মজুত ছিল, যার ১১ লাখ টন খাবার আলু ও ৯ লাখ টন বীজ আলু। অ্যাসোসিয়েশনের তথ্যমতে, সাধারণত বছরের ওই সময়ের মধ্যে হিমাগারের ৭০ শতাংশ আলু বিক্রি হয়ে যায়, কিন্তু সে বছর বিক্রি হয়েছিল মাত্র ৪০ শতাংশ। হিমাগার গেটে তখন আলু বিক্রি হচ্ছিল কেজিপ্রতি ৮ থেকে ১০ টাকায়, আর নিম্নমানের আলু ৪ থেকে ৬ টাকায়।
ঢাকা ট্রিবিউনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ২৭ আগস্ট সরকার হিমাগার গেটে আলুর ন্যূনতম দাম কেজিপ্রতি ২২ টাকা নির্ধারণ করে এবং ৫০ হাজার টন আলু কিনে হিমাগারে রেখে ২০২৫ সালের অক্টোবর-নভেম্বরে বিক্রির ঘোষণা দেয়। কৃষি, বাণিজ্য, খাদ্য ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের সচিবদের নিয়ে গঠিত একটি কমিটির সুপারিশে এই সিদ্ধান্ত হয়; বাজারদর উৎপাদন খরচ পোষাতে না পারায় কমিটিটি গঠন করা হয়েছিল। ২০২৫ সালের অক্টোবরের শুরুতে দ্য ডেইলি স্টার জানায়, হিমাগার গেটে আলুর দাম তখন কেজিপ্রতি ১০ থেকে ১১ টাকা, নির্ধারিত ন্যূনতম দামের অনেক নিচে; ব্যবসায়ীরা জানান, দুটি পদক্ষেপের কোনোটিই বাস্তবায়িত হয়নি। খুচরা বাজারে আলুর দাম তখন নেমে এসেছিল কেজিপ্রতি ১৮ থেকে ২৫ টাকায়, যা এক বছর আগে ছিল ৫০ থেকে ৬০ টাকা।

২০২৬ সালের মৌসুমের শুরুতে রংপুর অঞ্চল
নতুন মৌসুমের আলু এমন এক বাজারে আসে, যার চাপ তখনও কাটেনি। লালমনিরহাটের প্রতিবেদনের দশ দিন আগে, ২০২৬ সালের ৫ মার্চ বার্তা সংস্থা ইউএনবি জানায়, আলু তোলার মৌসুমের শুরুতেই দামের বড় পতনে উত্তরাঞ্চলের কৃষকেরা গভীর অনিশ্চয়তায় পড়েছেন। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের বরাতে সংস্থাটি জানায়, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশে ১ দশমিক ১৫ কোটি টন আলু উৎপাদিত হয়েছিল, যার ৮৭ লাখ টন এসেছিল রাজশাহী ও রংপুর বিভাগ থেকে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর রংপুরের অতিরিক্ত পরিচালক ইউএনবিকে বলেন, ২০২৫-২৬ মৌসুমে আলুর আবাদ লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে গেছে প্রায় ২৫ হাজার হেক্টর, যার ফলে সরবরাহ বেশি হয়েছে। অন্যদিকে কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের রংপুর বিভাগের উপপরিচালক জানান, আগের বছরের তুলনায় আবাদ কিছুটা কমেছে, যা পরে দাম স্থিতিশীল রাখতে সহায়ক হতে পারে। রংপুরের কাউনিয়া উপজেলার এক কৃষক জানান, আগের বছরের অবিক্রীত আলু নতুন আলুর চাহিদা কমিয়ে দিচ্ছে; গঙ্গাচড়ার এক কৃষক বলেন, কম দামের কারণে তিনি খরচ তুলতে পারছেন না।
