সময়মতো ও সঠিক নিয়মে সার দিলে বাংলাদেশের নারিকেল গাছে ফলন বাড়ে এবং গাছ সুস্থ থাকে। ২০২৫ সালের ৭ জুলাই জাগো নিউজ ২৪-এ প্রকাশিত একটি কৃষি নির্দেশিকায় এ কথা বলা হয়। উপকূল ও দক্ষিণাঞ্চলের চাষিদের জন্য লেখা ওই নির্দেশিকায় নারিকেল গাছে কখন সার দিতে হবে, কোন কোন সার লাগবে, গাছের গোড়ার চারপাশে বৃত্তাকারে কীভাবে সার দিতে হবে এবং গাছের নিচের জমি কীভাবে যত্নে রাখতে হবে, তা তুলে ধরা হয়। নিচে সেই পরামর্শের পাশাপাশি কৃষি কর্তৃপক্ষ ও আগের প্রতিবেদনের তথ্য দেওয়া হলো: নারিকেল গাছ কীভাবে খাদ্য নেয়, ২০২৫ সালের আগে নারিকেল এলাকায় কী সমস্যা দেখা দিয়েছিল এবং নির্দিষ্ট বাগানের জন্য উপযোগী সুপারিশ চাষি কোথায় পেতে পারেন।
নির্দেশিকায় প্রতিটি সারের যে পরিমাণ দেওয়া হয়েছিল, তা বাংলাদেশের কোনো প্রকাশিত সরকারি সুপারিশের সঙ্গে মিলিয়ে নিশ্চিত করা যায়নি, তাই এখানে সেই পরিমাণ দেওয়া হলো না। সঠিক পরিমাণ নির্ভর করে মাটি, গাছের বয়স ও জাতের ওপর। তাই কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার কাছ থেকে, সম্ভব হলে মাটি পরীক্ষা করিয়ে, সারের মাত্রা জেনে নেওয়া উচিত।
বসতবাড়ি ও উপকূলের বহুমুখী গাছ
নারিকেল হলো পাম গোত্রের শাখা-প্রশাখাহীন লম্বা গাছ কোকোস নুসিফেরার (Cocos nucifera) ফল। বাংলাদেশের জাতীয় জ্ঞানকোষ বাংলাপিডিয়ার বর্ণনায় এ গাছ ২০ থেকে ৩০ মিটার উঁচু হয়, এর কাণ্ড মসৃণ ও বেলনাকার এবং ওপরের দিকে ক্রমশ সরু। গাছটি পৃথিবীর উষ্ণমণ্ডলে বিস্তৃত; বিশেষ করে সমুদ্র উপকূলের নিচু জমি ও ছোট দ্বীপাঞ্চলে ভালো জন্মে। বাংলাদেশের সব জায়গাতেই নারিকেল গাছ জন্মে, তবে বাংলাপিডিয়া বলছে, সমুদ্রতীরবর্তী লোনা মাটিতে এর উৎপাদন ভালো। দেশে যেসব নারিকেলের চাষ হয় তার মধ্যে আছে টিপিকা সবুজ, টিপিকা বাদামি ও দুধে। জাতভেদে বছরে একটি গাছে ২০০ বা তার বেশি নারিকেল পাওয়া যায়।
নারিকেল গাছের প্রায় প্রতিটি অংশই কাজে লাগে। এর সাদা শাঁস পিঠা, মিষ্টি, বিস্কুট, চকোলেট ও নানা রান্নায় ব্যবহার হয়। শুকনো শাঁস থেকে তৈরি তেল মাথায় দেওয়া ছাড়াও রান্নায় এবং সাবান, শ্যাম্পু ও অন্যান্য প্রসাধনী তৈরিতে লাগে, আর তেল বের করার পর যে খৈল থাকে তা পশুখাদ্য হয়। ছোবড়া দিয়ে শক্ত দড়ি, ব্রাশ, জাজিম ও পাপোশ তৈরি হয়, খোল দিয়ে তৈরি হয় হুঁকো। কাঁচা ও শুকনো পাতায় মাদুর ও ঝুড়ি বোনা হয় এবং কুঁড়েঘরের চালা ছাওয়া