বাংলাদেশে প্রতি একশো জন কর্মজীবী মানুষের মধ্যে প্রায় পঁয়তাল্লিশ জন এখনও কৃষির ওপর নির্ভর করেন। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর শ্রমশক্তি জরিপ ২০২২ বলছে, দেশের মোট কর্মসংস্থানের ৪৫.৩৩ শতাংশই কৃষিতে। অথচ একই ব্যুরোর সাময়িক হিসাবে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে শস্য, প্রাণিসম্পদ, বন ও মৎস্য মিলিয়ে কৃষি খাতের অবদান দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের মাত্র ১১.৫৫ শতাংশ। এত মানুষের শ্রমে এত কম আয় কেন, এই প্রশ্নের একটি বড় উত্তর লুকিয়ে আছে উৎপাদনশীলতায়। আর সেই উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর পথ হিসেবে এখন সবচেয়ে বেশি আলোচিত শব্দটি হলো এগ্রোটেক।
এগ্রোটেক বা কৃষি প্রযুক্তি বলতে বোঝায় আধুনিক প্রযুক্তি ও উদ্ভাবন কাজে লাগিয়ে কৃষির উন্নতি। মাটির ভেতরের অবস্থা মাপার ছোট যন্ত্র, আকাশ থেকে জমি দেখার ড্রোন, ধান কাটার কম্বাইন হারভেস্টার, মোবাইল ফোনের পরামর্শ সেবা, অনলাইনে ফসল বিক্রির ব্যবস্থা, সবই এর অংশ। এর লক্ষ্য একটাই: কম খরচে, কম অপচয়ে, সঠিক সময়ে বেশি ফসল ঘরে তোলা এবং তাতে কৃষকের আয় বাড়ানো। অনেকের মতে এটি শুধু কৃষকের জন্য নয়, গোটা কৃষি শিল্পের জন্যই এক নতুন যুগের সূচনা করতে পারে।
বাংলাদেশ কৃষিপ্রধান দেশ, আর কৃষি খাত দেশের অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ খুঁটি। তবে এই খাত নানা চাপের মুখে। একই জমি থেকে বছরের পর বছর বেশি ফসল তুলতে হচ্ছে, কারণ মানুষ বাড়ছে কিন্তু জমি বাড়ছে না। অতিরিক্ত রাসায়নিক ও পানির ব্যবহারে পরিবেশের ওপর চাপ পড়ছে। আবার গ্রামের তরুণেরা কাজের খোঁজে শহরে বা বিদেশে যাওয়ায় ধান রোপণ আর কাটার মৌসুমে শ্রমিক পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে। এসব সমস্যার মোকাবিলায় কৃষি প্রযুক্তি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। ঠিকমতো ব্যবহার করতে পারলে কৃষক উৎপাদন বাড়াতে পারবেন, খরচ কমাতে পারবেন এবং আরও টেকসই চাষব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারবেন।
কৃষিতে প্রযুক্তির প্রয়োজন কেন বাড়ছে
সারা বিশ্বেই এগ্রোটেকের গুরুত্ব দিন দিন বাড়ছে, কারণ এটি কৃষির পুরোনো কিছু সমস্যার নতুন সমাধান দিচ্ছে। কৃষক আগে অভিজ্ঞতা আর অনুমানের ওপর ভর করে সিদ্ধান্ত নিতেন: কবে সেচ দেবেন, কতটা সার দেবেন, কখন কীটনাশক ছিটাবেন। অভিজ্ঞতার মূল্য অনেক, কিন্তু আবহাওয়া যখন আগের মতো আচরণ করে না, তখন শুধু অনুমান দিয়ে চলে না। সময়োপযোগী প্রযুক্তি কৃষকের হাতে সেই বাড়তি তথ্য তুলে দেয়, যা দিয়ে তিনি ফসলের যত্ন আরও নিখুঁতভাবে নিতে পারেন।
