বাংলাদেশের গ্রামজীবনে খুব পরিচিত প্রাণী খেঁকশিয়াল, ইংরেজিতে যাকে বলা হয় বেঙ্গল ফক্স, এখন বিলুপ্তির ঝুঁকিতে পড়েছে বলে জানাচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। প্রকৃতি সংরক্ষণ বিষয়ক আন্তর্জাতিক সংস্থা আইইউসিএন জানিয়েছে, বর্তমানে সংকটাপন্ন শ্রেণিতে থাকা এই প্রাণী সংস্থাটির চলমান নতুন মূল্যায়নে বিপন্ন শ্রেণিতে চলে যেতে পারে।
কারণ হিসেবে সবচেয়ে আগে আসছে আবাসস্থল। যত দিন যাচ্ছে, খেঁকশিয়ালের থাকার জায়গা তত কমছে। আইইউসিএনের তথ্য অনুযায়ী এরা সাধারণত খোলা তৃণভূমি, চরাঞ্চল ও ঝোপঝাড়যুক্ত এলাকায় থাকে, আর বন থেকে কৃষিজমি হয়ে মানুষের বসতির কাছাকাছি পর্যন্ত বিভিন্ন পরিবেশে মানিয়ে নিতে পারে।
কৃষকের হিসাবে এই প্রাণীর মূল্য কম নয়। মৃত প্রাণী খেয়ে পরিবেশ পরিষ্কার রাখা, ইঁদুরসহ ছোট প্রাণীর সংখ্যা নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং খাদ্যশৃঙ্খলের ভারসাম্য ধরে রাখতে খেঁকশিয়াল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ইঁদুর ধানখেতের অন্যতম বড় শত্রু, ফলে খেঁকশিয়ালের সংখ্যা কমা কেবল একটি প্রাণীর হারিয়ে যাওয়ার গল্প নয় — পরিবেশবিদেরা একে পুরো বাস্তুতন্ত্রের জন্য সতর্কবার্তা বলছেন।
প্রাণীটিকে ঘিরে ভুল পরিচয়ের সমস্যাও আছে। অনেকে খেঁকশিয়াল আর পাতিশিয়ালকে একই প্রাণী মনে করেন, কারণ বাংলায় 'শিয়াল' শব্দটি সব ধরনের ফক্সের ক্ষেত্রেই ব্যবহৃত হয়। কিন্তু খেঁকশিয়াল বলতে বোঝায় বেঙ্গল ফক্স প্রজাতিকে, যার বৈজ্ঞানিক নাম ভালপিস বেঙ্গালেনসিস। গ্রামাঞ্চলে যাকে সাধারণভাবে 'শিয়াল' বলা হয়, সেটি অনেক ক্ষেত্রেই পাতিশিয়াল বা গোল্ডেন জ্যাকাল, বৈজ্ঞানিক নাম ক্যানিস অরিয়াস।
দুটিই ক্যানিডি পরিবারের সদস্য হলেও এরা ভিন্ন গণের — একটি ভালপিস, অন্যটি ক্যানিস। খেঁকশিয়াল আকারে ছোট, শরীর হালকা, কান বড় ও লম্বা, মুখ সরু, লেজ ঘন ও ঝুঁটিওয়ালা এবং লেজের ডগা কালো। পাতিশিয়াল আকারে বড়, পা লম্বা, মুখ মোটা, দেখতে অনেকটা বুনো কুকুরের মতো এবং লেজ তুলনামূলক ছোট।
বাসস্থানের ধরনেও পার্থক্য আছে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আব্দুল আজিজ বিবিসি বাংলাকে বলেন, "এরা প্রধানত গুহাবাসী। নেটওয়ার্কভিত্তিক গুহায় থাকে, মানে মাটির নিচে অনেকগুলো টানেল তৈরি করে।" পাতিশিয়াল সাধারণত একটি সাধারণ গর্ত খুঁড়েই থাকে, বলছিলেন তিনি।
লোকবিশ্বাসে শিয়াল কখনো ধূর্ত চরিত্র, কখনো অমঙ্গলের প্রতীক, কখনো গৃহপালিত পশুপাখি খেয়ে ফেলার দায়ে অভিযুক্ত। কিন্তু চরাঞ্চল ও তৃণভূমি সংকুচিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সেই পরিচিত ডাকও গ্রাম থেকে মিলিয়ে যাচ্ছে।
সূত্র: বিবিসি বাংলা





মন্তব্য
(০)