হয়, পাতার মধ্যশিরা দিয়ে হয় ঝাঁটা। কচি নারিকেল বা ডাবের পানি সুস্বাদু পানীয়, আবার উদ্ভিদের কোষকলা চাষেও এটি একটি মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার হয়। গাছের কাণ্ড দিয়ে ঘরের আড়া, পুলের খুঁটি ও ঘরের খুঁটি তৈরি হয়। দেশের মধ্য ও দক্ষিণাঞ্চলে বসতবাড়ির চারপাশে ব্যাপকভাবে নারিকেল গাছ লাগানো হয়, আর কোনো কোনো শহরে পথের ধারের গাছ হিসেবেও এটি রোপণ করা শুরু হয়েছে।
জাগো নিউজের নির্দেশিকায় খুলনা, বরিশাল, পটুয়াখালী, ভোলা, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার অঞ্চলকে নারিকেল চাষের প্রধান এলাকা হিসেবে উল্লেখ করা হয়। ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে ঢাকা ট্রিবিউন জানায়, নারিকেল উৎপাদনে বাংলাদেশ বিশ্বে দ্বাদশ; দেশে ২৫ হাজার ৩৩৫ হেক্টর জমি থেকে ৪ লাখ ৪২ হাজার ৭০০ টন নারিকেল উৎপাদিত হয়।

উপকূলে ফলন কমছিল কেন
নির্দেশিকার শুরুতেই চাষিদের সমস্যার কথা বলা হয়: জলবায়ু পরিবর্তন, মাটির লবণাক্ততা বৃদ্ধি, আবাদি জমি ক্রমে কমে যাওয়া এবং অনিয়ন্ত্রিত চাষাবাদের কারণে নারিকেল উৎপাদনে নানা সমস্যা দেখা দিয়েছে। তবে আধুনিক চাষপদ্ধতি, সঠিক জাত নির্বাচন, সার প্রয়োগ, সেচ ও রোগ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো সম্ভব বলে নির্দেশিকায় বলা হয়। উপকূল থেকে আগের প্রতিবেদনগুলোতেও একই চাপের কথা উঠে এসেছিল।
২০১৮ সালের মে মাসে দ্য ডেইলি স্টার বাগেরহাট থেকে জানায়, ইঁদুর, মাকড় ও উচ্চ লবণাক্ততায় সেখানে কচি নারিকেলের ক্ষতি হচ্ছে। কচুয়া উপজেলার চাষিরা পত্রিকাটিকে বলেন, মাকড়ের আক্রমণে নারিকেলে দাগ পড়ে, আকারে ছোট হয় ও শুকিয়ে যায়; একজন নারিকেল ব্যবসায়ী বলেন, দাগওয়ালা নারিকেল কেউ কিনতে চান না। ডিএইর বাগেরহাট কার্যালয়ের অতিরিক্ত উপপরিচালক (উদ্যান) জানান, মাকড় দমনে কীটনাশক এবং ইঁদুর দমনে ফাঁদ ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। আর বাগেরহাটে ডিএইর উপপরিচালক বলেন, উচ্চ লবণাক্ততার কারণে এলাকায় নারিকেলের উৎপাদন দিন দিন কমছে। ২০১৯ সালের জানুয়ারিতে প্রথম আলো ইংরেজিতে প্রকাশিত ইউএনবির এক প্রতিবেদনে স্থানীয় একটি বেড়িবাঁধ বাস্তবায়ন কমিটির সভাপতি বলেন, রামপাল ও মোংলা এলাকায় একসময় প্রচুর নারিকেল ও সুপারি গাছ ছিল, কিন্তু লবণাক্ততা বাড়ায় তা নাটকীয়ভাবে কমে গেছে।
