বাংলাদেশ নদীমাতৃক দেশ। তাই তো মাছ আমাদের অন্যতম আয়ের উৎস। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে দেশে মাছ উৎপাদন ছিল ৫০ লাখ মেট্রিক টন। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে প্রায় ৫ হাজার ১৪৫ কোটি টাকা সমমূল্যের ৯১ হাজার মেট্রিক টন মাছ বা মৎস্য-জাত পণ্য রপ্তানি করা হয়েছে। সে হিসেবে আগের বছরের তুলনায় প্রায় এক হাজার কোটি টাকার মাছ রপ্তানি বেড়েছে। তবে ইলিশের উৎপাদন কমে যাওয়ার পাশপাশি এর গড় আকারও ছোট হয়ে আসার কথা বলছেন জেলে ও মৎস্যবিজ্ঞানীরা।
মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ বিভাগের তথ্যমতে, বিশ্বে স্বাদুপানি ও চাষের মাছ উৎপাদনে বিশ্বের শীর্ষ তিন দেশের একটি বাংলাদেশ। বাংলাদেশ স্বাদুপানির মাছ উৎপাদন করে ১৩ লাখ ২২ হাজার টন। যা বিশ্বের মোট মাছের ১১ দশমিক ৭ শতাংশ। এর আগে সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশের অবদান ছিল ১১ শতাংশ। বর্তমানে দেশে মাছের মোট উৎপাদন কত?
মৎস্য অধিদপ্তরের ২০২৫ সালের তথ্য অনুযায়ী, দেশের মৎস্য খাত ১৪ লাখ নারীসহ দুই কোটির বেশি মানুষের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জীবিকার সংস্থান করে। এই সংখ্যা দেশের মোট জনসংখ্যার ১২ শতাংশ। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে দেশে মাছ উৎপাদন ছিল ৫০ লাখ মেট্রিক টন। দিনে মাথাপিছু মাছ গ্রহণের পরিমাণ ছিল ৬৭ গ্রাম। বর্তমানে সামুদ্রিক উৎস থেকে বাংলাদেশ কত শতাংশ মাছ আহরণ করে?
বাংলাদেশ তার মোট বার্ষিক মৎস্য উৎপাদনের প্রায় ১২.৫৩ শতাংশ সামুদ্রিক উৎস থেকে আহরণ করে থাকে। বাকি সিংহভাগ মাছ আসে অভ্যন্তরীণ মুক্ত ও বদ্ধ জলাশয় এবং মাছ চাষ থেকে। কৃষি তথ্য সার্ভিস (এআইএস) জানায়, মাছ উৎপাদনে উৎসের অবদান সামুদ্রিক উৎস প্রায় ১২.৫৩% (পরিমাণ প্রায় ৬.২৯ লাখ মেট্রিক টন)। অভ্যন্তরীণ উৎস ও চাষ প্রায় ৮৭.৪৭%।
কৃষি তথ্য সার্ভিস (এআইএস) আরও জানায়, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে প্রায় ৫ হাজার ১৪৫ কোটি টাকা সমমূল্যের ৯১ হাজার মেট্রিক টন মাছ বা মৎস্য-জাত পণ্য রপ্তানি করা হয়েছে। এর আগের ২০২৩-২৪ অর্থবছরে বাংলাদেশ ৭১,৪৭৭ মেট্রিক টন মাছ বা মৎস্য-জাত পণ্য এক্সপোর্ট করে ৪ হাজার ৩৭৬ কোটি টাকা আয় করে। সে হিসেবে আগের বছরের তুলনায় প্রায় এক হাজার কোটি টাকার মাছ রপ্তানি বেড়েছে।
