সরাসরিবাজারদর
আটা (প্যাকেটজাত)৫৮আদা - আমদানিকৃত১৬৭আদা - দেশী১৫৪আমন চাল - মাঝারি৫৬আমন চাল - মোটা৪৮আমন চাল - সরু৭২আয়োডিনযুক্ত লবণ (প্যাকেটজাত)৩২কাঁচা মরিচ২১৮খামারের মুরগী১৬২খাসী৯০০চিনি (দেশী)১৩২ছোলা - গোটা৮৫ডিম ফার্ম - লাল৪৭পেঁয়াজ - দেশী৬০বোরো চাল - মাঝারি৫৫বোরো চাল - মোটা৪৭বোরো চাল - সরু৬৬মাংসঃ– গরু৭২৯মুগ ডাল১২২রসুন - আমদানিকৃত১৯২রসুন - দেশী১৭৩সয়াবিন তেল১৬৩
হালনাগাদ ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬
ঢাকা২৭°মূলত পরিষ্কারআর্দ্রতা ৮৭%বাতাস কিমি/ঘ

কাঁঠাল হতে পারে রপ্তানি আয়ের নতুন দিগন্ত

বাংলাদেশের জাতীয় ফল কাঁঠাল। অথচ জাতীয় পরিচয়ের এই গুরুত্বপূর্ণ ফলটি এখনো দেশের অর্থনীতিতে তার প্রকৃত অবস্থান অর্জন করতে পারেনি। প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ কাঁঠাল উৎপাদিত হলেও এর একটি বড় অংশ বাজারজাতকরণ ও সংরক্ষণের অভাবে নষ্ট হয়ে যায়। কৃষক ন্যায্যমূল্য পান না, ভোক্তারা মৌসুমের বাইরে এই ফলের সুবিধা থেকে বঞ

ফল

বাংলাদেশের জাতীয় ফল কাঁঠাল। অথচ জাতীয় পরিচয়ের এই গুরুত্বপূর্ণ ফলটি এখনো দেশের অর্থনীতিতে তার প্রকৃত অবস্থান অর্জন করতে পারেনি। প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ কাঁঠাল উৎপাদিত হলেও এর একটি বড় অংশ বাজারজাতকরণ ও সংরক্ষণের অভাবে নষ্ট হয়ে যায়। কৃষক ন্যায্যমূল্য পান না, ভোক্তারা মৌসুমের বাইরে এই ফলের সুবিধা থেকে বঞ্চিত হন এবং দেশ হারায় সম্ভাব্য বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের সুযোগ। অথচ পরিকল্পিত উদ্যোগ গ্রহণ করা গেলে কাঁঠাল হতে পারে বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কৃষিভিত্তিক শিল্প ও রপ্তানি পণ্য।

বাংলাদেশের কৃষি খাত দীর্ঘদিন ধরে দেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করছে। খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি কৃষি গ্রামীণ অর্থনীতিকে সচল রাখছে এবং কর্মসংস্থানের বিশাল ক্ষেত্র সৃষ্টি করছে। বর্তমানে কৃষিপণ্যের উৎপাদন বৃদ্ধির পাশাপাশি মূল্যসংযোজন ও রপ্তানিমুখী শিল্প গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে কাঁঠালকে ঘিরে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হয়েছে।

কাঁঠাল বাংলাদেশের প্রায় সব অঞ্চলে জন্মে। বিশেষ করে গাজীপুর, নরসিংদী, ময়মনসিংহ, টাঙ্গাইল, সিলেট, মৌলভীবাজার, চট্টগ্রাম ও পার্বত্য অঞ্চলে এর উৎপাদন উল্লেখযোগ্য। কৃষকেরা তুলনামূলক কম খরচে কাঁঠাল চাষ করতে পারেন এবং প্রতিটি গাছ বহু বছর ধরে ফলন দেয়। ফলে এটি একটি লাভজনক কৃষিপণ্য হিসেবে বিবেচিত হওয়ার যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে।

