ইসলামের ইতিহাসে সাহাবি খুবাইব ইবনে আদি (রা.) স্মরণীয় হয়ে আছেন এক বিরল শেষ ইচ্ছার জন্য: ফাঁসির কাষ্ঠে তোলার আগে তিনি দুই রাকাত নামাজ পড়ার সুযোগ চেয়েছিলেন। সহিহ বুখারি ও সিরাতগ্রন্থের বর্ণনা ধরে তাঁর ঘটনাটি তুলে ধরেছেন প্রথম আলোর লেখক নূরুল্লাহ মারূফ।
নবীজি (সা.) মদিনায় আসার প্রায় তিন বছর পরের কথা। বদর ও ওহুদের পর খালিদ ইবনে সুফিয়ান নামের এক ব্যক্তি মদিনায় অতর্কিত হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছিল বলে সুনানে আবু দাউদে (হাদিস: ২৭৬০) বর্ণিত আছে। সাহাবি আবদুল্লাহ ইবনে উনাইস সেই হামলা ঠেকান। এরপর খালিদের গোত্র বনু লাহিয়ান প্রতিশোধ নিতে আজাল ও কারাহ গোত্রের কিছু লোককে ঘুষ দিয়ে মদিনায় পাঠায়, কোরআন শেখানোর জন্য সাহাবিদের নিয়ে যাওয়ার অজুহাতে।
নবীজি (সা.) আসিম ইবনে সাবিতের নেতৃত্বে দশজন সাহাবিকে তাদের সঙ্গে পাঠান, যাঁদের একজন খুবাইব। মক্কা ও উসফানের মাঝে রাজি নামের জলাশয়ের পাড়ে বিশ্রামের সময় দুই শ অস্ত্রধারী তাঁদের ঘিরে ফেলে, যাদের এক শ জন ছিল দক্ষ তীরন্দাজ। আসিমসহ সাতজন শহীদ হন। ক্ষমার শপথ দিয়ে বাকি তিনজনকে আত্মসমর্পণ করানো হয়, কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে বেঁধে ফেলা হয়। প্রতিবাদ করায় আবদুল্লাহ ইবনে তারিককে পাথর মেরে শহীদ করা হয়, আর খুবাইব ও জায়েদ ইবনে দাসিনাহকে মক্কায় দাস হিসেবে বিক্রি করা হয় (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৩৯৮৯)।
খুবাইবকে কিনে নেয় হারিস ইবনে আমিরের ছেলেরা; বদর যুদ্ধে হারিস নিহত হয়েছিলেন খুবাইবের হাতেই। পবিত্র মাসে রক্তপাত নিষিদ্ধ ছিল বলে ঠিক হয়, মাস শেষে হারামের সীমানার বাইরে নিয়ে তাঁকে ফাঁসি দেওয়া হবে। বন্দিদশায় একদিন হারিসের এক মেয়ে দেখেন, তাঁর শিশুপুত্র খুবাইবের কোলে, আর খুবাইবের হাতে ক্ষুর। মেয়েটির আতঙ্ক বুঝে খুবাইব বলেন, তিনি বিশ্বাসঘাতক নন, তাঁর ধর্ম নিরপরাধ শিশুকে হত্যার অনুমতি দেয় না। সেই নারী পরে বলেছিলেন, খুবাইবের মতো উত্তম বন্দী তিনি জীবনে দেখেননি।
ফাঁসির দিন মক্কার মানুষের ভিড়ের মধ্যে খুবাইব দুই রাকাত নামাজ পড়ার সুযোগ চান। অনুমতি পেয়ে ধীরস্থিরভাবে নামাজ শেষ করে বলেন, তারা মৃত্যুভয় ভাববে বলেই তিনি নামাজ দীর্ঘ করেননি। এরপর তাঁকে কাষ্ঠে ঝুলিয়ে বর্শা দিয়ে আঘাত করা হয়। আল-ওয়াকিদির কিতাবুল মাগাজির বর্ণনায়, শেষ মুহূর্তে তিনি দোয়া করেন, আল্লাহ যেন রাসুলের কাছে তাঁর সালাম পৌঁছে দেন।
সহিহ বুখারির (হাদিস: ৩০৪৫) বর্ণনা অনুযায়ী, মদিনায় নবীজি (সা.) সাহাবিদের খুবাইবের শাহাদাতের খবর দেন। মৃত্যুর মুখেও নামাজকে শেষ ইচ্ছা করে নেওয়ার এই ঘটনা মুসলিমদের কাছে ইমানের দৃঢ়তার এক উদাহরণ হয়ে আছে।
ছবি: Mbasit / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 3.0)
সূত্র: প্রথম আলো





মন্তব্য
(০)