কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই সমাজকে কীভাবে বদলে দেবে, তা নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে একটি পুরোনো প্রযুক্তির কথা মনে করা যেতে পারে। সেটি হলো কুকুর।
মানুষ যখন কুকুরকে পোষ মানাতে শুরু করেছিল, তখন এর সুফল ছিল অসাধারণ। কুকুরের ঘ্রাণশক্তি কাজে লাগিয়ে মানুষ দূরের শিকার শনাক্ত করতে পারত। রাতে কুকুরের শ্রবণশক্তি শত্রুর আগমন টের পেতে সাহায্য করত।
এর ফলে মানুষ শিকার ও যুদ্ধে আরও দক্ষ হয়ে ওঠে। কিছু নৃতত্ত্ববিদের মতে, কুকুরও অন্যতম কারণ, যার ফলে হোমো স্যাপিয়েন্স বা আধুনিক মানুষ নিয়ান্ডারথালদের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় এগিয়ে যায় এবং শেষ পর্যন্ত পৃথিবীতে আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করে।
তবে কুকুরকে পোষ মানানোর শুরুটা মোটেই ঝুঁকিমুক্ত ছিল না। মানুষকে আক্ষরিক অর্থেই বন্যপ্রাণীকে নিজের গুহায় ঢুকতে দিতে হয়েছিল। তাদের এমনভাবে প্রশিক্ষণ দিতে হয়েছিল, যাতে তারা মানুষের জন্য বিপজ্জনক না হয়ে ওঠে।
হাজার হাজার বছর পরও কখনো কখনো পোষা কুকুর নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। তবে সামগ্রিকভাবে মানুষ এই সম্পর্ককে সফল বলেই মনে করে।
এআই নিয়েও আশাবাদীদের ধারণা অনেকটা এমন। তাদের মতে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মানুষের কাজ কেড়ে নেওয়ার পরিবর্তে মানুষের সক্ষমতা বাড়াবে। অর্থাৎ মানুষ ও এআই একসঙ্গে কাজ করে আরও বেশি দক্ষ হয়ে উঠবে।
কিন্তু সমস্যা হলো, কুকুরের বিবর্তনের সঙ্গে এআইয়ের বিবর্তনের তুলনা করা যায় না। এআই অত্যন্ত দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। ভবিষ্যতে এআই নিজেই যদি নিজের আরও উন্নত সংস্করণ তৈরি করতে শুরু করে, তখন পরিস্থিতি কী হবে, তা নিয়ে নিশ্চিত হওয়া কঠিন।
কুকুরের ক্ষেত্রে মানুষ মোটামুটি নিশ্চিত থাকতে পারে যে তারা ভবিষ্যতে নিজেরাই বোতলের ছিপি খুলবে না এবং মানুষকে বন্দি করার পরিকল্পনাও করবে না। কিন্তু অত্যন্ত উন্নত এআইয়ের ক্ষেত্রে এমন নিশ্চয়তা এখনই দেওয়া সম্ভব নয়।
এআই কীভাবে ভবিষ্যৎ সমাজকে বদলে দিতে পারে, তা নিয়ে সম্প্রতি দুটি বই বিশেষভাবে আলোচনায় এসেছে। একটি লিখেছেন নোবেল পুরস্কারজয়ী অর্থনীতিবিদ দারন আচেমোগ্লু। অন্যটি লিখেছেন পুলিৎজার পুরস্কারপ্রাপ্ত ইতিহাসবিদ জিল লেপোর।
হার্ভার্ডের ইতিহাসবিদ জিল লেপোরের দৃষ্টিতে মূল সমস্যাটি প্রযুক্তি তৈরির পেছনে থাকা ব্যক্তিদের নিয়েও। তাঁ মতে, প্রযুক্তি খাতের অনেক প্রভাবশালী ব্যক্তি ভবিষ্যৎ নিয়ে এমন পরিকল্পনা করছেন, যা গণতন্ত্র ও মানবসমাজের জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
'দ্য রাইজ অ্যান্ড ফল অব দ্য আর্টিফিশিয়াল স্টেট' বইয়ে লেপোরের যুক্তি হলো, প্রযুক্তি উদ্যোক্তারা এমন একটি ভবিষ্যৎ তৈরি করতে চাইছেন, যেখানে মানুষকে যন্ত্র দিয়ে শাসন করা হবে এবং অনেক মানুষকে যন্ত্র দিয়ে প্রতিস্থাপন করা হবে।
