গ্রামবাংলার বেশির ভাগ গোয়ালে গরুর দিন শুরু হয়, শেষও হয় শুকনো ধানের খড়ের চাড়িতে। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ও বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিএলআরআই) গবেষকেরা ২০১৫ সালে লিখেছিলেন, দেশের স্থানীয় খামারিরা গরুকে মূলত ধানের খড়ই খাওয়ান, আর নিম্নমানের এই আঁশজাতীয় খাদ্য পশুর শক্তি ও আমিষের ন্যূনতম রক্ষণাবেক্ষণ চাহিদাটুকুও মেটাতে পারে না।
২০২১ সালের শরতে এসে গোখাদ্যের দামও বেড়েছিল। সে বছরের সেপ্টেম্বরে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের (ডিএলএস) একজন সহকারী পরিচালক ঢাকা ট্রিবিউনকে বলেছিলেন, আগের চার মাস ধরে খামারিরা ৩৭ কেজির প্রতি বস্তা খাদ্য কিনেছেন ৪০০ থেকে ৫০০ টাকায়; গরুর দাম বেশি হওয়ার একটি কারণ হিসেবেও তিনি গোখাদ্যের উচ্চমূল্যের কথা বলেন।
দ্য এগ্রো নিউজে ২০২১ সালের ২৩ অক্টোবর প্রথম প্রকাশিত এই প্রতিবেদনের মূল কথা সহজ: গবাদিপশু পালন করে বেশি আয় করতে হলে সুষম খাদ্যের দিকে নজর দিতে হবে, কারণ সুষম খাদ্য ছাড়া গবাদিপশু ঠিকমতো বাড়ে না। নিচে একে একে দেখানো হলো আমিষ, শর্করা, চর্বি, খনিজ, ভিটামিন ও পানি পশুর দেহে কী কাজ করে। তথ্য নেওয়া হয়েছে বিএলআরআইয়ের গবেষণা, জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্প্রসারণ বিভাগের নির্দেশিকা থেকে।
সুষম খাদ্য কী, আর কেন তাতে লাভ
গবাদিপশুর সুষম খাদ্য বলতে বোঝায় এমন খাদ্য, যাতে আমিষ, শর্করা, স্নেহ বা চর্বি, খনিজ লবণ, ভিটামিন বা খাদ্যপ্রাণ ও পানি সঠিক অনুপাতে থাকে। পশুর বৃদ্ধি ও দেহগঠনে সুষম খাদ্যের গুরুত্ব অপরিসীম। এর অভাবে পশুর অপুষ্টি দেখা দেয় এবং নানা রোগ আক্রমণ করে।
ভারতের জাতীয় দুগ্ধ উন্নয়ন বোর্ডের (এনডিডিবি) এম আর গর্গের লেখা এফএওর ২০১২ সালের একটি নির্দেশিকা কথাটিকে আরও হাতে-কলমে বলেছে: সুষম রেশন হলো শুকনো খড়, কাঁচা ঘাস, দানাদার খাদ্য ও খনিজ সম্পূরক থেকে এমন পরিমাণে আমিষ, শক্তি, খনিজ ও ভিটামিন জোগানো, যাতে পশু পুরো উৎপাদন দেয় এবং সুস্থ থাকে।
রেশন ভারসাম্যহীন হলে কী হয়, তার একটি তালিকাও নির্দেশিকায় আছে:
- দুধ উৎপাদন কম হয়, বৃদ্ধি ও প্রজনন খারাপ হয়;
- পশু তার জাতগত সামর্থ্যের চেয়ে কম দুধ দেয়;
- দুধ দেওয়ার মেয়াদ কমে, দুই বাচ্চার মাঝের সময় বাড়ে;
- দুধজ্বর (মিল্ক ফিভার) ও কিটোসিসের মতো বিপাকজনিত রোগের ঝুঁকি বাড়ে;
- বাছুর ধীরে বাড়ে, প্রথম বাচ্চা দিতে দেরি হয়;
- পশুর উৎপাদনশীল জীবন ছোট হয়, পরিবেশদূষণ বাড়ে, খামারির লাভ কমে।
বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ টাকার কারণেই। এফএওর নির্দেশিকা বলছে, দুধ উৎপাদনের মোট খরচের ৭০ শতাংশের বেশি যায় শুধু খাদ্যে। এনডিডিবির রেশন ভারসাম্য কর্মসূচিতে সাতটি এলাকার প্রায় ১১ হাজার ৫০০ পশুর তথ্যে দেখা গেছে, সুষম রেশন খাওয়ানোয় এক-দুটি গাভি বা মহিষের মালিকের দৈনিক নিট আয় ১০ থেকে ১৫ শতাংশ বেড়েছে; দুধ বেড়েছে, খাদ্যখরচ কমেছে।
রেশন ঠিক করার পর ওই গাভিগুলো প্রতি কেজি খাদ্যের শুষ্ক পদার্থ থেকে ০.৭৮ কেজি চর্বি-সমন্বিত দুধ দিয়েছে, আগে যা ছিল ০.৫৮ কেজি। হিসাব অনুযায়ী প্রতি কেজি দুধে মিথেন নিঃসরণও ১৫ থেকে ২০ শতাংশ কমেছে।
বয়স ও অবস্থাভেদে চাহিদা বদলায়। প্রতিটি পশুর দেহের ওজন অনুযায়ী একটি রক্ষণাবেক্ষণ রেশন লাগে; দুধাল পশুর লাগে দুধের জন্য বাড়তি খাদ্য; তিন বছর বা তার কম বয়সী পশুর বৃদ্ধির জন্য রক্ষণাবেক্ষণের চেয়ে প্রায় ২০ শতাংশ বেশি, আর তিন থেকে চার বছর বয়সীর প্রায় ১০ শতাংশ বেশি লাগে; গর্ভবতী পশু শেষ দুই মাসে বাড়তি খাদ্য পায়। এনডিডিবির হিসাবে দৈনিক শুষ্ক পদার্থ গ্রহণ ধরা হয় দেহের ওজনের মোটামুটি ২ থেকে ৩ শতাংশ।
বাংলাদেশে গোখাদ্যের বাস্তবতা
জাতীয় জ্ঞানকোষ বাংলাপিডিয়ার হিসাবে দেশে গরুর সংখ্যা প্রায় ২ কোটি ৩৪ লাখ। বাংলাপিডিয়া লিখেছে, রোমন্থক পশুর খাদ্য আসে মূলত ফসলের অবশেষ, শস্যের উপজাত, ঝোপঝাড়, পশুখাদ্যের গাছ ও ঘাস থেকে; আর পশুখাদ্যের বড় অংশই ধানের খড় এবং তেলবীজ ও ডালফসলের শুকনো অবশেষ। শীতে বেশির ভাগ এলাকায় কাঁচা ঘাস খুবই দুর্লভ হয়ে পড়ে, তখন খামারিরা কলাগাছ, বাঁশপাতা ও কচুরিপানার দিকেও ঝোঁকেন।
একই জ্ঞানকোষের হিসাবে দেশে পশুখাদ্যের চাহিদা প্রায় ৭ কোটি টন, উৎপাদন প্রায় ২ কোটি ৪০ লাখ টন; ঘাটতি ৬৬ শতাংশ।
এর মধ্যেও গরু পালনের ব্যবসা বাড়ছিল। ২০২১ সালের সেপ্টেম্বরে ঢাকা ট্রিবিউনে প্রকাশিত ডিএলএসের তথ্য অনুযায়ী, গরুর খামারির সংখ্যা ২০১৫ সালের ৩ লাখ থেকে বেড়ে ৬ লাখ ৯৮ হাজারে পৌঁছেছিল; মোটাতাজা করা ষাঁড় ২০১৭ সালের ৩৩ লাখ ৪০ হাজার থেকে ২০২১ সালে হয়েছিল ৩৮ লাখ ৬০ হাজার। মাংস উৎপাদন ২০০৯-১০ অর্থবছরের প্রায় ১৩ লাখ টন থেকে ২০১৯-২০ অর্থবছরে ৭৫ লাখ টন ছাড়িয়েছিল।
দুর্বল জায়গাটি ছিল খাদ্য। পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের অর্থনীতিবিদ আহসান এইচ মনসুর পত্রিকাটিকে বলেছিলেন, বেশি দামে খাদ্য কিনতে হয় বলে বাংলাদেশে উৎপাদন খরচ বেশি। বাংলাদেশ ডেইরি ফারমার্স অ্যাসোসিয়েশনের মোহাম্মদ শাহ এমরান কাঁচা ঘাসের জন্য জমির অভাবের কথা তুলে ধরেছিলেন।

