জুম ধান সাধারণত চাষ হয় পাহাড়ের ঢালে। কিন্তু ২০২৫ সালের আমন মৌসুমে দক্ষিণ-পশ্চিমের সমতলের জেলা ঝিনাইদহে এক কৃষক সেই ধান চাষ করেছেন সমতলের জমিতে। ঝিনাইদহ সদর উপজেলার কুমড়াবাড়িয়া ইউনিয়নের রামনগর গ্রামের কৃষক আব্দুর রহিম 'সেন্টু পাজাম ২১' নামের পাহাড়ি জাতের ধান লাগিয়েছিলেন উঁচু একখণ্ড পতিত জমিতে। কম সেচ, কম সার ও কম কীটনাশকে তিনি পেয়েছেন তার ভাষায় দারুণ ফলন। ২০২৫ সালের ১৪ নভেম্বর জাগো নিউজ এই খেতের খবর প্রকাশ করে। পাহাড়ি জাতের ধান সমতলের জমিতে বেশি ফলন দেওয়ায় জেলার কৃষি বিভাগ এতে নতুন সম্ভাবনা দেখছে বলে জানায়।
এর এক দিন আগে, ২০২৫ সালের ১৩ নভেম্বর, রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা বাসসও একই খেতের খবর দেয়। বাসসের প্রতিবেদনে বলা হয়, চলতি রোপা আমন মৌসুমে আব্দুর রহিম উঁচু ভিটা জমিতে এই বীজ বুনেছিলেন, আর বীজ তার কাছে কুরিয়ার সার্ভিসে এসেছিল শেরপুর থেকে, যে জেলায় জাতটি উদ্ভাবিত হয়েছে।
অনলাইনে কেনা তিন কেজি বীজ
ইন্টারনেটে এই ধানের ব্যতিক্রমী চাষাবাদ দেখে আগ্রহী হন আব্দুর রহিম। অনলাইনে মাত্র ৩ কেজি বীজ অর্ডার করেন তিনি, পরে সেই বীজ রোপণ করেন পতিত জমিতে। জাগো নিউজকে তিনি বলেন, 'অনলাইনে যোগাযোগ করে ৩ কেজি বীজ কিনি। কুরিয়ার সার্ভিসে বীজ আমার ঠিকানায় চলে আসে। সেই বীজ রোপণ করেছি। আমন ধানে যে পরিমাণ সেচ লাগে, এই ধান চাষে তার ১০ শতাংশ সেচও লাগেনি। সার-কীটনাশকের ব্যবহার একেবারেই সীমিত। উৎপাদন খরচ বিঘাপ্রতি ৭-৮ হাজার টাকা।'
তিনি জানান, ১০ কাঠা জমিতে তিনি এই ধান লাগিয়েছেন। নিজের ভাগিনাসহ আরও একজনকে বীজ দিয়েছিলেন, তারাও দারুণ ফলন পেয়েছেন। তার কথায়, 'আমন ধানের অর্ধেক খরচে বেশি ফলন এ ধানে। আমার ১০ কাঠা জমিতে প্রায় ২৫-২৬ মণ ধান পাবো। আগামী মৌসুমে আরও বেশি জমিতে এটি চাষ করার পরিকল্পনা আছে।' খরচ ও সম্ভাব্য ফলনের এই হিসাব কৃষকের নিজের খেতের অভিজ্ঞতা থেকে দেওয়া; এটি সরকারি শস্য কর্তন পরিমাপ নয়।
রামনগর গ্রামের আরেক কৃষক এলাহি মন্ডল প্রতিদিন নিজের মাঠে যাওয়া-আসার পথে খেতটি দেখেন। জাগো নিউজকে তিনি বলেন, 'প্রতিবেশী আব্দুর রহিম এ ধান চাষ করেছেন। ভাবতাম, বাঁশ বাগানের পাশে পতিত জমিতে এ ধান লাগিয়েছে, ধান হবে না। সেচ দেয় না, সার দেয় না, ধান ভালো হবে না। এখন তো ধানের ফলন দেখে অবাক। এত কম খরচে এত বেশি ফলন খুব কমই দেখা যায়। আগামী মৌসুমে আমিও এ ধান চাষ করবো।'
উপজেলা কৃষি কার্যালয় যা দেখেছে
