শেরপুরে সাপের কামড়ের পর চিকিৎসাধীন অবস্থায় মো. শাহিন আকন্দ (২০) নামে এক তরুণ মারা গেছেন। সময়মতো অ্যান্টিভেনমসহ প্রয়োজনীয় চিকিৎসা না পাওয়ায় শেরপুর জেলা সদর হাসপাতালের দায়িত্বরত চিকিৎসকদের গাফিলতিকে দায়ী করছেন নিহতের স্বজনরা।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এ অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, রোগীর শারীরিক অবস্থা ও উপসর্গ অনুযায়ী যথাযথ চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে।
নিহত শাহিন শেরপুর সদর উপজেলার ৯ নং চরমোচারিয়া ইউনিয়নের হরিণধরা কান্দাপাড়া গ্রামের কৃষক মো. শফিকুল আকন্দের ছেলে। তিনি শেরপুর সরকারি কলেজের অর্থনীতি বিভাগের অনার্স প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন। সম্প্রতি তিনি পুলিশের কনস্টেবল নিয়োগ পরীক্ষায়ও অংশ নিয়েছিলেন।
নিহতের স্বজনরা জানায়, শুক্রবার (২১ আগস্ট) রাত ৮টার দিকে বাড়ি থেকে বের হয়ে রাস্তায় হাঁটার সময় শাহিনকে সাপে কামড় দেয়। পরে বন্ধু ও স্বজনরা তাকে দ্রুত শেরপুর ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেলা সদর হাসপাতালে নিয়ে যান।
নিহতের জেঠাতো ভাই সাব্বির আহমেদ বলেন, রাত ৮টার দিকে সাপে কামড় দেওয়ার পর সাড়ে ৮টার মধ্যে শাহিনকে হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে প্রথমে তার রক্ত পরীক্ষা করা হয়। প্রায় ২০ মিনিট পর রিপোর্ট পাওয়ার পর চিকিৎসকেরা জানান, শরীরে বিষের উপস্থিতি নেই এবং রক্ত চলাচল স্বাভাবিক রয়েছে। তাকে হাসপাতালে ভর্তি রেখে বিশ্রাম নিতে বলা হয়।
তিনি আরও বলেন, শাহিনের পায়ে সাপের কামড়ের পর যে বাঁধন দেওয়া হয়েছিল, চিকিৎসকেরা সেটি খুলে দেন। এরপর সে চোখে ঝাপসা দেখতে শুরু করে। বিষয়টি চিকিৎসকদের জানালে কয়েকটি ওষুধ দেওয়া হয়। এর মধ্যে ৪টি ওষুধ পাওয়া গেলেও ১টি শেরপুরে কোথাও পাওয়া যায়নি।
তিনি অভিযোগ করে আরও বলেন, রাত সাড়ে ৯টার পর শাহিনের শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তাকে অ্যান্টিভেনম দেওয়া হয়। কিছুক্ষণ পর রাত সাড়ে ১০টার দিকে তার অবস্থা আরও খারাপ হলে চিকিৎসকেরা তাকে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রেফার করেন। ময়মনসিংহ নেওয়ার পথে ফুলপুরের ভাইটকান্দি এলাকায় পৌঁছানোর পর অ্যাম্বুলেন্সে অক্সিমিটার দিয়ে পরীক্ষা করে দেখি তার কোনো সাড়া নেই। পরে তাকে ফুলপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক রাত সাড়ে ১১টার দিকে তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি আরও বলেন, আমরা হাসপাতালে পৌঁছানোর সময় শাহিনের অবস্থা এতটা খারাপ ছিল না। কিন্তু চিকিৎসা দিতে সময় নেওয়া হয়েছে। সময়মতো অ্যান্টিভেনম দেওয়া হলে হয়ত আজ তাকে হারাতে হতো না।
নিহত শাহিনের বন্ধু মোস্তফা কামাল বলেন, আমরা যখন শাহিনকে হাসপাতালে নিয়ে যাই, তখন চিকিৎসকের দায়িত্ব পরিবর্তনের সময় চলছিল। পরে আরেকজন চিকিৎসক এসে তাকে দেখেন এবং সিনিয়রদের সঙ্গে কথা বলেন। শুরুতে আমার বন্ধুর অবস্থা ভালো ছিল। সময়মতো অ্যান্টিভেনম দেওয়া হলে হয়ত সে মারা যেত না।
তিনি আরও বলেন, আমরা রাত সাড়ে ৮টার দিকে হাসপাতালে পৌঁছালেও হাসপাতালের নথিতে কেন রাত ৯টা ২৫ মিনিটে রোগী ভর্তি দেখানো হয়েছে— এটাই আমাদের প্রশ্ন। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলছে, রাত ৯টা ৪০ মিনিটে অ্যান্টিভেনম দেওয়া হয়েছে। শুরুতে বলা হয়েছিল, রোগীর অবস্থা ভালো। পরে পায়ের বাঁধন খুলে দেওয়ার পর চোখে ঝাপসা দেখা ও শ্বাসকষ্ট শুরু হয়।
