বর্ষার এ মৌসুমে কক্সবাজার দক্ষিণ বনবিভাগের উখিয়া ও টেকনাফের বনাঞ্চলে প্রায়ই দেখা মিলছে হাতির পালের। খাদ্যের সন্ধানে বন্য হাতি বন ছেড়ে কখনো কখনো লোকালয়ে চলে আসে। হাতির এমন আনাগোনার দৃশ্য দেখে মুগ্ধ হন স্থানীয় বাসিন্দারা। অনেকেই হাতির পালকে ক্যামেরাবন্দি করেন। তবে হাতি লোকালয়ে ঢুকে পড়ায় অনেক সময় চাষাবাদ ও ফসলের ক্ষয়ক্ষতি হয়।
স্থানীয়দের দাবি, হাতির চলাচলের পথ ও আবাসস্থল সংরক্ষণের পাশাপাশি বনাঞ্চলে তাদের পর্যাপ্ত খাদ্যের ব্যবস্থা করা জরুরি। একই সঙ্গে এসব বন্যহাতির মধ্যে কিছু হাতিকে দুর্বল অবস্থায় দেখা যায়, যাদের চিকিৎসাসেবা প্রয়োজন। বর্তমানে বনে থাকা হাতিগুলোর সঠিক রক্ষণাবেক্ষণ ও সুরক্ষা নিশ্চিত করা জরুরি। তা না হলে কক্সবাজার দক্ষিণ বনবিভাগের উখিয়া ও টেকনাফের বনাঞ্চল থেকে বন্যহাতির সংখ্যা কমে গিয়ে একসময় বিলুপ্তির ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
কক্সবাজার দক্ষিণ বনবিভাগের মধ্যে টেকনাফ, হোয়াইক্যং, শীলখালী, উখিয়া ও ইনানী রেঞ্জে হাতির অবস্থান রয়েছে। বর্ষার এসময় একটি বা দুটি অথবা চার থেকে পাঁচটি করে ছোটো-বড়ো হাতির চলাচল রয়েছে।
হোয়াইক্যং হরিখোলা গ্রামের বাসিন্দা ও বন পাহারাদার কর্মী ক্যানচারন চাকমা বলেন, আমাদের গ্রামে মাঝে-মধ্যে বন্য হাতি চলে আসে। বনেও হাতির দেখা মেলে। পাশাপাশি হোয়াইক্যং-শামলাপুর সংযোগ সড়কেও দু-একটি হাতি চলে আসে। আমরা হাতির কোনো ক্ষতি না করে সেগুলোকে আবার বনে ফিরিয়ে দিই। বনে পর্যাপ্ত খাবার থাকলে হাতি লোকালয়ে আসত না। হোয়াইক্যং রেঞ্জে থাকা বন্য হাতিগুলো সংরক্ষণ করা জরুরি। একসময় এ বনে হাতির উপস্থিতি বেশি ছিল। এখন যেসব হাতি দেখা যায়, তাদের বেশিরভাগই দুর্বল।
শীলখালী রেঞ্জের জাহাজপুরা এলাকার বাসিন্দা এনামুল হক বলেন, জাহাজপুরা গর্জনবাগান এলাকায় কিছুদিন আগেও একটি হাতির পাল দেখা গেছে। হাতির পালটি দেখে খুব ভালো লেগেছে। অনেক সময় হাতিগুলো চাষাবাদের জমি ও সুপারি বাগানে ঢুকে পড়ে। এতে স্থানীয়দের কিছুটা ক্ষতি হয়।
তবে বন্য হাতিগুলোর নিরাপদ অবস্থান নিশ্চিত করা সবার দায়িত্ব। বনের ভেতরে যখন হাতির পাল দেখা যায়, তখন দৃশ্যটি খুবই ভালো লাগে। বন্য মা হাতিগুলো বাচ্চাদের নিয়ে খাবারের সন্ধানে বনে বনে ঘুরে বেড়ায়।
টেকনাফ সদর রেঞ্জ বড়ইতলীর বাসিন্দা মোহাম্মদ সিরাজ বলেন, হ্নীলা ইউনিয়ন বড়ইতলী সংলগ্ন বনাঞ্চলে বর্ষার এ সময় হাতির পালের দেখা মিলে। অনেক সময় সেগুলো দেখতে মানুষ ভিড় জমায়, অনেকে তাদের মোবাইল ফোনে হাতির ছবি ও ভিডিও করেন।
