অগ্রহায়ণের রোদে গ্রামের উঠানে চাটাই বিছিয়ে ধান শুকানো বাংলাদেশের চেনা দৃশ্য। সেই ধানের একটা অংশ চলে যায় গোলায়, আরেকটা অংশ আলাদা করে রাখা হয় আগামী মৌসুমের বীজ হিসেবে। এই আলাদা করে রাখা মুঠো মুঠো দানার ওপরই নির্ভর করে পরের বছরের মাঠ কতটা সবুজ হবে, গোলা কতটা ভরবে। বীজকে তাই কৃষির প্রাণ বলা হয়। সঠিক পরিচর্যা পেলে বীজের অঙ্কুরোদগম ক্ষমতা বাড়ে, চারা রোগের সঙ্গে লড়তে পারে, ফলন নিশ্চিত হয় এবং উৎপাদন খরচও কমে আসে।
তবু বীজের যত্ন নিয়ে আমাদের মাঠে ভাবনা তুলনামূলক কম। অনেক কৃষক সার, সেচ আর কীটনাশকের পেছনে যত টাকা ও শ্রম দেন, বীজ বাছাই বা শোধনে তার সামান্য অংশও দেন না। অথচ কৃষি বিশেষজ্ঞরা বহু বছর ধরে বলে আসছেন, অন্য সব উপকরণ একই রেখে শুধু মানসম্পন্ন বীজ ব্যবহার করলেই ফসলের ফলন ১৫ থেকে ২০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানো সম্ভব। দ্য ডেইলি স্টার ও দ্য ফাইন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেসে প্রকাশিত বীজ নিয়ে আলোচনাগুলোতেও এই হিসাব বারবার উঠে এসেছে।
মাঠের অভিজ্ঞতাও একই কথা বলে। বাংলাদেশে কৃষকদের অংশগ্রহণে চালানো এক গবেষণায় দেখা গেছে, কৃষকের নিজের ঘরে রাখা বীজের বদলে শুধু পরিষ্কার ও বাছাই করা বীজ ব্যবহার করায় বোরো মৌসুমে গড়ে প্রায় ১০ শতাংশ এবং রোপা আমনে প্রায় ১১ শতাংশ বেশি ধান পাওয়া গেছে। কোনো নতুন সার নয়, নতুন যন্ত্র নয়, শুধু বীজের প্রতি একটু বাড়তি মনোযোগ।
বীজের যত্ন কোনো একদিনের কাজ নয়। এটি শুরু হয় ফসল কাটার সময় থেকে, চলে সংরক্ষণের পুরো সময় ধরে, আর শেষ হয় বপনের ঠিক আগে। এই পথে পাঁচটি ধাপ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ: ভালো বীজ বাছাই, বীজ শোধন, সঠিক সংরক্ষণ, অঙ্কুরোদগম পরীক্ষা এবং বপনের আগের প্রস্তুতি।
প্রথম ধাপ: ভালো বীজ বাছাই
বীজ বাছাই ফসল উৎপাদনের প্রথম ধাপ। এখানে ভুল হলে পরের কোনো যত্নেই পুরো ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়া যায় না। ভালো বীজ বলতে এমন বীজ বোঝায়, যা রোগমুক্ত, পুষ্ট, আকারে মোটামুটি সমান এবং যার মধ্যে অন্য জাতের বীজ, আগাছার বীজ, মাটির ঢেলা বা খড়কুটো মিশে নেই।
আকারে সমান বীজের একটা বড় সুবিধা আছে। সমান বীজ প্রায় একই সময়ে গজায়, চারাগুলো একই তালে বাড়ে, ফুল ও ফল আসে কাছাকাছি সময়ে। ফলে সার দেওয়া, আগাছা বাছা বা ফসল কাটার সময় ঠিক করা অনেক সুবিধাজনক হয়। অপুষ্ট, চিটা বা ভাঙা বীজ হয় একেবারেই গজায় না, নয়তো দুর্বল চারা দেয়, যা পরে রোগ-পোকার প্রথম শিকার হয়।