২০২৩ সালের ২১ সেপ্টেম্বর ঢাকা ট্রিবিউনের প্রতিবেদনে ক্ষতির একটি হিসাব দেওয়া হয়। পত্রিকাটি জানায়, ডিএইর এক হিসাবে দেশের দক্ষিণাঞ্চলের নারিকেল উৎপাদন এলাকায় অব্যবস্থাপনা ও পোকামাকড়ের আক্রমণে প্রায় ৬০ শতাংশ উৎপাদন কমেছে। এর প্রধান কারণ হিসেবে পত্রিকাটি উল্লেখ করে সাদা মাছি ও মাকড়ের আক্রমণ, সঠিকভাবে সার না দেওয়া এবং প্রচলিত চাষিদের সীমিত কারিগরি জ্ঞান, যার মধ্যে পোকা দমন ও ডালপালা ছাঁটাইয়ের জ্ঞানও পড়ে। প্রতিবেদনে বলা হয়, নারিকেল আকারে ছোট হয়ে গেছে, গায়ে আঁচড়ের দাগ পড়ছে, আকৃতি বিকৃত হচ্ছে এবং ভেতরে শুকিয়ে যাচ্ছে। পত্রিকাটি আরও জানায়, বাগেরহাটে ১০টি ছোবড়ার কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয় নতুন এক পোকা। ২০২৫ সালের ১৫ মে মোঙ্গাবে জানায়, রুগোজ স্পাইরালিং হোয়াইটফ্লাই বা সর্পিল সাদা মাছি (Aleurodicus rugioperculatus) ২০১৯ সালে প্রথম দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে নারিকেল গাছে শনাক্ত হয় এবং পরে সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে। রস শোষণকারী এই পোকা পাতা থেকে পুষ্টি ও পানি শুষে নেয় এবং সালোকসংশ্লেষণ ব্যাহত করে। বাংলাদেশে ৬১টি পোষক উদ্ভিদে এটি পাওয়া গেছে, যার মধ্যে নারিকেল, কলা ও পেয়ারা সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত। এ ছাড়া নারিকেলের মাকড় (Aceria guerreronis) কচি ফলে বাসা বাঁধে এবং এর বাচ্চা কচি নারিকেলের ক্ষতি করে। সার দিলেই এসব পোকা দমন হয় না, তবে ঢাকা ট্রিবিউনের প্রতিবেদন দেখায়, চাষি ও সম্প্রসারণকর্মীরা পুষ্টি ব্যবস্থাপনা ও পোকা দমনকে একই কাজের দুই অংশ হিসেবে দেখেছেন।
নারিকেল গাছ কীভাবে খাদ্য নেয় ও ফল ধরে
নারিকেল গাছের কোনো প্রধান মূল বা মূলরোম নেই। এর আছে গুচ্ছমূল: অনেকগুলো সরু শিকড়, প্রতিটি প্রায় এক সেন্টিমিটার মোটা, যা মাটির ওপরের স্তরের কাছাকাছি দিয়ে চারদিকে ছড়িয়ে যায়। একটি গাছে এমন ২ হাজার থেকে ৪ হাজার শিকড় হতে পারে; গাছকে মাটিতে শক্ত করে ধরে রাখতে অল্প কয়েকটি শিকড় গভীরে যায়। গাছ যত বাড়ে, পুরোনো মরা শিকড়ের জায়গায় নতুন শিকড় গজায়। এ কারণেই কাণ্ডের গায়ে সার স্তূপ না করে গোড়া থেকে কিছুটা দূরে, যেখানে খাদ্য গ্রহণকারী শিকড় থাকে, সেখানে বৃত্তাকারে বা থালার মতো করে সার দেওয়া হয়।