মাছ উৎপাদনের পাশাপাশি রপ্তানিতেও এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাজ্য, চীন, ভারত, ফ্রান্স, আমেরিকা, জাপান, রাশিয়া, নেদারল্যান্ডস, বেলজিয়াম, জার্মানিসহ বিশ্বের ৫২টি দেশে চিংড়ি, রুই, কাতলা, মৃগেল, কাঁকড়া, কুঁচিয়া, পাঙাশ, পাবদা, তেলাপিয়া, শোল, কৈ, শিং, মাগুর ইত্যাদি প্রজাতির স্বাদুপানির মাছ ও বিভিন্ন প্রজাতির সামুদ্রিক মাছ রপ্তানি হচ্ছে। মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ বিভাগের তথ্যমতে, বিশ্বে স্বাদুপানি ও চাষের মাছ উৎপাদনে বিশ্বের শীর্ষ তিন দেশের একটি বাংলাদেশ।
বাংলাদেশ স্বাদু-পানির মাছ উৎপাদন করে ১৩ লাখ ২২ হাজার টন। যা বিশ্বের মোট মাছের ১১ দশমিক ৭ শতাংশ। এর আগে সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশের অবদান ছিল ১১ শতাংশ। সম্প্রতি জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) প্রকাশিত বিশ্বের সামগ্রিক মৎস্যসম্পদ বিষয়ক প্রতিবেদনেও এমন তথ্যই উঠে এসেছে। মিঠাপানি ও বদ্ধ জলাশয়ের মাছ উৎপাদনেও ব্যাপক উন্নয়ন হয়েছে। বিশ্বে অভ্যন্তরীণ মুক্ত জলাশয়ে মাছ আহরণে বাংলাদেশ এখন দ্বিতীয় ও তেলাপিয়া মাছ উৎপাদনে পঞ্চম।
তবে ইলিশ মাছ উৎপাদনে বাংলাদেশ বিশ্বে ১ নম্বর অবস্থানে রয়েছে। বিশ্বে মোট ইলিশ উৎপাদনের প্রায় ৭০ থেকে ৮০ শতাংশই বাংলাদেশে হয়। দেশে কয়েক বছর ধরে ভরা মৌসুমেও চড়া দামে ইলিশ বিক্রি হচ্ছে, যার কারণ হিসেবে মাছটির নানা বিপদে পড়ে যাওয়ার কথা সামনে এনেছেন জেলে থেকে শুরু করে মৎস্যবিজ্ঞানীরা। কারো মতে, ইলিশের যাত্রাপথ সংকুচিত হয়ে আসছে; কেউ আনছেন রেণু নিধনের কথা; আছে ইলিশের খাদ্য কমে যাওয়ার যুক্তিও। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, নদীদূষণ, নাব্য হারানো কিংবা ইলিশকে জীবনচক্র সম্পন্ন করতে না দেওয়ার মতো কারণও উঠে এসেছে।
আবার কোনো কোনো গবেষক বলেছেন, একটি বা দুটি কারণে উৎপাদন কমছে, বিষয়টি এমন নয়। অনেকগুলো কারণেই ইলিশের উৎপাদনে নিম্নমুখী প্রবণতা তৈরি হয়েছে। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে গবেষণায় মনোযোগ দেওয়া; ঠিকঠাক আইন বাস্তবায়ন; জেলেদের তালিকা হালনাগাদ করে প্রণোদনা দেওয়া; ইলিশের প্রজননক্ষেত্র রক্ষা; কৃত্রিম প্রজননে মনোযোগ দেওয়া এবং ভারত ও মিয়ানমারের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগ নেওয়ার মতো পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