ঝিনাইদহ সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. নূর এ নবী জানান, ধানটির আবাদ প্রক্রিয়া দেখে তারাও অবাক হয়েছেন। জাগো নিউজকে তিনি বলেন, 'যে জমিতে ধান চাষ করা হয়েছে, সেই জমি উঁচু জায়গা। এ ধান আবাদে কৃষকের আমন ধানের মতো অতিরিক্ত সেচ লাগেনি। সার-কীটনাশকও সীমিত ব্যবহার করেছেন। ধানটি আকারে কিছুটা মোটা। সমতল জমিতে এ ধানের চাষ ও ফলন অনেক ভালো হয়েছে। প্রতিটি ডগা বা বাইলে প্রায় ৩শ'র বেশি ধান পেয়েছি। আশা করছি, এ ধানের আবাদ আরও বাড়বে।'
বাসসকে একই কর্মকর্তা বলেন, এই ধান চাষে আমন ধানের মতো অতিরিক্ত সেচ লাগে না, সার ও কীটনাশকও লাগে সীমিত, এমনকি পোকামাকড়ের আক্রমণও এই ধানে কম হয়। ঝিনাইদহের সমতল জমিতে এই ধানের চাষ ও ফলন দেখে তারা বিস্মিত হয়েছেন এবং আশা করছেন এর আবাদ আরও বাড়বে।
প্রতিবেদনে এই জাতের জন্য সার বা কীটনাশকের কোনো নির্দিষ্ট মাত্রা দেওয়া হয়নি, এখানেও দেওয়া হলো না। কেউ এই ধান চাষ করতে চাইলে নিজের জমির জন্য বীজ, বোনার সময় ও পরিচর্যা নিয়ে আগে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা বা ইউনিয়নের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তার পরামর্শ নেওয়া উচিত।
সেন্টু পাজাম ২১: শেরপুরের এক কৃষকের উদ্ভাবিত জাত
দুই প্রতিবেদনেই উদ্ধৃত কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, 'সেন্টু পাজাম ২১' জাতের ধান চাষ হয় শেরপুর, জামালপুর ও নেত্রকোনা এবং পাহাড়ি অঞ্চলে, পাহাড় ও টিলার ঢালে; আমন মৌসুমে জুম ধান হিসেবে এর আবাদ হয়ে থাকে। এর উদ্ভাবক শেরপুরের নালিতাবাড়ী উপজেলার কৃষক সেন্টু কুমার হাজং, তার নামেই জাতের নামকরণ। উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার বর্ণনায়, এটি মূলত দেশি পাজাম ও ভারতীয় রঞ্জিত (পাজাম) ধানের মিশ্রণে তৈরি একটি উচ্চফলনশীল জাত।
নালিতাবাড়ী থেকে আগের প্রতিবেদনগুলোতেও জাতটির উৎপত্তির একই বিবরণ পাওয়া যায়। ২০২১ সালের ১৮ ডিসেম্বর প্রথম আলো জানায়, পাঁচ বছর ধরে দেশি পাইজামের সঙ্গে ভারতীয় রঞ্জিত (পাইজাম) ধানের সংকরায়ণ করে ২০১৯ সালে সেন্টু হাজং নতুন জাতটি উদ্ভাবন করেন এবং নিজের নামের সঙ্গে মিলিয়ে এর নাম রাখেন 'সেন্টু-২১'। এর চাল অনেকটা পাইজামের মতো চিকন। পত্রিকাটির হিসাবে, পাইজামের ফলন একরে ৩৫ থেকে ৪০ মণ, আর সেন্টু-২১ এর ফলন একরে ৬০ থেকে ৭০ মণ। বীজতলা থেকে ফসল কাটা পর্যন্ত সেন্টু-২১ এ সময় লাগে ১৫০ থেকে ১৫৫ দিন, পাইজামে লাগে ১৬০ দিন। এই ধানে তেমন পরিচর্যা লাগে না, পোকামাকড়ের আক্রমণও কম হয় বলে প্রতিবেদনে বলা হয়।