যেখানে সম্ভব, প্রত্যয়িত বা পরীক্ষিত বীজ ব্যবহার করা ভালো। বাংলাদেশে বীজের মান যাচাই ও প্রত্যয়নের দায়িত্বে আছে সরকারি বীজ প্রত্যয়ন এজেন্সি। বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন (বিএডিসি) দেশজুড়ে তাদের বিক্রয়কেন্দ্র ও নিবন্ধিত ডিলারের মাধ্যমে ধান, গম, ডাল, তেলবীজ ও সবজির বীজ সরবরাহ করে। বিশ্বস্ত বেসরকারি বীজ কোম্পানিও রয়েছে। প্যাকেটে জাতের নাম, উৎপাদনের তারিখ, অঙ্কুরোদগমের হার ও মেয়াদ লেখা আছে কি না, কেনার আগে দেখে নেওয়া দরকার।
নিজের ঘরের বীজ রাখলেও বাছাইয়ের কাজটা সমান জরুরি। মাঠের যে অংশের গাছ সবচেয়ে সুস্থ ও রোগমুক্ত ছিল, সেখান থেকে বীজের জন্য ফসল আলাদা করে কাটা ভালো। ধানের ক্ষেত্রে গ্রামের একটি প্রচলিত কৌশল হলো পানিতে বীজ ঢেলে দেওয়া: পুষ্ট ও ভারী দানা নিচে ডুবে যায়, আর চিটা ও হালকা দানা ভেসে ওঠে। ভেসে থাকা দানা ফেলে দিয়ে ডুবে থাকা বীজ তুলে পরিষ্কার পানিতে ধুয়ে শুকিয়ে নিলে মানসম্পন্ন বীজের একটা বড় অংশ আলাদা হয়ে যায়।
দ্বিতীয় ধাপ: বীজ শোধন
বীজ শোধন মানে বীজের গায়ে বা ভেতরে লুকিয়ে থাকা রোগজীবাণু ও পোকামাকড় দূর করা। অনেক রোগের জীবাণু বীজের সঙ্গেই এক মৌসুম থেকে আরেক মৌসুমে চলে আসে। চারা গজানোর মুহূর্তে সেগুলো সক্রিয় হয়ে ওঠে, আর তখন কচি চারা সবচেয়ে অসহায় থাকে। মাটিতে থাকা ছত্রাক ও পোকাও এই সময়েই আক্রমণ করে।
শোধনের সবচেয়ে প্রচলিত পদ্ধতি হলো ছত্রাকনাশক বা কীটনাশক ব্যবহার। সাধারণ হিসাব হলো প্রতি কেজি বীজে ২ থেকে ৩ গ্রাম ছত্রাকনাশক মিশিয়ে শোধন করা। তবে কোন ফসলে কোন ওষুধ কত মাত্রায় লাগবে, তা প্যাকেটের নির্দেশনা এবং উপজেলা কৃষি অফিসের পরামর্শ মিলিয়ে ঠিক করা উচিত। মাত্রা কম হলে জীবাণু মরে না, বেশি হলে বীজের অঙ্কুরোদগম ক্ষমতাই নষ্ট হতে পারে।
যারা রাসায়নিক এড়াতে চান, তাদের জন্য জৈব শোধনের পথও আছে। নিম পাতার রসের মতো জৈব উপাদান দিয়ে বীজ শোধন করা যায়। নিমের তেতো উপাদান অনেক পোকামাকড় ও কিছু জীবাণুর বিরুদ্ধে কাজ করে বলে গ্রামাঞ্চলে বহুকাল ধরেই এর ব্যবহার চলে আসছে।