আমিষ: দেহ গড়ে, ক্ষয় পূরণ করে
আমিষ বা প্রোটিনজাতীয় খাদ্য অন্ত্রে পরিপাক হয়ে অ্যামিনো অ্যাসিডে পরিণত হয়। পরে তা অন্ত্রে শোষিত হয়ে রক্তে মেশে এবং দেহের ক্ষয়পূরণ ও বৃদ্ধি ঘটায়। এ কারণে সব বয়সেই আমিষ দরকার, তবে বাড়ন্ত বয়সে চাহিদা আরও বেশি।
আমিষের সাহায্যে দেহে জৈব অনুঘটক এনজাইম তৈরি হয়, যেমন পেপসিন ও ট্রিপসিন। এসব এনজাইম খাদ্যের প্রোটিন, চর্বি ও শর্করাকে ভেঙে সহজপাচ্য পুষ্টিতে রূপান্তর করে, যা কোষ সহজে শোষণ ও ব্যবহার করতে পারে। পশুর রক্ত, পেশি ও সংযোজক কলার প্রধান অংশই প্রোটিনে গড়া। প্রয়োজনের অতিরিক্ত প্রোটিন দেহে শক্তি ও চর্বির উৎস হিসেবে কাজে লাগে।
খড়ে এই আমিষই কম। আইএনআরএই, সিরাদ, এএফজেড ও এফএওর পশুখাদ্য তথ্যভান্ডার ফিডিপিডিয়ার হিসাবে ধানের খড়ের শুষ্ক পদার্থে গড়ে অপরিশোধিত আমিষ থাকে মাত্র ৪.২ শতাংশ। এফএওর গবেষণার বরাত দিয়ে ফিডিপিডিয়া বলছে, খড়নির্ভর খাদ্যে বাড়ন্ত পশুর ভালো বৃদ্ধির জন্য খাদ্যে ৮ থেকে ১০ শতাংশ অপরিশোধিত আমিষ দরকার, আর দুধ বা মাংস চাইলে খড়ের সঙ্গে আমিষ ও শক্তি দুটোরই সম্পূরক দিতে হয়।
এর সাধারণ সমাধান ডালজাতীয় উদ্ভিদ। ফিডিপিডিয়া বাংলাদেশের একটি গবেষণার উল্লেখ করেছে, যেখানে খড়ভিত্তিক রেশনে খেসারি যোগ করায় গাভির দুধের পরিমাণ ও মান ভালো হয়েছিল। খৈল ও মাছের গুঁড়া (ফিশ মিল) আমিষের আরও দামি উৎস।
তুলনার জন্য, ২০১৫ সালের বিএলআরআই ষাঁড় পরীক্ষায় যে মিশ্র দানাদার খাদ্য ব্যবহার হয়েছিল, তাতে ছিল ৩৯ শতাংশ গমের ভুসি, ৫৪ শতাংশ ভাঙা ভুট্টা, ২ শতাংশ ভাঙা খেসারি, ৩ শতাংশ সয়াবিন মিল, ১ শতাংশ চুনাপাথর ও ১ শতাংশ সাধারণ লবণ। এটি সংকর ষাঁড় মোটাতাজা করার একটি গবেষণা-রেশন, সব খামারের জন্য তৈরি সূত্র নয়; সঠিক মিশ্রণ নির্ভর করে পশু ও হাতের কাছের খাদ্যের ওপর।
শর্করা ও চর্বি: খাদ্যের শক্তি
শর্করা পশুর দেহে কাজ, বৃদ্ধি ও দুধের শক্তি জোগায়। মূল প্রতিবেদনের ব্যাখ্যায়, শর্করা পরিপাকতন্ত্রে ভেঙে গ্লুকোজে পরিণত হয়, যা শোষিত হয়ে রক্তে মিশে কাজ করে। অতিরিক্ত শর্করা দেহে গ্লাইকোজেন হিসেবে জমা থাকে, আর খাদ্যে শর্করার অভাব হলে সেই গ্লাইকোজেনই শক্তি জোগায়।
ধানের খড়ের বেশির ভাগই শর্করা, কিন্তু তার অনেকটাই পশু কাজে লাগাতে পারে না। ফিডিপিডিয়ার বর্ণনায় খড় শক্তির ভালো উৎস হলেও বেশি সিলিকার কারণে সহজে হজম হয় না; রোমন্থক পশুতে এর জৈব পদার্থের পাচ্যতা গড়ে ৪৯.৮ শতাংশ।