কিন্তু বাস্তবতা হলো, কাঁঠালের উৎপাদন বাড়লেও বাজারব্যবস্থা সেই হারে উন্নত হয়নি। ফল পাকতে শুরু করলে অল্প সময়ের মধ্যেই তা বিক্রি করতে হয়। পর্যাপ্ত কোল্ড চেইন, সংরক্ষণাগার কিংবা প্রক্রিয়াজাতকরণ সুবিধা না থাকায় কৃষকেরা বাধ্য হয়ে অনেক সময় কম দামে ফল বিক্রি করেন। উৎপাদন বেশি হলে বাজারে দাম কমে যায়, আর ক্ষতির বোঝা বহন করতে হয় কৃষকদেরই।

বিশ্বব্যাপী কৃষিপণ্যের বাজারে এখন মূল্যসংযোজিত পণ্যের চাহিদা দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। কাঁচা কৃষিপণ্য রপ্তানির তুলনায় প্রক্রিয়াজাত পণ্য অনেক বেশি লাভজনক। উদাহরণ হিসেবে থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম, ফিলিপাইন ও মালয়েশিয়ার কথা বলা যায়। এসব দেশ তাদের ফলমূল প্রক্রিয়াজাত করে আন্তর্জাতিক বাজারে বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করছে। বাংলাদেশও যদি কাঁঠালকে কেন্দ্র করে একটি আধুনিক শিল্পখাত গড়ে তুলতে পারে, তাহলে কৃষি অর্থনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ হবে।

বর্তমানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কাঁঠালকে 'সুপার ফুড' হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। পুষ্টিগুণে সমৃদ্ধ এই ফলে রয়েছে ভিটামিন এ, ভিটামিন সি, পটাশিয়াম, ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেশিয়াম, খাদ্যআঁশ এবং বিভিন্ন ধরনের অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট। স্বাস্থ্যসচেতন মানুষের কাছে কাঁঠালের গ্রহণযোগ্যতা বাড়ছে। বিশেষ করে ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকায় উদ্ভিজ্জ খাদ্যের চাহিদা বৃদ্ধি পাওয়ায় কাঁচা কাঁঠাল নতুন গুরুত্ব পেয়েছে।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বর্তমানে কাঁচা কাঁঠালকে মাংসের বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। নিরামিষভোজী ও ভেগান জনগোষ্ঠীর মধ্যে কাঁঠালের জনপ্রিয়তা দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে। কাঁচা কাঁঠালের আঁশযুক্ত গঠন রান্নার পর অনেকটা মাংসের মতো অনুভূতি দেয়। ফলে বিভিন্ন রেস্তোরাঁ ও খাদ্যপ্রতিষ্ঠান এটি ব্যবহার করছে। এই বৈশ্বিক প্রবণতা বাংলাদেশের জন্য একটি বড় সুযোগ তৈরি করেছে।

তবে সুযোগকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। শুধু উৎপাদন বৃদ্ধি করলেই হবে না, উৎপাদিত কাঁঠালকে বাজারোপযোগী পণ্যে রূপান্তর করতে হবে। বর্তমানে দেশের বিভিন্ন স্থানে সীমিত পরিসরে কাঁঠালের চিপস, জ্যাম, জেলি ও ক্যান্ডি উৎপাদিত হলেও তা শিল্পপর্যায়ে পৌঁছাতে পারেনি। প্রয়োজন আধুনিক প্রযুক্তি, উদ্যোক্তা উন্নয়ন, বিনিয়োগ এবং সরকারি নীতিগত সহায়তা।

বাংলাদেশ যখন স্মার্ট অর্থনীতি ও রপ্তানিমুখী উন্নয়নের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, তখন কাঁঠালের মতো একটি সম্ভাবনাময় সম্পদকে অবহেলা করার সুযোগ নেই। জাতীয় ফলের মর্যাদাকে অর্থনৈতিক শক্তিতে রূপান্তর করতে হলে এখনই সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। কৃষি, শিল্প, বাণিজ্য এবং রপ্তানি নীতির সমন্বয়ের মাধ্যমে কাঁঠালকে দেশের নতুন অর্থনৈতিক সম্ভাবনার প্রতীকে পরিণত করা সম্ভব।