কোন রোগগুলো বীজের সঙ্গে ঘরে ফিরে আসে, তার একটি পরিচিত উদাহরণ ধানের বাকানি রোগ। এই ছত্রাকজনিত রোগে আক্রান্ত চারা অস্বাভাবিকভাবে লম্বা ও ফ্যাকাশে হয়ে যায়, অনেক চারা শেষ পর্যন্ত মারা যায়। রোগটির জীবাণু মূলত বীজের মাধ্যমেই ছড়ায়, তাই বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি) এর প্রতিকার হিসেবে বীজতলায় ফেলার আগে বীজ শোধনের ওপর জোর দেয়। ধানের বাদামি দাগ ও ব্লাস্ট রোগের জীবাণুও বীজের গায়ে লেগে থাকতে পারে। অর্থাৎ শোধন না করা বীজ অনেক সময় রোগকেই নতুন মৌসুমে নিমন্ত্রণ করে আনে।
ডালজাতীয় ফসলে বীজ পরিচর্যার আরেকটি দিক আছে, যা রোগ ঠেকানোর চেয়ে পুষ্টি জোগানোর কাজ করে। মসুর, ছোলা, মুগ বা চীনাবাদামের বীজে বপনের আগে রাইজোবিয়াম নামের উপকারী জীবাণুর সার মাখিয়ে নিলে গাছের শিকড়ে ছোট ছোট গুটি তৈরি হয়। এই গুটির ভেতরে থাকা জীবাণু বাতাস থেকে নাইট্রোজেন সংগ্রহ করে গাছকে দেয়, ফলে ইউরিয়ার প্রয়োজন কমে। বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিনা) এ ধরনের জীবাণু সার তৈরি ও মাঠে প্রচলনের কাজ করে আসছে। তবে রাসায়নিক শোধক আর জীবাণু সার একসঙ্গে মেশালে উপকারী জীবাণুগুলোই মারা যেতে পারে, তাই প্যাকেটের নির্দেশনা মেনে আলাদাভাবে ব্যবহার করতে হবে।
রাসায়নিক দিয়ে শোধন করা বীজ নিয়ে সাবধান থাকা জরুরি। কাজের সময় হাতে গ্লাভস ও মুখে মাস্ক পরা, কাজ শেষে ভালো করে হাত ধোয়া এবং শোধন করা বীজ কোনোভাবেই খাবার বা পশুখাদ্য হিসেবে ব্যবহার না করা, এই নিয়মগুলো মানতেই হবে। শোধিত বীজের বস্তা শিশু ও গবাদিপশুর নাগালের বাইরে রাখতে হবে।
তৃতীয় ধাপ: সঠিকভাবে সংরক্ষণ
ফসল কাটা থেকে পরের বপন পর্যন্ত বীজকে কয়েক মাস, কখনো প্রায় এক বছর ঘরে কাটাতে হয়। এই সময়টাতেই সবচেয়ে বেশি বীজ নষ্ট হয়। বীজ জীবন্ত; সে শ্বাস নেয়, আর্দ্রতা টানে। ভেজা ও গরম পরিবেশে তার ভেতরের সঞ্চিত খাবার দ্রুত ফুরিয়ে যায়, ছত্রাক বাসা বাঁধে, পোকা ঢোকে।
তাই বীজ রাখতে হবে শুষ্ক ও ঠান্ডা জায়গায়, যেখানে আর্দ্রতা কম এবং বাতাস চলাচল করে। সরাসরি রোদ বা চুলার তাপ থেকে বীজ দূরে রাখা দরকার। সবচেয়ে ভালো ফল পাওয়া যায় বায়ুরোধী পাত্র বা প্যাকেটে রাখলে: মুখবন্ধ টিন, ঢাকনাওয়ালা প্লাস্টিকের ড্রাম, কিংবা ভালোভাবে সিল করা মোটা পলিথিনের ব্যাগ। বাইরের বাতাস ঢুকতে না পারলে আর্দ্রতা ও পোকা দুটোই দূরে থাকে।
তবে পাত্রে ভরার আগে বীজ পুরোপুরি শুকিয়ে নেওয়া সবচেয়ে জরুরি। আধা শুকনো বীজ বায়ুরোধী পাত্রে রাখলে উল্টো ক্ষতি হয়, ভেতরের আর্দ্রতা আটকে থেকে বীজ পচে যায়। আন্তর্জাতিক ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটসহ বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের পরামর্শ হলো, দীর্ঘদিন রাখার জন্য ধানবীজের আর্দ্রতা ১২ শতাংশ বা তার নিচে নামিয়ে আনা ভালো। গ্রামে অনেকে দাঁতে কেটে দেখেন: দানা কট করে ভেঙে গেলে বুঝে নেন, বীজ যথেষ্ট শুকিয়েছে।