এফএওর নির্দেশিকা ব্যাখ্যা করেছে, গ্রীষ্মমণ্ডলীয় দেশে দুধাল পশু মূলত ফসলের অবশেষ খেয়ে বাঁচে, কাঁচা ঘাস পায় সামান্য; তাই রক্ষণাবেক্ষণ ও দুধের চাহিদা মেটাতে দানাদার খাদ্য দরকার।
আবার দানাদার বেশি হলেও বিপদ। একই নির্দেশিকা অনুযায়ী, খাদ্যে দানাদারের ভাগ ৬০ শতাংশের বেশি হলে রুমেনে অম্লতা (অ্যাসিডোসিস) দেখা দিয়ে পশু খাওয়া ছেড়ে দিতে পারে; রুমেনের পিএইচ কমে গেলে আঁশ হজমকারী ব্যাকটেরিয়ার ক্ষতি হয়, দুধে চর্বির ভাগ কমে। রেশনে খড়ের মতো লম্বা আঁশ থাকলে পশু জাবর কাটে, লালা বেশি তৈরি হয়, রুমেন স্থিতিশীল থাকে।
স্নেহ বা চর্বি প্রাণিদেহের কলার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান; গবাদিপশুর দেহে এটি মূলত তাপ ও শক্তির উৎস হিসেবে জমা থাকে। গবাদিপশুর রেশনে চর্বি থাকে অল্প, আর বেশি দিলেই ভালো নয়: যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়া টেকের ১৯৯৬ সালের একটি সম্প্রসারণ নোট বলছে, দুধাল গাভির রেশনে মোট চর্বি শুষ্ক পদার্থের সর্বোচ্চ ৭ শতাংশে সীমিত রাখা উচিত।

খনিজ: হাড়, রক্ত ও প্রজনন
বাড়ন্ত পশুর নতুন হাড় ও কলা তৈরিতে খনিজ পদার্থ খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এটি কঙ্কালের আকৃতি ও দৃঢ়তা বজায় রাখে, লোম, ক্ষুর ও শিং গঠনেও দরকার হয়। লৌহ রক্তে অক্সিজেন ও কার্বন ডাই-অক্সাইড বহনে সাহায্য করে, আর পটাশিয়াম দেহের তরলের অম্ল-ক্ষারের সমতা রক্ষা করে।
যুক্তরাষ্ট্রের ওহাইও স্টেট বিশ্ববিদ্যালয়ের গরু বিশেষজ্ঞরা ২০০৯ সালের একটি সম্প্রসারণ নোটে বলেছেন, যেসব খনিজ মাথাপিছু দিনে এক গ্রামের বেশি লাগে সেগুলো প্রধান খনিজ: লবণ (সোডিয়াম), ক্যালসিয়াম, ফসফরাস, পটাশিয়াম, ম্যাগনেশিয়াম ও সালফার। তাঁদের মতে, ঘাসে যথেষ্ট লবণ থাকে না, ক্যালসিয়াম শোষণে ভিটামিন ডি লাগে, আর ফসফরাসের ঘাটতিতে পশুকে অপুষ্ট দেখায় এবং প্রায়ই প্রজনন সমস্যা হয়।
খড়নির্ভর খাদ্যে এর কয়েকটিরই ঘাটতি থাকে। ফিডিপিডিয়া জানাচ্ছে, ধানের খড়ে ফসফরাস, তামা, দস্তা, ক্যালসিয়াম ও লবণ এত কম থাকে যে পশুর চাহিদা মেটে না। খড়ে অক্সালেটও বেশি, শুষ্ক পদার্থের ১ থেকে ২ শতাংশ, যা প্রাপ্য ক্যালসিয়াম কমিয়ে দেয়; ফলে ক্যালসিয়াম সম্পূরক জরুরি হয়ে পড়ে। শুধু খড় দিয়ে অল্প দিনের জন্য হালের বলদ চালানো গেলেও আমিষ ও খনিজ, বিশেষ করে ফসফরাস ও ক্যালসিয়াম, যোগ করতে হয়েছে।
এফএওর নির্দেশিকা যোগ করেছে, কিছু খাদ্যে অক্সালেট, ফাইটেট ও গসিপলের মতো উপাদান থাকে, যা খনিজ শোষণ কমায়; এ কারণেই এনডিডিবি এলাকাভিত্তিক খনিজ মিশ্রণের ওপর জোর দিয়েছে। কোন খামারে কতটা খনিজ সম্পূরক লাগবে, তা ঠিক করবেন প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা বা পশুচিকিৎসক।