বিশ্ব অর্থনীতির বর্তমান বাস্তবতায় কৃষিপণ্যের কাঁচামাল বিক্রির চেয়ে প্রক্রিয়াজাত পণ্য রপ্তানি অনেক বেশি লাভজনক। একটি কৃষিপণ্য যখন প্রক্রিয়াজাত হয়ে বহুমুখী পণ্যে রূপান্তরিত হয়, তখন তার মূল্য কয়েক গুণ বৃদ্ধি পায়। বাংলাদেশে উৎপাদিত কাঁঠালের ক্ষেত্রেও একই সম্ভাবনা বিদ্যমান। কিন্তু যথাযথ পরিকল্পনার অভাবে এই সম্ভাবনার বড় অংশ এখনো অনাবিষ্কৃত রয়ে গেছে।

বাংলাদেশের কৃষি ও অর্থনীতির ভবিষ্যৎ সম্ভাবনার দিকে তাকালে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে: কাঁঠাল শুধু একটি ফল নয়, এটি হতে পারে গ্রামীণ উন্নয়ন, শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান এবং বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের নতুন দিগন্ত। সেই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার জন্য এখন প্রয়োজন দূরদর্শী সিদ্ধান্ত, কার্যকর নীতি এবং দ্রুত বাস্তবায়ন। তাই এখনই সময় কাঁঠালকে শুধু মৌসুমি ফল হিসেবে না দেখে একটি কৌশলগত অর্থনৈতিক সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করার।

বর্তমানে বিশ্ববাজারে কাঁঠাল থেকে উৎপাদিত বিভিন্ন খাদ্যপণ্যের চাহিদা ক্রমাগত বাড়ছে। কাঁঠালের চিপস, জ্যাম, জেলি, ক্যান্ডি, ফ্রোজেন কাঁঠাল, শুকনো কাঁঠাল, কাঁঠালের পাউডার, জুস এবং কাঁচা কাঁঠালভিত্তিক উদ্ভিজ্জ খাদ্য ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা, মধ্যপ্রাচ্য ও পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশে জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে। স্বাস্থ্যকর খাদ্যের প্রতি মানুষের আগ্রহ বৃদ্ধি পাওয়ায় কাঁঠালকে অনেকেই ভবিষ্যতের গুরুত্বপূর্ণ খাদ্যসম্পদ হিসেবে বিবেচনা করছেন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, আগামী দশকে উদ্ভিজ্জ খাদ্যপণ্যের বাজার আরও সম্প্রসারিত হবে। জলবায়ু পরিবর্তন, পরিবেশগত সচেতনতা এবং স্বাস্থ্যঝুঁকি কমানোর চিন্তা থেকে বিশ্বের বহু মানুষ প্রাণিজ খাদ্যের বিকল্প খুঁজছেন। কাঁচা কাঁঠাল এই চাহিদার একটি কার্যকর সমাধান হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। বাংলাদেশের জন্য এটি একটি বিরল সুযোগ, কারণ কাঁঠাল আমাদের দেশে সহজলভ্য এবং তুলনামূলক কম খরচে উৎপাদন করা সম্ভব।

কাঁঠালের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো এর প্রায় প্রতিটি অংশ ব্যবহারযোগ্য। কাঁঠালের কোয়া যেমন সুস্বাদু খাদ্য, তেমনি বিচিও অত্যন্ত পুষ্টিকর। কাঁঠালের বিচি থেকে ময়দা, বিস্কুট, স্ন্যাকস এবং বিভিন্ন খাদ্যপণ্য তৈরি করা সম্ভব। খোসা ও অন্যান্য অবশিষ্টাংশ পশুখাদ্য এবং জৈব সার উৎপাদনে ব্যবহার করা যায়। অর্থাৎ কাঁঠালভিত্তিক শিল্পে অপচয়ের পরিমাণ খুবই কম।

