মৌসুমে মাঠে আলু উঠেছিল আশার ফসল হয়ে। কম দামে বিক্রি না করে কৃষক ও ব্যবসায়ীরা ভালো দামের আশায় হিমাগারে তুলেছিলেন লাখ লাখ টন আলু। চার মাস পর সেই আলুই এখন গলার কাঁটা। বাজারে চাহিদা নেই, দামও বাড়ছে না। বরং দীর্ঘদিন পড়ে থাকায় হিমাগারের বস্তায় বস্তায় আলু পচতে শুরু করেছে।
ভুক্তভোগীরা বলছেন, এসব আলু এখন বিক্রি করলেও লোকসান, আবার রেখে দিলেও বাড়ছে নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি। এর সঙ্গে আটকে আছে মূলধন। ফলে সামনে আমন মৌসুমের চাষাবাদে প্রয়োজনীয় অর্থ জোগাড় করতেও হিমশিম খাচ্ছেন অনেকে।
বগুড়া ও জয়পুরহাটের হিমাগারগুলো ঘুরে, কৃষক-ব্যবসায়ী ও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে এমন চিত্র পাওয়া গেছে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, জয়পুরহাটে বর্তমানে হিমাগার গেটে ৬০ কেজির এক বস্তা সাদা ডায়মন্ডসহ বিভিন্ন জাতের আলু বিক্রি হচ্ছে ৯২০ থেকে ৯৬০ টাকায়। অথচ উৎপাদন ও হিমাগার ভাড়াসহ প্রতি বস্তায় কৃষকের খরচ পড়েছে প্রায় ১ হাজার ৪০০ টাকা। অর্থাৎ প্রতি বস্তায় গড়ে ৪৪০ থেকে ৪৮০ টাকা পর্যন্ত ঘাটতি থাকছে।
বগুড়াতেও পরিস্থিতি খুব একটা ভিন্ন নয়। জেলার এরুলিয়ার কাফেলা স্টোরে স্টিক ও কাটিলাল জাতের আলু কেজিপ্রতি সাড়ে ১৪ থেকে ১৫ টাকা, পাকরি ২৭ থেকে ২৮ টাকা এবং ডায়মন্ড ১৫ টাকা ৫০ পয়সায় বিক্রি হচ্ছে। কৃষক ও ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে ব্যাপারিরা স্টিক ও কাটিলাল ১৫ টাকা, পাকরি ২৮ থেকে ২৯ টাকা এবং ডায়মন্ড ১৬ টাকা কেজি দরে কিনছেন। ৬০ কেজির এক বস্তায় ব্যাপারিদের লাভ থাকছে মাত্র ৫ থেকে ১০ টাকা। বস্তা খোলার পর পচা বা নিম্নমানের আলু বেশি পাওয়া গেলে সেই সামান্য লাভও থাকছে না; কখনও লোকসান হচ্ছে।
বগুড়ার একটি হিমাগার থেকে আলু বের করার সময় দেখা যায়, বস্তা খুলতেই ভালো আলুর সঙ্গে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ পচা ও নষ্ট আলু বের হচ্ছে। কোনোটি কালচে, কোনোটি নরম ও পচে গেছে। আবার কোনো আলু বাইরে ভালো দেখালেও কাটার পর ভেতরে পচন ধরা পড়ছে। ভালো আলু আলাদা করে বাজারজাত করতে শ্রমিকদের দিয়ে বাছাই করতে হচ্ছে। এক পাশে জমছে নষ্ট আলুর স্তূপ।
দীর্ঘদিন হিমাগারে পড়ে থাকার কারণে সময় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আলুর মান আরও খারাপ হওয়ার আশঙ্কা করছেন ব্যবসায়ীরা। এতে কৃষকের লোকসান যেমন বাড়ছে, তেমনি বাছাই ও পরিবহন খরচের কারণে ব্যবসায়ীদেরও ঝুঁকি বাড়ছে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর জয়পুরহাটে ৩৯ হাজার ৩৩০ হেক্টর জমিতে ৯ লাখ ৩০ হাজার টন আলু উৎপাদন হয়েছে। গত বছরের তুলনায় আবাদ কমেছে প্রায় পাঁচ হাজার হেক্টর। জেলার ২২টি হিমাগারে মোট ২ লাখ ১৫ হাজার ৯৮২ টন আলু মজুত করা হয়েছিল।
আগস্টের প্রথম সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও এসব হিমাগারের ২০ শতাংশ আলুও বিক্রি হয়নি। গত বছর একই সময়ে প্রায় ৪৫ শতাংশ আলু খালাস হয়েছিল। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে একই সময়ে হিমাগার থেকে আলু বিক্রির গতি অর্ধেকেরও নিচে নেমেছে।