ধানের হিসাবটা ধরলেই ব্যাপারটা পরিষ্কার হয়। বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠে কাটা বোরোর বীজ আবার বীজতলায় যায় অগ্রহায়ণ-পৌষে, অর্থাৎ মাঝখানে পুরো বর্ষাকাল। আর অগ্রহায়ণে কাটা আমনের বীজ ফেলা হয় পরের আষাঢ়-শ্রাবণে। দুই ক্ষেত্রেই বীজকে ছয়-সাত মাস বা তারও বেশি সময় ঘরে থাকতে হয়, যার বড় অংশ কাটে আর্দ্র ও গরম আবহাওয়ায়। এই দীর্ঘ অপেক্ষাই সংরক্ষণকে এত গুরুত্বপূর্ণ করে তোলে।
প্রতিটি পাত্র বা বস্তার গায়ে জাতের নাম, কোন জমি থেকে এবং কবে সংগ্রহ করা হয়েছে, তা লিখে রাখা ভালো অভ্যাস। কয়েক ধরনের বীজ একসঙ্গে রাখলে মিশে যাওয়ার ঝুঁকি কমে, আর পরের মৌসুমে কোন বীজ কেমন ফল দিল, তার হিসাব রাখাও সুবিধাজনক হয়।
সংরক্ষণের পাত্র মেঝেতে সরাসরি না রেখে মাচা বা কাঠের তক্তার ওপর রাখা উচিত, যাতে মাটির আর্দ্রতা উঠে না আসে। বর্ষার মৌসুমে মাঝেমধ্যে পাত্র খুলে দেখা দরকার, বীজে ছত্রাক বা পোকা লেগেছে কি না। পোকামাকড় ঠেকাতে নিমপাতা বা নিমতেলের মতো জৈব উপাদান ব্যবহার করা যায়।
চতুর্থ ধাপ: অঙ্কুরোদগম পরীক্ষা
মাসের পর মাস ঘরে থাকার পর বীজ আদৌ গজাবে কি না, বপনের আগে তা জেনে নেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ। না জেনে বীজতলায় বা জমিতে বীজ ফেললে, পরে দেখা যায় অর্ধেক জায়গা ফাঁকা। তখন নতুন করে বীজ কিনে আবার বোনা মানে সময়, টাকা আর মৌসুম তিনটিই হারানো।
পরীক্ষাটি ঘরে বসেই করা যায়, কোনো যন্ত্র লাগে না। পদ্ধতিটি এরকম:
- বস্তা বা পাত্রের বিভিন্ন জায়গা থেকে মিশিয়ে ১০০টি বীজ গুনে নিন।
- বীজগুলো একটি ভেজা কাপড়ে ছড়িয়ে মুড়িয়ে রাখুন; কাপড় যেন শুকিয়ে না যায়, সেদিকে খেয়াল রাখুন।
- কয়েক দিন পর কাপড় খুলে গুনে দেখুন কতগুলো বীজ অঙ্কুরিত হয়েছে।
- ১০০টির মধ্যে ৮০টি বা তার বেশি গজালে, অর্থাৎ অঙ্কুরোদগম ৮০ শতাংশ বা তার বেশি হলে, সেই বীজ চাষের জন্য উপযুক্ত।
ফল যদি ৮০ শতাংশের কম আসে, তাহলে দুটি পথ খোলা থাকে। হার সামান্য কম হলে বীজের পরিমাণ কিছুটা বাড়িয়ে বোনা যায়। কিন্তু হার অনেক কম হলে সেই বীজ বাদ দিয়ে নতুন ভালো বীজ সংগ্রহ করাই ভালো। এই ছোট পরীক্ষা মৌসুমের শুরুতেই বড় বিপদ থেকে বাঁচায়। ভেজা কাপড়ের বদলে ভেজা বালি বা মাটি ভরা একটি থালাতেও একই নিয়মে পরীক্ষা করা যায়। কেনা বীজের ক্ষেত্রেও পরীক্ষাটি করে নেওয়া ভালো, কারণ পরিবহন ও দোকানে রাখার সময়ও বীজের মান কমে যেতে পারে।
