বৈশাখের এক দুপুরে হাওরের কিনারে দাঁড়িয়ে থাকা কোনো কৃষককে জিজ্ঞেস করলে তাঁর দুশ্চিন্তার কথা প্রায় একই রকম শোনা যায়। ধান পেকে গেছে, আকাশে মেঘ জমছে, কিন্তু কাটার লোক পাওয়া যাচ্ছে না। যে শ্রমিক পাওয়া যায়, তাঁর মজুরি আগের চেয়ে অনেক বেশি। অথচ কয়েক দিন দেরি হলেই ঢল বা শিলাবৃষ্টিতে পুরো মৌসুমের পরিশ্রম পানিতে যেতে পারে। এমন অবস্থায় মাঠে যখন একটি কম্বাইন হারভেস্টার নামে এবং কয়েক ঘণ্টায় এক খেতের ধান কেটে, মাড়াই করে বস্তায় ভরে দেয়, তখন বোঝা যায় কেন কৃষি যান্ত্রিকীকরণকে আধুনিক কৃষির সফলতার চাবিকাঠি বলা হচ্ছে।
যান্ত্রিকীকরণ বলতে কী বোঝায়
কৃষি যান্ত্রিকীকরণ বলতে কৃষিকাজের বিভিন্ন ধাপে আধুনিক যন্ত্রপাতি ও প্রযুক্তির ব্যবহারকে বোঝায়। জমি চাষ, বীজ বোনা ও চারা রোপণ, সেচ, ফসল কাটা এবং প্রক্রিয়াজাত করার মতো কাজে যখন মানুষ ও গবাদিপশুর শ্রমের জায়গায় যন্ত্র আসে, তখন কৃষির উৎপাদনশীলতা বাড়ে। উৎপাদনশীলতা মানে একই জমি, একই সময় আর একই খরচে বেশি ফসল পাওয়া।
একসময় বাংলাদেশের মাঠের পরিচিত ছবি ছিল লাঙল টানা গরু, হাতে কাস্তে আর উঠানে গরু দিয়ে ধান মাড়াই। সেই ছবি এখন অনেকটাই বদলে গেছে। গ্রামে গ্রামে পাওয়ার টিলার আর ট্রাক্টরের শব্দ, সেচের জন্য অগভীর নলকূপ, আর বোরো ও গমের মাঠে কম্বাইন হারভেস্টার এখন আর বিস্ময়ের বিষয় নয়। তবে এই পরিবর্তন সব ধাপে সমানভাবে আসেনি, আর সেখানেই বাংলাদেশের কৃষির সামনের বড় প্রশ্নগুলো লুকিয়ে আছে।
হালের গরু থেকে পাওয়ার টিলার
বাংলাদেশে যন্ত্রের এই অগ্রযাত্রার পেছনে একটি দুর্যোগের ভূমিকা আছে। জার্নাল অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজে প্রকাশিত এক গবেষণায় বলা হয়েছে, ১৯৮৮ সালের ভয়াবহ দুর্যোগে বিপুল মানুষের প্রাণহানির পাশাপাশি জমি চাষের কাজে ব্যবহৃত বহু হালের পশু মারা যায়। জমি চাষের সেই সংকট সামলাতে জরুরি পদক্ষেপ হিসেবে সরকার কৃষিযন্ত্র, বিশেষ করে পাওয়ার টিলার আমদানি উদার করে দেয়। এরপর বিদেশ থেকে কম দামের ছোট পাওয়ার টিলার গ্রামে গ্রামে ছড়িয়ে পড়তে থাকে।
সেই সময় থেকে কয়েক দশকে গরুর লাঙল প্রায় হারিয়ে গেছে। পাওয়ার টিলার হলো দুই চাকার ছোট একটি চাষযন্ত্র, যা পেছন থেকে হেঁটে চালাতে হয়। ছোট খেতে ঘোরানো যায়, কাদা জমিতেও চলে, আবার এর ইঞ্জিন খুলে সেচপাম্প বা মাড়াইযন্ত্র চালানো যায়, ট্রলি জুড়ে মালামালও টানা যায়। একটি যন্ত্র দিয়ে এতগুলো কাজ করা যায় বলেই বাংলাদেশের ছোট জমির কৃষির সঙ্গে পাওয়ার টিলার এত ভালোভাবে মিশে গেছে।