এতে উদার গণতন্ত্র দুর্বল হওয়ার পাশাপাশি প্রাকৃতিক পরিবেশও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে বলে আশঙ্কা তার।
প্রযুক্তি উদ্যোক্তাদের নিজেদের বক্তব্যও তার উদ্বেগের অন্যতম ভিত্তি। ওপেনএআইয়ের প্রধান স্যাম অল্টম্যান একসময় এমন একটি এআইয়ের সম্ভাবনার কথা বলেছেন, যা পৃথিবীর মানুষের পছন্দ ও প্রয়োজন বুঝে সিদ্ধান্ত নিতে পারবে।
ইলন মাস্ক আবার আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, অতিবুদ্ধিমান রোবটের যুগে মানুষ হয়তো পোষা ল্যাব্রাডরের মতো অবস্থায় চলে যেতে পারে।
প্রযুক্তি খাতের বড় উদ্যোক্তাদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়েও লেপোর প্রশ্ন তুলেছেন। কেউ মহাকাশে যাওয়ার কথা বলছেন, কেউ মঙ্গলগ্রহে মানুষের বসতি স্থাপনের কথা বলছেন, আবার কেউ ভার্চ্যুয়াল জগৎকে ভবিষ্যতের গুরুত্বপূর্ণ আবাস হিসেবে দেখছেন।
লেপোরের মতে, এসব পরিকল্পনা থেকে মনে হতে পারে, প্রযুক্তি খাতের নেতারা পৃথিবীতে সম্ভাব্য বিপর্যয়ের ঝুঁকি নিয়ে খুব বেশি চিন্তিত নন।
তবে প্রযুক্তি উদ্যোক্তাদের নিয়ে এমন সমালোচনার একটি সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। এআইয়ের ভবিষ্যৎ শুধু ইলন মাস্ক, স্যাম অল্টম্যান বা অন্য কোনো বিলিয়নিয়ারের ব্যক্তিগত রাজনৈতিক মতাদর্শের ওপর নির্ভর করবে না।
প্রযুক্তি সমাজকে কীভাবে বদলাবে, তা অনেক বেশি নির্ভর করবে প্রযুক্তির নিজস্ব সক্ষমতা এবং মানুষ সেটিকে কীভাবে ব্যবহার করছে তার ওপর।
এই জায়গাতেই গুরুত্ব পায় অর্থনীতিবিদ দারন আচেমোগ্লুর বিশ্লেষণ।
আচেমোগ্লু তার 'হোয়াট হ্যাপেন্ড টু লিবারেল ডেমোক্রেসি?' বইয়ে প্রযুক্তি ও গণতন্ত্রের সম্পর্ক বিশ্লেষণ করেছেন। তিনি মনে করেন, উদার গণতন্ত্র দীর্ঘ সময় ধরে অর্থনৈতিক অগ্রগতি ও উদ্ভাবনকে উৎসাহিত করেছে।
করব্যবস্থা ও সরকারি সেবার মাধ্যমে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সুফল ছড়িয়ে দেওয়া এবং বিভিন্ন নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে নাগরিকদের সুরক্ষা দেওয়াও এই ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য।
কিন্তু কম্পিউটার ও ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যাপক বিস্তারের পর পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করে বলে মনে করেন আচেমোগ্লু।
তার মতে, ডিজিটাল প্রযুক্তি শারীরিক শ্রমের তুলনায় জ্ঞানভিত্তিক শ্রমের চাহিদা বাড়িয়ে বৈষম্য তীব্র করেছে। এর ফলে উচ্চশিক্ষিত একটি শ্রেণির সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রভাব বেড়েছে।
একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রে মানুষের সামাজিক যোগাযোগের ধরনও বদলে গেছে। গত দুই দশকে সরাসরি বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটানোর পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। রাজনৈতিক বিতর্কও আরও তীব্র ও বিষাক্ত হয়েছে।