বাংলাদেশে যদি কাঁঠাল প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্র গড়ে তোলা যায়, তাহলে গ্রামীণ অর্থনীতিতে একটি নতুন শিল্পবিপ্লবের সূচনা হতে পারে। কাঁঠাল উৎপাদনকারী অঞ্চলে ছোট ও মাঝারি শিল্পপ্রতিষ্ঠান স্থাপন করলে স্থানীয় জনগণের কর্মসংস্থান বাড়বে। পরিবহন, সংরক্ষণ, প্যাকেজিং, বিপণন এবং রপ্তানির সঙ্গে যুক্ত হয়ে হাজার হাজার মানুষের নতুন আয়ের সুযোগ সৃষ্টি হবে।

বর্তমানে দেশে তৈরি পোশাকশিল্পের ওপর বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের বড় অংশ নির্ভরশীল। অর্থনীতির দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতার জন্য রপ্তানি পণ্যের বহুমুখীকরণ অত্যন্ত জরুরি। কৃষিপণ্যভিত্তিক রপ্তানি খাত এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। কাঁঠাল ও কাঁঠালজাত পণ্য রপ্তানি সেই বহুমুখীকরণের একটি সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র।

তবে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশ করতে হলে মান নিয়ন্ত্রণকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। উৎপাদন, সংগ্রহ, সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং প্যাকেজিংয়ের প্রতিটি ধাপে আন্তর্জাতিক মান অনুসরণ করতে হবে। আধুনিক পরীক্ষাগার, খাদ্যনিরাপত্তা সনদ এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ড পূরণ করতে না পারলে বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতা করা কঠিন হবে।

এ ক্ষেত্রে সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি উদ্যোক্তাদেরও এগিয়ে আসতে হবে। কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠান, বিশ্ববিদ্যালয়, রপ্তানি উন্নয়ন সংস্থা এবং শিল্প উদ্যোক্তাদের সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া কাঁঠালভিত্তিক শিল্প গড়ে তোলা সম্ভব নয়। একই সঙ্গে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে সহজ শর্তে ঋণ প্রদানের ব্যবস্থা করতে হবে, যাতে নতুন উদ্যোক্তারা এই খাতে বিনিয়োগে উৎসাহিত হন।

বর্তমান বিশ্বে কৃষিকে আর শুধু খাদ্য উৎপাদনের খাত হিসেবে দেখা হয় না। কৃষি এখন শিল্প, বাণিজ্য, কর্মসংস্থান এবং রপ্তানি আয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস। যে দেশ কৃষিপণ্যকে মূল্যসংযোজনের মাধ্যমে বিশ্ববাজারে পৌঁছে দিতে পারে, সেই দেশই কৃষি অর্থনীতির প্রকৃত সুফল ভোগ করে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও একই বাস্তবতা প্রযোজ্য।

বাংলাদেশে কাঁঠালকে ঘিরে একটি সমন্বিত শিল্পখাত গড়ে তুলতে হলে সর্বপ্রথম প্রয়োজন জাতীয় পর্যায়ের একটি সুস্পষ্ট নীতিমালা। কৃষি, শিল্প, বাণিজ্য ও রপ্তানি খাতের মধ্যে সমন্বয় ঘটিয়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। জাতীয় ফল হিসেবে কাঁঠালের উন্নয়ন ও বাজার সম্প্রসারণের জন্য একটি পৃথক কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করা যেতে পারে।

কাঁঠাল উৎপাদনকারী জেলাগুলোতে আধুনিক সংগ্রহ ও প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্র স্থাপন করা জরুরি। বর্তমানে কৃষকদের উৎপাদিত ফল স্থানীয় বাজারেই বিক্রি করতে হয়। কিন্তু উৎপাদন এলাকায় প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা গড়ে উঠলে কৃষকেরা সরাসরি শিল্পকারখানায় কাঁচামাল সরবরাহ করতে পারবেন। এতে মধ্যস্বত্বভোগীদের প্রভাব কমবে এবং কৃষকেরা ন্যায্যমূল্য পাবেন।

কোল্ড স্টোরেজ ও কোল্ড চেইন অবকাঠামোর উন্নয়নও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ফল সংগ্রহের পর দ্রুত সংরক্ষণের ব্যবস্থা না থাকলে এর মান নষ্ট হয়ে যায়। আধুনিক সংরক্ষণ প্রযুক্তি ব্যবহার করলে কাঁঠালের সংরক্ষণকাল বৃদ্ধি করা সম্ভব হবে এবং রপ্তানির জন্য উপযোগী রাখা যাবে।