কেন যন্ত্র দরকার
যান্ত্রিকীকরণের সুবিধাগুলো কয়েকটি ভাগে ভাগ করা যায়। কৃষি বিশেষজ্ঞরা যে কারণগুলো বারবার সামনে আনেন, সেগুলো হলো:
- উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি: যন্ত্র ব্যবহার করে অল্প সময়ে বেশি জমি চাষ করা যায়; ফসলের উৎপাদন ও মান দুটোই বাড়ে।
- খরচ কমানো: হাতে কাজ করানোর তুলনায় যন্ত্রে খরচ কম পড়ে।
- সময় সাশ্রয়: যন্ত্রে কাজ দ্রুত শেষ হয়।
- কৃষকের আর্থিক উন্নতি: উৎপাদন বাড়লে কৃষকের লাভও বাড়ে।
- প্রতিকূল আবহাওয়ার সঙ্গে খাপ খাওয়ানো: যন্ত্রের সাহায্যে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে চাষাবাদ শেষ করা যায়, যা খারাপ আবহাওয়ার ক্ষতি কমায়।
এই তালিকার পেছনে আছে গ্রামের শ্রমবাজারের বড় একটি পরিবর্তন। গবেষণা ও পরামর্শ প্রতিষ্ঠান লাইটক্যাসল পার্টনার্সের ২০২৩ সালের এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, গ্রামের শ্রমিকেরা শহরে চলে যাচ্ছেন, অদক্ষ কৃষিশ্রমিকদের বড় একটি অংশ সেবা খাত ও তৈরি পোশাক শিল্পে কাজ নিয়েছেন। একই বিশ্লেষণে সরকারি শ্রমশক্তি জরিপের তথ্য উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, দেশের মোট কর্মসংস্থানের ৪৫ দশমিক ৩ শতাংশ এখনো কৃষিতে। অর্থাৎ কৃষি এখনো সবচেয়ে বড় কর্মক্ষেত্র, কিন্তু ব্যস্ত মৌসুমে ঠিক সময়ে শ্রমিক পাওয়া কঠিন হয়ে উঠছে।
ধানের চারা রোপণের উদাহরণ নিলেই পার্থক্যটা বোঝা যায়। ওই বিশ্লেষণ অনুযায়ী হাতে চারা রোপণে প্রতি হেক্টরে প্রায় ১২৩ থেকে ১৫০ শ্রমঘণ্টা লাগে, আর যন্ত্রে লাগে মাত্র ৯ থেকে ১১ শ্রমঘণ্টা। শ্রমঘণ্টা মানে একজন মানুষের এক ঘণ্টার কাজ। যে কাজে একদল শ্রমিকের কয়েক দিন লাগে, যন্ত্র তা কয়েক ঘণ্টায় শেষ করে দেয়। মৌসুমের সবচেয়ে ব্যস্ত সময়ে এই গতিই অনেক সময় লাভ আর লোকসানের পার্থক্য গড়ে দেয়।
সময়ের প্রশ্নটি আরও গভীর। বাংলাদেশে এক ফসল তোলার পরপরই আরেক ফসলের প্রস্তুতি শুরু হয়; অনেক জমিতে বছরে দুই বা তিনটি ফসল হয়। বোরো কাটতে দেরি হলে আউশ বা আমনের রোপণও পিছিয়ে যায়, আর গম কাটতে দেরি হলে পাটের বোনা। একটি কাজের দেরি এভাবে পুরো বছরের ফসলচক্রে ছড়িয়ে পড়ে। যন্ত্র এই চক্রকে সময়মতো চালু রাখতে সাহায্য করে।