বাংলাদেশের জন্য বিষয়টি আরও জরুরি। এখানে একজন কৃষকের জমি সাধারণত ছোট, কয়েক খণ্ডে ভাগ করা। এক মৌসুমের ক্ষতি সামলানোর মতো সঞ্চয় বেশির ভাগ পরিবারের থাকে না। বন্যা, খরা, লবণাক্ততা, অসময়ের বৃষ্টি, শিলাবৃষ্টি, সবই ঘুরেফিরে আসে। তাই এ দেশে কৃষি প্রযুক্তির মূল্য মাপা হয় একটি সরল মাপকাঠিতে: প্রযুক্তিটি কি কৃষকের ঝুঁকি কমায়, আর তাঁর পকেটে কিছু বাড়তি টাকা এনে দেয়? যে প্রযুক্তি এই দুই প্রশ্নের উত্তরে হ্যাঁ বলতে পারে, সেটিই মাঠে টিকে থাকে।
মাঠের খবর মাঠেই: সেন্সর, তথ্য আর উৎপাদনশীলতা
এগ্রোটেকের প্রথম বড় সুবিধা হলো জমিকে ভালোভাবে চেনা। মাটিতে বসানো ছোট সেন্সর বা সংবেদী যন্ত্র মাটির আর্দ্রতা, তাপমাত্রা, অম্লতা কিংবা পুষ্টির মাত্রা মেপে তথ্য পাঠাতে পারে। আবহাওয়া কেন্দ্রের তথ্য, উপগ্রহের ছবি আর ড্রোনের তোলা ছবি মিলিয়ে বোঝা যায় জমির কোন অংশে ফসল দুর্বল, কোথায় পানির টান পড়েছে, কোথায় পোকার আক্রমণ শুরু হয়েছে। এতে কৃষক সঠিক সময়ে সঠিক ব্যবস্থা নিতে পারেন, আর তার ফল দেখা যায় ফলনে।
উদাহরণ হিসেবে সারের কথাই ধরা যাক। পুরো জমিতে একই হারে সার ছিটালে যে অংশে পুষ্টি আগে থেকেই আছে সেখানে টাকা নষ্ট হয়, আর যে অংশে ঘাটতি সেখানে তা পূরণ হয় না। মাটি পরীক্ষার ফল আর জমির তথ্য হাতে থাকলে প্রয়োজন অনুযায়ী সার দেওয়া যায়। একই কথা সেচের ক্ষেত্রেও। বোরো মৌসুমে সেচের পেছনে কৃষকের বড় অঙ্কের খরচ হয়, বিশেষ করে ডিজেল বা বিদ্যুতে চলা পাম্পে। মাটির আর্দ্রতা জেনে সেচ দিলে পানি ও জ্বালানি দুটোই বাঁচে।
বাংলাদেশের কৃষকেরা এভাবে এগ্রোটেকের মাধ্যমে ফসলের উৎপাদন বাড়াতে এবং খরচ কমাতে পারেন। সেন্সর, ড্রোন আর স্বয়ংক্রিয় যন্ত্রের সাহায্যে সঠিক সময়ে সেচ, সার প্রয়োগ ও কীটনাশক ব্যবহারের ব্যবস্থা করা সম্ভব। তাতে ফলন বাড়ে, আর উৎপাদন খরচ অনেকটাই কমে আসে।
সময়ই ফসল: সঠিক সময়ে সঠিক কাজ
কৃষিতে একটি পুরোনো কথা আছে, সময়ের এক ফোঁড় অসময়ের দশ ফোঁড়। বীজতলা তৈরি, চারা রোপণ, আগাছা দমন, সেচ, সার, কীটনাশক, ফসল কাটা, প্রতিটি কাজের একটি উপযুক্ত সময় আছে। সময় পেরিয়ে গেলে একই পরিশ্রমে ফল মেলে কম। স্বয়ংক্রিয় যন্ত্র, ড্রোন আর সেন্সরের সাহায্যে কৃষক সেই সময়টা ধরতে পারেন। কোন দিন সেচ দরকার, কোন সপ্তাহে কীটনাশক দিলে কাজ হবে, আবহাওয়ার পূর্বাভাস দেখে কবে ধান কাটা নিরাপদ, এসব সিদ্ধান্ত নিতে প্রযুক্তি সাহায্য করে।
ফসল কাটার সময় এর সবচেয়ে ভালো উদাহরণ দেখা যায় হাওর অঞ্চলে। বৈশাখের শুরুতে পাহাড়ি ঢল নামার আগে বোরো ধান কেটে ঘরে তোলার তাড়া থাকে। শ্রমিক কম পেলে পাকা ধান মাঠেই ডুবে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। এই সংকট কমাতে সরকার ২০২০ সালের জুনে সমন্বিত ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে কৃষি যান্ত্রিকীকরণ প্রকল্প শুরু করে। প্রকল্পটির আওতায় হাওর ও দক্ষিণের উপকূলীয় এলাকায় ৭০ শতাংশ এবং অন্য এলাকায় ৫০ শতাংশ ভর্তুকিতে কম্বাইন হারভেস্টার, রিপার, রাইস ট্রান্সপ্লান্টার, পাওয়ার থ্রেশার ও বীজ বপন যন্ত্র দেওয়া হয়েছে। প্রকল্পের ব্যবস্থাপনা নিয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনের তদন্তের খবরও সংবাদমাধ্যমে এসেছে, তবে মাঠে যন্ত্রের ব্যবহার যে বেড়েছে, তা স্পষ্ট।