কক্সবাজার দক্ষিণ বনবিভাগের উখিয়া রেঞ্জের দোছড়ি বিটের বাসিন্দা আব্দুল গফুর বলেন, এ বনে হাতির পালের উপস্থিতি দেখে মনটা ভরে যায়। মায়ের সঙ্গে ছোট ছোট হাতির বাচ্চাদের ঘুরে বেড়ানোর দৃশ্য সত্যিই মনোমুগ্ধকর। বনের ভেতর এভাবে হাতির পাল দেখতে পাওয়া আমাদের জন্য আনন্দের বিষয়।
বন ও হাতির চলাচলের পথ নিরাপদ থাকলে হাতিরা বনের মধ্যেই স্বাভাবিকভাবে বিচরণ করতে পারবে। এতে লোকালয়ে হাতি আসার ঝুঁকিও কমবে। স্থানীয় মানুষকেও হাতির প্রতি সহনশীল হতে হবে এবং হাতির পাল দেখলে তাদের বিরক্ত না করে বন বিভাগকে খবর দেওয়া উচিত।
টেকনাফ সদর রেঞ্জ কর্মকর্তা আব্দুর রশিদ বলেন, বন্য হাতির নিরাপত্তা ও তাদের নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করতে আমরা কাজ করে যাচ্ছি। অনেক সময় হাতি লোকালয়ে চলে এলেও স্থানীয়দের সহযোগিতায় বন বিভাগের পক্ষ থেকে তাদের নিরাপদে বনে ফিরিয়ে দেওয়া হয়। বনে দায়িত্ব পালন করতে গেলে প্রায়ই হাতির পালের দেখা মেলে। তবে সাধারণত হাতিগুলো সহজে মানুষের ক্ষতি করে না।
কক্সবাজার দক্ষিণ বনবিভাগের সহকারী বন সংরক্ষক মনিরুল ইসলাম বলেন, আমি প্রায়ই পাহাড়ি এলাকায় যাই। কিছুদিন আগেও চোয়াংখালী এলাকায় একসঙ্গে পাঁচটি হাতি দেখেছি। এছাড়া আরেকটি দলে ১১টি হাতি ঘোরাফেরা করতে দেখা গেছে। হ্নীলা, থাইংখালী ও দোছড়ি এলাকায়ও প্রায়ই হাতির পাল বিচরণ করে।
তিনি আরও বলেন, কক্সবাজার দক্ষিণ বনবিভাগের হাতিগুলো সংরক্ষণে একটি প্রকল্পের কাজ চলমান রয়েছে। বনে হাতির পাল অবাধে ঘুরে বেড়াতে দেখলে ভালো লাগে। এসব হাতির নিরাপদ আবাসস্থল ও চলাচলের পথ সংরক্ষণে আমাদের কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।
উখিয়া রেঞ্জের সহকারী বন সংরক্ষক ও রেঞ্জ কর্মকর্তা মো. শাহিনুর ইসলাম বলেন, গত পরশুদিন রাতেও দোছড়ি বিট এলাকায় একটি হাতির পাল এসেছিল। কিছুক্ষণ ঘোরাফেরা করার পর হাতিগুলো আবার বনের দিকে চলে যায়। এ এলাকায় প্রায়ই ১৪টি, ১০টি, সাতটি কিংবা পাঁচটি হাতির পালকে বিচরণ করতে দেখা যায়। তবে উখিয়া রেঞ্জের আওতাধীন দোছড়ি বিট এলাকায় বনে হাতির বিচরণ সবচেয়ে বেশি। এখানে প্রায়ই বিভিন্ন আকারের হাতির পাল ঘোরাফেরা করে।
তিনি আরও বলেন, হাতির কারণে যাতে মানুষের কোনো ক্ষতি না হয় এবং মানুষও যাতে হাতির ক্ষতি করতে না পারে, সে জন্য বন বিভাগের বিশেষ দল কাজ করছে। হাতি লোকালয়ে চলে এলে দ্রুত ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ এবং হাতিগুলোকে নিরাপদে বনে ফিরিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়।
জাহাঙ্গীর আলম/এসজেডএইচ/এএসএম





মন্তব্য
(০)