চাকরির পেছনে না ছুটে ইউটিউব দেখে আগ্রহী হন জাহিদুল মাহমুদ সুমন। সেই আগ্রহ থেকেই সমন্বিত চাষ করে সারা ফেলেছেন তিনি। পিরোজপুরের তরুণ এই কৃষি উদ্যোক্তা প্রায় ৪ শতাধিক পেঁপে গাছ ও মাছ চাষসহ বিভিন্ন ফল উৎপাদনে সফল হয়েছেন। স্থানীয়রা তার সফলতা দেখে আগ্রহী হচ্ছেন সমন্বিত চাষে। সরকারি সহায়তা ও সহজ শর্তে ঋণ পেলে সমন্বিত চাষের পরিধি বাড়ানোর কথা জানান এ তরুণ উদ্যোক্তা।
নিজের মেধা আর শ্রমকে কাজে লাগিয়ে সমন্বিত কৃষিতে অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন জেলার ভান্ডারিয়া উপজেলার রাধানগর এলাকার উদ্যোক্তা জাহিদুল মাহমুদ সুমন। ইউটিউব দেখে উদ্বুদ্ধ হয়ে শুরু করেন এ কৃষি প্রকল্প। তার চোখ ধাঁধানো সফলতা দেখে এখন স্থানীয় অনেক বেকার সমন্বিত কৃষিতে উদ্বুদ্ধ হচ্ছেন।
কৃষি ও মৎস্য উৎপাদনের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা খামারটিতে রয়েছে পেঁপে, আম, বাতাবি লেবু এবং বিভিন্ন প্রজাতির মাছ। মাত্র ৮৮ শতক জমি নিয়ে ২০২২ সালে এই সমন্বিত কৃষি শুরু হয়। তিন বছরের ব্যবধানে সেই উদ্যোগ এখন বিস্তৃত হয়েছে প্রায় ৫ একর জমিতে। যেখান থেকে বছরে উপার্জন করছেন ১০-১৫ লাখ টাকা। এলাকার শিক্ষিত বেকার যুবকদের কাছে সুমনের এ সমন্বিত খামার হয়ে উঠেছে স্বাবলম্বী হওয়ার অনুকরণীয় মডেল।
খামারের প্রধান আকর্ষণ ভারতীয় শাহী জাতের পেঁপে। প্রতিটি পেঁপের ওজন ৩-৪ কেজি পর্যন্ত। বাজারে প্রতি কেজি পেঁপে ৩৫-৫০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। খামারে আছে প্রায় ৪ শতাধিক পেঁপে গাছ। প্রতিটি গাছ থেকেই বছরে গড়ে প্রায় ৩ হাজার টাকার পেঁপে বিক্রি হয়। এ ফসল স্থানীয়দের চাহিদা মিটিয়ে ঢাকা-চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন জায়গায় যাচ্ছে। এ ছাড়া কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হয়েছে এলাকার মানুষের।
শুধু পেঁপে চাষেই সীমাবদ্ধ নয় সুমনের উদ্যোগ। প্রকল্পের আওতায় আছে তিনটি মাছের পুকুর। সেখানে তেলাপিয়া, পাঙাশ, রুই, কাতলা, গুলিশা ও গলদা চিংড়িসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছ চাষ করা হচ্ছে। কৃষি ও মৎস্য উৎপাদনের সমন্বয়ে বাড়ছে লাভের পরিমাণ।
মাছ ও পেঁপের পাশাপাশি খামারে আছে আম ও বাতাবি লেবুর বাগান। খামারটিতে নিয়মিত কাজ করছেন পাঁচজন শ্রমিক। ফলে স্থানীয় পর্যায়ে কর্মসংস্থানের সুযোগও সৃষ্টি হয়েছে। প্রতিদিনই ভান্ডারিয়াসহ আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষ এ সমন্বিত কৃষি প্রকল্প দেখতে আসেন। এত বড় উদ্যোগ গড়ে তুললেও এখন পর্যন্ত কোনো সরকারি অনুদান পাননি সুমন।