পঞ্চম ধাপ: বপনের আগের প্রস্তুতি
বপনের ঠিক আগে বীজকে একটু প্রস্তুত করে নিলে সে দ্রুত ও সমানভাবে গজায়। সবচেয়ে প্রচলিত কাজটি হলো ভিজিয়ে রাখা। বীজ চাষের আগে ১২ থেকে ২৪ ঘণ্টা পানিতে ভিজিয়ে রাখলে শুকনো বীজ পানি টেনে নেয়, ভেতরের ঘুমন্ত ভ্রূণ জেগে ওঠে এবং অঙ্কুরোদগমের প্রক্রিয়া দ্রুত হয়। ধানের বীজতলার জন্য ভেজানো বীজ জাগ দিয়ে মুখ ফোটানোর রেওয়াজ আমাদের কৃষকদের বহু পুরোনো অভ্যাস।
দ্বিতীয় বিষয় হলো তাপমাত্রা। প্রতিটি ফসলের বীজ গজানোর জন্য নির্দিষ্ট মাত্রার উষ্ণতা দরকার। চাষের আগে বীজের জন্য প্রয়োজনীয় তাপমাত্রা নিশ্চিত করতে হবে। শীতের তীব্র রাতে বোরোর বীজতলা পলিথিন দিয়ে ঢেকে রাখার যে পরামর্শ কৃষি সম্প্রসারণ কর্মীরা দেন, তার কারণও এটিই: ঠান্ডায় বীজ ঠিকমতো গজায় না, আর গজালেও চারা দুর্বল হয়।
বীজ কতটা গভীরে বোনা হচ্ছে, সেটিও অঙ্কুরোদগমে প্রভাব ফেলে। খুব গভীরে গেলে কচি অঙ্কুর মাটি ফুঁড়ে উঠতে পারে না, আবার খুব ওপরে থাকলে পাখি ও পিঁপড়ার খাবার হয় কিংবা রোদে শুকিয়ে যায়। প্রতিটি ফসলের জন্য সুপারিশ করা গভীরতা মেনে চলা উচিত।
পরিচর্যা করা বীজ মাঠে কী সুবিধা দেয়
বীজের পেছনে এই বাড়তি সময় ও শ্রম কেন দেবেন, তার উত্তর মেলে মাঠেই। পরিচর্যা করা বীজের সুবিধাগুলো মোটামুটি এরকম:
- মাটি ও বীজবাহিত জীবাণু এবং পোকামাকড় থেকে অঙ্কুরিত বীজ ও কচি চারা রক্ষা পায়।
- বীজের অঙ্কুরোদগমের ক্ষমতা বাড়ে।
- চারা দ্রুত ও সমানতালে বেড়ে ওঠে।
- ডালজাতীয় ফসলে দ্রুত শুঁটি আসে।
- মাটি বা পাতায় ওষুধ দেওয়ার চেয়ে বীজে নজর দেওয়া অনেক সুবিধাজনক ও কম খরচের।
- বেশি বা কম আর্দ্রতার মতো খারাপ পরিস্থিতিতেও ফসলের উৎপাদনে একটা সমতা বজায় থাকে।
পঞ্চম সুবিধাটি একটু ভেবে দেখার মতো। এক কেজি বীজে দুই থেকে তিন গ্রাম ওষুধ মেশাতে যে খরচ, পুরো জমিতে চারা রোগে আক্রান্ত হওয়ার পর স্প্রে করার খরচ তার বহু গুণ। আর তখন ক্ষতির একটা অংশ আর ফেরানোও যায় না। রোগ ঠেকানোর সবচেয়ে সস্তা জায়গা তাই বীজ।
তিন পদ্ধতি: ড্রেসিং, আচ্ছাদন ও বড়ি
বীজ পরিচর্যা এমন একটি শব্দ, যা একই সঙ্গে পণ্য এবং প্রক্রিয়া দুটোই বোঝায়। অর্থাৎ বীজের গায়ে যা দেওয়া হয়, সেটিও বীজ পরিচর্যা, আবার দেওয়ার কাজটিও। কাজের ধরন অনুযায়ী এটি মূলত তিনভাবে করা হয়।