মাঠের যন্ত্রগুলো
ট্রাক্টর: জমি চাষের জন্য ট্রাক্টর সবচেয়ে পরিচিত যন্ত্রগুলোর একটি। এটি দ্রুত ও ভালোভাবে বড় এলাকা চাষ করতে পারে। ট্রাক্টরের পেছনে লাঙল, মই বা অন্য যন্ত্র জুড়ে দিয়ে একই যন্ত্রে নানা কাজ করা যায়, আবার ফসল ও মালামাল পরিবহনেও এটি ব্যবহার হয়। বাংলাদেশের ছোট ছোট খেতে অবশ্য দুই চাকার পাওয়ার টিলারই বেশি জনপ্রিয়, যা কাদা করা ধানের জমিতেও চলতে পারে।
কম্বাইন হারভেস্টার: ফসল কাটার জন্য কম্বাইন হারভেস্টার ব্যবহার করা হয়। এটি ফসল কাটা, মাড়াই ও ঝাড়াইয়ের কাজ একসঙ্গে করে। ধান ও গমের কাটার মৌসুমে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন এনেছে এই যন্ত্র। হাওর অঞ্চলে যেখানে আগাম বন্যার ঝুঁকিতে কয়েক দিনের মধ্যে ধান তুলতে হয়, সেখানে কম্বাইন হারভেস্টারের গুরুত্ব আরও বেশি। মাঠে কাটা ধান পড়ে থেকে নষ্ট হওয়ার ক্ষতিও এতে কমে।

রাইস ট্রান্সপ্লান্টার: ধানের চারা রোপণের জন্য রাইস ট্রান্সপ্লান্টার ব্যবহার করা হয়, যা শ্রম ও সময় দুটোই বাঁচায়। যন্ত্রটি সারি ধরে নির্দিষ্ট দূরত্বে চারা বসায়। এর জন্য চারা তৈরি করতে হয় বিশেষ ট্রে বা মাদুরের মতো পাতলা বীজতলায়, যাতে যন্ত্র চারাগুলো একসঙ্গে তুলে নিতে পারে। সারিতে লাগানো চারার মাঝে আগাছা পরিষ্কার ও সার দেওয়ার কাজও সুবিধাজনক হয়।

ড্রিপ সেচ: ড্রিপ সেচ পানি সাশ্রয়ী ও কার্যকর একটি পদ্ধতি, যাতে পাইপ ও সরু নলের মাধ্যমে ফোঁটায় ফোঁটায় পানি সরাসরি গাছের শিকড়ের কাছে পৌঁছায়। পুরো জমি ভেজানোর দরকার হয় না, তাই পানি কম লাগে, আগাছাও কম জন্মায়। সবজি ও ফলবাগানে এই পদ্ধতি বেশি কাজে আসে। যেসব এলাকায় শুকনো মৌসুমে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নেমে যায়, সেখানে পানি বাঁচানোর এই প্রযুক্তি বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক।

ড্রোন: ড্রোন ব্যবহার করে মাঠের সার্বিক অবস্থা ওপর থেকে পর্যবেক্ষণ করা যায় এবং কীটনাশক স্প্রে করা যায়। ওপর থেকে তোলা ছবিতে বোঝা যায় খেতের কোন অংশে গাছ দুর্বল, কোথায় পোকা বা রোগ লেগেছে। স্প্রে করার সময় ড্রোন নির্দিষ্ট জায়গায় নির্দিষ্ট পরিমাণ ওষুধ ছিটাতে পারে, আর যিনি স্প্রে করছেন তাঁকে বিষের সরাসরি সংস্পর্শে আসতে হয় না।
হাওরে সময়ের সঙ্গে লড়াই
