কুড়িগ্রাম জেলার রৌমারী উপজেলার বিভিন্ন বাজারে ২০১৯ সালের জুলাইয়ের শুরুতে রূপচাঁদা মাছের নাম করে নিষিদ্ধ পিরানহা মাছ বিক্রি হচ্ছিল। ঢাকা ট্রিবিউন বাংলার ৩ জুলাই ২০১৯ তারিখের প্রতিবেদনে বলা হয়, কিছু অসাধু ব্যবসায়ী ক্রেতাদের ধোঁকা দিয়ে এ মাছ বিক্রি করছিলেন। উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা আমিনুর রহমান বিক্রির বিষয়টি স্বীকার করেন এবং জানান, ২ জুলাই রৌমারী বাজার থেকে ২০ কেজি পিরানহা জব্দ করা হয়েছে।
কোথা থেকে আসছিল মাছ
প্রতিবেদন অনুযায়ী, মাছ বিক্রেতা আব্দুল হালিম জানান, জামালপুরের মাছ ব্যাপারী চাঁদ মিয়া প্রতিদিন প্রায় ২০০ কেজি পিরানহা রৌমারীর যাদুরচর ইউনিয়নের শিবেরডাঙ্গি এলাকায় এনে বিক্রি করতেন। খুচরা বিক্রেতারা সেখান থেকে কিনে উপজেলার বিভিন্ন বাজারে রূপচাঁদা বলে ভোক্তাদের কাছে বেচতেন। পিরানহা চাষ ও বিক্রি যে নিষিদ্ধ, তা তিনি জানতেন না বলে দাবি করেন এবং আর কখনো এ মাছ বিক্রি না করার কথা বলেন।
রফিকুল নামে আরেক বিক্রেতা জানান, যাদুরচর ইউনিয়ন পরিষদের একটি পুকুর ইজারা নিয়ে মোস্তফা নামে এক মৎস্যচাষী সেখানে পিরানহা চাষ করছিলেন; আরও কয়েকজন বিক্রেতাও একই কথা বলেন। মোস্তফা চাষের কথা স্বীকার করলেও বলেন, “আগে কিছু পিরানহা চাষ করলেও নিষিদ্ধ হওয়ায় তা এখন তুলে ফেলছি।” উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা অবশ্য উপজেলায় এ মাছ চাষের বিষয়টি নাকচ করেন এবং বলেন, “ইতোমধ্যেই বাজারে অভিযান পরিচালনা শুরু করেছি।”

২০০৮ সাল থেকে নিষিদ্ধ পিরানহা
মৎস্য অধিদপ্তরের সংকলিত মৎস্য রক্ষা ও সংরক্ষণ বিধিমালা, ১৯৮৫ অনুযায়ী, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় ২০০৮ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি প্রজ্ঞাপন (এসআরও নং ৪১-আইন/২০০৮) দিয়ে বিধিমালায় ১৬ নম্বর বিধি যুক্ত করে, যা ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০০৮ গেজেটে প্রকাশিত হয়। এই বিধিতে বলা আছে, কেউ পিরানহা গোত্রের কোনো প্রজাতির মাছ আমদানি, পরিবহন, প্রজনন, চাষ, বিক্রি, গ্রহণ, বাজারজাত, প্রদর্শন বা নিজের কাছে রাখতে পারবেন না।
কুড়িগ্রাম জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. জিল্লুর রহমান ঢাকা ট্রিবিউন বাংলাকে বলেন, “পিরানহা মাছ চাষ, পরিবহণ ও বিক্রি সরকার কর্তৃক নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। এরপরও যদি কেউ এই মাছ চাষ কিংবা বিক্রি করেন তাহলে তিনি অপরাধ করছেন এবং তিনি শাস্তির আওতায় আসবেন।” তিনি উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তাকে ব্যবস্থা নিতে বলবেন বলেও জানান। তাঁর আশঙ্কা ছিল, “রৌমারী এমনিতেই বন্যা প্রবণ এলাকা। পুকুরে এই মাছ হয়ে থাকলে তা যদি একবার আমাদের নদী নালা কিংবা জলাশয়ে প্রবেশ করে, তাহলে আমাদের জলজ বাস্তুসংস্থান মারাত্মক হুমকির মুখে পড়বে।”
এমন ঘটনা কেবল রৌমারীতে ঘটেনি। প্রথম আলো ২০১৯ সালের ২২ মে জানায়, ঢাকার বাজারেও ভিন্ন নামে পিরানহা বিক্রি হচ্ছিল, আর সে বছরের মার্চ থেকে ১৫ মে পর্যন্ত ৫ মেট্রিক টন পিরানহা জব্দ করা হয়। ২০০৯ সালে দ্য ডেইলি স্টার টাঙ্গাইলের বাজারে পিরানহা ‘থাই রূপচাঁদা’ নামে বিক্রির খবর দিয়েছিল। প্রকৃত রূপচাঁদা বা সিলভার পমফ্রেট (Pampus argenteus) সমুদ্রের মাছ; ভারত ও প্রশান্ত মহাসাগরের উপকূলীয় জলে থাকে এবং স্বাদের জন্য দামি।

পিরানহা কোন মাছ
পিরানহা দক্ষিণ আমেরিকার স্বাদু পানির মাছ। এর আদি আবাস আমাজন অববাহিকা, ওরিনোকো, গায়ানার নদীগুলো, প্যারাগুয়ে-পারানা ও সাও ফ্রান্সিসকো নদীব্যবস্থা। মাছটি সেরাসালমিডি গোত্রের; প্রজাতির সংখ্যা নিয়ে মতভেদ আছে, হিসাব ৩০টির কম থেকে ৬০টির বেশি পর্যন্ত। এর দুই চোয়ালে এক সারি ঘন, ধারালো, ত্রিকোণ দাঁত থাকে, যা একটি আরেকটির সঙ্গে খাঁজে খাঁজে আটকে যায়। লাল পেটের পিরানহা (Pygocentrus nattereri) অ্যাকুরিয়ামে সবচেয়ে বেশি রাখা প্রজাতি।
পিরানহা মূলত মাছ খায়, তবে ফল, বীজ ও পোকামাকড়ও খায়। মানুষের ওপর এর আক্রমণ বিরল; বেশির ভাগ ক্ষেত্রে হাত বা পায়ে ছোটখাটো আঘাত হয়, মৃত্যুর ঘটনা অত্যন্ত বিরল। দেশি জলাশয়ের জন্য এর বড় বিপদ অন্য মাছ ও জলজ প্রাণী খেয়ে ফেলার স্বভাব; প্রথম আলোর প্রতিবেদনে মৎস্য কর্মকর্তা এ কারণেই একে রাক্ষুসে স্বভাবের মাছ বলেছিলেন।

ছবি: Gregory Moine / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY 2.0)
সূত্র: ঢাকা ট্রিবিউন বাংলা, মৎস্য অধিদপ্তর (মৎস্য রক্ষা ও সংরক্ষণ বিধিমালা, ১৯৮৫, ২০১১ পর্যন্ত সংশোধিত), প্রথম আলো, দ্য ডেইলি স্টার, উইকিপিডিয়া





মন্তব্য
(০)