মেঘনায় মাছ ধরার শত শত নৌকার ভিড়ে কিছু নৌকা আলাদা চোখে পড়ে: বাঁশের খুঁটিতে পলিথিনের ছাউনি, এক কোণে চুলা আর হাঁড়ি, অন্য কোণে গুটিয়ে রাখা কাপড়। নদীভাঙনে ভিটেমাটি হারানো এসব পরিবারের কাছে এই নৌকাই এখন ঘর, সংসার আর জীবিকার জায়গা। জাগো নিউজের প্রতিবেদক খায়রুল বাশার আশিক বরিশাল ও ভোলার মেঘনা তীর ঘুরে তাদের জীবনের কথা তুলে এনেছেন।
বরিশালের মেহেন্দীগঞ্জের উলানিয়ায় মেঘনা পাড়ে এমন এক নৌকায় থাকেন হাফিজা বেগম। প্রায় পাঁচ বছর আগে ভাঙনে স্বামীর ভিটা নদীতে যায়, তারপর আর ঘর তোলার মতো জমি মেলেনি। স্বামী ও দুই সন্তান নিয়ে আজ এক চরে, কাল আরেক চরে নৌকা ভেড়ান তিনি। ভোলার ইলিশা ঘাটের কাছে মাছ ধরে সংসার চালানো আমির মিয়া বলেন, ছয় বছর ধরে তিনি নদীতেই থাকেন, আর নতুন চর জাগলে তা প্রভাবশালীদের দখলে চলে যায়।
উলানিয়া ছাড়াও ভোলার তুলাতলী, ইলিশা ও তজুমদ্দিনের সুলিজঘাটসহ মেঘনা তীরের নানা এলাকায় ঘরহারা পরিবারের দেখা মেলে। কেউ আত্মীয়ের বাড়িতে, কেউ শহরের বস্তিতে আশ্রয় নিয়েছেন, কেউ নৌকাকেই বেছে নিতে বাধ্য হয়েছেন। এদের বেশির ভাগের জীবিকা মাছ ধরা: জাল ফেলা, বড়শিতে পুঁটি গেঁথে বোয়াল, আইড় বা চিতল ধরা, আর বড় মাছ বাজারে বেচে চাল, ডাল, তেল কেনা।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এরা বেদে বা যাযাবর জনগোষ্ঠী নন। তাদের একসময় ভিটা, উঠান আর গ্রাম ছিল; ভাঙন সেই স্থির জীবনকে ভাসমান করে দিয়েছে। নৌকায় নৌকায় গড়ে ওঠে প্রতিবেশীর সম্পর্ক, বিপদে একে অপরের পাশে দাঁড়ায় তারা, কখনো দুই নৌকার পরিবারের ছেলেমেয়ের বিয়েও হয়।
সবচেয়ে বড় ক্ষতি শিশুদের। সরেজমিনে দেখা গেছে, নৌকায় বেড়ে ওঠা অনেক শিশু নিয়মিত স্কুলে যায় না; কেউ প্রাক-প্রাথমিকের পর আর পড়েনি। জন্মনিবন্ধন, স্বাস্থ্যসেবা, পরিবার পরিকল্পনা ও সামাজিক নিরাপত্তার মতো সেবার সঙ্গেও স্থায়ী ঠিকানাহীন এই পরিবারগুলোর যোগাযোগ সামান্য। অসুখ হলে কাছের ফার্মেসির ওষুধই ভরসা।
বরিশাল সরকারি ব্রজমোহন কলেজের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের প্রধান ড. মুহাম্মদ ইব্রাহীম খলিল বলেন, নদীভাঙনকে শুধু প্রাকৃতিক দুর্যোগ হিসেবে দেখলে ভূমি ব্যবস্থাপনা, পুনর্বাসন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের প্রশ্ন আড়ালে থেকে যায়। তার মতে, সরকারি খাসজমি বরাদ্দে এই ভূমিহীন পরিবারগুলোকে অগ্রাধিকার দিলে ভাসমান মানুষের সংখ্যা কমানো সম্ভব, আর ভাঙনে সব হারানো মানুষের পুনর্বাসন দয়া নয়, রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
উপকূলের নদীভাঙন শুধু জমি আর ফসল কেড়ে নেয় না, জেলে পরিবারের ঠিকানাও মুছে দেয়। মেঘনায় নতুন চর জাগলেও ঘরহারা এই মানুষদের প্রশ্ন একটাই: সেখানে তাদের জায়গা কোথায়।
ছবি: Alaminnayemhang / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪




মন্তব্য
(০)