যান্ত্রিকীকরণের গুরুত্ব সবচেয়ে স্পষ্ট দেখা যায় দেশের উত্তর পূর্বের হাওর অঞ্চলে। বছরের বড় একটা সময় এই বিশাল নিচু এলাকা পানির নিচে থাকে, তাই এখানে কার্যত একটিই ফসল হয়, বোরো ধান। সেই ধান পাকে বৈশাখে, ঠিক যখন উজানের পাহাড়ি ঢলে আগাম বন্যার ঝুঁকি শুরু হয়। কয়েক দিনের দেরিতে পুরো বছরের একমাত্র ফসল পানিতে তলিয়ে যাওয়ার নজির হাওরবাসীর অভিজ্ঞতায় বহুবার আছে।
এই কারণেই সরকার হাওরে যন্ত্র কেনায় সমতলের চেয়ে বেশি ভর্তুকি দেয়। একসঙ্গে বিশাল এলাকার ধান পাকে বলে হাতে কাটার জন্য যত শ্রমিক দরকার, তত শ্রমিক একসঙ্গে পাওয়া কঠিন; বাইরের জেলা থেকে শ্রমিক আনতে হয়, খরচও বাড়ে। কম্বাইন হারভেস্টার সেখানে কয়েক দিনের কাজ কয়েক ঘণ্টায় শেষ করে। কাটা, মাড়াই আর ঝাড়াই একসঙ্গে হয় বলে ধান মাঠ থেকে সরাসরি বস্তায় উঠে যায়, আর বৃষ্টি বা ঢল এলে ক্ষতির ঝুঁকি কমে।
বাংলাদেশ কোথায় দাঁড়িয়ে
বাংলাদেশে কৃষি যান্ত্রিকীকরণ দ্রুত এগোচ্ছে। সরকারের নানা উদ্যোগ আর আধুনিক যন্ত্র আগের চেয়ে হাতের কাছে পাওয়া যাওয়ায় মাঠের চেহারা বদলাচ্ছে। তবে এগোনোর গতি সব ধাপে এক নয়। লাইটক্যাসল পার্টনার্সের বিশ্লেষণ অনুযায়ী জমি চাষ, সেচ, মাড়াই ও কীটনাশক প্রয়োগে যান্ত্রিকীকরণ ৯০ শতাংশের বেশি। সার দেওয়া ও আগাছা পরিষ্কারে তা ১০ শতাংশের নিচে। আর চারা রোপণ ও ফসল কাটায় যান্ত্রিকীকরণের হার ২ শতাংশেরও কম।
এই হিসাব থেকে পরিষ্কার, সবচেয়ে বেশি শ্রম লাগে যে দুটি কাজে, অর্থাৎ রোপণ আর কাটা, সেখানেই যন্ত্র সবচেয়ে কম পৌঁছেছে। এই ফাঁক পূরণেই সরকারের মূল নজর। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর বাছাই করা যন্ত্রে ভর্তুকি দিচ্ছে: হাওর ও উপকূলীয় এলাকায় ৭০ শতাংশ, অন্য এলাকায় ৫০ শতাংশ। অর্থাৎ একটি যন্ত্রের দামের অর্ধেক বা তারও বেশি সরকার দেয়, বাকিটা কৃষক বা উদ্যোক্তা।
২০২০ সালে অনুমোদিত সমন্বিত ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে কৃষি যান্ত্রিকীকরণ প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয় ৩ হাজার ২০ কোটি টাকা। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর দেশের সব জেলা ও উপজেলায় এটি বাস্তবায়ন করছে। লাইটক্যাসলের তথ্য অনুযায়ী প্রকল্পের লক্ষ্য ছিল ২০২০ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে ১২ ধরনের ৫১ হাজার ৩০০টি কৃষিযন্ত্র বিতরণ। শুধু ২০২০-২১ অর্থবছরেই বিতরণ করা হয় প্রায় ২ হাজার ৩০০ যন্ত্র, যার মধ্যে ১ হাজার ৭৬২টি কম্বাইন হারভেস্টার, ৩৭৯টি রিপার বা ফসল কাটার ছোট যন্ত্র এবং ৩৪টি রাইস ট্রান্সপ্লান্টার।