কালাই উপজেলার বোড়াই গ্রামের কৃষক সবুর আলী ১০০ বস্তা আলু হিমাগারে রেখেছিলেন। ভাড়াসহ তার মোট খরচ হয়েছিল প্রায় ১ লাখ ৩৫ হাজার টাকা। চার মাস পর সেই আলু বিক্রি করে পেয়েছেন মাত্র ৯৮ হাজার টাকা। এতে তার লোকসান হয়েছে প্রায় ৩৭ হাজার টাকা।
পাঁচবিবির চাটখুর গ্রামের জাহিদুর রহমান ও কালাইয়ের আঁওড়া গ্রামের মোমিন মোল্লার অবস্থাও একই। মৌসুমে কম দামে আলু বিক্রি না করে ভালো দামের আশায় হিমাগারে রেখেছিলেন তারা। এখন দাম না বাড়ায় আলু বিক্রি করতেও পারছেন না।
আলু বিক্রি না হওয়ায় শুধু কৃষকের লোকসানই বাড়ছে না, আটকে থাকছে তাদের মূলধনও। এখন আমন ধানের মৌসুম। বীজ, সার, শ্রমিকের মজুরি ও জমি প্রস্তুতের খরচ মেটাতে অনেক কৃষক হিমাগারে রাখা আলু বিক্রির টাকার ওপর নির্ভর করেন। কিন্তু আলু বিক্রি না হওয়ায় সেই অর্থ হাতে আসছে না। ফলে পুরোনো আলুর লোকসানের সঙ্গে নতুন ফসলের চাষাবাদে অর্থসংকটও তৈরি হয়েছে।
বগুড়া ও জয়পুরহাট মিলিয়ে গত মৌসুমে প্রায় ২১ লাখ ৪৮ হাজার টন আলু উৎপাদন হয়েছে। দুই জেলার ৫৬টি হিমাগারে সংরক্ষণ করা হয়েছিল ৫ লাখ ৫ হাজার ২৬৮ টন আলু। বিপুল এই মজুতের তুলনায় বাজারে চাহিদা কম থাকায় হিমাগার থেকে আলু বের করার গতি কমে গেছে।
জয়পুরহাটের কালাই উপজেলার পুনট হাটের ব্যবসায়ীরা জানান, বিভিন্ন জেলার মোকামে আলু পাঠিয়েও তারা লোকসান গুনছেন। প্রতি ট্রাকে চার থেকে পাঁচ হাজার টাকা এবং বস্তাপ্রতি ৫০ থেকে ৫৫ টাকা পর্যন্ত লোকসান হচ্ছে। ফলে অনেক ব্যবসায়ী আলু কেনাবেচা কমিয়ে দিয়েছেন।
বগুড়ার আলু ব্যবসায়ী সামসুল প্রামাণিক বলেন, 'হিমাগারে রাখা কৃষক ও ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে ব্যাপারিরা স্টিক ও কাটিলাল আলু কেজিপ্রতি ১৫ টাকা, পাকরি ২৮ থেকে ২৯ টাকা এবং ডায়মন্ড ১৬ টাকা দরে কিনছেন। ৬০ কেজির বস্তায় লাভ থাকছে মাত্র ৫ থেকে ১০ টাকা। বস্তা খুলে খারাপ আলু বেশি পাওয়া গেলে কখনও লাভের বদলে লোকসান হচ্ছে।'
তিনি বলেন, পরিবহন, শ্রমিক ও বাছাইয়ের খরচ যোগ হলে অনেক ক্ষেত্রে বস্তাপ্রতি লাভ থাকে না। বাজারে চাহিদা কম থাকায় ব্যবসায়ীরাও বেশি দামে আলু কিনে ঝুঁকি নিতে চাইছেন না। ফলে কৃষক বিক্রি করতে পারছেন না, আবার ব্যবসায়ীরাও পর্যাপ্ত আলু কিনছেন না।
জয়পুরহাটের কালাইয়ের পুনট কোল্ড স্টোরেজে আড়াই লাখের বেশি বস্তা আলু সংরক্ষণ করা হয়েছিল। আগস্টের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত সেখান থেকে মাত্র ৪৫ হাজার বস্তা খালাস হয়েছে বলে হিমাগার ব্যবস্থাপনা সূত্রে জানা গেছে।
হিমাগারটির ব্যবস্থাপক বিপ্লব কুমার বলেন, বাজারে দাম না থাকায় কৃষকরা আলু বিক্রি করতে আসছেন না। ফলে একদিকে বিপুল পরিমাণ আলু পড়ে আছে, অন্যদিকে ভাড়ার টাকা আদায় নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। আলু যত বেশি সময় হিমাগারে থাকবে, মান নষ্ট হওয়ার ঝুঁকিও তত বাড়বে।
