বাংলাদেশে সার ব্যবস্থাপনা নিয়ে সাম্প্রতিক অস্থিরতার মধ্যে কৃষি বিজ্ঞানীরা বিকল্প হিসেবে ন্যানো ফার্টিলাইজার বা অণু সারের দিকে নজর দেওয়ার কথা বলছেন। কোথাও সড়ক আটকে বিক্ষোভ, কোথাও ডিলারের গুদামে লুটপাটের ঘটনার প্রেক্ষাপটে তাদের বক্তব্য, এই প্রযুক্তির কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করা গেলে ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের সার আমদানি ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমিয়ে আনা সম্ভব।
প্রায় ১৮ কোটি মানুষের খাবার জোগাতে বাংলাদেশের জমিতে প্রতি বছরই সারের ব্যবহার বাড়ছে। বিজ্ঞানীদের হিসাবে, গত দুই দশকে ইউরিয়া, টিএসপি ও এমওপির মতো প্রচলিত রাসায়নিক সারের ব্যবহার কয়েকগুণ বেড়ে যাওয়ায় একদিকে বাড়তি খরচে আমদানি করতে হচ্ছে, অন্যদিকে মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহারে মাটি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। সেই সঙ্গে বাড়ছে সারের অপচয়, উৎপাদন খরচ এবং পরিবেশ দূষণের মাত্রা।
ন্যানো ফার্টিলাইজার বলতে বোঝানো হয় নাইট্রোজেন, ফসফরাস ও পটাশিয়ামের পাশাপাশি দস্তা, লোহা ও বোরনের মতো অনুখাদ্যকে ন্যানো-আকারে তৈরি সার। ন্যানো মানে ১ থেকে ১০০ ন্যানোমিটার। সাধারণ সারের দানা খালি চোখে দেখা গেলেও ন্যানো সারের কণা এত ছোট যে এক লিটার পানিতে ৫০০ মিলিয়ন পর্যন্ত কণা মেশানো সম্ভব।
বিজ্ঞানীদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী এই সারের তিনটি বিশেষ গুণ আছে। কণা ছোট হওয়ায় ফসলের পাতা বা শেকড়ের সংস্পর্শে আসার জায়গা অনেক বেশি; কণাগুলো পলিমার বা ক্লে দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয় বলে ৪০ থেকে ৫০ দিন ধরে ধীরে ধীরে গাছকে খাবার দেয়, একবার স্প্রে করলেই যথেষ্ট; আর পাতায় স্প্রে করলে স্টোমাটা বা ছিদ্র দিয়ে সরাসরি গাছের ভেতরে ঢুকে যায়, মাটিতে দিলে শেকড় সহজেই টেনে নেয়।
বাজারে সবচেয়ে আলোচিত দুটি পণ্য ন্যানো ইউরিয়া এবং ন্যানো ডিএপি, যেগুলো সাধারণত তরল আকারে বোতলে পাওয়া যায়। কৃষি বিজ্ঞানীদের অনেকের হিসাবে ৫০০ মিলিলিটার ন্যানো ইউরিয়া এক বস্তা অর্থাৎ ৪৫ কেজি ইউরিয়ার সমান নাইট্রোজেন জোগাতে সক্ষম। ভারত ও চীনসহ বিভিন্ন দেশে কৃষি উৎপাদনে এই সারের ব্যবহার ইতিমধ্যে শুরু হয়েছে।
বাংলাদেশে ন্যানো প্রযুক্তি নিয়ে কাজ শুরু হয় ২০১২ সালে দেশে প্রথম ন্যানো টেকনোলজি বিষয়ক আন্তর্জাতিক সেমিনারের পর থেকে। তারই প্রতিফলন ঘটে ২০১৮ সালে প্রণীত জাতীয় কৃষি নীতিতে, যেখানে ন্যানো ফার্টিলাইজার, ন্যানো পেস্টিসাইড ও ন্যানো সেন্সরের ব্যবহার ও প্রসারের বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত করা হয়। কিন্তু নীতিতে থাকলেও মাঠপর্যায়ে এই প্রযুক্তির ব্যবহার এখনও প্রায় শুরুই হয়নি বলে জানাচ্ছেন গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মো. তোফাজ্জল ইসলাম।
কৃষকের জন্য হিসাবটি সহজ: সারের জোগান অনিশ্চিত হলে আমন কিংবা রবি মৌসুমের ফলনই ঝুঁকিতে পড়ে। ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত শুরুর পর বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের সঙ্গে সার নিয়েও ধাক্কা খেয়েছে কৃষিনির্ভর অনেক দেশ, ফলে তারা অভ্যন্তরীণ উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর চেষ্টা করছে। সেই দৌড়ে বাংলাদেশ এখনও পিছিয়ে।
সূত্র: বিবিসি বাংলা





মন্তব্য
(০)