এখানে রিপার যন্ত্রটির একটু পরিচয় দেওয়া দরকার। কম্বাইন হারভেস্টার যেখানে কাটা, মাড়াই ও ঝাড়াই একসঙ্গে করে, রিপার শুধু ফসলের গোড়া কেটে সারি করে মাঠে শুইয়ে রাখে। পরে সেই ফসল আঁটি বেঁধে মাড়াইযন্ত্রে মাড়াই করতে হয়। রিপার দামে অনেক কম, ছোট খেতে চলে, আর খড় অক্ষত থাকে, যা গবাদিপশুর খাবার হিসেবে কৃষকের কাছে মূল্যবান।
সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি আরও কয়েকটি ধারা যান্ত্রিকীকরণকে এগিয়ে নিচ্ছে:
- সরকারি ভর্তুকি: কৃষকদের আধুনিক যন্ত্র কিনতে ভর্তুকি দেওয়া হচ্ছে।
- বেসরকারি খাতের অবদান: বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান কৃষিযন্ত্র সরবরাহ করছে এবং কৃষকদের প্রশিক্ষণ দিচ্ছে।
- স্মার্ট কৃষি প্রযুক্তি: মোবাইল অ্যাপ ও ড্রোনের ব্যবহার বাড়ছে।
যন্ত্রের বাজারও বড় হচ্ছে। লাইটক্যাসলের হিসাবে দেশে কৃষিযন্ত্রের বার্ষিক বাজার প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকার, যদিও এর মাত্র ১০ থেকে ১২ শতাংশ দেশে তৈরি ছোট যন্ত্রের। গ্রামে এখন অনেক তরুণ উদ্যোক্তা একটি কম্বাইন হারভেস্টার বা পাওয়ার টিলার কিনে ভাড়ায় অন্যের জমিতে কাজ করেন। এতে যে কৃষক নিজে যন্ত্র কিনতে পারেন না, তিনিও ভাড়া দিয়ে যন্ত্রের সুবিধা পান।
ভাড়ায় যন্ত্র: ছোট কৃষকের পথ
বাংলাদেশের যান্ত্রিকীকরণের একটি বিশেষ দিক হলো, এখানে বেশির ভাগ কৃষক যন্ত্রের মালিক নন, ব্যবহারকারী। পাওয়ার টিলার, সেচপাম্প বা মাড়াইযন্ত্রের মালিক গ্রামের কয়েকজন উদ্যোক্তা, যাঁরা মৌসুমে অন্যের জমিতে ভাড়ায় কাজ করে দেন। বিঘাপ্রতি বা ঘণ্টাপ্রতি ভাড়া দিয়ে ছোট কৃষকও চাষ, সেচ বা মাড়াইয়ের সুবিধা পান, আর যন্ত্রের মালিকও বছরে বহু খেতে কাজ করে যন্ত্রের দাম তুলে আনেন। জার্নাল অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজের ওই গবেষণাও এই ভাড়াভিত্তিক সেবাকে ছোট কৃষকের যন্ত্রে পৌঁছানোর প্রধান পথ হিসেবে দেখিয়েছে।
কম্বাইন হারভেস্টার ও রাইস ট্রান্সপ্লান্টারের ক্ষেত্রেও একই পথ দেখা যাচ্ছে। ভর্তুকিতে কেনা একটি হারভেস্টার এক মৌসুমে এক জেলা থেকে আরেক জেলায় যায়, কারণ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ধান পাকে কিছুটা আগে পরে। এতে যন্ত্র বেশি দিন কাজ পায়, মালিকের আয় বাড়ে, আর বহু কৃষক সময়মতো ফসল তুলতে পারেন। তবে মৌসুমের চূড়ান্ত সময়ে সব এলাকায় একসঙ্গে যন্ত্রের চাহিদা তৈরি হলে ভাড়া বেড়ে যায়, আর সবাই সময়মতো যন্ত্র পান না।
