কৃষিকে এখন আর কেবল কত খাবার উৎপাদন হলো তা দিয়ে নিজের সাফল্য মাপলে চলবে না—স্বাস্থ্যকর খাদ্যতালিকার জন্য প্রয়োজনীয় বৈচিত্র্যময় ও পুষ্টিকর খাবার সে জোগাচ্ছে কি না, তা-ও হিসাব করতে হবে। কিয়োটোতে ইন্টারন্যাশনাল হর্টিকালচারাল কংগ্রেস ২০২৬-এ এ কথা বলেছেন এফএওর মহাপরিচালক কু ডংইউ।
তিনি বলেন, “আমরা কত খাবার উৎপাদন করছি, কেবল তা দিয়ে আর সাফল্য মাপা যাবে না। মাপতে হবে কৃষি সুস্থ সমাজের প্রয়োজনীয় খাবারগুলো দিচ্ছে কি না, এবং সেই খাবার সবার জন্য সহজলভ্য, নাগালের মধ্যে ও সাধ্যের মধ্যে আছে কি না।”
বাণিজ্যিক হিসাবে উদ্যানতত্ত্ব খাত ভালোই করেছে। ২০১০ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে ফল ও সবজির উৎপাদন বেড়েছে দানাদার শস্যের চেয়ে দ্রুত; বিশ্বের মোট কৃষি উৎপাদনমূল্যের প্রায় এক-চতুর্থাংশ—প্রায় ১.৪ ট্রিলিয়ন ডলার—এখন এই খাতের। এ সময়ে রপ্তানি বছরে প্রায় ২.৬ শতাংশ হারে বেড়ে ২০২৪ সালে দাঁড়িয়েছে ১৭ কোটি ৫০ লাখ টনে, যার মূল্য ২৪ হাজার কোটি ডলার। কিন্তু বিজ্ঞানী, নীতিনির্ধারক, ব্যবসায়ী ও উৎপাদকদের সামনে মহাপরিচালক বলেন, এই সাফল্য স্বাস্থ্যকর খাদ্যতালিকায় রূপ নেয়নি।
তিনি পরস্পরসংযুক্ত তিনটি সমস্যা চিহ্নিত করেন। উৎপাদনশীলতায়—গবেষণা, জাত উন্নয়ন ও অবকাঠামোয় দীর্ঘদিনের কম বিনিয়োগের ফলে উদ্যান ফসলের ফলন বছরে এক শতাংশেরও কম হারে বেড়েছে, যা দানাদার শস্যের চেয়ে পিছিয়ে। সহজলভ্যতায়—এফএওর সর্বশেষ বিশ্লেষণ বলছে, ২০২৩ সালে মাত্র অর্ধেকের মতো দেশ এফএও/ডব্লিউএইচওর দৈনিক মাথাপিছু ৪০০ গ্রাম লক্ষ্যমাত্রা পূরণের মতো ফল ও সবজি উৎপাদন করেছে; বাস্তব গড় ব্যবহার আরও কম—বিশ্বে দৈনিক আনুমানিক ৮০ গ্রাম ফল ও ১৯০ গ্রাম সবজি। সাধ্যের দিক থেকে—২০১৬ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে ৮৯ শতাংশ দেশে ফলের এবং ৯৩ শতাংশ দেশে সবজির উৎপাদক মূল্য বেড়েছে, বার্ষিক মধ্যক বৃদ্ধি যথাক্রমে প্রায় ৪.২ ও ৪.৭ শতাংশ।