জাতটি ছড়িয়েছে কৃষকের হাত থেকে কৃষকের হাতে। ওই প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২১ সালের আমন মৌসুমে সেন্টু হাজং ও আরও চার কৃষকের কাছ থেকে বীজ নিয়ে নালিতাবাড়ীর দেড় থেকে দুই হাজার কৃষক সেন্টু-২১ আবাদ করেন, আর স্থানীয় বাজারেও এর বীজ বিক্রি হচ্ছিল। ভটপুর গ্রামের এক কৃষক পত্রিকাটিকে জানান, আগের মৌসুমে তিনি একরে ৬০ থেকে ৬৫ মণ ফলন পেয়েছেন, একরপ্রতি খরচ হয়েছে ১২ হাজার টাকা, আর প্রতি মণ ধান বিক্রি করেছেন ১ হাজার ৩০০ টাকায়। নালিতাবাড়ী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা তখন জানান, পরের আমন মৌসুমে তারা এই ধান ট্রায়াল হিসেবে চাষ করবেন এবং ফলাফল দেখে সরকারি অনুমোদনের জন্য বীজ প্রত্যয়ন এজেন্সিতে পাঠাবেন।
২০২২ সালের ১৫ ডিসেম্বর ঢাকা মেইল জানায়, 'সেন্টু পাইজাম' নামেও পরিচিত এই জাত নালিতাবাড়ীতে বেশ আলোড়ন তুলেছে। আন্ধারুপাড়া গ্রামের এক কৃষক জানান, তিনি এই ধানে একরে শুকনো ৫০ থেকে ৬০ মণ ফলন পেয়েছেন, আর তখন স্থানীয় বাজারে সেন্টু পাইজামের দাম ছিল প্রতি মণ ১ হাজার ৩৫০ থেকে ১ হাজার ৪৫০ টাকা। ২০২৩ সালের ১০ মে প্রতিদিনের বাংলাদেশ জানায়, শেরপুরের নালিতাবাড়ী ও ঝিনাইগাতী এবং ময়মনসিংহের হালুয়াঘাটসহ আশপাশের উপজেলায় কয়েক হাজার একর জমিতে কৃষকেরা সেন্টু হাজংয়ের উদ্ভাবিত ধান চাষ করেছেন।

নালিতাবাড়ীর কৃষক-গবেষক সেন্টু কুমার হাজং
সেন্টু হাজংয়ের কাজের শুরু একটি ছোট প্রশিক্ষণ থেকে। ২০২৩ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি প্রথম আলো জানায়, ২০০৫ সালে একটি বেসরকারি সংস্থা দরিদ্র কৃষকদের ধানের সংকরায়ণ ও নতুন জাত উদ্ভাবনের কৌশল শিখিয়েছিল, আর সেখানে তিন দিনের প্রশিক্ষণ কর্মশালায় যোগ দিয়েছিলেন তিনি। ২০২০ সালের সেপ্টেম্বরে বাংলা ট্রিবিউন জানিয়েছিল, প্রশিক্ষণটি তিনি নিয়েছিলেন কারিতাস থেকে। পত্রিকাগুলোর বর্ণনায়, এরপর থেকে নতুন নতুন ধানের ধরন বের করাই তার ধ্যানজ্ঞান।
তিনি হাতে ধানের সংকরায়ণ করেন, প্রতিটি সংকরের বীজ টবে লাগান, ভালো গাছ থেকে বীজ রাখেন, তারপর আমন মৌসুমে প্রায় ৬৫ শতক জমিতে ছোট ছোট প্লটে তা চাষ করেন। ২০২৩ সালে প্রথম আলো তার বাড়ির আঙিনায় খড়ের ছাউনির একটি ছোট ঘরের বর্ণনা দেয়: ভেতরে ২৫ থেকে ৩০টি প্লাস্টিকের টব, বীজধানের বস্তা, আর একটি বড় ড্রামে ১৭ বছরে সংগৃহীত ২৭০ ধরনের ধানের নমুনা, প্রতিটি গোছায় লেখা জাত, উচ্চতা, সময় ও ধরন। পত্রিকাটির তথ্যমতে, সেখানে ছিল তার নিজের সংকরায়ণে বের করা ২৩ ধরনের ধান। ২০২২ সালের ডিসেম্বরে ঢাকা মেইল জানায়, একটি নতুন জাত বের করতে তার প্রায় ৭ বছর লাগে এবং নিজের জমিতে তিনি ৩৭০টি ট্রায়াল প্লট তৈরি করেছেন।