প্রথমটি বীজ ড্রেসিং, যা বীজ পরিচর্যার সবচেয়ে চালু পদ্ধতি। এতে বীজকে শুকনো গুঁড়া, তরল মিশ্রণ অথবা থকথকে কাদার মতো মিশ্রণের মধ্যে রেখে ওষুধ মাখানো হয়। কৃষকের জন্য এটি সবচেয়ে হাতের কাছের পদ্ধতি। বীজের সঙ্গে কীটনাশক মেশাতে সস্তা মাটির পাত্র ব্যবহার করা যায়। পলিথিনের চাদরের ওপর বীজ ছড়িয়ে তার ওপর উপযুক্ত পরিমাণে রাসায়নিক ছিটিয়ে উল্টেপাল্টে মেশানো যায়। ধাতব বীজ ড্রেসার, মাটির পাত্র অথবা পলিথিন ব্যাগ, এই তিনটির যেকোনোটিতে ড্রেসিংয়ের কাজ চলে। বড় পরিসরে চাষিরা যান্ত্রিক পদ্ধতিতেও এটি করতে পারেন। খামার ও শিল্পক্ষেত্র, দুই জায়গাতেই বীজ ড্রেসিং করা হয়ে থাকে।
পলিথিন ব্যাগে ড্রেসিংয়ের কৌশলটি গ্রামে বেশ জনপ্রিয়। ব্যাগে বীজ ও মাপমতো ওষুধ ভরে মুখ শক্ত করে বেঁধে কয়েক মিনিট ঝাঁকালে প্রতিটি দানার গায়ে সমানভাবে ওষুধ লেগে যায়, আর ধুলা উড়ে হাতে-মুখে লাগার ঝুঁকিও কমে।
দ্বিতীয় পদ্ধতি বীজ আচ্ছাদন। এতে বীজের ক্ষমতা বাড়াতে একটি বিশেষ দ্রব্য দিয়ে তার গায়ে পাতলা আবরণ তৈরি করা হয়। আবরণের ভেতরে ছত্রাকনাশক, কীটনাশক বা পুষ্টি উপাদান থাকতে পারে। এই আচ্ছাদনের জন্য উন্নত বীজ পরিচর্যা প্রযুক্তি দরকার, তাই পদ্ধতিটি সাধারণত শিল্পক্ষেত্রে, অর্থাৎ বীজ কোম্পানির কারখানায় ব্যবহার করা হয়। বাজারে রঙিন আবরণের যে বীজ দেখা যায়, সেগুলো এভাবেই তৈরি।
তৃতীয় পদ্ধতি বীজের বড়ি দেওয়া, যাকে সবচেয়ে উন্নত বীজ পরিচর্যা পদ্ধতি ধরা হয়। এতে বীজের চারপাশে উপাদানের পুরু স্তর দিয়ে ছোট বড়ির মতো গোল করে ফেলা হয়। ফলে বীজের আকার-আকৃতি বদলে যায় এবং খুব ছোট বীজও যন্ত্রে বা হাতে বোনা সুবিধাজনক হয়। তবে এর জন্য আধুনিক যন্ত্রপাতি ও প্রযুক্তি দরকার, এবং এটি অত্যন্ত ব্যয়সাপেক্ষ পদ্ধতি।
ফলনে ও খরচে যে পার্থক্য আসে
সব মিলিয়ে বীজ পরিচর্যার উপকারিতাকে চারটি বড় ভাগে ভাবা যায়।
প্রথমত, উচ্চ অঙ্কুরোদগম হার। পরিচর্যার ফলে বীজ দ্রুত অঙ্কুরিত হয় এবং জমিতে ফাঁকা জায়গা কম থাকে। দ্বিতীয়ত, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি। বীজ শোধনের ফলে রোগ ও কীটপতঙ্গ থেকে সুরক্ষা পাওয়া যায়, বিশেষ করে জীবনের প্রথম কয়েক সপ্তাহে, যখন চারা সবচেয়ে নাজুক।
তৃতীয়ত, উন্নত ফলন। পরিচর্যায় বীজের গুণগত মান বজায় থাকে, আর সুস্থ, সমান ও সবল চারা শেষ পর্যন্ত বেশি ফলন দেয়। চতুর্থত, খরচ সাশ্রয়। বীজের সঠিক ব্যবস্থাপনার ফলে কৃষির মোট খরচ কমে: বাড়তি বীজ কিনতে হয় না, নতুন করে বুনতে হয় না, পরে রোগ সামলাতে বাড়তি ওষুধও কম লাগে।