যন্ত্র বিতরণের পরিমাণও কম নয়। আন্তর্জাতিক কৃষি গবেষণা জোট সিজিআইএআরের প্রকাশিত এক মূল্যায়ন অনুযায়ী, এই কর্মসূচিতে ১,৫৯৫ কোটি টাকা মূল্যের ৩৫ হাজারের বেশি ভর্তুকির যন্ত্র বিতরণ করা হয়েছে, আর সেই মূল্যের ৮৪ শতাংশই ছিল কম্বাইন হারভেস্টার। একই মূল্যায়নে বলা হয়েছে, বড় যন্ত্রে ভর্তুকির বেশির ভাগ চলে যাওয়ায় ছোট ও কম দামের যন্ত্র কিংবা ছোট কৃষকের কাছে সুফল কতটা পৌঁছাচ্ছে, সেটি নিয়ে ভাবার সুযোগ আছে। অর্থাৎ যন্ত্র আনা যেমন জরুরি, তেমনই জরুরি সেটি কার হাতে যাচ্ছে তা খেয়াল রাখা।
এগ্রোটেক এভাবে আধুনিক কৃষিযন্ত্র, ড্রোন ও অন্যান্য প্রযুক্তির মাধ্যমে কৃষিকাজের কার্যকারিতা বাড়ায়। কাজ দ্রুত হয়, সময়মতো হয়, অপচয় কমে।
পরিবেশ বাঁচিয়ে টেকসই চাষ
কৃষি প্রযুক্তির আরেকটি বড় দিক হলো পরিবেশ রক্ষা। কীটনাশক কতটা দরকার, সেটি নিখুঁতভাবে মাপতে পারলে মাত্রাতিরিক্ত রাসায়নিক আর জমিতে, খালে বা পুকুরে গিয়ে পড়ে না। এতে উপকারী পোকা, মাছ ও মানুষের স্বাস্থ্য রক্ষা পায়। পানি বাঁচানোর সেচপদ্ধতি ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ কমায়, যা দেশের উত্তর ও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে বড় উদ্বেগের বিষয়। জৈব সার আর মাটির স্বাস্থ্য মেপে সার দেওয়ার চর্চা জমির উর্বরতা দীর্ঘদিন ধরে রাখে।
পরিবেশবান্ধব কৃষিপদ্ধতি কৃষকের জন্য টেকসই এবং লাভজনক, দুটোই হতে পারে। কারণ অপ্রয়োজনীয় রাসায়নিক কেনার টাকা বাঁচে, আর মাটি ভালো থাকলে পরের মৌসুমেও ফলন ভালো আসে। প্রযুক্তির সাহায্যে তাই পরিবেশের ওপর ক্ষতিকর প্রভাব কমিয়ে একটি টেকসই কৃষিব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব।
কৃষকের হাতে যে সুবিধাগুলো আসে
এগ্রোটেক শুধু যন্ত্র আর সফটওয়্যারের বিষয় নয়, এটি কৃষকের দৈনন্দিন জীবনে পরিবর্তন আনে। মাঠে যাঁরা এই প্রযুক্তি ব্যবহার করছেন, তাঁদের অভিজ্ঞতা আর গবেষকদের পর্যবেক্ষণ মিলিয়ে কয়েকটি সুবিধা আলাদা করে বলা যায়:
- উৎপাদন বৃদ্ধি ও খরচ কমানো: সেন্সর ও স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা ফসলের অবস্থার ওপর নজর রাখে, ফলে সঠিক সময়ে পদক্ষেপ নেওয়া যায়; উপকরণ যায় যেখানে দরকার, সেখানেই।
- তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত: মোবাইল অ্যাপ, ড্রোন ও উপগ্রহের ছবি থেকে ফসলের অবস্থা, দাম ও বাজারের চাহিদা জেনে সিদ্ধান্ত নেওয়া যায়।