পূর্ণবয়স্ক নারিকেল গাছ বিরতিহীনভাবে বাড়ে এবং সারা বছর পাতা, ফুল ও ফল দেয়। একেকটি ফুলের কুঁড়ি থেকে পুষ্পমঞ্জরি তৈরি হতে প্রায় ১৪ মাস লাগে, আর স্ত্রী ফুল ফোটার পর নারিকেল পাড়ার উপযোগী হতে লাগে আরও ১১ মাস। একটি সুস্থ গাছে বছরে ১৫টি পর্যন্ত পুষ্পমঞ্জরি আসতে পারে, এবং সেগুলো এমনভাবে পর্যায়ক্রমে আসে যে প্রতিটি ধাপেই একটি করে থাকে। বাস্তবে এর মানে হলো, চাষি এ বছর যে নারিকেল পাড়েন তার গঠন শুরু হয়েছিল দুই বছরেরও বেশি আগে। তাই সার দেওয়ার সুফল বা অবহেলার কুফল ধীরে ধীরে চোখে পড়ে, এবং একবারে বেশি সার দেওয়ার চেয়ে বছরের পর বছর নিয়মিত যত্ন বেশি জরুরি। লম্বা জাতের গাছে প্রথম ফল আসে ছয় থেকে দশ বছরে এবং গাছ ৬০ থেকে ১০০ বছর বাঁচে; খাটো জাতে আগে ফল আসে, তবে আয়ু কম।
পানি ও পুষ্টি একসঙ্গে কাজ করে। খরার সময় নতুন পাতা ঠিকমতো খোলে না, পুরোনো পাতা শুকিয়ে যায় এবং নারিকেল ঝরে পড়তে পারে। গবেষণাতেও পুষ্টির সঙ্গে ফল ধরা শুরুর সম্পর্ক দেখা গেছে: ২০২৪ সালের নভেম্বরে ইন্টারন্যাশনাল জার্নাল অব মলিকুলার সায়েন্সেসে প্রকাশিত খাটো জাতের নারিকেল নিয়ে এক গবেষণায় দেখা যায়, ফুল-ফল ধারণের পর্যায়ে থাকা গাছের শিকড়ে ফসফরাসের ঘনত্ব শুধু পাতা-কাণ্ড বাড়ার পর্যায়ে থাকা গাছের চেয়ে ১.৩১ গুণ। গবেষকদের মতে, ফসফরাস বেশি শোষণ গাছকে পাতা বাড়ানো থেকে ফুল ধরার পর্যায়ে যেতে সাহায্য করতে পারে।

কখন সার দেবেন
জাগো নিউজের নির্দেশিকায় বছরে দুবার সার দেওয়াকে উত্তম বলা হয়: একবার জুন-জুলাইয়ে, বর্ষার শুরুতে, আরেকবার নভেম্বর-ডিসেম্বরে, শীতের শুরুতে। নির্দেশিকার শেষ অংশে একই ভাগকে মৌসুমের আগে একবার এবং বর্ষা শেষে আরেকবার সুষম হারে জৈব ও রাসায়নিক সার দেওয়ার কথা হিসেবে বর্ণনা করা হয়, যাতে গাছ প্রয়োজনীয় পুষ্টি পায়।
দক্ষিণ ভারতে, যেখানে ব্যাপক পরিসরে নারিকেল চাষ হয়, সেখানে তামিলনাড়ু কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ও (টিএনএইউ) দুই ভাগে সার দেওয়ার সুপারিশ করে। বিশ্ববিদ্যালয়টির কৃষি তথ্য পোর্টালে ফলন্ত গাছের জৈব সার ও রাসায়নিক সার দুই সমান ভাগে, জুন-জুলাই এবং ডিসেম্বর-জানুয়ারিতে দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। টিএনএইউ এমন একটি শর্তও দেয়, যা দিনক্ষণের মতোই গুরুত্বপূর্ণ: সার দেওয়ার সময় মাটিতে যথেষ্ট রস থাকতে হবে। জাগো নিউজের নির্দেশিকাও অন্য দিক থেকে একই কথা বলে: সার দেওয়ার পর, বিশেষ করে শুষ্ক মৌসুমে, হালকা পানি দিতে হবে।