দেশে তৈরি যন্ত্রের সম্ভাবনা
আমদানি করা বড় যন্ত্রের পাশাপাশি দেশে তৈরি ছোট যন্ত্রেরও একটি জায়গা আছে। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের খামার যন্ত্রপাতি গবেষণা বিভাগ দেশের মাটি ও খেতের উপযোগী নানা যন্ত্র উদ্ভাবন করেছে, যেমন পাওয়ার টিলারে জুড়ে বীজ বোনার যন্ত্র। একটি সরকারি নীতি পর্যালোচনায় দেখা যায়, ভর্তুকি কার্যক্রমের দ্বিতীয় পর্যায়ে, ২০১৩ থেকে ২০১৮ সালে, ভর্তুকি বাড়িয়ে সমতলে ৫০ শতাংশ ও হাওর ও উপকূলে ৭০ শতাংশ করা হয়, আর নজর দেওয়া হয় রাইস ট্রান্সপ্লান্টার, পাওয়ার টিলারচালিত বীজ বপন যন্ত্র, রিপার, ছোট কম্বাইন হারভেস্টার ও মাড়াইযন্ত্রের দিকে।
দেশের বিভিন্ন জায়গায় গড়ে ওঠা হালকা প্রকৌশল কারখানাগুলো এখন কৃষিযন্ত্রের যন্ত্রাংশ ও ছোট যন্ত্র তৈরি করছে। দেশে তৈরি যন্ত্রের সুবিধা হলো দাম কম, খুচরা যন্ত্রাংশ কাছেই পাওয়া যায়, আর স্থানীয় মিস্ত্রিরাই সারাতে পারেন। কিন্তু মান নিয়ন্ত্রণ ও নকশার উন্নতি ছাড়া এই সম্ভাবনা পুরোপুরি কাজে লাগানো যাবে না বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন।

ফসল তোলার পরের কাজ
যান্ত্রিকীকরণের আলোচনা প্রায়ই চাষ আর কাটার মধ্যে আটকে থাকে, কিন্তু প্রক্রিয়াজাত করার ধাপটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। ধান মাড়াইয়ে এখন গ্রামে গ্রামে যন্ত্রচালিত মাড়াইযন্ত্র চলে, আর ধান থেকে চাল করার কাজ প্রায় পুরোপুরি চালকলে হয়। একসময় ঘরে ঘরে ঢেঁকিতে ধান ভানার যে দৃশ্য ছিল, তা এখন প্রায় স্মৃতি। এতে নারীদের কঠোর শ্রম কমেছে, চালের মানও একরকম হয়েছে।
তবে ফসল শুকানোর কাজ এখনো বেশির ভাগ ক্ষেত্রে রোদের ওপর নির্ভরশীল। উঠানে বা রাস্তার পাশে ধান ও গম শুকানো হয়, আর বর্ষা বা টানা মেঘলা আবহাওয়ায় ভেজা ধানে ছত্রাক ধরে, অঙ্কুর গজায়, মান নষ্ট হয়। যন্ত্রচালিত শুকানোর ব্যবস্থা এখনো সীমিত। কাটা, মাড়াই, শুকানো আর সংরক্ষণের প্রতিটি ধাপে যত কম সময় লাগে, ফসলের অপচয় তত কমে, তাই এই ধাপগুলোকেও যান্ত্রিকীকরণের পরিকল্পনায় রাখার কথা বলেন বিশেষজ্ঞরা।
যে বাধাগুলো রয়ে গেছে
