প্রায় দুই দশক একনাগাড়ে বাড়ার পর বাংলাদেশে ইলিশের উৎপাদন গত তিন বছর ধরে ক্রমাগত কমছে এবং মাছটির গড় ওজনও কমতে শুরু করেছে। গবেষকদের মধ্যে এ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে, আর উৎপাদন বাড়াতে মৎস্য অধিদপ্তরের নেওয়া ছয় বছর মেয়াদি প্রকল্পটি কার্যত ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়েছে।
সংখ্যায় ধারাটি স্পষ্ট। মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী ২০০২-০৩ সময়ে দেশে ইলিশের উৎপাদন ছিল ১ লাখ ৯৯ হাজার মেট্রিক টন এবং এরপর থেকে গড়ে প্রতিবছরই তা বাড়ছিল। ২০২২-২৩ অর্থবছরে উৎপাদন হয়েছিল ৫ লাখ ৭১ হাজার মেট্রিক টন, পরের বছর ২০২৩-২৪ সময়ে ৫ লাখ ২৯ হাজার এবং ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৫ লাখ ৪ হাজার মেট্রিক টন।
মৎস্য অধিদপ্তরের ইলিশসম্পদ উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা প্রকল্পের পরিচালক মোল্লা এমদাদুল্যাহ উৎপাদন কমার বিষয়টি স্বীকার করেছেন। তিনি বিবিসি বাংলাকে বলেন, "প্রজনন মৌসুমে ইলিশ ধরা বন্ধ রাখাসহ কিছু পদক্ষেপ কার্যকর করার কারণে উৎপাদন ক্রমাগত বাড়ছিল। কিন্তু সেটি হোঁচট খেতে শুরু করেছে ২০২২-২৩ অর্থবছর থেকে।" ২০২০ সালে নেওয়া প্রকল্পটির মেয়াদ চলতি জুনে শেষ হওয়ার আগেই নতুন প্রকল্প নেওয়ার প্রস্তুতি চলছে সরকারি পর্যায়ে।
মাছের আকার কমাটিকেই বড় বিপদ বলছেন গবেষকরা। ইলিশ গবেষক ও মৎস্য বিজ্ঞান ইন্সটিটিউটের সাবেক পরিচালক ডঃ আনিসুর রহমান বলছেন, "বড় ইলিশ আসতে শুরু করেছিল। সেখানে কেন হুট করে উৎপাদন ও ওজন কমতে শুরু করলো সেটি চিহ্নিত করা জরুরি। বাজারে ছোট ইলিশ বাড়ছে, বড় ইলিশ কমছে- এটি ইলিশের পপুলেশনের জন্যও বিপজ্জনক।"
দামেই এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি টের পাচ্ছেন ক্রেতারা। গত দুই বছর ধরে ইলিশের দাম বাড়তির দিকে। সম্প্রতি চাঁদপুরের আড়তে ৯০০-৯৫০ গ্রাম ওজনের ইলিশ কেজিপ্রতি প্রায় সাড়ে তিন হাজার টাকায় বিক্রি হওয়ার তথ্য দিয়েছেন একজন ক্রেতা; ঢাকার কারওয়ান বাজারে ৮০০ থেকে ৯০০ গ্রাম ইলিশের কেজিপ্রতি দাম চাওয়া হচ্ছে গড়ে দুই হাজার টাকার বেশি।
খাতটির গুরুত্ব ছোট নয়। বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইন্সটিটিউটের তথ্যানুযায়ী দেশের মোট মৎস্য উৎপাদনের প্রায় ১২ শতাংশ আসে ইলিশ থেকে, আর মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের দাবি অনুযায়ী বিশ্বে উৎপাদিত মোট ইলিশের প্রায় ৭০ থেকে ৮০ শতাংশই বাংলাদেশে হয়।
২০১৮ সালে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানীরা ইলিশের পূর্ণাঙ্গ জীবনরহস্য উন্মোচনের পর আশা করা হয়েছিল, সংরক্ষণ, উৎপাদন ও গুণগত মানে বড় অগ্রগতি আসবে। তার বদলে উৎপাদন কমতে শুরু করায় জেলে ও আড়তদার উভয়েরই হিসাব বদলে যাচ্ছে।
সূত্র: বিবিসি বাংলা





মন্তব্য
(০)