কোন সার, কতটা
নির্দেশিকায় জৈব সার হিসেবে গোবর এবং বাংলাদেশে বহুল প্রচলিত তিনটি রাসায়নিক সার মিলিয়ে দেওয়ার কথা বলা হয়: ইউরিয়া, যা নাইট্রোজেন জোগায়; ট্রিপল সুপার ফসফেট বা টিএসপি, যা ফসফরাস জোগায়; এবং মিউরেট অব পটাশ বা এমওপি, যা পটাশিয়াম জোগায়। পূর্ণবয়স্ক গাছের জন্য প্রতিটি সারের বার্ষিক পরিমাণও দেওয়া হয় এবং তিন থেকে পাঁচ বছরের গাছে তার অর্ধেক দিতে বলা হয়।
সেই পরিমাণ বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বারি), ডিএই বা জাতীয় সার সুপারিশ নির্দেশিকার প্রকাশিত সুপারিশের সঙ্গে মিলিয়ে নিশ্চিত করা যায়নি, আর অন্যান্য উৎসে পাওয়া পরিমাণের মধ্যেও বড় ফারাক আছে। তাই সেগুলো এখানে দেওয়া হলো না। কৃষি কর্তৃপক্ষগুলো মাটি, জলবায়ু, জাত ও ব্যবস্থাপনার মান অনুযায়ী নারিকেলের সারের মাত্রা ঠিক করে। যেমন টিএনএইউর সূচিতে চারা লাগানোর পঞ্চম বছর থেকে জৈব সারসহ পূর্ণবয়স্ক গাছের পুরো মাত্রা শুরু হয়, আর দ্বিতীয়, তৃতীয় ও চতুর্থ বছরে দেওয়া হয় ওই সূচির যথাক্রমে এক-চতুর্থাংশ, অর্ধেক ও তিন-চতুর্থাংশ। তবে এই পরিমাণগুলো তামিলনাড়ুর পরিবেশের জন্য নির্ধারিত, স্থানীয় পরামর্শের বিকল্প নয়।
বাংলাদেশে বাস্তব পদক্ষেপ হলো উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা বা ইউনিয়নের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তার পরামর্শ নেওয়া, যিনি নির্দিষ্ট বাগানের জন্য সারের পরিমাণ বলে দিতে এবং মাটি পরীক্ষার ব্যবস্থা করতে পারেন। ২০২৩ সালে ঢাকা ট্রিবিউনের বর্ণনা করা বাগেরহাটের নারিকেল প্রশিক্ষণ কর্মসূচিতে চাষিরা গাছে কম্পোস্ট, ইউরিয়া, টিএসপি ও এমওপির সঙ্গে বোরন, সালফার, কপার সালফেট ও চুন দিয়েছিলেন। এ থেকে বোঝা যায়, শুধু তিনটি প্রধান সারে মাটির সব চাহিদা না-ও মিটতে পারে।
এই নির্দেশিকার জন্য যেসব কর্তৃপক্ষের পরামর্শ দেখা হয়েছে, তাদের সবার পরামর্শেই জৈব পদার্থের গুরুত্ব আছে। টিএনএইউ ফলন্ত গাছে খামারজাত জৈব সার, কম্পোস্ট বা সবুজ সার দিতে বলে, এবং কম্পোস্টের বিকল্প হিসেবে শণ বা ধৈঞ্চার মতো সবুজ সারের ফসল গাছের গোড়ার থালায় বুনে ফুল আসার সময় মাটিতে মিশিয়ে দেওয়ার পরামর্শ দেয়। নারিকেলের ছোবড়ার গুঁড়া, নারিকেলের পাতা ও বাগানের অন্যান্য বর্জ্য দিয়ে তৈরি কম্পোস্টের কথাও বিশ্ববিদ্যালয়টি উল্লেখ করে।

গাছের চারপাশে সার দেওয়ার নিয়ম