ইলিশের উৎপাদন কমে যাওয়ার পাশপাশি এর গড় আকারও ছোট হয়ে আসার কথা বলছেন জেলে ও মৎস্যবিজ্ঞানীরা। গবেষকদের ভাষ্য, ইলিশ এক থেকে দুই বছরের মধ্যে পরিণত হয়ে যায়। একটি জাটকা এক বছর বাঁচলে সেটির আকৃতি ১১ দশমিক ৮১ ইঞ্চি পর্যন্ত হয়। পাঁচ থেকে সাত বছর বেঁচে থাকলে ২২ ইঞ্চির বেশিও হতে পারে। ইলিশ গবেষক ও মৎস্য বিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক আনিসুর রহমান বলেন, ‌'বিগত দুই বছর সামগ্রিক উৎপাদন কমছে শুধু নয়, বড় আকারের ইলিশের পরিমাণ কমে গেছে। একটা সময় ইলিশের গড় আকার ছিল ৪০০ থেকে ৪৫০ গ্রাম। এখন ৩০০ থেকে সাড়ে ৩৫০ গ্রামে চলে আসছে।'
বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের গবেষণায় দেখা গেছে, সর্বশেষ ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা নেমেছে ১৩ দশমিক ৩৯ ইঞ্চিতে। যা ২০২২-২৩ অর্থবছরে ধরা পড়া ইলিশের গড় আকৃতি ছিল ১৪ দশমিক ৬৫ ইঞ্চি। আকৃতিতে গড়ে সবচেয়ে ছোট ইলিশ ধরা পড়ে রাজশাহী জেলায়; ১১ দশমিক ৪২ ইঞ্চি। আর বড় আকৃতির ইলিশ পাওয়া যায় কক্সবাজারে; ১৫ দশমিক ১৬ ইঞ্চি।
ইলিশের আকার ছোট হয়ে আসার কারণ হিসেবে গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, 'ইলিশের খাদ্যতালিকায় ২৭ প্রজাতির উদ্ভিদ কণা (জুপ্ল্যাংকটন) ও ১২ প্রজাতির প্রাণিকণা (ফাইটোপ্ল্যাংটন) আছে। এসব প্ল্যাংকটনের পরিমাণ মেঘনা নদীতে ৬৮ শতাংশ কমেছে। এর বড় কারণ নদীদূষণ।' গবেষণাটি করেছেন মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মোহাম্মদ আশরাফুল আলম। তিনি বলেন, 'পদ্মা ও মেঘনার মোহনায় ইলিশের জন্য প্রয়োজনীয় খাদ্য প্ল্যাংকটন আশঙ্কাজনকভাবে কমে আসছে। এর প্রভাব পড়ছে ইলিশের আকৃতিতেও। ইলিশ দ্রুত বড় হচ্ছে না। আর বড় হওয়ার আগেই জেলেদের জালে ধরা পড়ছে।'
ইলিশের ছোট হয়ে যাওয়ার ভিন্ন কারণ বলছেন চীনের সাংহাই ওশান ইউনিভার্সিটির কলেজ অব ফিশারিজ অ্যান্ড লাইফ সায়েন্সেসের শিক্ষক কিশোর কুমার সরকার। তিনি বলেন, 'গত কয়েক দশকে জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে গড় তাপমাত্রা বেড়েছে। বহু গবেষণায় দেখা গেছে, মাছের আকার-আকৃতির ওপর এর বিরাট প্রভাব রয়েছে। এই প্রভাব পরিযায়ী মাছের মতো অতি সংবেদনশীল মাছ, যারা নদী ও সমুদ্র, উভয় জলাভূমিতেই জীবনচক্রের ধারাবাহিকতা রক্ষায় বিচরণ করে, তাদের ওপরে বেশ ভালো ভাবেই পরার কথা।'
তার ওপর বঙ্গোপসাগরের উজানে নাব্য কমে যাওয়া, বিশেষ করে মাইগ্রেশনের চ্যানেল বা যে রুট ধরে ইলিশ সমুদ্র থেকে নদীতে প্রবেশ করে বা নদী থেকে সমুদ্রে ফেরত যায়, সেই রুটগুলোতে ডুবোচরের সংখ্যা আগের চেয়ে অনেক বেড়ে যাওয়ায় ইলিশের স্বাভাবিক চলাচল মারাত্মক বিঘ্নিত হচ্ছে। আর এতে ইলিশের স্বাভাবিক জীবনচক্র ব্যাহত হচ্ছে।





মন্তব্য
(০)