ভিটামিন: অল্প লাগে, প্রভাব বড়
যেসব জৈব যৌগ অল্প পরিমাণে দেহের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ও স্বাস্থ্য রক্ষায় জরুরি, সেগুলোই ভিটামিন। পর্যাপ্ত আমিষ, শর্করা, চর্বি ও খনিজ দিলেও ভিটামিন ছাড়া জীবন চলে না। খাদ্যে ভিটামিন না থাকলে, অথবা তা ঠিকমতো শোষিত বা ব্যবহৃত না হলে নির্দিষ্ট রোগ দেখা দেয়।
সব ভিটামিন অবশ্য খাদ্য থেকে আসতে হয় না। যুক্তরাষ্ট্রের মিসৌরি বিশ্ববিদ্যালয়ের হোমার বি সিওয়েল ২০০৫ সালের একটি সম্প্রসারণ নিবন্ধে ব্যাখ্যা করেছেন, মাংসের গরুর ভিটামিনের চাহিদা মূলত এ, ডি ও ই-তে সীমিত, কারণ রুমেন সচল হলে সেখানকার ব্যাকটেরিয়াই বি-গ্রুপের ভিটামিন ও ভিটামিন কে তৈরি করে। রক্ত জমাট বাঁধার জন্য ভিটামিন কে দরকার ঠিকই, কিন্তু সচল রুমেনের প্রাপ্তবয়স্ক পশুতে ব্যাকটেরিয়াই সাধারণত তা জোগায়।
খড় খাওয়া পালে সবচেয়ে বেশি নজর দিতে হয় ভিটামিন এ-তে। সিওয়েল লিখেছেন, এর প্রধান কাজ ত্বক এবং শ্বাসতন্ত্র, পরিপাকতন্ত্র ও প্রজননতন্ত্রের আবরণ সুস্থ রাখা; ঘাটতির প্রথম সহজে চোখে পড়া লক্ষণগুলোর একটি রাতকানা। প্রজননক্ষম পালে উর্বরতা কমে, বাচ্চা কম হয়। সবুজ উদ্ভিদে থাকা ক্যারোটিন পশু ভিটামিন এ-তে রূপান্তর করে, তবে ডাঁটাসর্বস্ব শুকনো ঘাসে ক্যারোটিন কম, কারণ এর বেশির ভাগ থাকে পাতায়।
সূর্যের অতিবেগুনি রশ্মি ত্বকের ৭-ডিহাইড্রোকোলেস্টেরল নামের একটি স্টেরলের ওপর পড়লে ভিটামিন ডি তৈরি হয়। ভিটামিন ই, সঙ্গে অণুখনিজ সেলেনিয়াম, বাছুরের হোয়াইট মাসল ডিজিজ ঠেকায়। মূল প্রতিবেদন যোগ করেছে, ভিটামিন ই-এর অভাবে প্রজননে ব্যর্থতা দেখা দিতে পারে। রাতকানা, শক্ত বা দুর্বল বাছুর কিংবা বারবার গর্ভধারণে ব্যর্থতা দেখলে আন্দাজে ভিটামিন না দিয়ে পশুচিকিৎসকের কাছে যান।
পানি: সবচেয়ে সস্তা পুষ্টি
যুক্তরাষ্ট্রের নিউ মেক্সিকো স্টেট বিশ্ববিদ্যালয়ের সমবায় সম্প্রসারণ সেবার নির্দেশিকা ‘ওয়াটার ফর ডেইরি ক্যাটল’ বলছে, গবাদিপশুর দেহের ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ পানি। পানি দেহতরলের ভারসাম্য রাখে, পুষ্টি হজম ও ব্যবহারে সাহায্য করে, বর্জ্য ও বাড়তি তাপ বের করে দেয়, গর্ভের বাছুরকে ঘিরে রাখে এবং দেহজুড়ে পুষ্টি বয়ে নেয়।