আচেমোগ্লুর আশঙ্কা, এআই এই সমস্যাগুলো আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। একদিকে এআই উদ্ভাবনের গতি বাড়িয়ে মানুষের জীবনকে অনেক বেশি সমৃদ্ধ করতে পারে। অন্যদিকে ব্যাপক কর্মসংস্থানহীনতাও তৈরি করতে পারে।
এর ফলে সমাজে এমন একটি বিভাজন তৈরি হতে পারে, যেখানে কিছু মানুষ প্রযুক্তি ও উৎপাদনের নিয়ন্ত্রণে থাকবে এবং অন্য একটি বড় অংশ কাজ ও সামাজিক মর্যাদা হারাবে।
এতে গণতন্ত্রের ওপরও বড় ধরনের চাপ তৈরি হতে পারে।
তবে আচেমোগ্লু একটি বিকল্প পথের কথা বলেছেন। তার প্রস্তাব হলো 'প্রো-ওয়ার্কার এআই'—অর্থাৎ এমন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, যা কর্মীদের জায়গা নেওয়ার পরিবর্তে তাদের কাজের মূল্য বাড়াবে।
প্রাগৈতিহাসিক শিকারিরা যেমন নিজেদের দক্ষতার সঙ্গে কুকুরের ঘ্রাণশক্তি ও গতি যুক্ত করে আরও কার্যকর হয়ে উঠেছিল, আধুনিক কর্মীরাও তেমনভাবে এআইকে কাজে লাগাতে পারে।
উদাহরণ হিসেবে বিদ্যুৎকর্মীদের কথা বলা যায়। এআই সেন্সরের তথ্য বিশ্লেষণ করে বিদ্যুৎ গ্রিডের সম্ভাব্য সমস্যা শনাক্ত করতে পারে। একই সঙ্গে অতীতের সমস্যার তথ্য ও সমাধান বিশ্লেষণ করে কর্মীদের দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে সহায়তা করতে পারে।
শিক্ষাক্ষেত্রেও একই ধরনের ব্যবহার সম্ভব। এআই শিক্ষার্থীদের পরীক্ষার উত্তর বিশ্লেষণ করে তাদের প্রয়োজন অনুযায়ী আলাদা দলে ভাগ করার পরামর্শ দিতে পারে। এতে শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের জন্য আরও লক্ষ্যভিত্তিক পাঠদান করতে পারবেন।
এ ধরনের 'মানুষের পরিপূরক এআই' ধারণার সঙ্গে দ্বিমত করা কঠিন। এআই যদি মানুষের কাজের সক্ষমতা বাড়ায়, তাহলে প্রযুক্তির কারণে সামাজিক অস্থিরতা তুলনামূলকভাবে কম হতে পারে।
তবে বড় প্রশ্ন হলো, কীভাবে সেই লক্ষ্য অর্জন করা হবে। এআইয়ের উন্নয়ন অত্যন্ত দ্রুতগতিতে এগোচ্ছে। এর ভবিষ্যৎ সক্ষমতাও এখনো পুরোপুরি জানা নেই।
এ কারণেই এআই নিয়ে ভবিষ্যৎবাণী করা কঠিন। একদিকে মানুষের মধ্যে এআই নিয়ে আশাবাদের চেয়ে হতাশা বাড়ছে। অন্যদিকে প্রযুক্তির উন্নয়ন থামার কোনো লক্ষণও নেই।
শেষ পর্যন্ত নতুন এই 'কুকুরকে' মানুষকে গুহায় আমন্ত্রণ জানাতেই হবে। এআই প্রযুক্তির নেতৃত্বে থাকা যুক্তরাষ্ট্র ও চীন একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী।
কেউই এমন অবস্থায় পড়তে চায় না, যেখানে অন্য দেশ প্রথমে অতিবুদ্ধিমান এআই তৈরি করে ফেলবে এবং নিজেদের কৌশলগত সুবিধা প্রতিষ্ঠা করবে।
তাই কুকুরের মতো এআই মানুষের বিশ্বস্ত সহচর হবে, নাকি একদিন মানুষের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে—এই প্রশ্নের উত্তর এখনো অজানা। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট, এআই এরই মধ্যে মানুষের গুহায় ঢুকে পড়েছে। এখন নির্ধারণ করতে হবে, মানুষ তাকে কতটা বশে রাখতে পারবে।
সূত্র: দ্য ইকোনমিস্টকেএএ/





মন্তব্য
(০)