- বাজারে প্রবেশ: অনলাইন প্ল্যাটফর্মে সরাসরি পণ্য বিক্রির সুযোগ তৈরি হয়, স্থানীয় হাটের বাইরেও ক্রেতা মেলে।
- প্রশিক্ষণ ও জ্ঞান: অ্যাপ ও সফটওয়্যারের মাধ্যমে কৃষক হাতের কাছে সঠিক তথ্য পান এবং তা প্রয়োগ করতে শেখেন।
- সময় ও শ্রম সাশ্রয়: সেচ, সার প্রয়োগ, ফসল কাটার মতো কাজ দ্রুত ও নির্ভুলভাবে হয়, কঠিন শারীরিক পরিশ্রম কমে।
এই সুবিধাগুলোর কোনোটিই আলাদা করে বিপ্লব নয়, কিন্তু একসঙ্গে যোগ হলে একটি খামারের হিসাব বদলে যায়। কয়েক শতাংশ বাড়তি ফলন, কয়েক শতাংশ কম খরচ আর বাজারে একটু ভালো দাম, এই তিনটি মিলেই ঠিক হয় কৃষকের বছর শেষে লাভ হলো নাকি লোকসান।
হাতের মুঠোয় পরামর্শ: ফোনকল, অ্যাপ আর আবহাওয়া বার্তা
তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্তের কথা শুনলে অনেকে দামি যন্ত্রের কথা ভাবেন। কিন্তু বাংলাদেশে কৃষি প্রযুক্তির সবচেয়ে বিস্তৃত রূপ আসলে সাধারণ মোবাইল ফোন। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কৃষি কল সেন্টারে ১৬১২৩ নম্বরে ফোন করে কৃষক কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ বিষয়ে পরামর্শ নিতে পারেন। কৃষি তথ্য সার্ভিসের তথ্য অনুযায়ী, ঢাকার খামারবাড়িতে বসে কৃষি কর্মকর্তারা এসব কলের উত্তর দেন। সরকারি সংস্থা, টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রক সংস্থা, উন্নয়ন সংস্থা প্র্যাকটিক্যাল অ্যাকশন এবং মোবাইল অপারেটরদের যৌথ উদ্যোগে সেবাটি চালু হয়েছিল।
ফসলের রোগ চেনার জন্য আছে কৃষকের জানালা নামে একটি মোবাইল অ্যাপ। ঢাকা ট্রিবিউনের প্রতিবেদন ও গবেষণাপত্র অনুযায়ী, এতে ১২০টি ফসলের এক হাজারের বেশি সমস্যার ছবি ও সমাধান রাখা আছে, এবং ইন্টারনেট ছাড়াও অ্যাপটি ব্যবহার করা যায়। কৃষক গাছের পাতার দাগ বা পোকার ছবি মিলিয়ে সমস্যা চিনে নিতে পারেন, দূরের কৃষি অফিসে না গিয়েই।
আবহাওয়ার ঝুঁকি সামলাতে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর চালু করেছে বাংলাদেশ কৃষি আবহাওয়া তথ্য সেবা, সংক্ষেপে বামিস। আবহাওয়া অধিদপ্তর ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য নিয়ে এই পোর্টালে দেশের ৬৪ জেলার জন্য সপ্তাহে দুবার কৃষি আবহাওয়া পরামর্শ প্রকাশ করা হয়। বৃষ্টি আসার আগে সার না দেওয়া, ঝড়ের পূর্বাভাস থাকলে পাকা ধান আগে কেটে ফেলা, এ ধরনের সিদ্ধান্তে এই পরামর্শ সরাসরি কাজে লাগে।
বিশ্বব্যাংকের এক প্রকল্প মূল্যায়ন প্রতিবেদন অনুযায়ী, যাচাই করা এই আবহাওয়া পরামর্শ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মাধ্যমে প্রায় ৩০ হাজার অগ্রগামী কৃষকের কাছে পৌঁছায়, আর তাঁদের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে আশপাশের গ্রামে। ২০১৯ সাল থেকে ২০২৫ সালের এপ্রিল পর্যন্ত বামিস পোর্টালটি ৯৫ লাখ বার দেখা হয়েছে। মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমেও এখন এই পরামর্শ পাওয়া যায়। যে কৃষক আগে শুধু রেডিওর আবহাওয়া সংবাদের ওপর নির্ভর করতেন, তিনি এখন নিজের জেলার জন্য তৈরি কৃষি পরামর্শ হাতে পাচ্ছেন।