শেরপুর প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক মাসুদ হাসান বাদল বলেন, সাপে কাটা রোগীর চিকিৎসায় কোনো গাফিলতি থাকলে প্রশাসনিক তদন্তের মাধ্যমে তা বের করা জরুরি। হাসপাতালের সিসিটিভি ফুটেজ রয়েছে। কখন রোগী হাসপাতালে আনা হয়েছিল এবং কখন কী চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে, এসব বিষয় তদন্ত করে দেখা উচিত। দায়িত্বে অবহেলা বা গাফিলতির প্রমাণ পাওয়া গেলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।
তবে চিকিৎসায় গাফিলতির অভিযোগ অস্বীকার করেছেন শেরপুর জেলা সদর হাসপাতালের ইমার্জেন্সি মেডিকেল অফিসার ডা. তৌহিদ ইসলাম। তিনি বলেন, আমি রোগীকে হ্যান্ডওভার নেওয়ার সময় খাতায় রাত ৯টা ২৫ মিনিটে ভর্তি হওয়ার তথ্য লেখা ছিল। রোগীর শারীরিক অবস্থা খারাপের দিকে যাওয়ায় জরুরি ভিত্তিতে অ্যান্টিভেনম দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। হাসপাতালে তখন সিনিয়র কোনো চিকিৎসক উপস্থিত না থাকায় তাদের পরামর্শ নিয়ে রাত ৯টা ৪০ মিনিটে অ্যান্টিভেনম দেওয়া হয়।
তিনি আরও বলেন, অ্যান্টিভেনম দেওয়ার পরও রাত সাড়ে ১০টার দিকে রোগীর অবস্থার অবনতি হলে তাকে দ্রুত ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রেফার করা হয়। আমরা আমাদের জায়গা থেকে সর্বোচ্চ চিকিৎসা দেওয়ার চেষ্টা করেছি। সাপে কাটা রোগীর ক্ষেত্রে উপসর্গ অনুযায়ী চিকিৎসা দেওয়া হয়।
শেরপুর জেলা সদর হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. মোহাম্মদ ইমরান হোসেন বলেন, হাসপাতালে সাপে কাটা রোগীদের জন্য পর্যাপ্ত অ্যান্টিভেনম রয়েছে। বর্তমানে যে পরিমাণ অ্যান্টিভেনম আছে, তা দিয়ে অন্তত ১৮ জন সাপে কাটা রোগীকে চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব।
তিনি আরও বলেন, শাহিন নামে ওই রোগী আমাদের কাছে আসার সময় তার শারীরিক অবস্থা ভালো ছিল না। প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে রাত ৯টা ৪০ মিনিটে তাকে অ্যান্টিভেনম দেওয়া হয়। এরপর অবস্থার আরও অবনতি হলে তাকে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রেফার করা হয়।
পরিবারের পক্ষ থেকে রোগীর অবস্থা প্রথমে ভালো ছিল বলে যে দাবি করা হয়েছে, এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, আমাদের নথি অনুযায়ী রাত ৯টা ২৫ মিনিটে রোগী হাসপাতালে আসে। আমরা আমাদের জায়গা থেকে সর্বোচ্চ চিকিৎসা ও অ্যান্টিভেনম দিয়েছি।
অ্যান্টিভেনম দেওয়ার পর রোগীর অবস্থার অবনতি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, প্রত্যেক ওষুধেরই পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া থাকতে পারে। অ্যান্টিভেনমেরও পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া রয়েছে। অনেক সময় রোগীর পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে। শাহিনের ক্ষেত্রে শ্বাসকষ্টসহ শারীরিক অবস্থা খারাপ থাকায় পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি হয়।
শেরপুরের সিভিল সার্জন ডা. মুহাম্মদ শাহীন বলেন, শাহিনকে অ্যান্টিভেনম দেওয়া হয়েছিল। তবে তার শারীরিক অবস্থা খারাপ থাকায় তাকে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রেফার করা হয়। চিকিৎসায় গাফিলতির অভিযোগের বিষয়ে বিস্তারিত জানতে হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়কের সঙ্গে কথা বলতে হবে।
পরিবারের অভিযোগ ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের বক্তব্যের মধ্যে ভিন্নতা থাকায়, শাহিনকে হাসপাতালে নেওয়া থেকে শুরু করে চিকিৎসা ও অ্যান্টিভেনম দেওয়ার পুরো সময়ক্রম নিরপেক্ষভাবে তদন্তের মাধ্যমে স্পষ্ট করার দাবি উঠেছে। শাহিনের মৃত্যুতে শেরপুর সরকারি কলেজের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মধ্যে শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
মো. নাঈম ইসলাম/কেজে/জেআইএম





মন্তব্য
(০)