নির্দেশিকায় বৃত্তাকার নালা পদ্ধতির কথা বলা হয়, যাতে সার খাদ্য গ্রহণকারী শিকড়ের কাছে পৌঁছায়। ধাপগুলো ছিল:
- গাছের গোড়া থেকে ১ থেকে ১.৫ মিটার দূরে চারপাশে বৃত্তাকারে ১৫ থেকে ২০ সেন্টিমিটার গভীর নালা খুঁড়ুন।
- নালার মাটিতে সার ছিটিয়ে দিন।
- এরপর মাটি দিয়ে ঢেকে দিন।
- হালকা পানি দিন, বিশেষ করে শুষ্ক মৌসুমে।
- গাছের নিচের জমি আগাছামুক্ত রাখুন।
- পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা রাখুন, যাতে গাছের গোড়ায় পানি জমে না থাকে।
নির্দেশিকায় বলা হয়, গাছের চারপাশে গর্ত করেও সার দেওয়া যায়, এবং সার ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সেচ ও আগাছা দমন যুক্ত হলে ফলন আরও বাড়ে। টিএনএইউ গাছের গোড়া থেকে ১.৮ মিটার ব্যাসার্ধের গোলাকার থালায় জৈব ও রাসায়নিক সার দিয়ে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে সেচ দিতে বলে। অর্থাৎ গাছের আকার ও শিকড়ের বিস্তার অনুযায়ী কাণ্ড থেকে দূরত্ব কমবেশি করা যায়।
মাটির অম্লতা, অণুপুষ্টি ও কচি ফল ঝরা
মাটির ভারসাম্য নষ্ট থাকলে সার দিয়েও সুফল না-ও মিলতে পারে। টিএনএইউ কচি নারিকেল বা মুচি ঝরে পড়াকে খতিয়ে দেখার মতো লক্ষণ হিসেবে দেখে এবং এর সম্ভাব্য কারণগুলো তালিকা করে: মাটির অতিরিক্ত অম্লতা বা ক্ষারত্ব, পানি নিষ্কাশনের অভাব, তীব্র খরা, জিনগত কারণ, পুষ্টির অভাব, পরাগায়নের অভাব, হরমোনের ঘাটতি, পোকামাকড় ও রোগ। বিশ্ববিদ্যালয়টি বলে, মাটির পিএইচ ৫.৫-এর কম হলে তা অতিরিক্ত অম্লতার লক্ষণ, যা চুন দিয়ে সংশোধন করা যায়; আর পিএইচ ৮.০-এর বেশি হলে তা ক্ষারত্বের লক্ষণ, যা জিপসাম দিয়ে সংশোধন করা যায়। টিএনএইউ আরও বলে, পর্যাপ্ত সার না দেওয়া বা ভুল সময়ে সার দেওয়াও মুচি ঝরার একটি কারণ।
অণুপুষ্টিও গুরুত্বপূর্ণ। টিএনএইউ অণুপুষ্টির অভাবজনিত 'পেনসিল পয়েন্ট' নামের একটি সমস্যার বর্ণনা দেয়, যাতে কাণ্ড আগার দিকে সরু হয়ে যায়, পাতার সংখ্যা কমে এবং পাতা ছোট, ফ্যাকাশে ও হলুদ হয়ে যায়; বিশ্ববিদ্যালয়টির মতে, আগেভাগে ধরা পড়লে এটি সারানো যায়। বোরনের অভাবকে টিএনএইউ 'ক্রাউন চোক' বা মাথা আটকে যাওয়া সমস্যার কারণ বলে চিহ্নিত করে এবং এর জন্য বোরাক্স দেওয়ার সুপারিশ করে। কোন উপাদান কতটা লাগবে তা যেহেতু মাটির ওপর নির্ভর করে, তাই বাংলাদেশের চাষিরা এমন লক্ষণ দেখলে আন্দাজে অণুপুষ্টি না দিয়ে উপজেলা কৃষি অফিসকে গাছ দেখানো উচিত।