বর্তমান চিত্রের চেয়ে ভবিষ্যতের ধারা আরও উদ্বেগজনক। পূর্বাভাস বলছে, ২০৫০ সাল নাগাদ উপ-সাহারা আফ্রিকার এক-তৃতীয়াংশেরও কম দেশ যৌথ এফএও/ডব্লিউএইচও সুপারিশ পূরণের মতো ফল ও সবজি পাবে। জমি ও পানির সীমাবদ্ধতা এবং বাড়তি তাপমাত্রা, পানিসংকট, চরম আবহাওয়া, পোকা ও রোগের চাপ মাথায় রেখে কু আহ্বান জানান উন্নত বীজ ও চারা, স্বাস্থ্যকর মাটি, দক্ষ সেচ, যান্ত্রিকীকরণ ও ডিজিটাল প্রযুক্তি, সম্প্রসারণ সেবা, ফসল-পরবর্তী ব্যবস্থাপনা এবং উৎপাদক ও বাজারের মধ্যে শক্তিশালী সংযোগে বিনিয়োগের। তাঁর কথায়, “ভবিষ্যতের প্রবৃদ্ধি আসতে হবে কম সম্পদে বেশি উৎপাদনের পথ ধরে।”
প্রযুক্তি যা-ই হোক, তা পৌঁছাতে হবে যিনি ফসল ফলান তাঁর কাছেই। মহাপরিচালক বলেন, “তাঁদের জ্ঞান, আস্থা ও অংশগ্রহণ ছাড়া কোনো উদ্ভাবন, কোনো নীতি বা কোনো বিনিয়োগই সফল হবে না। বিজ্ঞানী ও গবেষকদের কাজ কৃষকের স্বীকৃতি পেতে হবে।” বিশ্বের অর্ধেকেরও বেশি ফল ও সবজি আসে ২০ হেক্টর বা তার কম আয়তনের খামার থেকে, আর এশিয়া ও উপ-সাহারা আফ্রিকায় এই হার ৮০ শতাংশের বেশি—এ কারণেই তিনি ক্ষুদ্র উৎপাদকদের জন্য সহজলভ্য, সাশ্রয়ী ও গ্রহণযোগ্য উদ্ভাবনের ওপর জোর দেন।
প্রজনন দ্রুত করা ও ফসল-পরবর্তী ক্ষতি কমাতে এআই, জিনোম সম্পাদনা ও ডিজিটাল সরঞ্জামের ভূমিকার কথা বলেন তিনি; উদাহরণ হিসেবে আসে যৌথ এফএও/আইএইএ কেন্দ্রের মিউটেশন ব্রিডিং, যার হাত ধরে ৭০টিরও বেশি উদ্ভিদ প্রজাতিতে ৩,৪৫০-এর বেশি জাত আনুষ্ঠানিকভাবে অবমুক্ত হয়েছে। প্রথাগত জ্ঞানের কথাও বলেন তিনি—এফএওর ‘গ্লোবালি ইম্পর্ট্যান্ট অ্যাগ্রিকালচারাল হেরিটেজ সিস্টেমস’-এ স্বীকৃত ১০৪টি ব্যবস্থার প্রায় অর্ধেকই উদ্যানতত্ত্বসংশ্লিষ্ট, চীনের চিয়া কাউন্টির কুল বাগান থেকে মিসরের সিওয়া মরূদ্যানের খেজুর ও জলপাই বাগান কিংবা পেরুর আন্দিজের সিঁড়ি-চাষ পর্যন্ত।
২০২৭ সালে প্রকাশিতব্য এফএওর প্রতিবেদন ‘আনলকিং দ্য ফুল পোটেনশিয়াল অব ফ্রুটস অ্যান্ড ভেজিটেবলস গ্লোবালি’-তে উৎপাদন, বাণিজ্য ও ব্যবহারের ধারার পাশাপাশি জীবিকা, স্বাস্থ্য, উৎপাদনশীলতা, উদ্ভিদস্বাস্থ্য, বীজ সরবরাহ ও বাজার নিয়ে আলোচনা থাকবে। কংগ্রেসের এক পার্শ্ব-আয়োজনে উপস্থাপিত প্রাথমিক ফলাফল বলছে, পদক্ষেপ নেওয়া এখন জরুরি।
সূত্র: এফএও নিউজরুম





মন্তব্য
(০)