এত অগ্রগতির পরও কৃষি যান্ত্রিকীকরণের পথে কয়েকটি বড় বাধা রয়ে গেছে:
- প্রাথমিক খরচ বেশি: যন্ত্র কিনতে বড় বিনিয়োগ লাগে।
- প্রশিক্ষণের অভাব: অনেক কৃষক আধুনিক যন্ত্র চালাতে দক্ষ নন।
- যন্ত্র রক্ষণাবেক্ষণ: যন্ত্র মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণের প্রয়োজনীয় সুবিধার অভাব।
- বিদ্যুৎ ও জ্বালানির চাহিদা: যন্ত্র চালাতে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি লাগে, যা অনেক এলাকায় যথেষ্ট নয়।
প্রথম বাধাটি সবচেয়ে বড়। একটি কম্বাইন হারভেস্টারের দাম সাধারণ কৃষকের নাগালের বাইরে, ভর্তুকির পরও। আবার বাংলাদেশের বেশির ভাগ কৃষকের জমি ছোট ও ছড়ানো ছিটানো। কয়েক বিঘা জমির জন্য বড় যন্ত্র কেনা লাভজনক নয়, আর ছোট খেতের আল পেরিয়ে বড় যন্ত্র এক খেত থেকে আরেক খেতে নেওয়াও ঝামেলার। এ কারণে ভাড়াভিত্তিক সেবা ও ছোট আকারের যন্ত্রের চাহিদা বাড়ছে।
প্রশিক্ষণ আর মেরামতের সমস্যা একে অপরের সঙ্গে জড়িত। যন্ত্র ভুলভাবে চালালে দ্রুত নষ্ট হয়, আর নষ্ট যন্ত্র সারাতে দক্ষ মিস্ত্রি ও খুচরা যন্ত্রাংশ গ্রামে সবসময় পাওয়া যায় না। ব্যস্ত মৌসুমে একটি যন্ত্র কয়েক দিন বসে থাকলে সেই ক্ষতি আর পূরণ হয় না। তাই যন্ত্র বিতরণের সঙ্গে সঙ্গে চালক ও মিস্ত্রির প্রশিক্ষণ এবং উপজেলা পর্যায়ে মেরামত কেন্দ্র গড়ে তোলার কথা বিশেষজ্ঞরা বারবার বলছেন।
জ্বালানি ও বিদ্যুতের প্রশ্নটিও গুরুত্বপূর্ণ। বেশির ভাগ কৃষিযন্ত্র ডিজেলে চলে, তাই ডিজেলের দাম বাড়লে চাষ, সেচ আর কাটার খরচ একসঙ্গে বাড়ে। বিদ্যুৎচালিত সেচপাম্পের জন্য গ্রামে নিয়মিত বিদ্যুৎ দরকার, যা সব এলাকায় সমানভাবে নেই। সৌরশক্তিতে চলা সেচপাম্প এই সমস্যার একটি বিকল্প হিসেবে ধীরে ধীরে জায়গা করে নিচ্ছে।
নিরাপত্তার দিকটিও অবহেলা করার মতো নয়। মাড়াইযন্ত্র, পাওয়ার টিলার বা ট্রাক্টর চালানোয় অসাবধানতা থেকে দুর্ঘটনা ঘটে, বিশেষ করে যখন অপ্রশিক্ষিত কেউ বা কিশোরেরা যন্ত্র চালায়। ঢিলেঢালা কাপড় ঘূর্ণায়মান অংশে জড়িয়ে যাওয়া বা ঢালু আলে ট্রাক্টর উল্টে যাওয়ার মতো ঘটনা প্রশিক্ষণ ও সতর্কতায় অনেকটাই এড়ানো যায়। তাই যন্ত্র চালানোর প্রশিক্ষণে নিরাপত্তার নিয়ম শেখানো যন্ত্র বিতরণের মতোই জরুরি।
সামনের দিনের কৃষি