নির্দেশিকা অনুযায়ী, দুধাল গাভির মোট পানির চাহিদার ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ মেটে পান করা পানিতে; বাকিটা আসে খাদ্য থেকে এবং দেহে পুষ্টি ভাঙার সময় তৈরি পানি থেকে। গাভি কতটা পানি খাবে, তা নির্ভর করে তার আকার, দুধের পরিমাণ, খাদ্যগ্রহণ, গরম ও আর্দ্রতা এবং খাদ্যের আর্দ্রতার ওপর; গরমের চাপে শুকনো গাভির পানি গ্রহণ ১২০ থেকে ২০০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে।
ফিডিপিডিয়ার হিসাবে ধানের খড়ে গড়ে ৯২.৮ শতাংশই শুষ্ক পদার্থ, অর্থাৎ খড় থেকে পানি আসে সামান্য; অন্যদিকে কাঁচা নেপিয়ার ঘাসে শুষ্ক পদার্থ মাত্র ১৭.৯ শতাংশ, বাকিটা মূলত পানি। তবু পশুকে আলাদা করে পানি দিতে হয়। নিউ মেক্সিকোর নির্দেশিকা যোগ করেছে, দুধের পাশাপাশি ইচ্ছেমতো পানি পাওয়া বাছুর দ্রুত বাড়ে; পানি হতে হবে টাটকা, পরিষ্কার এবং সব সময় হাতের কাছে।

খড়ের পুষ্টি বাড়ানো: ইউরিয়া মোলাসেস খড় ও কাঁচা ঘাস
১৯৮৪ সালে ঢাকার সাভারে প্রতিষ্ঠিত বিএলআরআই, যার একটি আঞ্চলিক কেন্দ্র সিরাজগঞ্জের বাঘাবাড়িতে, খামারির হাতে থাকা খাদ্য থেকেই বেশি ফল পাওয়ার পথ খুঁজে আসছে; গরু মোটাতাজাকরণের মডেলও এর মধ্যে আছে।
এর সবচেয়ে পরিচিত পদ্ধতিগুলোর একটি ইউরিয়া মোলাসেস খড় বা ইউএমএস। লাইভস্টক রিসার্চ ফর রুরাল ডেভেলপমেন্ট সাময়িকীতে প্রকাশিত এম এম রশিদ, এম এ হক, কে এস হক ও এ কে এফ এইচ ভূঁইয়ার ২০১৫ সালের গবেষণায় ইউএমএস তৈরি হয়েছিল শুষ্ক পদার্থের ভিত্তিতে ইউরিয়া, চিটাগুড় (মোলাসেস) ও খড় ৩:১৫:৮২ অনুপাতে মিশিয়ে। কাঁচা খড়ের ওজনের ৫৫ শতাংশ পরিমাণ পানিতে ইউরিয়া ও চিটাগুড় গুলে সেই দ্রবণ কাটা শুকনো খড়ে দুই সমান ভাগে ছিটানো হয়, প্রতিবার ভালো করে মেশানো হয়।
৯০ দিনের ওই পরীক্ষায় গড়ে প্রায় ৩৪৩ কেজি ওজনের ১২টি সংকর (দেশি x ব্রাহমা) ষাঁড়কে তিন দলে ভাগ করা হয়। শুধু দানাদার খাওয়া ষাঁড় দিনে ৯৫৪ গ্রাম, অর্ধেক দানাদার ও অর্ধেক ইউএমএস খাওয়া ষাঁড় ৮৭৩ গ্রাম এবং শুধু ইউএমএস খাওয়া ষাঁড় ২০৫ গ্রাম ওজন বাড়িয়েছে। প্রতি কেজি ওজন বাড়াতে খাদ্যখরচ ছিল যথাক্রমে ২.২৬, ২.০৪ ও ২.৬০ মার্কিন ডলার। গবেষকদের উপসংহার, পুরো দানাদার খাদ্যের অর্ধেক ইউএমএস দিয়ে বদলালে বৃদ্ধি সামান্যই কমে, কিন্তু মাংস উৎপাদনের খরচ কমে।
সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের জার্নালে ২০১৮ সালে প্রকাশিত একটি ছোট গবেষণায় দক্ষিণ সুনামগঞ্জের এক হাওর গ্রামের ১০ জন খামারির ষাঁড় ২০১৭ সালের জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত পর্যবেক্ষণ করা হয়। ইউএমএস পাওয়া ষাঁড়ের দৈনিক ওজন বেড়েছে ৪৯৬.৪১ গ্রাম, অন্য দলে ২৩৬.৬২ গ্রাম; মোট লাভ (গ্রস মার্জিন) ছিল ১৪ হাজার ৩১০ টাকা, অন্য দলে ৩ হাজার ৮১০ টাকা।