বগুড়ায় গত মৌসুমে প্রায় ৬৬ হাজার হেক্টর জমিতে ১৪ লাখ টন আলু উৎপাদন হয়েছে। জেলার ৩৩টি হিমাগারে প্রায় ২ লাখ টন আলু সংরক্ষণ করা হয়েছিল। বৃহত্তর বগুড়ার ৪৯টি হিমাগারেও দীর্ঘ সময় পর্যন্ত অর্ধেকের বেশি আলু অবিক্রীত থাকার তথ্য পাওয়া গেছে। দাম পড়ে যাওয়ায় বগুড়ার কৃষকদের প্রতি বস্তায় ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা পর্যন্ত লোকসান হয়েছে। ফলে অনেক কৃষক হিমাগার থেকে আলু তুলতেও আগ্রহ দেখাচ্ছেন না।
কৃষক ও ব্যবসায়ীদের মতে, শুধু উৎপাদন বেশি হওয়াই বর্তমান সংকটের কারণ নয়। উৎপাদনের সঙ্গে বাজার, সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও রপ্তানির সমন্বিত পরিকল্পনার ঘাটতিও এর জন্য দায়ী। দুই জেলায় বছরে ২০ লাখ টনের বেশি আলু উৎপাদন হলেও সেই বিপুল ফসলের তুলনায় দেশীয় প্রক্রিয়াজাত শিল্প ও রপ্তানি বাজার এখনও যথেষ্ট বড় হয়নি।
ফলে উৎপাদন বাড়লেই বাজারে সরবরাহের চাপ তৈরি হচ্ছে। আবার কোনো মৌসুমে উৎপাদন কম হলে ভোক্তা পর্যায়ে দাম বেড়ে যাচ্ছে। এই বৈপরীত্যের চাপ কখনও কৃষক, কখনও ভোক্তার ওপর পড়ছে।
কৃষকদের দাবি, শুধু হিমাগারের সংখ্যা বাড়িয়ে এই সমস্যার সমাধান হবে না। আলু দিয়ে চিপস, ফ্রেঞ্চ ফ্রাই, স্টার্চসহ বিভিন্ন প্রক্রিয়াজাত পণ্য তৈরির শিল্প বাড়াতে হবে। পাশাপাশি বিদেশে রপ্তানির বাজার সম্প্রসারণ করতে হবে। বিশেষ করে উৎপাদন বেশি হলে রপ্তানি বাড়ানোর সুযোগ তৈরি করা গেলে স্থানীয় বাজারের ওপর চাপ কমবে এবং কৃষকরাও ন্যায্য দাম পেতে পারেন।
তবে রপ্তানি বাড়াতে শুধু অনুমোদন যথেষ্ট নয়। আলুর মান নিয়ন্ত্রণ, বাছাই, প্যাকেজিং, সংরক্ষণ, পরিবহন ও বন্দর ব্যবস্থার উন্নয়নও জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বর্তমান পরিস্থিতিতে কৃষকেরা দ্রুত বাজার সচল করার দাবি জানাচ্ছেন। তাদের আশঙ্কা, হিমাগারে আলু পড়ে থাকার সময় যত বাড়বে, নষ্ট হওয়ার পরিমাণও তত বাড়বে। এতে শেষ পর্যন্ত কৃষককে আরও কম দামে আলু বিক্রি করতে হতে পারে।
আলুর বাজারে উৎপাদন এলাকা ও ভোক্তা পর্যায়ের দামের বৈপরীত্যও নতুন নয়। উৎপাদন এলাকায় কৃষক যখন কম দামে আলু বিক্রি করতে পারছেন না, তখন দেশের অন্য এলাকায় অনেক সময় ভোক্তাকে বেশি দামে আলু কিনতে হয়। অর্থাৎ উৎপাদন থেকে ভোক্তা পর্যন্ত মূল্যশৃঙ্খলে সমন্বয়ের ঘাটতিই সংকটকে আরও জটিল করে তুলছে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক সামসুদ্দিন বলেন, চাহিদার তুলনায় উৎপাদন বেশি হওয়ায় আলুর দাম কমেছে। বাজার সচল ও যৌক্তিক দাম নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করা হচ্ছে।
কৃষক ও ব্যবসায়ীদের মতে, হিমাগারে আটকে থাকা আলু দ্রুত বাজারজাত করার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদে প্রক্রিয়াজাত শিল্প, রপ্তানি ও বাজার ব্যবস্থাপনায় সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া না হলে প্রতি বছরই একই সংকট ফিরে আসবে। আর তার খেসারত দিতে হবে মূলত কৃষককেই।
এল.বি/কেএইচকে





মন্তব্য
(০)