কৃষি যান্ত্রিকীকরণের মাধ্যমে বাংলাদেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব। এর পাশাপাশি এটি কৃষকের জীবনমান উন্নত করতে এবং দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে বড় ভূমিকা রাখবে। বিশেষজ্ঞরা সামনে তিনটি ধারার কথা বলছেন:
- রোবট প্রযুক্তি: ভবিষ্যতে আরও উন্নত রোবট মাঠের কাজে ব্যবহৃত হবে।
- স্মার্ট কৃষি: তথ্য বিশ্লেষণ ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কৃষির প্রতিটি ধাপে কাজে লাগবে।
- সবুজ প্রযুক্তি: পরিবেশবান্ধব ও টেকসই প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়বে।
স্মার্ট কৃষি বলতে বোঝায় মাটি, আবহাওয়া, ফসলের অবস্থা আর বাজারদরের তথ্য একসঙ্গে বিশ্লেষণ করে সিদ্ধান্ত নেওয়া: কখন সেচ দিতে হবে, কতটুকু সার লাগবে, কোন খেতে পোকার ঝুঁকি বেশি। মোবাইল ফোনের মাধ্যমে এমন পরামর্শ কৃষকের হাতে পৌঁছানোর কাজ এরই মধ্যে শুরু হয়েছে। সবুজ প্রযুক্তির মধ্যে আছে পানি সাশ্রয়ী সেচ, সৌরচালিত পাম্প, আর এমন যন্ত্র যা কম জ্বালানিতে বেশি কাজ করে।
এই পরিবর্তনে গ্রামের তরুণদের জন্যও নতুন সুযোগ তৈরি হচ্ছে। যে তরুণ হয়তো কাজের খোঁজে শহরে চলে যেতেন, তিনি এখন যন্ত্র চালক, মিস্ত্রি বা ভাড়াভিত্তিক সেবার উদ্যোক্তা হয়ে গ্রামেই আয় করতে পারেন। কৃষিকে যখন কম কষ্টের ও বেশি লাভের পেশা হিসেবে দেখা যায়, তখন শিক্ষিত তরুণেরাও এর দিকে ফেরেন। যান্ত্রিকীকরণের সামাজিক সুফল তাই শুধু ফলনের হিসাবে ধরা পড়ে না।
যন্ত্র আর কৃষকের ভবিষ্যৎ
কৃষি যান্ত্রিকীকরণ আজ সময়ের দাবি, যা কৃষিকে আধুনিক ও লাভজনক করে তুলছে। তবে যন্ত্র এলেই সব সমস্যার সমাধান হয় না। যন্ত্র যেন ছোট কৃষকের নাগালে আসে, যেন তা চালানোর ও সারানোর মানুষ গ্রামেই তৈরি হয়, আর যেন রোপণ ও কাটার মতো সবচেয়ে শ্রমনির্ভর কাজে যন্ত্রের ব্যবহার বাড়ে, সেদিকে নজর দেওয়াই এখন মূল কাজ।
ঠিক পরিকল্পনা আর প্রশিক্ষণের মাধ্যমে এই বাধাগুলো পেরোনো সম্ভব। কৃষি যান্ত্রিকীকরণে বিনিয়োগ করে দেশের খাদ্য উৎপাদন বাড়ানো এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নে ভূমিকা রাখা যায়। আর মাঠে দাঁড়িয়ে থাকা সেই কৃষক, যিনি পাকা ধান আর কালো মেঘের দিকে তাকিয়ে শ্রমিকের অপেক্ষা করছিলেন, তাঁর দুশ্চিন্তা কমানোই এই পুরো উদ্যোগের আসল মাপকাঠি।
প্রচ্ছদ ছবি: কুড়িগ্রামের রৌমারীতে কম্বাইন হারভেস্টারে গম কাটা। ছবি: Tanvir Rahat / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)





মন্তব্য
(০)