টানা ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে চট্টগ্রামের বন্যা পরিস্থিতির অবনতি ঘটেছে। বন্যায় শুধু জনজীবনই নয়, কৃষি ও মৎস্য খাতেও নেমে এসেছে বড় ধরনের বিপর্যয়। প্রায় ২০ লাখ মানুষ পানিবন্দি থাকার পাশাপাশি জেলার প্রায় ১০ হাজার পুকুর-ঘের এবং ১৪ হাজার হেক্টরের বেশি কৃষিজমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। প্রাথমিক হিসাবে মাছ ও ফসলে শত কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা করা হচ্ছে। ক্ষয়ক্ষতির চূড়ান্ত হিসাব নিতে এবং ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক ও মৎস্যচাষিদের পুনর্বাসনের প্রস্তুতি শুরু করেছে সংশ্লিষ্ট বিভাগ।
জেলা মৎস্য অফিস সূত্রে জানা যায়, বন্যায় চট্টগ্রামের ১৫টি উপজেলার ১৫৩টি ইউনিয়নের ৯ হাজার ৯৩৩টি পুকুর ও দিঘি এবং ৩২০টি চিংড়ি ঘের ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে প্রায় ৪ হাজার ১০০ হেক্টর জলাশয়ের মাছচাষ ক্ষতির মুখে পড়েছে।
চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলায় পাহাড়ি ঢলে ডুবে গেছে ঘরবাড়ি
সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে বাঁশখালী ও সাতকানিয়া উপজেলায়। বাঁশখালীতে প্রায় আড়াই হাজার পুকুর এবং ৩১০টি চিংড়ি ঘের তলিয়ে গেছে। পুরো উপজেলায় প্রায় ৪১ কোটি ৫০ লাখ টাকা মাছ বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে। সাতকানিয়ায় ৪৬৬ হেক্টর পুকুর ও দিঘির প্রায় ১০ কোটি ৭৫ লাখ টাকার মাছ পানিতে ভেসে গেছে।
এ ছাড়া লোহাগাড়ায় ১ হাজার ৬২০টি পুকুরে প্রায় সাড়ে ৮ কোটি টাকা, কর্ণফুলীতে ৫৫৭টি পুকুর ও দিঘিতে প্রায় ৬ কোটি টাকা, চন্দনাইশে ৩৮৩টি পুকুর ও দিঘিতে প্রায় ৫ কোটি ৯৪ লাখ টাকা, বোয়ালখালীতে ৭৫৬টি পুকুর ও দিঘিতে প্রায় সাড়ে ৪ কোটি টাকা, পটিয়ায় ১ হাজার ৪৩৫টি পুকুর ও দিঘিতে প্রায় ৩ কোটি ৬৮ লাখ টাকা, ফটিকছড়িতে ৫৩৩টি পুকুরে প্রায় ২ কোটি ৭০ লাখ টাকা এবং আনোয়ারায় প্রায় ১ হাজার ১০০টি পুকুর ও ১০টি চিংড়ি ঘেরে প্রায় দেড় কোটি টাকার মাছের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
জেলা মৎস্য কর্মকর্তা সালমা বেগম জাগো নিউজকে বলেন, 'চট্টগ্রামে এবার স্মরণকালের বড় বন্যা হয়েছে। বিশেষ করে দক্ষিণ চট্টগ্রামের উপজেলাগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অতিবর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে এখনো সাতকানিয়া ও বাঁশখালীর অধিকাংশ এলাকার মানুষ পানিবন্দি।'
সালমা বেগম বলেন, 'জেলার ১৫টি উপজেলার প্রায় সব এলাকাতেই কমবেশি পুকুর, দিঘি ও চিংড়ি ঘের বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। প্রাথমিক হিসাবে ১০ হাজারের বেশি পুকুর, দিঘি ও ঘের ক্ষতির মুখে পড়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে বাঁশখালী উপজেলায়। এখন পর্যন্ত পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, বন্যার পানিতে ৯০ কোটিরও বেশি টাকার বেশি মাছ পানিতে তলিয়ে গেছে।'
তিনি বলেন 'বন্যা পরবর্তী সময়ে মৎস্য চাষিদের পাশে দাঁড়াতে জেলা মৎস্য অফিস থেকে পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এ জন্য প্রাথমিকভাবে মৎস্য অধিদপ্তরে ক্ষয়ক্ষতির প্রতিবেদন পাঠানো হয়েছে।'
অন্যদিকে জেলা কৃষি অফিসের তথ্য অনুযায়ী, বন্যা ও জলাবদ্ধতায় চট্টগ্রামের সব উপজেলাতেই কমবেশি কৃষিজমির ক্ষতি হয়েছে। প্রাথমিক হিসাবে জেলার ৮ হাজার ৭৬৮ হেক্টর আউশ ধানের আবাদ, ৬৫২ হেক্টর আমনের বীজতলা এবং ৪ হাজার ৯০৭ হেক্টর গ্রীষ্মকালীন সবজিক্ষেত ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে বাঁশখালী, চন্দনাইশ, সীতাকুণ্ড, সন্দ্বীপ ও সাতকানিয়া উপজেলায়। আউশ ধানের মধ্যে বাঁশখালীতে দুই হাজার ১৫০ হেক্টর, চন্দনাইশে দুই হাজার ১২০ হেক্টর, সীতাকুণ্ডে এক হাজার ৫০০ হেক্টর এবং সন্দ্বীপে এক হাজার হেক্টর জমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
অন্যদিকে, গ্রীষ্মকালীন সবজির ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে চন্দনাইশে ৮৩০ হেক্টর জমিতে। এছাড়া সীতাকুণ্ডে ৭০০ হেক্টর, সন্দ্বীপে ৬০০ হেক্টর, ফটিকছড়িতে ৪৭৫ হেক্টর, সাতকানিয়ায় ৪৬০ হেক্টর, পটিয়ায় ৪৫৫ হেক্টর, বাঁশখালীতে ৪০০ হেক্টর এবং রাউজানে ৩১০ হেক্টর জমির সবজি আবাদ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
জেলা কৃষি কর্মকর্তা আপ্রু মারমা জাগো নিউজকে বলেন, 'বন্যা ও পাহাড়ি ঢলে চট্টগ্রামের কয়েকটি উপজেলা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে সীতাকুণ্ড, বাঁশখালী, চন্দনাইশ ও সন্দ্বীপে আউশ ধানের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। বিশেষ করে চন্দনাইশে আউশ ধান ও গ্রীষ্মকালীন সবজির অধিকাংশ জমিই পানিতে তলিয়ে গেছে।'
তিনি বলেন, 'বন্যায় কৃষি খাতই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আমরা প্রাথমিকভাবে ক্ষয়ক্ষতির একটি হিসাব করেছি। পানি পুরোপুরি নেমে গেলে চূড়ান্ত প্রতিবেদন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে। সেখানে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক এবং জমির পরিমাণ উল্লেখ থাকবে।'
এমডিআইএইচ/এমএএইচ/





মন্তব্য
(০)