এসব সেবার মিল একটি জায়গায়: কৃষক উন্নত প্রযুক্তির মাধ্যমে নিজের জমি, ফসল ও বাজার সম্পর্কে দরকারি তথ্য আগের চেয়ে অল্প পরিশ্রমে জানতে পারছেন, আর তা দিয়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারছেন।
ক্রেতার কাছে সরাসরি পৌঁছানো
বাংলাদেশের কৃষকের একটি পুরোনো অভিযোগ হলো, ফসল ফলান তিনি, আর লাভের বড় অংশ চলে যায় মধ্যস্বত্বভোগীর হাতে। এগ্রোটেক এখানেও একটি পথ খুলে দিয়েছে। অনলাইন প্ল্যাটফর্ম আর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কৃষক বা কৃষকের দল সরাসরি ক্রেতার কাছে পণ্য বিক্রি করতে পারেন। আম, লিচু, সবজি কিংবা দেশি মুরগির মতো পণ্য এখন অনেক জেলা থেকে সরাসরি শহরের ক্রেতার কাছে যাচ্ছে।
সঠিক মান আর সরবরাহ ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে পারলে এই পথ স্থানীয় বাজার ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক বাজারেও পৌঁছাতে পারে। রপ্তানির ক্ষেত্রে ক্রেতারা জানতে চান পণ্যটি কোথায়, কীভাবে উৎপাদিত হয়েছে। জমির তথ্য, ব্যবহৃত উপকরণ আর ফসল তোলার তারিখের ডিজিটাল রেকর্ড থাকলে সেই প্রশ্নের উত্তর দেওয়া যায়। বাজারের সঙ্গে সংযোগ মজবুত হলে কৃষক ভালো দাম পান, আর তাতে তাঁর আয় বাড়ে।
প্রশিক্ষণ: যন্ত্রের চেয়েও জরুরি দক্ষতা
প্রযুক্তি হাতে পেলেই কাজ হয় না, সেটি ব্যবহার করতে জানতে হয়। এগ্রোটেক তাই কৃষকের জন্য প্রশিক্ষণের নতুন দরজাও খুলেছে। ভিডিও, অ্যাপ ও অনলাইন কোর্সে চাষের নতুন কৌশল শেখা যায়। কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলো, যেমন বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট ও বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট, তাদের উদ্ভাবিত জাত ও প্রযুক্তির তথ্য অনলাইনে প্রকাশ করে। মাঠপর্যায়ে উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তারা কৃষকদের প্রযুক্তি ব্যবহারে হাতে-কলমে সাহায্য করেন।
একটি ড্রোন বা একটি কম্বাইন হারভেস্টার যত আধুনিকই হোক, সেটি চালানো, রক্ষণাবেক্ষণ করা এবং তার দেওয়া তথ্য বোঝার মতো দক্ষ মানুষ না থাকলে যন্ত্রটি অচল পড়ে থাকে। গ্রামের তরুণদের জন্য এখানে নতুন কাজের সুযোগও তৈরি হচ্ছে: যন্ত্র ভাড়া দেওয়া, মেরামত করা, ড্রোন দিয়ে স্প্রে করার সেবা দেওয়া। অনেক এলাকায় কৃষক নিজে যন্ত্র না কিনে ভাড়ায় সেবা নিচ্ছেন, যা ছোট জমির মালিকদের জন্য বাস্তবসম্মত পথ।
খরচ আর সময়ের হিসাব
