ধানের দর পতনে বিপাকে পড়েছেন সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চলের প্রায় চার লাখ কৃষক। বেশি দামের আশায় যাঁরা ধান শুকিয়ে গোলায় রেখেছিলেন, তাঁরা এখন ক্রেতাই পাচ্ছেন না। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এভাবে চলতে থাকলে আগামী বোরো মৌসুমে চাষাবাদে কৃষকের আগ্রহ কমে যাবে।
সদর উপজেলার গৌরারং ইউনিয়নের শাফেলা গ্রামের বিপ্লব চন্দ গত বোরো মৌসুমে ২৫০ মণের মতো ধান পেয়েছিলেন। বৈশাখে সামান্য ধান বিক্রি করে মণপ্রতি ৯০০ থেকে ১০০০ টাকা পেয়েছিলেন। বাকি ১৫০ মণ গোলায় রেখেছেন। তিনি বলেন, ‘আমাদের এলাকায় এক কেয়ার (৩০ শতক) জমি চাষাবাদে খরচ হয় ছয়-সাত হাজার টাকা। প্রতি কেয়ারে ধান পাওয়া যায় ১০ মণ। ৭০০ টাকা মণে ধান বিক্রি করলে খরচ উঠবে না।’
গৌরারং ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান শওকত আলী নিজেও গৃহস্থ। গত মৌসুমে ৬০০ মণ ধান পেয়েছিলেন, এর ৪৫০ মণ এখনও গোলায়। গত রমজানে এক হাজার ৪০০ টাকা মণেও বিক্রি করেননি। এখন পাইকাররা ৬০০-৭০০ টাকা দর বলেন, তাও টাকা মেলে সিলেট বা আশুগঞ্জে ধান পাঠিয়ে বিক্রির পর।
শাল্লা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ছত্তার মিয়ার হিসাবে, গত মৌসুমে তাঁর দুই হাজার মণ ধান পাওয়ার কথা ছিল, পেয়েছেন ৭০০ মণ। তাঁর ধানে পাইকাররা এখন ৫০০ টাকা মণ দিতে চান। তিনি বলেন, ‘আমি পাইকারদের জানিয়ে দিয়েছি, কয়েকশ হাঁস কিনব, ধান বিক্রি না করে হাঁসকে খেতে দেব। সামনের মৌসুমে ক্ষেত করব না।’ আগামী মৌসুমের জন্য ৩০ কেয়ার জমি পাঁচ হাজার টাকাতেও বর্গা নিতে কেউ রাজি হচ্ছেন না বলে জানান তিনি।
ব্যবসায়ীদের ভাষ্যেও একই চিত্র। মধ্যনগরের আড়তদার গোপেশ দাস বলেন, গত বছর সেপ্টেম্বরে যে ধান এক হাজার ৩৭০ থেকে এক হাজার ৪০০ টাকা মণে কেনা হয়েছে, এবার তা এক হাজার ১৮০ থেকে এক হাজার ২০০ টাকায় নেমেছে। ধানের রং একটু অনুজ্জ্বল হলে ব্যাপারীরা ৫০০-৬০০ টাকার বেশি দিচ্ছেন না। তাঁর মতে, ‘হাওরের ধান এবার মানে ভালো নয়’— এই প্রচারণাই দাম নামিয়ে দিয়েছে।
সরকারি ক্রয়ও পুরো লক্ষ্য ছোঁয়নি। গত বোরো মৌসুমে সুনামগঞ্জে দুই লাখ ২৩ হাজার ৫১১ হেক্টর জমিতে ১৩ লাখ টন ধান উৎপাদন হয়েছিল। মণপ্রতি এক হাজার ৪৪০ টাকা দরে জেলায় ২১ হাজার টন ধান কেনার লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে খাদ্য বিভাগ কিনেছে ২০ হাজার টন। জেলা খাদ্য কর্মকর্তা ফেরদৌস জাহান জানান, ৩১ আগস্ট পর্যন্ত ধান কেনার কথা থাকলেও সারাদেশে লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হওয়ায় ৯ আগস্টেই ক্রয় বন্ধ হয়ে যায়; শুরুর দিকে গুদামের ধারণক্ষমতাও কম ছিল।
জেলা কৃষি বিপণন কর্মকর্তা আহমদ আসিফুর রব বলেন, বিষয়টি নিয়ে অনেকে ফোন করেছেন; পরে মিলারদের সঙ্গে কথা বলেছেন তিনি। মিলাররা বলেছেন, এবার সুনামগঞ্জে ধানের রং নষ্ট হয়েছে, সে কারণেই বাজারে দাম কমেছে।
সূত্র: সমকাল (প্রতিবেদন: পঙ্কজ দে, সুনামগঞ্জ)





মন্তব্য
(০)