ইউএনবি লালমনিরহাটের কালীগঞ্জ উপজেলার এক কৃষকের সঙ্গেও কথা বলে, যিনি ১৮ বিঘা জমিতে কার্ডিনাল জাতের আলু লাগিয়েছিলেন; তার হিসাবে কেজিপ্রতি খরচ ২২ টাকা, অথচ বিক্রি করতে পারছিলেন মাত্র ১৫ থেকে ১৮ টাকায়। কৃষক ও ব্যবসায়ীরা দাম পড়ার যেসব কারণ বলেছেন, সংস্থাটি সেগুলোর তালিকা দেয়: আগের মৌসুমের অবশিষ্ট মজুত, দুর্বল বাজার ব্যবস্থাপনা, হিমাগারের অভাব, সিন্ডিকেটের প্রভাব, অতিরিক্ত উৎপাদন এবং রপ্তানির সীমিত সুযোগ।
তিস্তাপারের কৃষিনির্ভর জেলা লালমনিরহাট
বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী, রংপুর বিভাগের লালমনিরহাট জেলার আয়তন ১ হাজার ২৪৭ দশমিক ৩৭ বর্গকিলোমিটার। জেলার উত্তরে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, দক্ষিণে রংপুর জেলা, পূর্বে কুড়িগ্রাম জেলা ও পশ্চিমবঙ্গ এবং পশ্চিমে নীলফামারী ও রংপুর জেলা। প্রধান নদী তিস্তা ও ধরলা। ১৯৮৪ সালে গঠিত এই জেলায় পাঁচটি উপজেলা: লালমনিরহাট সদর, আদিতমারী, কালীগঞ্জ, হাতীবান্ধা ও পাটগ্রাম। ২০১১ সালের আদমশুমারির হিসাবে জ্ঞানকোষটি জেলার জনসংখ্যা দিয়েছে ১২ লাখ ৫৬ হাজার ৯৯ জন।
জেলার অর্থনীতির মূল ভিত্তি কৃষি। একই ভুক্তি অনুযায়ী, জেলার ৭২ দশমিক ৭৮ শতাংশ মানুষের আয়ের প্রধান উৎস কৃষি। লালমনিরহাট সদর, আদিতমারী ও কালীগঞ্জ উপজেলার প্রধান ফসলের তালিকায় ধান, তামাক, ভুট্টা ও সবজির সঙ্গে আলুর নাম আছে, আর আদিতমারীর প্রধান রপ্তানিপণ্যের মধ্যেও আলু রয়েছে।
আলুর দরপতন এই জেলায় নতুন নয়। ২০২১ সালের ৩১ মার্চ দ্য ডেইলি স্টার বাংলা জানায়, সে মৌসুমে লালমনিরহাটে ৫ হাজার ৯৫০ হেক্টর জমিতে আলুর চাষ হয়ে উৎপাদন হয়েছিল ৫০ কেজির ২৭ লাখ ৮১ হাজার ৩০ বস্তা, অথচ জেলার আটটি হিমাগারের ধারণক্ষমতা ছিল ১৪ লাখ ৯১ হাজার ৪০০ বস্তা। কৃষকেরা তখন কেজিপ্রতি খরচ ধরেছিলেন ১১ থেকে ১২ টাকা, আর বাধ্য হয়ে বিক্রি করছিলেন ৭ থেকে ৮ টাকায়; লালমনিরহাট ও কুড়িগ্রামের ২০ হাজারের বেশি চাষি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিলেন। লালমনিরহাটের হিমাগার মালিকেরা পত্রিকাটিকে জানান, হিমাগারে আর জায়গা নেই, তাই কৃষকদের ফিরিয়ে দিতে হচ্ছে। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক তখন বলেন, অনুকূল আবহাওয়ায় বাম্পার ফলন হয়েছে, বীজের দাম বেশি থাকায় খরচ বেড়েছে, আর আগের বছরের লাভে উৎসাহিত হয়ে কৃষকেরা বেশি জমিতে আলু লাগিয়েছেন।

আলু ফসল: মৌসুম, জাত ও সংরক্ষণ
আলু, বৈজ্ঞানিক নাম Solanum tuberosum, সোলানেসি পরিবারের উদ্ভিদ; বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান খাদ্য। বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী, দেশের সব জেলাতেই শীতকালে আলুর চাষ হয়, আর ভালোভাবে সার দেওয়া, রোদেলা ও মাটিতে পর্যাপ্ত আর্দ্রতা থাকা জমি আলুর জন্য উপযুক্ত। নভেম্বরের প্রথম পক্ষ আলু লাগানোর সঠিক সময়, তবে উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের কিছু এলাকায় আগাম ফসল তুলতে কৃষকেরা অক্টোবরেই আলু লাগান। প্রায় সব আলুই হাতে লাগানো হয়, দুই-তিনটি চোখযুক্ত কন্দের টুকরা দিয়ে; সারির মাঝে দূরত্ব সাধারণত ৪৫ থেকে ৬০ সেন্টিমিটার। বাড়ন্ত কন্দ যেন মাটিতে ঢাকা থেকে আলো ও পোকা থেকে সুরক্ষিত থাকে, সে জন্য সারির ওপর মাটি তুলে দেওয়া হয়।