গবেষণার ক্ষেত্রেও বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। বাংলাদেশের কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোকে কাঁঠালের উন্নত জাত উদ্ভাবন, রোগবালাই নিয়ন্ত্রণ, ফলের গুণগত মান বৃদ্ধি এবং নতুন নতুন প্রক্রিয়াজাত পণ্য উদ্ভাবনের ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা সংস্থাগুলোর সঙ্গে শিল্প উদ্যোক্তাদের সমন্বয় ঘটানোও প্রয়োজন।

উদ্যোক্তাদের জন্য সহজ শর্তে ঋণ, কর-রেয়াত এবং বিনিয়োগ সহায়তা নিশ্চিত করা গেলে এই খাতে নতুন বিনিয়োগ আসবে। অনেক তরুণ উদ্যোক্তা কৃষিভিত্তিক শিল্পে আগ্রহী হলেও প্রয়োজনীয় পুঁজি ও প্রযুক্তিগত সহায়তার অভাবে এগিয়ে যেতে পারেন না। সরকারি প্রণোদনা এ ক্ষেত্রে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারে।

রপ্তানি বাজার সম্প্রসারণের জন্য আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কাঁঠালজাত পণ্যের ব্র্যান্ডিংও জরুরি। যেমন থাইল্যান্ড তাদের ফলকে বিশ্ববাজারে সফলভাবে পরিচিত করেছে, তেমনি বাংলাদেশকেও 'বাংলাদেশি জ্যাকফ্রুট' নামে একটি স্বতন্ত্র ব্র্যান্ড গড়ে তুলতে হবে। আন্তর্জাতিক খাদ্যমেলা, বাণিজ্য প্রদর্শনী এবং কূটনৈতিক মিশনের মাধ্যমে বিদেশি বাজারে প্রচারণা জোরদার করা যেতে পারে।

বিদেশে অবস্থানরত বাংলাদেশি প্রবাসীরাও কাঁঠালজাত পণ্যের সম্ভাব্য বাজার তৈরি করতে পারেন। মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা এবং এশিয়ার বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশি ও দক্ষিণ এশীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে কাঁঠালের চাহিদা রয়েছে। এই বাজারকে আরও সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিতে হবে।

বাংলাদেশ বর্তমানে টেকসই উন্নয়ন, রপ্তানি বহুমুখীকরণ এবং খাদ্য প্রক্রিয়াজাত শিল্প সম্প্রসারণের যে লক্ষ্য নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে, কাঁঠাল সেই লক্ষ্য অর্জনের একটি কার্যকর মাধ্যম হতে পারে। জাতীয় ফল হিসেবে কাঁঠালের মর্যাদা শুধু পাঠ্যপুস্তক বা আনুষ্ঠানিক ঘোষণার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে এটিকে জাতীয় অর্থনীতির একটি শক্তিশালী খাতে পরিণত করা সময়ের দাবি।

বিশ্ববাজারে যখন স্বাস্থ্যকর খাদ্য ও উদ্ভিজ্জ পণ্যের চাহিদা দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে, তখন বাংলাদেশের জন্য এটি একটি সুবর্ণ সুযোগ। আজ যে কাঁঠাল গ্রামীণ হাটে অল্প দামে বিক্রি হচ্ছে, সঠিক পরিকল্পনা ও বিনিয়োগের মাধ্যমে সেই কাঁঠালই আগামী দিনে দেশের জন্য কোটি কোটি ডলারের রপ্তানি আয় বয়ে আনতে পারে। তাই সরকার, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, উদ্যোক্তা, কৃষক এবং রপ্তানিকারকদের সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে কাঁঠালকে কেন্দ্র করে একটি শক্তিশালী মূল্যসংযোজনভিত্তিক শিল্প গড়ে তোলা এখন সময়ের অপরিহার্য দাবি। জাতীয় সম্পদকে জাতীয় শক্তিতে রূপান্তরের এই সুযোগ হাতছাড়া করা উচিত হবে না।