যত্নের ওপরই নির্ভর করেছে ভিয়েতনামি খাটো জাতের ভাগ্য
সার ও যত্নের গুরুত্ব স্পষ্ট হয় ভিয়েতনামি খাটো জাতের নারিকেল ছড়িয়ে দেওয়ার সরকারি উদ্যোগে। ২০২১ সালের ৫ ডিসেম্বর দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড জানায়, ডিএই ২০১৫ সালে সিয়াম ব্লু ও সিয়াম গ্রিন নামের দুটি জাত চালু করে এবং উপকূলীয় এলাকায় বাণিজ্যিক চাষের জন্য এগুলোকে স্বল্পমেয়াদি, উচ্চফলনশীল ও লবণসহিষ্ণু জাত হিসেবে প্রচার করে। প্রকল্প পরিচালক পত্রিকাটিকে জানান, সারা বছর ফল উৎপাদনের মাধ্যমে পুষ্টি উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় ২০১৫ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে দক্ষিণাঞ্চল ও অন্যান্য জেলার চাষিদের আড়াই লাখ চারা দেওয়া হয়, যাতে শুধু চারার পেছনেই সরকারের খরচ হয় ১৩ কোটি ১২ লাখ টাকার বেশি।
পত্রিকাটি দেখতে পায়, অনেক গাছে ফুলই আসেনি। পটুয়াখালীতে প্রায় ৩০ হাজার চারা বিতরণ করা হয়েছিল; সেখানকার ডিএইর উপপরিচালক বলেন, কিছু বাগানে ফুল ও ফল এসেছে, কিন্তু পাঁচ বছরের বেশি বয়সী অনেক গাছে আসেনি, এবং এর জন্য তিনি যত্নের অভাবকে দায়ী করেন। তিনি বলেন, "এই ভিয়েতনামি জাতগুলো হাইব্রিড গরুর মতো। যত বেশি খাওয়াবেন, তত বেশি দুধ দেবে।" বরিশালের বাবুগঞ্জের একজন উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তার হিসাবে, প্রতিটি গাছে সার, কীটনাশক, সেচ ও শ্রমের জন্য বছরে অন্তত ৩০০ টাকা লাগে; কিন্তু অনেক চাষি ১৫০ টাকার কম খরচ করেছেন, যা খারাপ ফলাফলের একটি কারণ বলে তিনি মনে করেন। নার্সারি মালিকেরা প্রতি ছয় মাস পরপর প্রতিটি গাছের গোড়ায় সার দেওয়ার পরামর্শ দেন। প্রকল্প পরিচালক বলেন, ভিয়েতনামি নারিকেল চাষ কেবল মৃদু শীত ও গন্ধকসমৃদ্ধ মাটির কিছু দক্ষিণাঞ্চলীয় জেলায় সফল হয়, এবং তিনি কেবল বরিশাল অঞ্চলে বাণিজ্যিক চাষের সুপারিশ করেন।
২০২৫ সালের মে মাসে মোঙ্গাবের প্রতিবেদনে একই উদ্যোগকে ২০১৪ সালে শুরু হওয়া একটি সরকারি পুষ্টি উন্নয়ন প্রকল্প হিসেবে বর্ণনা করা হয়, যার মাধ্যমে তিনটি উচ্চফলনশীল জাত আনা হয়: ভিয়েতনাম থেকে সিয়াম ব্লু ও সিয়াম গ্রিন এবং ভারত থেকে ডিজে সম্পূর্ণা। ধারণা করা হতো, এগুলো দেশি জাতের চেয়ে প্রায় তিন গুণ ফলন দেয়। ডিএইর একজন প্রকল্প পরিচালক মোঙ্গাবেকে জানান, ডিএইর হর্টিকালচার সেন্টারগুলোর মাধ্যমে প্রায় ১০ লাখ চারা সরবরাহ করা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রত্যাশিত ফলন না পাওয়ায় এবং সাদা মাছির আক্রমণে গাছ শুকিয়ে যাওয়ায় অনেক চাষি বাগান ছেড়ে দিয়েছেন।
