বিশ্বের ৫০০ কোটিরও বেশি মানুষ জীবিকার জন্য কোনো না কোনোভাবে বন ও গাছের ওপর নির্ভরশীল, আর বহু গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর খাদ্যের বড় অংশ আসে বন থেকে। অথচ জাতীয় পরিসংখ্যান কিংবা কৃষিনীতিতে এর প্রায় কিছুই ধরা পড়ে না। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) মঙ্গলবার প্রকাশিত এক বৈশ্বিক প্রতিবেদনে সরকারগুলোকে এই ঘাটতি দূর করার আহ্বান জানিয়েছে।
ল্যান্ডস্কেপ অ্যালায়েন্সের সঙ্গে যৌথভাবে তৈরি প্রতিবেদনটির নাম Forests for food: Nourishing people, sustaining the planet। এতে দেখানো হয়েছে, ক্ষুধা ও দারিদ্র্য কমাতে বনের ভূমিকা কতটা; আর বন ও কৃষিকে আলাদা দুই খাত হিসেবে না দেখে কৃষি-খাদ্যব্যবস্থার নীতিতে বনকে যুক্ত করার সুপারিশ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনের ভূমিকায় এফএওর মহাপরিচালক কু ডংইউ লিখেছেন, “একসঙ্গে কাজ করে এবং জাতীয়, আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক কৌশলে বনকে পুরোপুরি যুক্ত করে আমরা আরও দক্ষ, অন্তর্ভুক্তিমূলক, সহনশীল ও টেকসই কৃষি-খাদ্যব্যবস্থা গড়তে পারি। বন সংরক্ষণ ও টেকসই ব্যবস্থাপনা মানুষের পুষ্টি, পৃথিবীর ভারসাম্য এবং বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কল্যাণের জন্য অপরিহার্য।”
প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, খাদ্য, ওষুধসহ নানা কাজে ৫০ হাজারেরও বেশি বন্য প্রজাতি ব্যবহৃত হয়, যার অন্তত ১০ হাজার সরাসরি খাওয়া হয়। বননির্ভর কিছু জনগোষ্ঠীর দৈনিক আমিষের ৮০ শতাংশ পর্যন্ত আসে বনজ খাদ্য থেকে। বনের ফলে থাকে খনিজ ও ভিটামিন, বাদাম ও বীজে ক্যালরি, তেল ও আমিষ, কন্দ ও মূলে শর্করা; আর বন্য পাতায় থাকে ভিটামিন এ, ক্যালসিয়াম ও আয়রন—যে অণুপুষ্টিগুলোর ঘাটতিই সবচেয়ে বেশি দেখা যায় ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর খাদ্যতালিকায়।
কৃষির ভিত্তিও দাঁড়িয়ে আছে বনের ওপর। বড় শহরগুলোর ৮৫ শতাংশের বেশি বিশুদ্ধ পানি আসে বনাঞ্চলীয় জলাধার থেকে; পানি নিয়ন্ত্রণ, মাটির সুরক্ষা, পুষ্টিচক্র, পরাগায়ন ও পোকা দমনের মাধ্যমে বন ফসল, গবাদিপশু ও মৎস্য খাতকে টিকিয়ে রাখে। অনেক অঞ্চলে গ্রামীণ পরিবারের আয়ের ২০ শতাংশ পর্যন্ত আসে বন থেকে, ফসল মার খেলে যা নিরাপত্তাবেষ্টনীর কাজ করে। এখনো প্রায় ১৮০ কোটি মানুষ রান্নায় কাঠের জ্বালানি ব্যবহার করে এবং ১০০ কোটির বেশি মানুষ বনের ভেষজ ওষুধের ওপর নির্ভরশীল।
ক্ষতির অঙ্কও বড়। গত এক দশকে বিশ্বে প্রতিবছর গড়ে ১ কোটি ৯ লাখ হেক্টর বন হারিয়ে গেছে। প্রতিবেদনটি সতর্ক করেছে, বন উজাড় ও বনের অবক্ষয় জীববৈচিত্র্য কমায়, বাস্তুতন্ত্রের সেবা দুর্বল করে এবং শেষ পর্যন্ত কৃষি উৎপাদনশীলতা কমিয়ে দেয়। জাতিসংঘের সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী ২০২৫ সালে প্রায় ৬৪ কোটি ৫০ লাখ মানুষ দীর্ঘমেয়াদি ক্ষুধার মুখে পড়েছিল।
প্রতিবেদনে ১২টি সুপারিশ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে প্রেক্ষাপট-অনুযায়ী সমন্বিত নীতি গ্রহণ, উৎপাদনব্যবস্থায় বৈচিত্র্য আনা, টেকসই কৃষি ও বন ব্যবস্থাপনায় সরকারি বিনিয়োগ বাড়ানো, বনজ খাদ্যের তথ্যব্যবস্থা গড়া এবং সরকার, নাগরিক সমাজ ও বেসরকারি খাতের অংশীদারিত্ব জোরদার করা। বিশ্ব খাদ্য নিরাপত্তা কমিটির ২০১৭ সালের সুপারিশ কতটা বাস্তবায়িত হয়েছে, তা-ও চীন, ডোমিনিকান প্রজাতন্ত্র, মরক্কো, তুরস্ক ও উরুগুয়ের উদাহরণ দিয়ে পর্যালোচনা করা হয়েছে।
কৃষকের জন্য এর সহজ অর্থ হলো—জমির আশপাশের গাছ কৃষির প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, বরং খাদ্যব্যবস্থার অংশ; দুই ফসলের মাঝের সময়ে ফল, গোখাদ্য, জ্বালানি, মাটির আচ্ছাদন ও আয়ের উৎস। প্রতিবেদনের বক্তব্য স্পষ্ট: গাছকে বাদ দিয়ে কৃষি পরিকল্পনা করলে জমি আসলে কী উৎপাদন করছে, তার পুরোটা কখনোই হিসাবে আসে না।
সূত্র: এফএও নিউজরুম





মন্তব্য
(০)