স্বয়ংক্রিয় যন্ত্র, ড্রোন ও সেন্সর ব্যবহার করে কৃষক কাজ দ্রুত এবং সঠিকভাবে করতে পারেন, যা তাঁর সময় ও অর্থ দুটোই বাঁচায়। যে জমিতে ধান কাটতে আগে অনেক শ্রমিকের কয়েক দিন লাগত, যন্ত্রে সেই কাজ হয় অনেক কম সময়ে। মাড়াই, ঝাড়াই আর বস্তায় ভরার কাজও একসঙ্গে হয়ে যায়।
সময় বাঁচানোর আরেকটি সুফল আছে, যা হিসাবের খাতায় প্রথমেই চোখে পড়ে না। ধান দ্রুত কেটে ঘরে তোলা গেলে পরের ফসলের জন্য জমি আগেভাগে তৈরি করা যায়। আমন কাটার পর দেরি না করে সরিষা, আলু বা ডাল বোনা গেলে একই জমি থেকে বছরে বাড়তি একটি ফসল পাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়। ফলে যন্ত্রের সুফল শুধু একটি মৌসুমে সীমাবদ্ধ থাকে না, পুরো বছরের শস্যচক্রে ছড়িয়ে পড়ে।
প্রযুক্তির সাহায্যে সেচ, সার প্রয়োগ ও অন্যান্য কাজ দ্রুত ও নির্ভুলভাবে করা যায়। এতে কৃষকের প্রচুর সময় বাঁচে এবং শারীরিক শ্রম কমে। বাঁচানো সময় তিনি অন্য ফসলে, গবাদিপশুতে বা বাড়তি আয়ের কাজে লাগাতে পারেন। ফলে একই পরিবার বছরে বেশি উৎপাদন করতে পারে।
আগামীর মাঠ: স্মার্ট খামার থেকে জৈবপ্রযুক্তি
কৃষি প্রযুক্তির ভবিষ্যৎ নিয়ে বিশেষজ্ঞরা আশাবাদী। প্রযুক্তির উন্নতির সঙ্গে কৃষির চেহারা বদলে যাচ্ছে, আর আগামী দিনে তা কৃষকের জন্য আরও সুবিধা ও সুযোগ তৈরি করবে। কয়েকটি ধারা এখনই স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
প্রথম ধারা স্মার্ট খামার ও স্বয়ংক্রিয়তা। স্মার্ট খামার বলতে বোঝায় এমন খামার, যেখানে সেন্সর, যন্ত্র আর সফটওয়্যার একসঙ্গে কাজ করে। মাটি শুকিয়ে গেলে পাম্প নিজে চালু হয়, মুরগির ঘরের তাপমাত্রা বাড়লে পাখা ঘোরে। এমন ব্যবস্থার ব্যবহার বাড়লে কৃষিকাজ আরও দ্রুত হবে, আর কৃষক কম সময় ও শ্রমে বেশি ফলন পাবেন।
দ্বিতীয় ধারা ড্রোনের ব্যাপক ব্যবহার। ড্রোন দিয়ে জমি জরিপ, ফসলের অবস্থা পর্যবেক্ষণ এবং কীটনাশক বা সার স্প্রে করার কাজ আরও দ্রুত হবে। আকাশ থেকে তোলা ছবিতে ফসলের স্বাস্থ্য নির্ভুলভাবে বোঝা যায়, ফলে কৃষক দ্রুত সমস্যার সমাধান করতে পারেন। কাদাজমিতে হেঁটে স্প্রে করার চেয়ে এতে কৃষকের শরীরে রাসায়নিক লাগার ঝুঁকিও কমে।
তৃতীয় ধারা জৈবপ্রযুক্তি ও জিন প্রকৌশল। ফসলের উৎপাদনশীলতা বাড়াতে এসব প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়বে, যার মাধ্যমে উচ্চ ফলনশীল ও রোগপ্রতিরোধী নতুন জাত উদ্ভাবন সম্ভব। বাংলাদেশ ইতিমধ্যে ডগা ও ফল ছিদ্রকারী পোকা প্রতিরোধী বিটি বেগুন মাঠে এনেছে। প্রচলিত প্রজনন আর আধুনিক জৈবপ্রযুক্তি মিলিয়ে বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট জলমগ্নতা ও লবণাক্ততা সহনশীল ধানের জাতও উদ্ভাবন করেছে, যা বন্যা ও উপকূলীয় এলাকার কৃষকদের কাজে লাগছে।