বাংলাদেশে তথাকথিত স্থানীয় জাত ও উচ্চফলনশীল জাত, দুই ধরনের আলুই চাষ হয়। বহু আগে আসা স্থানীয় জাতগুলো স্বাদ ও রান্নার গুণের জন্য এখনও টিকে আছে; এর একটি শীল বিলাতি, যা মূলত রংপুরে চাষ হয়, কন্দ লম্বাটে ও লালচে, প্রতিটির ওজন প্রায় ৩০ গ্রাম। উচ্চফলনশীল জাতের মধ্যে নেদারল্যান্ডস থেকে আসা কার্ডিনাল সম্ভবত সবচেয়ে জনপ্রিয় বিদেশি জাত; এর কন্দ লম্বাটে ও লালচে, হেক্টরপ্রতি ফলনের সম্ভাবনা ২০ থেকে ২৫ টন। আরেক ডাচ জাত ডায়মন্টের ফলন হেক্টরে ১৮ থেকে ২৪ টন। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বারি) কন্দাল ফসল গবেষণা কেন্দ্র নতুন জাত পরীক্ষা করে, আর বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি) কৃষকদের মধ্যে প্রত্যয়িত বীজ বিতরণ করে।
পুষ্টির দিক থেকে আলু শর্করায় সমৃদ্ধ এবং আমিষ, ভিটামিন সি, বি ভিটামিন, পটাশিয়াম, ফসফরাস ও লৌহের ভালো উৎস, বাংলাপিডিয়া জানায়। বেশির ভাগ খনিজ ও আমিষ থাকে খোসার নিচের পাতলা স্তরে, আর খোসা নিজেও আঁশের উৎস।
এই ফসলের দুর্বল জায়গা সংরক্ষণ। ফেব্রুয়ারি-মার্চের কয়েক সপ্তাহে আলু তোলা হলেও খাওয়া হয় সারা বছর; তাই দাম বাড়া পর্যন্ত ফসল ধরে রাখতে কৃষক হিমাগারের ওপর নির্ভর করেন। জায়গা না পেলে তাকে হয় তোলার মৌসুমের দামেই বিক্রি করতে হয়, নয়তো ঘরে রাখতে হয়, যেখানে শুকিয়ে, পোকায় ও রোগে ক্ষতি বেশি। দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের ২০২৫ সালের অক্টোবরের তথ্যে দেশের হিমাগারের ধারণক্ষমতা ছিল ৪৫ লাখ টন, আর ২০২৪-২৫ মৌসুমের উৎপাদন ছিল প্রায় ১ দশমিক ৩ কোটি টন।
বীজও একই শৃঙ্খলের অংশ। বাংলাপিডিয়া জানায়, বেশির ভাগ কৃষক নিজের ফসল থেকে রেখে দেওয়া আলুই বীজ হিসেবে ব্যবহার করেন, যাতে পরের মৌসুমে ফলন কমে; বিএডিসি এবং পঞ্চগড়ের দেবীগঞ্জে বারির প্রজনন বীজআলু উৎপাদন কেন্দ্রের মানসম্মত বীজ পুরো চাহিদা মেটাতে পারে না। দ্য ডেইলি স্টারের ২০২৫ সালের অক্টোবরের হিসাবে প্রতিবছরের উৎপাদন থেকে প্রায় ১০ লাখ টন আলু বীজের জন্য রাখা হয়।
ছবি: কুউ পুলক / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, বাংলাপিডিয়া (এশিয়াটিক সোসাইটি অব বাংলাদেশ), দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড, দ্য ডেইলি স্টার, ঢাকা ট্রিবিউন, ইউএনবি, দ্য ডেইলি স্টার বাংলা





মন্তব্য
(০)