সেন্টু-২১ এর আগেই তার একটি জাত পরিচিতি পায়। প্রথম আলোর তথ্য অনুযায়ী, সাত বছরের চেষ্টায় ২০১৬ সালে বিআর-১১ এর সঙ্গে চিনিশাইল ধানের সংকরায়ণ করে তিনি নতুন একটি ধরন বের করেন। এর ফলন একরে ৪৫ থেকে ৫৫ মণ, যেখানে সাধারণ ধানে হয় ৩০ থেকে ৩৫ মণ; গাছের উচ্চতা সাড়ে তিন থেকে চার ফুট, গাছ শক্ত বলে সহজে বাতাসে হেলে পড়ে না; সময় লাগে ১৪০ দিন। প্রতিদিনের বাংলাদেশ এই ধরনের নাম লিখেছে সেন্টুশাইল। নালিতাবাড়ী উপজেলা কৃষি কার্যালয়ের তথ্যমতে, সে বছর শুধু ওই উপজেলাতেই সাড়ে ছয় হাজার একর জমিতে এই ধান চাষ হয়েছিল।
তার বাড়ি যে নালিতাবাড়ীতে, সেটি শেরপুর জেলার একটি উপজেলা, যার উত্তরে ভারতের মেঘালয় রাজ্য। বাংলাপিডিয়া এই উপজেলার আদিবাসী জনগোষ্ঠী হিসেবে গারো, হাজং, হদি, মান্দাই ও কোচদের নাম উল্লেখ করেছে, আর প্রধান ফসল হিসেবে ধান, পাট, গম, আলু, সরিষা ও শাকসবজি। বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী, হাজং একটি আদিবাসী জনগোষ্ঠী, যাদের বসবাস বৃহত্তর ময়মনসিংহের পাহাড়সংলগ্ন ভূমিতে, যেমন শ্রীবর্দী, ঝিনাইগাতী, হালুয়াঘাট, নালিতাবাড়ী ও দুর্গাপুরে। বাংলাপিডিয়া আরও জানায়, উত্তর-পূর্বাঞ্চলের অনেক পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর মতো হাজংরা জুমচাষে অভ্যস্ত ছিল না; প্রাচীনকাল থেকেই তারা হালচাষের মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করত।
নতুন ধানের জাত যেভাবে অনুমোদন পায়
সেন্টু হাজংকে নিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলোতে বলা হয়, সরকারিভাবে তার ধানগুলো নিয়ে মাঠপর্যায়ে কোনো পরীক্ষা-নিরীক্ষা হয়নি, কোনো স্বীকৃতিও তিনি পাননি। এ বিষয়ে ২০২৩ সালে বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের (ব্রি) তৎকালীন মহাপরিচালক প্রথম আলোকে প্রক্রিয়াটি ব্যাখ্যা করেন। তার কথায়, একজন কৃষক জাত উদ্ভাবন করতে পারেন। বিভিন্ন স্থানে পরীক্ষামূলক চাষের পর জাতটির বীজ দিতে হবে বীজ প্রত্যয়ন এজেন্সিতে। তারা দেশের ১০টি অঞ্চলে জাতটি পরীক্ষামূলক চাষ করে দেখবে, প্রচলিত জাতের চেয়ে ভালো কি না। ভালো হলে তা যাবে ন্যাশনাল টেকনিক্যাল কমিটিতে, সেখানে পর্যালোচনার পর জাতীয় বীজ বোর্ডে। বীজ বোর্ড অনুমোদন দিলে ধানের নামসহ জাতটি সরকারি গেজেটে অন্তর্ভুক্ত হবে। তিনি বলেন, সেন্টু হাজং চাইলে আবেদন করতে পারেন।
বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী, বীজ প্রত্যয়ন এজেন্সি ১৯৭৪ সালে গাজীপুরে কৃষি মন্ত্রণালয়ের একটি নিয়ন্ত্রক দপ্তর হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। এর মূল কাজ কৃষকের কাছে মানসম্পন্ন প্রত্যয়িত বীজ পৌঁছানো নিশ্চিত করা। মাঠে বীজ-ফসল পরিদর্শন, গাজীপুর ও ঈশ্বরদীর পরীক্ষাগারে বীজের নমুনা পরীক্ষা এবং নিয়ন্ত্রিত ফসলের জাত মূল্যায়ন ও ছাড়করণ প্রক্রিয়ার সমন্বয় এর কাজের মধ্যে পড়ে। প্রত্যয়নের কাজে সংস্থাটি জাতীয় বীজ বোর্ডের অনুমোদিত পদ্ধতি অনুসরণ করে।
বাংলাপিডিয়ার বর্ণনায় ব্রি একটি স্বায়ত্তশাসিত গবেষণা প্রতিষ্ঠান, ১৯৭০ সালে গাজীপুরের জয়দেবপুরে প্রতিষ্ঠিত, যার কাজ দেশের বিভিন্ন ধান-পরিবেশের উপযোগী জাত ও চাষের কৌশল উদ্ভাবন। ২০২৩ সালে বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিনা) মহাপরিচালক, যিনি সেন্টু হাজংয়ের বাড়িতেও গিয়েছিলেন, প্রথম আলোকে বলেন, সেন্টু হাজং হাতে ধানের পরাগায়ন ও নির্বাচন করেন; তার ধানের দানা, গাছের ধরন, ফলন ও স্বাদ আগে দেখতে হবে; তারা তার ধানও পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখবেন, কারণ স্থানীয় কৃষকদের উদ্ভাবিত ধান মূল্যায়নের প্রয়োজন রয়েছে।
জুম চাষ কী
জুম, যাকে জুমিং বা স্থানান্তরিত চাষও বলা হয়, পাহাড়ে গাছপালা কেটে পুড়িয়ে চাষের পদ্ধতি। বাংলাপিডিয়া একে বাংলাদেশের পাহাড়ি এলাকার সবচেয়ে প্রচলিত চাষপদ্ধতি বলেছে, যা এখনও পার্বত্য চট্টগ্রামে সংরক্ষিত বনের বাইরের ঢালু পাহাড়ে চলে। এপ্রিলে প্রথম বৃষ্টির পর বীজ বোনা হয়। দা নামের চওড়া ফলার ছুরি দিয়ে পুরো জমিতে ছোট ছোট গর্ত করে তাতে নানা ফসলের মিশ্র বীজ দেওয়া হয়: ধান, ভুট্টা, কাউন, তিল, শসা, মিষ্টিকুমড়া, তরমুজজাতীয় ফল, বরবটি, তুলা, কলা, আদা ও হলুদ। আগাছা নিড়ানো হয় খুব কম, আর জুলাই থেকে ডিসেম্বরের মধ্যে ফসল যেমন যেমন পাকে, একে একে কাটা হয়।
বাংলাপিডিয়ার হিসাবে, প্রতিবছর প্রায় ২০ হাজার হেক্টর জমি জুম চাষের আওতায় আসে, আর এতে হেক্টরপ্রতি ১০০ থেকে ২৫০ মেট্রিক টন মাটি ক্ষয় হয়। আগে যেখানে একই জমিতে ফিরে আসার চক্র ছিল অন্তত সাত-আট বছর, এখন তা নেমে এসেছে তিন-চার বছরে; প্রথাগত দশ বছরের পতিতকাল কমে হয়েছে দুই-তিন বছর। এর কারণ জনসংখ্যার চাপ, কাপ্তাই জলাধারে কৃষিজমি হারানো এবং বড় আকারের বসতি স্থাপন। ফলে মাটির উর্বরতা কমছে, ভূমিক্ষয়, বন উজাড় এবং নদী ও হ্রদে পলি জমছে, ফলনও কমে গেছে।