চতুর্থ ধারা পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির উন্নয়ন। কৃষিতে টেকসই প্রযুক্তি আর পরিবেশবান্ধব পদ্ধতির ব্যবহার আরও উন্নত হবে, যাতে কৃষি খাত পরিবেশের জন্য নিরাপদ এবং দীর্ঘমেয়াদে লাভজনক থাকে।
পঞ্চম ধারা কৃষি তথ্য বিশ্লেষণ। বছরের পর বছর জমা হওয়া আবহাওয়া, মাটি, ফলন আর দামের তথ্য বিশ্লেষণ করে কৃষক নিজের জমির অবস্থা ও উৎপাদনশীলতা নিয়ে আরও সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এই তথ্য থেকে ফলনের পূর্বাভাসও দিতে পারে। এতে উৎপাদন বাড়ানো আর খরচ কমানোর সম্ভাবনা আরও বাড়বে।
যে বাধাগুলো পেরোতে হবে
সম্ভাবনার পাশাপাশি বাস্তবতাও মনে রাখা দরকার। প্রথম বাধা দাম। একজন ক্ষুদ্র কৃষকের পক্ষে দামি যন্ত্র বা সেন্সর কেনা কঠিন। তাই ভর্তুকি, কম সুদের কৃষিঋণ আর যন্ত্র ভাড়ার সেবা আরও দূর পর্যন্ত ছড়িয়ে দেওয়া জরুরি। দ্বিতীয় বাধা প্রশিক্ষণ। প্রযুক্তি বুঝতে না পারলে কৃষক তার ওপর ভরসা করেন না। তৃতীয় বাধা সংযোগ। গ্রামে দ্রুতগতির ইন্টারনেট আর নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ ছাড়া অনেক ডিজিটাল সেবা পুরোপুরি কাজ করে না।
আরেকটি বিষয় হলো আস্থা। কৃষক বহু বছর ধরে যে পদ্ধতিতে চাষ করে আসছেন, সেটি ছেড়ে নতুন কিছু গ্রহণ করতে তাঁর সময় লাগে, বিশেষ করে যখন একটি ভুল সিদ্ধান্তে পুরো মৌসুমের আয় ঝুঁকিতে পড়ে। তাই প্রদর্শনী খামার, প্রতিবেশী কৃষকের সাফল্য আর মাঠকর্মীর নিয়মিত পাশে থাকা প্রযুক্তি ছড়িয়ে দেওয়ার সবচেয়ে কার্যকর উপায়। প্রশিক্ষণ, সাশ্রয়ী দামের যন্ত্র আর গ্রামে সংযোগ, এই তিনটি নিশ্চিত হলে এগ্রোটেক টিকে থাকার লড়াই থেকে সমৃদ্ধির পথে যাওয়ার পার্থক্য গড়ে দিতে পারে।
ছোট খামারে বড় পরিবর্তনের সম্ভাবনা
সব মিলিয়ে বলা যায়, এগ্রোটেক কৃষিতে বড় পরিবর্তন আনছে এবং বাংলাদেশের কৃষি খাতে নতুন দিগন্ত খুলে দিচ্ছে। এটি কৃষককে আরও দক্ষতার সঙ্গে চাষ পরিচালনা করতে, সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে এবং লাভবান হতে সাহায্য করছে। এর সুফল শুধু একজন কৃষকের ঘরে সীমাবদ্ধ থাকে না, দেশের খাদ্য নিরাপত্তা ও অর্থনীতিতেও তা ছড়িয়ে পড়ে।
যে দেশে প্রায় অর্ধেক কর্মজীবী মানুষ কৃষির সঙ্গে যুক্ত, সেখানে কৃষির উৎপাদনশীলতা সামান্য বাড়লেও লক্ষ লক্ষ পরিবারের জীবনে তার ছাপ পড়ে। আগামী দিনে কৃষিতে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার আরও বিস্তৃত হবে বলেই সংশ্লিষ্টদের ধারণা। প্রশ্ন হলো, সেই প্রযুক্তি কত দ্রুত আর কত ন্যায্যভাবে ছোট ও প্রান্তিক কৃষকের হাতে পৌঁছায়। সেটি নিশ্চিত করা গেলে প্রযুক্তি বাংলাদেশের কৃষি খাতকে আরও শক্তিশালী ও টেকসই করে তুলবে।
ছবি: কৃষিতে প্রযুক্তি, Ahman10 / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY 3.0)





মন্তব্য
(০)