বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গে ইলিশের উৎপাদন কমছে, অথচ গুজরাটের নর্মদা নদীতে ইলিশ ধরা পড়ছে বিপুল সংখ্যায়। বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিবেশের পরিবর্তন ও অনুকূল বর্ষায় ভরুচের কাছে নর্মদার নিম্ন অববাহিকায় মিঠা ও লবণাক্ত পানির যে মিশ্রণ তৈরি হয়, তা পরিযায়ী এই মাছের প্রজননের জন্য উপযোগী হয়ে উঠেছে। কামধেনু বিশ্ববিদ্যালয়ের কলেজ অব ফিশারিজ সায়েন্সের সহকারী অধ্যাপক আর বি ভালা ও এ এম পারমারের মতে, এ ধরনের পরিবেশগত পরিবর্তন ইলিশের গতিপথ বদলে দিতে পারে।
মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০০২-০৩ সালে দেশে ইলিশ উৎপাদন ছিল ১ লাখ ৯৯ হাজার মেট্রিক টন এবং এরপর গড়ে প্রতিবছর বাড়ছিল; হোঁচট শুরু ২০২২-২৩ অর্থবছর থেকে। ওই বছর ৫ লাখ ৭১ হাজার টন, ২০২৩-২৪-এ ৫ লাখ ২৯ হাজার টন এবং ২০২৪-২৫-এ ৫ লাখ ৪ হাজার টন উৎপাদন হয়; ২০২৫-২৬-এর আনুষ্ঠানিক হিসাব না মিললেও কর্মকর্তাদের ধারণা তা পাঁচ লাখ টনের কম। বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের হিসাবে দেশের মোট মৎস্য উৎপাদনের প্রায় ১২ শতাংশ ইলিশ, আর বিশ্বের ইলিশের প্রায় ৬০ শতাংশ (মন্ত্রণালয়ের দাবি ৭০-৮০ শতাংশ) বাংলাদেশে হয়।
বিশেষজ্ঞদের ব্যাখ্যা, গঙ্গা-হুগলি-পদ্মা নদীব্যবস্থা আগে ইলিশের প্রধান প্রজননক্ষেত্র ছিল; ফারাক্কা ব্যারাজে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ বদলেছে, নির্মাণকাজ বেড়েছে, কোথাও গভীরতা কমেছে, আর দূষণ ও জলবায়ু পরিবর্তন চলাচল ও প্রজননক্ষেত্রে প্রভাব ফেলছে—তাই ঐতিহ্যবাহী ক্ষেত্র থেকে ইলিশের গতিপথ সরে যাওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
গুজরাটের মৎস্য কমিশনার বিজয় খারাদির তথ্য, রাজ্যে ইলিশ উৎপাদন ২০২২-২৩-এ ১৪ হাজার ১৯৮.৯৮ টন, ২০২৩-২৪-এ ৮ হাজার ২০৯.৪৮ টন, ২০২৪-২৫-এ ৮ হাজার ৫৩৫.৭৫ টন এবং ২০২৫-২৬-এ চার বছরের সর্বোচ্চ ১৪ হাজার ৫৮৭.৭২ টন। বৃদ্ধির বড় অংশ অভ্যন্তরীণ জলসীমা থেকে: ২০২৪-২৫-এর মাত্র ১২৩.৬২ টন থেকে ২০২৫-২৬-এ ৪ হাজার ৬৪৫.৯৯ টন। ভরুচ জেলায় উৎপাদন ৭ হাজার ৪১০.৯ টন, যার ২ হাজার ৯৪৯.৭৬ টন সামুদ্রিক।
নর্মদার তীরে ২৫ হাজারের বেশি জেলে এই মাছের ওপর নির্ভরশীল। ভাদভুত গ্রামের জেলে ধবল মাচ্ছি বলেন, বর্ষার চার মাসের ইলিশ মৌসুম তাঁদের আয়ের গুরুত্বপূর্ণ সময়, আর হানসোট, দাহেজ ও ভাদভুতে এবার ভালো মাছ পড়ছে; ভরুচের জেলে রমেশ মাচ্ছি বলেন, নর্মদায় এত ইলিশ তাঁরা আগে দেখেননি। গুজরাটের স্থানীয় বাজারে চাহিদা কম বলে বড় অংশ পশ্চিমবঙ্গে যাচ্ছে—ব্যবসায়ীদের হিসাবে চলতি মৌসুমে ভরুচ থেকে প্রায় ২৫০ টন কলকাতা ও হাওড়ার বাজারে—এবং গুজরাটি ইলিশ আসছে বাংলাদেশেও।
নর্মদায় ইলিশের এই উপস্থিতি শুধু আহরণের খবর নয়; নদীর পরিবেশ ও ইলিশের পরিযায়ী আচরণ বদলে যাওয়ার ইঙ্গিত। প্রবাহ, লবণাক্ততা, দূষণ ও জলবায়ুর পরিবর্তন দীর্ঘমেয়াদে ইলিশের চলাচলে কী প্রভাব ফেলছে, তা নিয়ে আরও গবেষণা দরকার বলে প্রতিবেদনটির উপসংহার। প্রতিবেদনটি জনকণ্ঠের।
সূত্র: দৈনিক জনকণ্ঠ





মন্তব্য
(০)