ঝিনাইদহের খবরের কিছুদিন আগেই পাহাড়ে ২০২৫ সালের জুমের ধান ঘরে উঠছিল। ২০২৫ সালের ২০ সেপ্টেম্বর খাগড়াছড়ি থেকে প্রথম আলো জানায়, বৈশাখের প্রথম বৃষ্টির পর এপ্রিলের মাঝামাঝি চাষিরা পাহাড় পরিষ্কার করেন, তুলনামূলক সমান জায়গায় ধান বোনেন, সঙ্গে সারি করে কলা, মরিচ, হলুদ, আদা, বরবটি, কুমড়াসহ নানা ফসল; সেপ্টেম্বরে ধান পাকতে শুরু করে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) হিসাবে, ২০২৪-২৫ মৌসুমে খাগড়াছড়িতে ১ হাজার ১২৪ হেক্টর জমিতে জুমের ধান চাষ হয়ে উৎপাদন হয়েছিল ১ হাজার ৫৪০ মেট্রিক টন, আর ২০২৫ সালে ১৬ লাখ কেজির বেশি উৎপাদনের আশা করা হচ্ছিল। ২৭ সেপ্টেম্বর বাসস জানায়, ব্রি আউশ মৌসুমের ব্রি ধান২৪, ব্রি ধান২৬, ব্রি ধান২৭ এবং গবেষণাধীন দুটি জাত খাগড়াছড়ির জুমে পরীক্ষামূলকভাবে আবাদ করেছে, আর ডিএইর উপপরিচালকের তথ্যমতে এর মধ্যে ব্রি ধান২৪ ও ব্রি ধান২৭ এর ফলন সবচেয়ে বেশি হয়েছে।

উঁচু জমির ধান: দাঁড়ানো পানি ছাড়াই চাষ
ধান বললেই সাধারণত পানিতে ডোবা খেতের ছবি মনে আসে, কিন্তু এক ধরনের ধান চাষ হয় দাঁড়ানো পানি ছাড়াই। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) এবং আন্তর্জাতিক ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের (ইরি) সহযোগিতায় ১৯৯৩ সালে প্রকাশিত 'রাইস ইন হিউম্যান নিউট্রিশন' বইয়ে বলা হয়েছে, আপল্যান্ড বা উঁচু জমির ধান চাষ হয় আইলবিহীন জমিতে, শুকনো অবস্থায় জমি তৈরি করে বীজ বোনা হয়, আর আর্দ্রতার জন্য নির্ভর করতে হয় বৃষ্টির ওপর। এই চাষের পরিসর বন কেটে পুড়িয়ে পাহাড়ে স্থানান্তরিত চাষ থেকে শুরু করে বড় যান্ত্রিক খামার পর্যন্ত; মাঝখানে রয়েছে লাখো দরিদ্রতম ধানচাষির ঢালু পাহাড়ি জমি, যেখানে মারাত্মক ভূমিক্ষয় আর ঘন ঘন খরা লেগেই থাকে।
বইটির তথ্যমতে, দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মোট ধানি জমির প্রায় ১৩ শতাংশ ছিল উঁচু জমির ধান, আর এই পরিবেশেই ফলন সবচেয়ে কম। বইটি আরও বলছে, ছত্রাকজনিত রোগ ব্লাস্ট উঁচু জমির ধানে বিশেষ সমস্যা। এর বিপরীতে বৃষ্টিনির্ভর নিচু জমির ধান চাষ হয় কাদা করা মাটিতে, আইল দিয়ে ঘেরা জমিতে, যেখানে ০ থেকে ৫০ সেন্টিমিটার পানি ধরে রাখা যায়; আর সেচের ধানখেতে পানি ধরে রাখা হয়, আংশিকভাবে আগাছা দমনের জন্যও।
আব্দুর রহিমের খেতটি পাহাড়ের ঢালও নয়, সেচের ধানখেতও নয়। উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা একে বলেছেন উঁচু জায়গা, বাসস বলেছে উঁচু ভিটা জমি; কর্মকর্তা জানিয়েছেন, এখানে কৃষকের আমনের মতো অতিরিক্ত সেচ লাগেনি। কোনো প্রতিবেদনেই অন্য জমিতে জাতটি চাষের সুপারিশ করা হয়নি; কর্মকর্তারা কেবল আশা প্রকাশ করেছেন যে এর আবাদ বাড়বে।

ঝিনাইদহ ও ২০২৫ সালের আমন মৌসুম
বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী, ঝিনাইদহ খুলনা বিভাগের একটি জেলা, আয়তন ১ হাজার ৯৬৪ দশমিক ৭৭ বর্গকিলোমিটার। এর উত্তরে কুষ্টিয়া, দক্ষিণে যশোর ও ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, পূর্বে রাজবাড়ী ও মাগুরা, পশ্চিমে চুয়াডাঙ্গা ও পশ্চিমবঙ্গ। প্রধান নদী গড়াই, কুমার, নবগঙ্গা, চিত্রা, ভৈরব, কপোতাক্ষ, বেতনা ও কালীগঙ্গা। ২০১১ সালের আদমশুমারিতে জনসংখ্যা ছিল ১৭ লাখ ৭১ হাজার ৩০৪। ১৯৮৪ সালে এটি জেলা হয়; ছয়টি উপজেলার মধ্যে ঝিনাইদহ সদর সবচেয়ে বড়। জেলার মানুষের আয়ের প্রধান উৎস কৃষি, ৬৭ শতাংশ।
রামনগর গ্রাম যে ঝিনাইদহ সদর উপজেলায়, তার আয়তন প্রায় ৪৭০ বর্গকিলোমিটার, ইউনিয়ন ১৭টি, যার একটি কুমড়াবাড়িয়া। প্রধান নদী বেগবতী ও নবগঙ্গা। বাংলাপিডিয়ার তথ্যমতে, এই উপজেলার ৬০ দশমিক ১২ শতাংশ মানুষের আয়ের প্রধান উৎস কৃষি। প্রধান ফসল ধান, পাট, আখ, গম, যব, পান, আলু ও শাকসবজি; রপ্তানিপণ্যের মধ্যে রয়েছে ধান, পাট, পান, কলা, খেজুরের গুড় ও শাকসবজি।
আমন এই জেলার বর্ষাকালের প্রধান ধান। ২০২৫ সালের ২০ সেপ্টেম্বর বাসস ও ঢাকা টাইমসের প্রতিবেদনে উদ্ধৃত ডিএইর তথ্য অনুযায়ী, সেই মৌসুমে ঝিনাইদহের ছয় উপজেলায় ১ লাখ ৪ হাজার হেক্টর জমিতে আমন ধানের আবাদ হয়েছিল, উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৫ লাখ ৬৪ হাজার ১৩৯ মেট্রিক টন। একই প্রতিবেদনগুলোতে বলা হয়, ছয় উপজেলাতেই কৃষকেরা ধানগাছের গোড়া পচা এবং মাজরা পোকার আক্রমণে বিপাকে পড়েছেন; বারবার স্প্রে করেও গাছ শুকিয়ে সাদা হয়ে যাচ্ছিল, খরচও বাড়ছিল। ডিএইর ঝিনাইদহের উপপরিচালক তখন বাসসকে বলেন, পোকার আক্রমণ নিয়ে এখন পর্যন্ত গুরুতর তথ্য পাননি, মাঠকর্মীরা কৃষকদের পরামর্শ দিচ্ছেন এবং খেত পরিদর্শন করা হবে।
২০২৫ সালের আমন কাটার শুরুতে, ৯ নভেম্বর বাসস জানায়, সরকার আমন মৌসুমে অভ্যন্তরীণ বাজার থেকে ৬ লাখ টন সেদ্ধ চাল, ৫০ হাজার টন আতপ চাল এবং ৫০ হাজার টন ধান কিনবে; প্রতি কেজির দাম সেদ্ধ চাল ৫০ টাকা, আতপ চাল ৪৯ টাকা এবং ধান ৩৪ টাকা। সংগ্রহ চলবে ২০২৫ সালের ২০ নভেম্বর থেকে ২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত। খাদ্য উপদেষ্টা বলেন, আমন মৌসুমে ধানের উৎপাদন খরচ বোরোর চেয়ে কম, কারণ এ সময় বৃষ্টি থাকায় সেচের খরচ কম হয়, কখনো কখনো সেচ খরচ লাগেই না।
ছবি: Reaid Hossain / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, বাসস (বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা), প্রথম আলো, ঢাকা মেইল, প্রতিদিনের বাংলাদেশ, বাংলা ট্রিবিউন, ঢাকা টাইমস, বাংলাপিডিয়া, এফএও (রাইস ইন হিউম্যান নিউট্রিশন, ১৯৯৩)





মন্তব্য
(০)