২০০৮ সালের ২৫ ডিসেম্বর রাঙামাটি শহরে রাস্তার ধারে পাহাড়ি ঢালে এক বড় গাছ দেখে থমকে গিয়েছিলেন কৃষিবিদ ও প্রকৃতিবিষয়ক লেখক মৃত্যুঞ্জয় রায়। মাথার সব ডালপালা ফুলে ভরা, ফুলের ভারে নুয়ে পড়া ঝুলন্ত শাখায় মালার মতো ছোট ছোট কদম ফুলের মতো ফুল। সঙ্গী পবন চাকমা জানালেন, গাছটির নাম ফুলসুমারি। প্রথম আলোয় প্রকাশিত লেখায় তিনি গাছটির পরিচয় তুলে ধরেছেন।
পবন চাকমার ভাষ্য, এ গাছের কাঠ এত শক্ত যে স-মিলে চেরাই করতে গেলে করাত ভেঙে যায়, বয়স্ক গাছ কাটা খুব কঠিন; পাহাড়িদের কাছে এর কাঠের কদর সেগুনের চেয়েও বেশি।
কানাডাপ্রবাসী স্থপতি মুশতাক কাদরীর কাছ থেকে লেখক গাছটির উদ্ভিদতাত্ত্বিক নাম জানেন: Terminalia pendula var. pendula, আগের নাম Anogeissus acuminata, পরিবার কমব্রিটেসি; অর্থাৎ এটি কাঠবাদাম, বহেড়া ও অর্জুনের গোত্রের গাছ। বাংলাদেশ উদ্ভিদ ও প্রাণী জ্ঞানকোষে এর স্থানীয় নাম চাকোয়া। বাংলায় একে সাকুয়া, হেউরি ও কোশই, ম্রো ভাষায় ক্রং, খাসিয়া ভাষায় টেংথ্রি আর চাকমা ভাষায় ফুলসুমারি বলা হয়। ইংরেজি নাম বাটনট্রি। গাছটি ভারত, চীন ও ভিয়েতনামেও আছে।
ফুলসুমারি মাঝারি আকারের গাছ, ৯ থেকে ৩৫ মিটার লম্বা হয়। ছাল ধূসর-রুপালি, বয়সের সঙ্গে ফাটে; কচি শাখায় কাঁটা থাকে। ৩ থেকে ৪ সেন্টিমিটার লম্বা ছোট পাতা শীতে ঝরে, ঝরার আগে হলদে-লাল হয়ে ওঠে, বসন্তে নতুন পাতা আসে। হলদে-সবুজ ছোট ফুল প্রায় ১ সেন্টিমিটার চওড়া গোল গুচ্ছে ফোটে, পুংকেশর রোঁয়ার মতো বেরিয়ে থাকে। প্রধানত জুন থেকে অক্টোবর ফুল ও ফল হয়, তবে লেখক রাঙামাটিতে ডিসেম্বরেও ফুল দেখেছেন। বীজ থেকে চারা হয়।
গাছটি কাঠ, পশুখাদ্য ও জ্বালানির জন্য মূল্যবান। লেখক উল্লেখ করেছেন, গবেষকেরা এর কাঠকে বিশ্বের তৃতীয় কঠিনতম কাঠ হিসেবে গণ্য করেন, শক্তিতে যা সেগুনের সমতুল্য। পাতা থেকে গাঢ় সবুজ রং পাওয়া যায়, গ্রীষ্মে সবুজ পাতা পশুকে খাওয়ানো হয়।
পার্বত্য অঞ্চলে গাছটি ঘিরে লোককাহিনিও আছে। ম্রো কাহিনিতে বলা হয়, প্রেমে ব্যর্থ এক তরুণী সাইরু পাহাড় থেকে লাফ দিয়েছিলেন; যেখানে পড়েছিলেন, সেখানে একটি ফুলসুমারি আর একটি ধারমারা গাছ এমনভাবে জন্মায় যেন তারা একে অপরকে জড়িয়ে আছে। মুশতাক কাদরীর প্রশ্ন, এমন শোভাময় গাছ কেন ঢাকার রাস্তার পাশে পথতরু হিসেবে কখনো বিবেচনা করা হয়নি।
ছবি: AlleinStein / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 3.0) (ভিয়েতনামের একটি ফুলসুমারি গাছ)
সূত্র: প্রথম আলো





মন্তব্য
(০)