তরুণ উদ্যোক্তা জাহিদুল মাহমুদ সুমন বলেন, ‌'আমি মূলত পেঁপে চাষ নিয়ে কাজ করার আগ্রহ প্রকাশ করি। একদিন ইউটিউবে দেখি, বরিশালের বাবুগঞ্জে ভালো একটি পেঁপের বাগান। ইউটিউবে বাগানটি দেখে আমার কাছে অনেক ভালো লাগে। পরে আমি সেই বাগানে যাই এবং বাগান থেকে চারা নিয়ে আসি। চারাগুলো সঠিকভাবে রোপণের চার মাস পরেই ফল আসতে শুরু করেছে।'
তিনি বলেন, 'বর্তমানে আমার পেঁপে বাগানে প্রতি গাছে দেড় থেকে দুই মণ পেঁপে আছে। একটা গাছ ২-৩ বছর থাকে। একটা গাছ থেকে ৫-৬ মণ পেঁপে পাওয়া যায়। এ ছাড়া এখানে বিভিন্ন প্রজাতির মাছ আছে। তেলাপিয়া, হাইব্রিড পাঙাশ, লইট্টা, কোরাল, আইড় বিভিন্ন প্রজাতির মাছ আছে। এ ছাড়া বিভিন্ন প্রজাতির ফলদ গাছও আমি করছি। এখানে চার শতাধিক পেঁপে গাছ আছে।'
জাহিদুল সুমন বলেন, 'আমার বছরে খরচ বাদ দিয়া ১০-১৫ লাখ টাকা প্রফিট আসতে পারে। সরকারের কাছে দাবি থাকবে, যেন আমাকে টেকনিক্যাল সাপোর্ট দেওয়া হয়। আর্থিকভাবে বিনা সুদে যে লোনটা পাওয়া যায়, ওই লোনটা যদি পাই, এখানে আমি বড় আধুনিক কৃষি প্রজেক্ট গড়ে তুলবো। যেখান থেকে মানুষের কর্মসংস্থান হবে।'
সুমনের কৃষি প্রজেক্টের শ্রমিক লিটন শেখ বলেন, 'আমাদের এলাকায় কৃষি প্রজেক্টটি হওয়ায় অনেক ভালো হয়েছে। কারণ এই প্রজেক্ট যখন করেন, আমি তখন থেকে কাজ করি। আমার কাজ হইছে বীজ গাড়া, ক্ষেত দেখা, সার দেওয়া, বেচাকেনা। আগে অনেক জায়গায় অনেক কাজে যাওয়া লাগতো, এখন সে কাজে যাওয়া লাগে না। চিন্তা-ভাবনা করা লাগে না। আমার যা বেতন দেয়, পরিবার সহকারে চলতেছে।'
কৃষি প্রজেক্টের কর্মচারী জয়নাল হাওলাদার বলেন, 'এখানে তিনটা পুকুর আছে, ৪০০ পেঁপে গাছ আছে। এগুলো দেখাশোনা করি। যাবতীয় যা লাগে তাই আমরা করি। এই প্রজেক্টের জন্য ভালো একটি কর্মস্থান হইছে। কর্মস্থলে খুব ভালো লাগে। বাহিরে যাওয়া লাগে না। বাহিরে বেতন কম, এখানে বেতন ভালোই। মোটামুটি চলে।'
ভান্ডারিয়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. জাহিদ মাহমুদ বলেন, 'সুমন একজন তরুণ কৃষি উদ্যোক্তা। তিনি আসলে বর্তমানে তরুণ কৃষকদের কাছে রোল মডেল। তিনি পাঁচ একর জমিতে বাগান করেছেন। এখানে ৪০০ শাহী জাতের পেঁপে রয়েছে। এর পাশাপাশি তিনি বিভিন্ন ধরনের সবজি চাষ করছেন। এখানে মাছ চাষসহ বিভিন্ন জাতের ফলেরও গাছ রয়েছে।'
তিনি বলেন, 'কৃষি বিভাগ শুরু থেকেই তার এ কার্যক্রমে সহযোগিতা করছে। আমরা মাটি তৈরি থেকে শুরু করে ফল আসা পর্যন্ত প্রত্যেকটা মুহূর্তে সহযোগিতা করে যাচ্ছি। সামনেও সকল প্রকার কার্যক্রমে সহযোগিতা করব। বিশেষ করে সামনে তাকে গুড অ্যাগ্রিকালচারাল প্র্যাকটিস প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। এর মাধ্যমে আমরা আশা করি, উৎপাদিত তার পেঁপে বিদেশে রপ্তানি করা সম্ভব হবে।'





মন্তব্য
(০)