এর বাইরে একটা বড় লাভ আছে, যা হিসাবের খাতায় সরাসরি ধরা পড়ে না। সময়মতো সমান চারা পেলে পুরো মৌসুমের কাজ একটা নিয়মে চলে। বীজতলা নষ্ট হয়ে দ্বিতীয়বার বীজ ফেলতে হলে রোপণ পিছিয়ে যায়, আর পিছিয়ে যাওয়া ফসল অনেক সময় শেষ দিকে খরা, শিলাবৃষ্টি বা বন্যার মুখে পড়ে।
কৃষকের জন্য কয়েকটি কাজের পরামর্শ
মাঠের অভিজ্ঞতা থেকে উঠে আসা কয়েকটি পরামর্শ মনে রাখলে বীজের যত্ন আরও কার্যকর হয়:
- সংরক্ষণের আগে বীজ পুরোপুরি শুকিয়ে নিন।
- পোকামাকড় প্রতিরোধে নিমতেল বা জৈব কীটনাশক ব্যবহার করুন।
- পুরোনো বীজের বদলে প্রতি মৌসুমে নতুন ও ভালো বীজ ব্যবহার করুন।
- উচ্চ ফলনশীল জাত ও স্থানীয় জাতের বীজের মিশ্রণ ব্যবহার করুন।
প্রতি মৌসুমে নতুন বীজের পরামর্শটির পেছনে কারণ আছে। একই বীজ বছরের পর বছর নিজের ঘরে রেখে বুনতে থাকলে তাতে অন্য জাতের মিশ্রণ, রোগের জীবাণু আর দুর্বলতা ধীরে ধীরে জমতে থাকে। মাঝে মাঝে বিশ্বস্ত উৎস থেকে বীজ বদলে নেওয়া তাই ভালো অভ্যাস।
আর উচ্চ ফলনশীল ও স্থানীয় জাতের মিশ্রণের পরামর্শটি ঝুঁকি ভাগ করে নেওয়ার কৌশল। উচ্চ ফলনশীল জাত বেশি ফলন দেয়, আবার স্থানীয় জাত অনেক সময় এলাকার আবহাওয়া ও মাটির সঙ্গে বেশি মানানসই। দুটোর মিশেলে এক বছরের খারাপ আবহাওয়ায় পুরো ফসল হারানোর আশঙ্কা কমে।
কোন ফসলে কোন জাত, কোন শোধক, কত মাত্রায়, এসব প্রশ্নে সবচেয়ে কাছের সহায় উপজেলা কৃষি অফিস ও ইউনিয়ন পর্যায়ের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের এই কর্মীরা এলাকার মাটি ও মৌসুম বুঝে পরামর্শ দিতে পারেন।
এক কেজি বীজের যত্নে এক মৌসুমের নিশ্চয়তা
সঠিক পদ্ধতিতে বীজ পরিচর্যা করলে ফসলের উৎপাদন বাড়ে, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ে। কাজটি কৃষকের হাতের নাগালে, খরচও সামান্য, কিন্তু গুরুত্বে অনেক বড়। বাছাই, শোধন, সংরক্ষণ, অঙ্কুরোদগম পরীক্ষা আর বপনের আগের প্রস্তুতি, এই পাঁচ ধাপ নিয়মিত মেনে চললে মাঠে তার ফল চোখে পড়বেই।
উঠানে শুকাতে দেওয়া যে মুঠো মুঠো দানা দিয়ে এই লেখা শুরু হয়েছিল, সেগুলোই আগামী মৌসুমের প্রথম পুঁজি। সেই পুঁজিকে যত্নে রাখা মানে পুরো মৌসুমের পরিশ্রমকে সুরক্ষা দেওয়া।
ছবি: ট্রেতে অঙ্কুরিত ধানের বীজ, Prajna Prabhu / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)





মন্তব্য
(০)