সরকারের দাবি, গুদামে পর্যাপ্ত সার রয়েছে, যা দিয়ে আগামী কয়েক মাসের চাহিদা মেটানো সম্ভব; আমদানির ব্যবস্থাও হয়েছে। তারপরও প্রয়োজনের সময়ে সার পাচ্ছেন না অনেক কৃষক। কোথাও ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়েও খালি হাতে ফিরতে হচ্ছে, কোথাও সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে কিনতে হচ্ছে, আবার কোথাও গুদামে সার নেই বলা হলেও পরে সেই সার অন্যত্র বেশি দামে বিক্রির অভিযোগ উঠছে।
গত এক মাসে দেশের বিভিন্ন এলাকায় কৃষকরা বিক্ষোভ, মানববন্ধন, উপজেলা প্রশাসনের কার্যালয় ঘেরাও ও সড়ক-মহাসড়ক অবরোধ করেছেন। ১০ আগস্ট থেকে ৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ পর্যালোচনা করে দেখা যায়, সারের দাবিতে অন্তত ১৫টি পৃথক কর্মসূচি হয়েছে; সবচেয়ে বেশি ঘটনা কুড়িগ্রাম ও লালমনিরহাটে। কয়েকটি জায়গায় ডিলারের গুদামের দরজা ও বেড়া ভেঙে সার নিয়ে যাওয়ার ঘটনাও ঘটেছে।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশে মোট ১২ লাখ ২২ হাজার টন সার মজুত ছিল— ইউরিয়া চার লাখ ২৭ হাজার, ডিএপি তিন লাখ ৩২ হাজার, এমওপি এক লাখ ১৭ হাজার এবং টিএসপি তিন লাখ ৫২ হাজার টন। অক্টোবর থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত চার ধরনের সারের মোট চাহিদা ধরা হয়েছে ৪০ লাখ ২৯ হাজার টন, বিপরীতে সম্ভাব্য সরবরাহ ৫৩ লাখ ৭১ হাজার টন— অর্থাৎ চাহিদার চেয়ে প্রায় ১৩ লাখ ৪২ হাজার টন বেশি সরবরাহের পরিকল্পনা রয়েছে।
তাহলে সংকট কোথায়। সার বিতরণ ব্যবস্থায় দীর্ঘদিন ধরে ডিলারদের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে অভিযোগ রয়েছে। আগের ব্যবস্থায় একটি ইউনিয়নে একজন প্রধান ডিলারের মাধ্যমে সার বিতরণ হতো; মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট সূত্রের অভিযোগ, কোনো কোনো এলাকায় একই পরিবারের একাধিক সদস্যের নামে ডিলারশিপ নিয়ে ব্যবসা নিয়ন্ত্রণের সুযোগ তৈরি হয়েছিল। বর্তমান সরকার নতুন নীতিমালা করে একটি ইউনিয়নে একাধিক ডিলার ও খুচরা বিক্রেতা রাখার সুযোগ রেখেছে।
কিন্তু এখানেই তৈরি হয়েছে নতুন দ্বন্দ্ব। পুরোনো ডিলারদের একটি অংশ নতুন ব্যবস্থায় একচেটিয়া ব্যবসা কমে যাওয়ার আশঙ্কা করছে বলে অভিযোগ রয়েছে। মন্ত্রণালয়ের দাবি, নীতিমালা বাস্তবায়নে দেরি এবং পুরোনো ডিলারদের একাংশের অসহযোগিতার কারণে কয়েকটি জেলায় বরাদ্দ করা সার পুরোপুরি উত্তোলন হয়নি। এ বিষয়ে ১৫ জেলার কৃষি কর্মকর্তাকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে, চারজন জেলা কৃষি কর্মকর্তাকে প্রত্যাহার ও আরও চারজনকে স্ট্যান্ড রিলিজ করা হয়েছে।
কুড়িগ্রাম অঞ্চলের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক সার ডিলার বলেন, প্রভাবশালী একটি মহল সার বিতরণ ব্যবস্থায় প্রভাব বিস্তার করছে; গুদামে সার আসার পর নির্দিষ্ট সংখ্যক বস্তা ওই মহলকে দিতে হয় এবং পরে তারা বেশি দামে সার বিক্রি করে। কুড়িগ্রামের জেলা প্রশাসক অন্নপূর্ণা দেবনাথ বলেন, গত বছরের তুলনায় এবার বেশি সার দেওয়া হলেও কিছু অসাধু ব্যক্তির কারণে পরিস্থিতি খারাপ হচ্ছে।
কৃষি অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক মোহাম্মদ সাইদুর রহমান মনে করেন, গুদামে সার থাকা আর কৃষকের হাতে সার পৌঁছানো এক বিষয় নয়। তাঁর ভাষায়, কৃষক যদি ডিলারের গুদাম থেকে সার না পেয়ে খোলাবাজারে বেশি দামে কিনতে বাধ্য হন, তাহলে শুধু জাতীয় মজুতের হিসাব দিয়ে সংকটের দায় এড়ানো যায় না।
পরিস্থিতি সামাল দিতে ২৮ আগস্ট থেকে ৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ১০ দিনে সারাদেশে ২০৪টি মোবাইল কোর্ট পরিচালিত হয়েছে; জরিমানা হয়েছে ৩৪ লাখ ৬৮ হাজার ৮২৪ টাকা, উদ্ধার হয়েছে লুট হওয়া প্রায় এক হাজার ৭০০ বস্তা সার, চারজনের কারাদণ্ড ও পাঁচজনের ডিলারশিপ বাতিল হয়েছে। ৬৪ জেলায় একজন করে মনিটরিং কর্মকর্তা এবং চার সদস্যের একটি তদারকি কমিটিও করা হয়েছে। কৃষি সচিব মো. সেলিম খান সমকালকে বলেন, দেশে সারের কোনো সংকট নেই; সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোর পেছনে কৃত্রিম অস্থিরতা তৈরির চেষ্টা রয়েছে।
সূত্র: সমকাল (প্রতিবেদন: জাহিদুর রহমান)





মন্তব্য
(০)