বাংলাদেশের কৃষি ও অর্থনীতির ভবিষ্যৎ সম্ভাবনার দিকে তাকালে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে: কাঁঠাল শুধু একটি ফল নয়, এটি হতে পারে গ্রামীণ উন্নয়ন, শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান এবং বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের নতুন দিগন্ত। সেই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার জন্য এখন প্রয়োজন দূরদর্শী সিদ্ধান্ত, কার্যকর নীতি এবং দ্রুত বাস্তবায়ন। তাই এখনই সময় কাঁঠালকে শুধু মৌসুমি ফল হিসেবে না দেখে একটি কৌশলগত অর্থনৈতিক সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করার।

সরকারের দূরদর্শী পদক্ষেপ, বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ এবং জনগণের সচেতন অংশগ্রহণের মাধ্যমে কাঁঠালভিত্তিক শিল্প ও রপ্তানি খাতকে জাতীয় অর্থনীতির একটি শক্তিশালী ভিত্তিতে পরিণত করা সম্ভব। দেশের কৃষি ও শিল্প উন্নয়নের স্বার্থে কাঁঠাল প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং রপ্তানির কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ ও দ্রুত বাস্তবায়ন করা জরুরি।

লেখক : শিক্ষক, প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি, বাংলাদেশ সরকারি মাধ্যমিক শিক্ষক সমিতি (কৃষি), কেন্দ্রীয় কমিটি। যুগ্ম মহাসচিব, নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা), কেন্দ্রীয় কমিটি। [email protected]

জাগো নিউজ ২৪দা এগ্রো নিউজ

ফল

সম্পর্কিত খবর

ফল

এআই দিয়ে স্ট্রবেরির জাত উদ্ভাবন: জাপানের Culta এখন বিশ্ববাজারের দিকে

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় ফলের জাত উদ্ভাবন করে চুক্তিবদ্ধ চাষির মাধ্যমে ব্র্যান্ডেড ফল বিক্রি করা জাপানি স্টার্টআপ Culta অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপে আলোচনা চালাচ্ছে; ২০৩২ সালের মধ্যে তাদের লক্ষ্য ৩ হাজার কোটি ইয়েন (১৯ কোটি ৫০ লাখ ডলার) আয়।

এজিফান্ডনিউজ ২৪১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬৩ মিনিটের পড়া
ফল

গৃহবন্দি সময় কাটে ফেসবুক-ইউটিউবে, ড্রাগন চাষে সফল ইব্রাহীম

করোনাকালে গৃহবন্দি ছিলেন মাগুরার মো. ইব্রাহীম। কাজের ব্যস্ততা ছিল না। অবসর কাটাতে ফেসবুক ও ইউটিউবে ঘুরে বেড়াতেন। একদিন ড্রাগন ফল চাষের একটি ভিডিও তার নজরে আসে। এরপর একের পর এক ভিডিও দেখতে থাকেন। ধীরে ধীরে ড্রাগন চাষের প্রতি আগ্রহ তৈরি হয়। একসময় অনলাইনে দেখা সেই ধারণাকে বাস্তবে রূপ দিতে শুরু করেন চাষ

জাগো নিউজ ২৪১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬৩ মিনিটের পড়া
ফল

জ্যাম-জেলি নয়, এবার পেয়ারা দিয়ে বানান টক-মিষ্টি তরকারি

আমাদের দেশে পেয়ারা সাধারণত পাকা ফল হিসেবেই বেশি খাওয়া হয়। পাকা পেয়ারা কেটে খাওয়া, জ্যাম, জেলি কিংবা বিভিন্ন মিষ্টি পদে ব্যবহার-এসবই বেশ পরিচিত। কিন্তু পেয়ারা যে শুধু ফল হিসেবে খাওয়ার জন্য নয়, তা জানলে অনেকেই অবাক হতে পারেন। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে কাঁচা বা আধাপাকা পেয়ারা দিয়ে নানা ধরনের রান্না করার চল

জাগো নিউজ ২৪১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬২ মিনিটের পড়া

মন্তব্য

()