জলবায়ু পরিবর্তনের হিসাব সাধারণত হয় তাপমাত্রার ডিগ্রি, নির্গমন আর আর্থিক ক্ষতিতে। কিন্তু এর আরেকটি ক্ষতি মাপা কঠিন: ভবিষ্যৎ নিয়ে মানুষের নিশ্চয়তা হারিয়ে যাওয়া। ভারতের টেরি স্কুল অব অ্যাডভান্সড স্টাডিজের ম্যানেজমেন্ট স্টাডিজ বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ও প্রধান শ্রুতি শর্মা ডাউন টু আর্থে লেখা এক কলামে এ কথা বলেছেন। তিনি লিখেছেন দুই জায়গা থেকে: জলবায়ু ঝুঁকি ও সহনশীলতার শিক্ষক হিসেবে, আবার একজন অভিভাবক হিসেবেও।
তাঁর লেখার শুরু একটি ছবি থেকে, যেখানে গর্ভাবস্থা থেকে বার্ধক্য পর্যন্ত জীবনের নানা পর্যায়ের মানুষকে ঘিরে আছে জলবায়ুর বিপদ: বাড়তি তাপমাত্রা, বায়ুদূষণ, বন্যা, খরা, ঝড়, দাবানল, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি আর লবণাক্ততা। শিশুর কাছে প্রচণ্ড গরম মানে নির্ঘুম রাত, স্কুলে বিঘ্ন বা বাইরে খেলতে না পারা; কিশোরের কাছে প্রশ্নটা দাঁড়ায়, কেমন ভবিষ্যতের দিকে সে বড় হচ্ছে। আর যে মা-বাবার কাছে আশা করা হয় তাঁরা ভবিষ্যৎকে নিরাপদ মনে করাবেন, তাঁদের মনে প্রশ্ন জাগে, প্রতিটি তাপপ্রবাহ বা বন্যাই কি সন্তানের জন্য স্বাভাবিক হয়ে যাবে?
শর্মা একটি বহুদেশীয় গবেষণার উল্লেখ করেছেন, যাতে ৪৪টি দেশের ৩৮৮ জন প্রাপ্তবয়স্কের মধ্যে ৮৩.৫ শতাংশ আগের পাঁচ বছরে অন্তত একটি চরম জলবায়ু ঘটনার মুখোমুখি হয়েছিলেন। এমন ঘটনার শিকার মানুষদের মধ্যে জলবায়ু নিয়ে উদ্বেগ বেশি পাওয়া গেছে, আর দৈনন্দিন জীবনযাত্রা ব্যাহত হওয়াই ছিল সেই উদ্বেগের সবচেয়ে বড় পূর্বাভাসক।
তাঁর যুক্তি, এই মানসিক বোঝা সবার ওপর সমানভাবে পড়ে না। কোনো পরিবার বন্যাপ্রবণ এলাকা ছেড়ে যেতে পারে, কারও যাওয়ার জায়গা নেই; কেউ ঘর ঠান্ডা রাখার খরচ বহন করতে পারে, কেউ বিদ্যুৎ বিল দিতেই হিমশিম খায়; কোনো শিক্ষার্থী মানসিক সহায়তা পায়, কেউ মৌলিক স্বাস্থ্যসেবাও পায় না। সে কারণেই তিনি জলবায়ু ও মানসিক স্বাস্থ্যের প্রশ্নকে জলবায়ু ন্যায়বিচারের প্রশ্ন বলেছেন।
জলবায়ু পরিবর্তন কীভাবে পড়ানো হচ্ছে, সে প্রশ্নও তুলেছেন তিনি। তাঁর মতে, শিক্ষার্থীদের সত্যটা জানাতে হবে, কিন্তু প্রতিটি আলোচনা যদি বিপর্যয়ে শেষ হয় আর ভয়ের পূর্বাভাসের সঙ্গে করণীয়ের পথ না দেখানো হয়, তরুণেরা নিজেদের কিছু করার সামর্থ্যে বিশ্বাস হারায়। তাঁর ভাষায়, আশা মানে বিজ্ঞানকে অস্বীকার করা নয়; ফল অনিশ্চিত হলেও নিজেদের সিদ্ধান্ত এখনো গুরুত্বপূর্ণ, এই বিশ্বাসই আশা।
শর্মা লিখেছেন, আমরা সহনশীল শহর, অবকাঠামো, কৃষি ও অর্থনীতির কথা বলি; হয়তো সহনশীল মনের কথাও বলা দরকার। সন্তানদের জন্য পরিষ্কার বাতাস, নিরাপদ পানি আর স্থিতিশীল প্রকৃতির পাশাপাশি রেখে যেতে হবে আশা করার, ঘুরে দাঁড়ানোর আর ঝুঁকি বোঝার সামর্থ্যও। মতামত লেখকের নিজস্ব।
ছবি: Takver / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 2.0)
সূত্র: ডাউন টু আর্থ





মন্তব্য
(০)