বন্যায় ফসলের ক্ষতির পরও এ বছর এখন পর্যন্ত 'সন্তোষজনক' পরিমাণে বোরো ধান-চাল সংগ্রহ করেছে সরকার। এরই মধ্যে ধান সংগ্রহের নির্ধারিত লক্ষ্য ছাড়িয়ে গেছে। সেদ্ধ ও আতপ চাল সংগ্রহও লক্ষ্যমাত্রার প্রায় কাছাকাছি পৌঁছেছে।
ফলে বাকি সময়ে পুরো লক্ষ্যমাত্রা পূরণ, এমনকি তা ছাড়িয়ে যাওয়ারও সম্ভাবনা দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। যদিও ফসলের ক্ষতির কারণে এবার সংগ্রহ লক্ষ্যমাত্রা পূরণ চ্যালেঞ্জিং ছিল।
দেশে সরকারি খাদ্যশস্য মজুতের সবচেয়ে বড় অংশটি আসে বোরো ধান থেকে। ফলে সরকারের এ সফল মজুত দেশের খাদ্য নিরাপত্তাকে আরও জোরদার করবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
তথ্য বলছে, গত মে মাস থেকে চলতি বোরো মৌসুমে ১৮ লাখ টন ধান ও চাল সংগ্রহ কর্মসূচি শুরু করে সরকার। এর মধ্যে ৫ লাখ টন ধান, ১২ লাখ টন সেদ্ধ চাল এবং ১ লাখ টন আতপ সংগ্রহের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল। এ সংগ্রহ অভিযানের আরও প্রায় দুই সপ্তাহ বাকি আছে (৩১ আগস্ট পর্যন্ত)।
খাদ্য অধিদপ্তর বলছে, এর মধ্যে (১৬ আগস্ট পর্যন্ত) ধান সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে গেছে। সংগ্রহ করা হয়েছে ৫ লাখ ৭৮ হাজার ১৪০ টন ধান। এছাড়া সেদ্ধ চাল ১২ লাখ টন লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে সংগ্রহ হয়েছে ১১ লাখ ৯ হাজার ৫৬৯ টন। এক লাখের জায়গায় এ পর্যন্ত আতপ চাল আসে ৯০ হাজার ৫৯৫ টন।
অধিদপ্তরের দাবি, ফসলের ক্ষতির চ্যালেঞ্জের মুখে এবার নানা পদক্ষেপের মাধ্যমে লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে তৎপরতা ছিল। লক্ষ্যমাত্রা পূরণে হাওরে আগেভাগেই ধান-চাল কেনা শুরু করা, কৃষক নিবন্ধনের সময় বাড়ানো, নিয়ন্ত্রণ কক্ষ চালু, গত ঈদের ছুটিতেও মাঠ প্রশাসন সচল রাখা এবং কৃষকদের কাছ থেকে ধান কেনার ক্ষেত্রে নিয়ম শিথিলের পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল।
এবার সরকার প্রতি কেজি ধান ৩৬ টাকা, সেদ্ধ চাল ৪৯ টাকা এবং আতপ চাল ৪৮ টাকা দরে সংগ্রহ করছে।
এ বিষয়ে খাদ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (সংগ্রহ বিভাগ) মো. মনিরুজ্জামান জাগো নিউজকে বলেন, সরকার নির্ধারিত দাম কৃষকদের কাছে লাভজনক হওয়ার পাশাপাশি বেশকিছু উদ্যোগের সুফল মিলেছে এবার বোরো সংগ্রহে।
তিনি বলেন, আমাদের বস্তা ও মজুত সক্ষমতা কম থাকার পরও কৃষকদের ধান ফিরিয়ে দেওয়া হয়নি। কৃষকের বস্তায়ও চাল নেওয়া হয়েছে, যা পরবর্তীতে সরকারি বস্তায় মজুত হয়েছে। এছাড়া অধিক সংগ্রহের কথা বিবেচনা করে জটিল নিয়ম শিথিলের পদক্ষেপও নেওয়া হয়েছিল।
এ কর্মকর্তা বলেন, এবার কৃষকদেরও সরকারের কাছে ধান দেওয়ার আগ্রহ ছিল। বিশেষ করে কৃষকের নিজস্ব অ্যাকাউন্টে ধান-চালের দাম পরিশোধ করায় প্রকৃত কৃষকরা সুফল পেয়েছেন।
এ সরকার চালের সংগ্রহ কার্যক্রমে সফল হয়েছে-এটা ভালো। পাশাপাশি এখন চালের মজুতও ভালো রেখেছে। সবমিলে দেশের খাদ্যনিরাপত্তা এখন একটি স্বস্তিদায়ক পর্যায়ে রয়েছে।- কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলম খান
খাদ্য বিভাগ বলছে, সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে এটি অন্যতম বড় সংগ্রহ কর্মসূচি। এর আগে অধিকাংশ সময় বোরো সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হয়নি। যে কারণে আমদানি নির্ভরতা বেড়েছিল বেশ কয়েক বছর।
এবার সংগ্রহ অভিযানের শুরুতেই বন্যায় হাওরের প্রায় ৪৯ হাজার হেক্টর জমির ধান ক্ষতিগ্রস্ত হয়, এ ক্ষতির পরিমাণ চালের হিসাবে দাঁড়ায় প্রায় ২ লাখ ১৪ হাজার টন, যা বোরো মৌসুমের মোট উৎপাদনের ১ শতাংশের মতো। এরপর হাওরের বাইরেও দেশের বিভিন্ন এলাকায়ও অতিবৃষ্টির কারণে ধানের ক্ষতি হয়।
সে সময় হাওরাঞ্চলের কৃষকদের সহায়তা দিতে সরকার পূর্বনির্ধারিত সময়সূচি পরিবর্তন করে বিশেষ উদ্যোগ নেয়। মূল পরিকল্পনা অনুযায়ী চাল সংগ্রহ ১৫ মে শুরু হওয়ার কথা থাকলেও ক্ষতিগ্রস্ত ছয় জেলায় ধান ও চাল সংগ্রহ একসঙ্গে ৩ মে থেকেই শুরু হয়।
খাদ্য বিভাগের মতে, ওই সিদ্ধান্তে কৃষকরা দ্রুত ধান ও চাল বিক্রির সুযোগ পেয়েছেন।
এসব বিষয়ে কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলম খান জাগো নিউজকে বলেন, এ সরকার চালের সংগ্রহ কার্যক্রমে সফল হয়েছে-এটা ভালো। পাশাপাশি এখন চালের মজুতও ভালো রেখেছে। সবমিলে দেশের খাদ্যনিরাপত্তা এখন একটি স্বস্তিদায়ক পর্যায়ে রয়েছে।
এদিকে সরকারি হিসাব অনুযায়ী এখন দেশে সর্বোচ্চ খাদ্যশস্য মজুত রয়েছে। এখন সরকারি গুদামে মোট খাদ্যশস্যের মজুত দাঁড়িয়েছে ২৪ লাখ ২ হাজার ৪২০ টন। এর মধ্যে চাল রয়েছে ২০ লাখ ৮১ হাজার ৬৯ টন, গম ২ লাখ ৪৯ হাজার ৫৩৫ টন এবং ধান ১ লাখ ১০ হাজার ৪৮৭ টন।
এনএইচ/এমআইএইচএস/





মন্তব্য
(০)