বাড়ির উঠান, ঝোপঝাড়, কৃষিজমি কিংবা জলাশয়ের পাশে সাপ দেখলে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে এবং অনেক ক্ষেত্রেই সাপটি চেনার আগেই মানুষ সেটিকে মেরে ফেলে। অথচ বাংলাদেশে নিয়মিত দেখা যায় এমন সাপের একটি বড় অংশই বিষধর নয়।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ফরিদ আহসান বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, বাংলাদেশে যেসব সাপ আছে তার ৮০ শতাংশই বিষধর নয়। এসব সাপের কোনোটি মানুষের বসতবাড়ির আশপাশে থাকে, কোনোটি কৃষিজমি বা জলাশয়ে, আবার কোনোটির দেখা মেলে গাছপালা ও ঝোপঝাড়ে।
সংখ্যার হিসাবটি এরকম: বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞ ড. এম. মনিরুল এইচ. খানের 'ফটোগ্রাফিক গাইড টু দ্য ওয়াইল্ডলাইফ অব বাংলাদেশ' বইয়ে দেশে মোট ১০৫ প্রজাতির সাপ থাকার কথা বলা হয়েছে, যদিও এর মধ্যে ২৪ প্রজাতির উপস্থিতি এখনও নিশ্চিত হয়নি। আইইউসিএন বাংলাদেশের ২০১৫ সালের রেড লিস্টে ৮১ প্রজাতির মূল্যায়ন করা হয়েছে এবং সংস্থাটি দেশে সবচেয়ে বেশি দেখা যায় এমন ১০টি সাপের নাম জানিয়েছে।
এর মধ্যে সবচেয়ে পরিচিত ঢোঁড়া, বৈজ্ঞানিক নাম জেনোক্রোফিস পিসকেটর, ইংরেজিতে চেকার্ড কিলব্যাক বা এশিয়াটিক ওয়াটার স্নেক। রেড লিস্টে এটি 'লিস্ট কনসার্ন' শ্রেণিতে। পুকুর, খাল, হ্রদ, ধীরগতির নদী, জলাভূমি, মাছের খামার ও ধানক্ষেতের মতো পানির কাছাকাছি পরিবেশ এদের পছন্দ। ছোট অবস্থায় এরা ব্যাঙের ডিম, ব্যাঙাচি ও পোকামাকড় খায়; বড় হলে মাছ, ব্যাঙের পাশাপাশি টিকটিকি, ইঁদুর ও ছোট পাখিও শিকার করে। ঢোঁড়া বিষধর নয়, তবে বিপদে পড়লে আত্মরক্ষার জন্য কামড় দিতে পারে।
গাছে থাকা সাপগুলোর মধ্যে পরিচিত লাউডগা বা সুতানলি। রেড লিস্টে আহেটুলা নাসুটা ও আহেটুলা প্রসিনা — দুই প্রজাতিরই স্থানীয় নাম হিসেবে লাউডগার উল্লেখ আছে এবং দুটিই অনুন্যতম সংকটাপন্ন। লম্বা, সরু ও সবুজ দেহের কারণে এরা গাছের ডালপালা ও পাতার সঙ্গে সহজে মিশে থাকে, আর টিকটিকি, গিরগিটি, ব্যাঙ ও ছোট পাখি শিকার করে। লাউডগা বিষধর না হলেও "চট করে কামড় দিয়ে ফেলে," বলছিলেন অধ্যাপক ফরিদ আহসান।
উজ্জ্বল রঙের কালনাগিনী, ইংরেজিতে অর্নেট ফ্লাইং স্নেক, বৈজ্ঞানিক নাম ক্রাইসোপেলিয়া অর্নাটা। নামে 'নাগিনী' থাকলেও এটি গোখরা বা কেউটে গোত্রের নয়। মূলত বৃক্ষচারী এই সাপ এক গাছ থেকে অন্য গাছে যাওয়ার সময় শরীর চ্যাপ্টা করে বাতাসে ভেসে কিছুটা দূরত্ব পেরোতে পারে, সেখান থেকেই ইংরেজি নামে 'ফ্লাইং স্নেক' কথাটি এসেছে।
কৃষকের জন্য এই পার্থক্য চেনা কেবল কৌতূহলের বিষয় নয়। ধানখেত, মাছের খামার ও পুকুরপাড়ে যে সাপগুলো সবচেয়ে বেশি মেলে তার অধিকাংশই নির্বিষ এবং ইঁদুর ও পোকামাকড় নিয়ন্ত্রণে রেখে ফসলের উপকারই করে। না চিনে মেরে ফেলার অভ্যাস তাই খেতের শত্রু কমায় না, বরং বাড়ায়।
সূত্র: বিবিসি বাংলা





মন্তব্য
(০)