ইউরিয়া ব্যবহারে সাবধানতা জরুরি। ফিডিপিডিয়া সতর্ক করেছে, বিষক্রিয়া এড়াতে ইউরিয়া গ্রহণ সীমিত রাখতে হবে; অল্প সময়ে বেশি খেলে ইউরিয়া বিষক্রিয়া হতে পারে; ইউরিয়াযুক্ত সম্পূরক ধীরে ধীরে চালু করতে হবে, এটি কখনো একমাত্র খাদ্য হবে না এবং সঙ্গে ন্যূনতম আঁশজাতীয় খাদ্য থাকতেই হবে। খড়ের রাসায়নিক প্রক্রিয়াজাতকরণ ভুলভাবে করলে মানুষ ও পশু দুইয়েরই ক্ষতি হতে পারে বলেও জানিয়েছে তথ্যভান্ডারটি। তাই চেষ্টা করার আগে উপজেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তর বা বিএলআরআই থেকে পদ্ধতিটি শিখে নিন।
আরেকটি সমাধান কাঁচা ঘাস। বাংলাপিডিয়ার তথ্যে বিএলআরআই নেপিয়ার, পারা, জার্মান ও গিনি ঘাস এবং ইপিল-ইপিল ও স্টাইলোর মতো ডালজাতীয় পশুখাদ্য বিতরণ করে; ১৯৯৯ সালে বাঘাবাড়িতে পাঠানো দুই ট্রাক নেপিয়ারের কাটিং থেকে চাহিদা বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ২০০ ট্রাকে। তবে ফিডিপিডিয়া সতর্ক করেছে, শুধু নেপিয়ার খাইয়ে গাভিপ্রতি দিনে মাত্র ৭ থেকে ৮ লিটার দুধ পাওয়া যায়, তাই এর সঙ্গেও সম্পূরক খাদ্য দিতে হয়।

রেশন ও অসুস্থ পশুর পরামর্শ কোথায় পাবেন
সব পশুর জন্য একই রেশন চলে না: সঠিক রেশন নির্ভর করে পশুর ওজন, দুধের পরিমাণ, গর্ভাবস্থা এবং এলাকায় পাওয়া খাদ্যের ওপর। বাংলাদেশে প্রথমে যোগাযোগ করুন ডিএলএসের উপজেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তরে, যেখানে প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ও ভেটেরিনারি সার্জনরা খামারিদের খাদ্য ও পশুস্বাস্থ্য বিষয়ে পরামর্শ দেন।
কোনো পশু খাওয়া ছেড়ে দিলে, ওজন হারালে, রাতকানা দেখা দিলে বা গরম না হলে পশুচিকিৎসককে দেখান। ওষুধ, ভিটামিন ইনজেকশন বা খনিজের মাত্রা কেবল পশুচিকিৎসকের পরামর্শেই দেবেন।
ছবি: Ferdous / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
সূত্র: দ্য এগ্রো নিউজ (নিজস্ব প্রতিবেদক), জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও), বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিএলআরআই) ও বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় (লাইভস্টক রিসার্চ ফর রুরাল ডেভেলপমেন্ট), ফিডিপিডিয়া (আইএনআরএই, সিরাদ, এএফজেড ও এফএও), নিউ মেক্সিকো স্টেট বিশ্ববিদ্যালয় সমবায় সম্প্রসারণ সেবা, মিসৌরি বিশ্ববিদ্যালয়, ওহাইও স্টেট বিশ্ববিদ্যালয়, ভার্জিনিয়া টেক, সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় জার্নাল, বাংলাপিডিয়া, ঢাকা ট্রিবিউন





মন্তব্য
(০)