বাগেরহাটে চাষিদের প্রশিক্ষণ
ভালো যত্নের পদ্ধতি মাঠপর্যায়ে শেখানোর উদ্যোগও ছিল। ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে ঢাকা ট্রিবিউন জানায়, বাগেরহাটভিত্তিক সমবায় প্রতিষ্ঠান রেনেসাঁ এন্টারপ্রাইজ মার্কিন সাহায্য সংস্থা ইউএসএআইডির সহায়তাপুষ্ট ফিড দ্য ফিউচার বাংলাদেশ হর্টিকালচার, ফ্রুটস অ্যান্ড নন-ফুড ক্রপস অ্যাকটিভিটির সঙ্গে মিলে চিতলমারী উপজেলার কয়েকটি ইউনিয়নে 'গাছি' নামে পরিচিত ৫০ জন স্থানীয় সেবাদাতা এবং ২ হাজারের বেশি চাষিকে প্রশিক্ষণ দিয়েছে। কর্মসূচির চাষিরা গাছে কম্পোস্ট ও সার দেন, মাকড় ও সাদা মাছি দমনে মাকড়নাশক ব্যবহার করেন এবং ফল রক্ষায় ফেরোমন ফাঁদ বসান। সমবায়টির পরিচালক পত্রিকাটিকে বলেন, গত কয়েক বছরে নারিকেলের উৎপাদন ব্যাপকভাবে কমে গেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, যেসব গাছে পরিচর্যা করা হয়েছে সেগুলোতে আক্রমণ কমেছে এবং ফুল ও কচি নারিকেল আগের চেয়ে সুস্থ দেখাচ্ছে।
জাগো নিউজের নির্দেশিকাও একই নীতিতে শেষ হয়। নিয়মিত, সঠিক মাত্রায় ও সুষমভাবে জৈব ও রাসায়নিক সার গাছের চারপাশে বৃত্তাকারে বা গর্তে দিলে এবং তার সঙ্গে সেচ, আগাছা দমন ও পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা থাকলে নারিকেল গাছ দীর্ঘমেয়াদে সুস্থ ও উৎপাদনশীল থাকে। নির্দেশিকায় বলা হয়, মাটির ধরন, গাছের বয়স ও পরিবেশভেদে সার দেওয়ার সময় ও পরিমাণ ভিন্ন হতে পারে; এ কারণেই তা ঠিক করার জায়গা স্থানীয় কৃষি অফিস।
ছবি: ইব্রাহিম হুসাইন মেরাজ / উইকিমিডিয়া কমন্স (সিসি বাই-এসএ ৪.০)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪ (৭ জুলাই ২০২৫), বাংলাপিডিয়া (নারিকেল), তামিলনাড়ু কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএনএইউ অ্যাগ্রিটেক পোর্টাল (নারিকেল: পুষ্টি ব্যবস্থাপনা), দ্য ডেইলি স্টার (৯ মে ২০১৮), প্রথম আলো ইংরেজিতে ইউএনবি (১৬ জানুয়ারি ২০১৯), দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড (৫ ডিসেম্বর ২০২১), ঢাকা ট্রিবিউন (২১ সেপ্টেম্বর ২০২৩), মোঙ্গাবে (১৫ মে ২০২৫), ইন্টারন্যাশনাল জার্নাল অব মলিকুলার সায়েন্সেস (৯ নভেম্বর ২০২৪), উইকিপিডিয়া (নারিকেল)


মন্তব্য
(০)