তীব্র গরমসহ নানা আবহাওয়াজনিত ঝুঁকিতে সরবরাহ নিয়ে শঙ্কা বাড়ায় আগস্টে বিশ্ববাজারে খাদ্যপণ্যের দাম বেড়েছে বলে জানিয়েছে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও)। এফএও খাদ্যমূল্য সূচক আগস্টে গড়ে দাঁড়িয়েছে ১৩৩.৩ পয়েন্টে—সংশোধিত জুলাইয়ের চেয়ে ১.৯ শতাংশ এবং এক বছর আগের চেয়ে ২.৫ শতাংশ বেশি।
এফএওর প্রধান অর্থনীতিবিদ মাক্সিমো তোরেরো বলেন, “আগস্টে বিশ্ববাজারে খাদ্যের দাম বাড়া একটি সতর্কবার্তা—খাদ্যবাজারে ঝুঁকির মাশুল ফিরে আসছে। জলবায়ুজনিত ধাক্কা, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা ও বিঘ্নিত বাণিজ্য-পরিবহন একসঙ্গে সরবরাহের প্রত্যাশা সংকুচিত করছে; এতে বোঝা যায়, বিশ্বব্যাপী খাদ্যমূল্যের স্থিতিশীলতার কেন্দ্রে এখন সহনশীলতা, উন্মুক্ত বাণিজ্য ও নিরাপদ উপকরণ সরবরাহ।”
দাম বাড়ায় সামনে ছিল দানাদার শস্য। আমদানি চাহিদা জোরালো থাকা ও ফসলের সম্ভাবনা নিয়ে উদ্বেগে শস্যসূচক বেড়েছে ২.২ শতাংশ। কৃষ্ণসাগরের রপ্তানি-পরিবহনে ধারাবাহিক বিঘ্ন এবং গরম-শুষ্ক আবহাওয়ায় ইউরোপের বড় অংশে উৎপাদন সম্ভাবনা কমে যাওয়ায় গমের দাম মাসে বেড়েছে ২.৬ শতাংশ, যা এক বছর আগের চেয়ে ১৫.০ শতাংশ বেশি। যুক্তরাষ্ট্রের কিছু অঞ্চলে ফলন নিয়ে উদ্বেগ, ইউরোপীয় ইউনিয়নে সম্ভাবনার অবনতি, ইথানল ও গোখাদ্য খাতের চাহিদা এবং সরবরাহ ও রপ্তানিতে বিঘ্নের কারণে ভুট্টার দাম বেড়েছে ২.৫ শতাংশ। এশিয়া ও আফ্রিকার ধারাবাহিক ক্রয়ে চালের সূচক বেড়েছে ০.৫ শতাংশ।
সবচেয়ে বড় লাফ চিনিতে—১১.৯ শতাংশ। প্রতিকূল আবহাওয়ায় ইউরোপীয় ইউনিয়নে চিনিবিটের ফলন কমার আশঙ্কা, এশিয়ার প্রধান উৎপাদক দেশগুলোতে এল নিনোর প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ, ব্রাজিলে উৎপাদন হ্রাস এবং ভারতের শুল্কমুক্ত অপরিশোধিত চিনি আমদানির ঘোষণা—সব মিলিয়েই এই উল্লম্ফন।
পাম ও সয়াবিন তেলের দাম বাড়ায় উদ্ভিজ্জ তেলের সূচক বেড়েছে ১.১ শতাংশ; তবে পর্যাপ্ত সরবরাহের আশায় সরিষা ও সূর্যমুখী তেলের দর সামান্য কমেছে। মাংসের সূচক বেড়েছে ১.০ শতাংশ—মুরগি, শূকর ও ভেড়ার মাংসের দাম বেড়েছে, যেখানে শূকরের মাংসের দাম বাড়ার মূল কারণ ইউরোপীয় ইউনিয়নে অতিরিক্ত গরমে পশুর বৃদ্ধি ধীর হয়ে যাওয়া। অন্যদিকে চীনের আমদানি কোটা বণ্টনে ব্রাজিল ও অস্ট্রেলিয়ার রপ্তানিকারকদের মধ্যে প্রতিযোগিতা বাড়ায় গরুর মাংসের দাম কমেছে। গরম ও শুষ্ক আবহাওয়ায় ইউরোপীয় ইউনিয়নে দুধের সরবরাহ কমায় দুগ্ধপণ্যের সূচক বেড়েছে ২.৩ শতাংশ।
একই দিনে প্রকাশিত এফএওর নতুন ‘সিরিয়াল সাপ্লাই অ্যান্ড ডিমান্ড ব্রিফ’ অনুযায়ী, ২০২৬ সালে বিশ্বে দানাদার শস্য উৎপাদন হবে ২৯৮ কোটি টন—২০২৫ সালের চেয়ে ২.০ শতাংশ কম হলেও এটি ইতিহাসের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ফলন। ফ্রান্স ও পোল্যান্ডে সম্ভাবনার অবনতি আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিলের ভালো ফলনকে ছাপিয়ে যাওয়ায় ভুট্টার পূর্বাভাস কমিয়ে ১৩০ কোটি ৯০ লাখ টন করা হয়েছে; গমের পূর্বাভাস বাড়িয়ে ধরা হয়েছে ৮১ কোটি ৭ লাখ টন, যা ২০২৫ সালের চেয়ে ৩.৮ শতাংশ কম। উৎপাদকের মুনাফা কমা ও এল নিনোজনিত আবহাওয়ায় চালের উৎপাদন গত মৌসুমের রেকর্ড থেকে ১.৯ শতাংশ কমে ৫৫ কোটি ৩১ লাখ টনে নামতে পারে।
২০২৬/২৭ মৌসুমে বিশ্বে মোট শস্য ব্যবহারের পূর্বাভাস ২৯৬ কোটি ৫০ লাখ টন, আগের বছরের চেয়ে ০.২ শতাংশ বেশি। ২০২৭ সালের মৌসুম শেষে শস্য মজুদ দাঁড়াতে পারে ৯৪ কোটি ৭২ লাখ টনে, যা শুরুর মজুদের চেয়ে কিছুটা বেশি—এর একটি কারণ রপ্তানিপথ সীমিত থাকায় রাশিয়া ও ইউক্রেনে গমের মজুদ বেড়ে যাওয়া। মজুদ-ব্যবহার অনুপাত আগের মৌসুমের ৩১.৯ শতাংশ থেকে কমে ৩১.৬ শতাংশ হলেও ঐতিহাসিক বিচারে তা স্বস্তিদায়ক। শস্যের বিশ্ব বাণিজ্য রেকর্ড পর্যায় থেকে নেমে ৫০ কোটি ৯৩ লাখ টন হতে পারে।
এফএও-পরিচালিত কৃষি বাজার তথ্যব্যবস্থা (এএমআইএস) একই দিনে তাদের মাসিক ‘মার্কেট মনিটর’ প্রকাশ করেছে। এতে বলা হয়েছে, প্রধান ফসলগুলোর ফিউচার্স বাজার “সাধারণভাবে ঊর্ধ্বমুখী”; প্রতিবেদনে পাম তেল খাতের ঝুঁকি, নীতি ও জলবায়ু অনিশ্চয়তা নিয়ে আলাদা নিবন্ধও রয়েছে।
সূত্র: এফএও নিউজরুম





মন্তব্য
(০)