উত্তরাঞ্চলের এক ছোট বাজার শহরে ভোর হওয়ার আগেই দোকান খোলেন মেহেদী। বীজ আর ফসল সুরক্ষার পণ্য সাজিয়ে রাখেন তাকে—রোদ চড়ার আগেই আশপাশের গ্রাম থেকে কৃষকেরা আসতে শুরু করবেন। পাঁচ বছর আগে তিনি ছিলেন সদ্য স্নাতক এক তরুণ; ডিগ্রি ছিল, উচ্চাকাঙ্ক্ষা ছিল, কিন্তু সামনে স্পষ্ট কোনো পথ ছিল না। আজ পাঁচ গ্রামের ৫০০-র বেশি কৃষককে সেবা দেন তিনি।
যে কর্মসূচি তাঁকে প্রশিক্ষণ দিয়েছে, তার ভাষায় মেহেদী একজন ‘এগ্রি-উদ্যোক্তা’। তবে যেসব কৃষক তাঁর ওপর নির্ভর করেন, তাঁদের কাছে পরিচয়টা আরও সহজ—ফসল নেতিয়ে পড়লে যাকে ডাকা হয়। তিনি কেবল উপকরণ বিক্রি করেন না; সমস্যা শনাক্ত করেন, পরামর্শ দেন, পরে খোঁজ নেন।
বাংলাদেশের গ্রামীণ অর্থনীতির মেরুদণ্ড এখনো কৃষি—দেশের মোট শ্রমশক্তির প্রায় ৪০ শতাংশ এ খাতে যুক্ত। বদ্বীপজুড়ে ছোট ছোট জমিতে চাষ করা লাখ লাখ নারী-পুরুষের জীবন বরাবরই আশা আর অনিশ্চয়তার মাঝামাঝি। অনিয়মিত বৃষ্টি, বন্যা, লবণাক্ততার অনুপ্রবেশ আর বাড়তে থাকা তাপমাত্রা কৃষি পঞ্জিকাকে অনির্ভরযোগ্য করে তুলেছে; যে ফসল একসময় চেনা ঋতুচক্রে ভালো হতো, এখন তাকে এমন পরিস্থিতির মুখে পড়তে হচ্ছে যার জন্য চাষিরা প্রশিক্ষিত নন।
নির্ভরযোগ্য পরামর্শ না পেয়ে অনেক কৃষক ভরসা করতেন অনানুষ্ঠানিক ডিলারদের ওপর। নারী কৃষকেরা এই ঘাটতি টের পেয়েছেন সবচেয়ে বেশি—জনপরিসর, সম্প্রসারণ সেবা ও বাজারে প্রবেশাধিকার কম থাকায় নতুন তথ্য তাঁদের কাছে পৌঁছাত সবার শেষে, আর ক্ষতির ভার বইতে হতো সবার আগে।
‘বেটার লাইফ ফার্মিং’ একটি লাস্ট-মাইল উদ্যোগ, যেখানে একসঙ্গে কাজ করছে বায়ার, নেটাফিম, ইয়ারা এবং বিশ্বব্যাংক গ্রুপের বেসরকারি খাতের প্রতিষ্ঠান আন্তর্জাতিক অর্থ কর্পোরেশন (আইএফসি)। বাংলাদেশে এর মডেল হলো গ্রামীণ এগ্রি-উদ্যোক্তাদের একটি নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা ও পেশাদার করে তোলা, যাঁরা ওয়ান-স্টপ কেন্দ্র চালিয়ে সামনের সারির পরামর্শদাতা ও সেবাদাতা হিসেবে কাজ করেন।
এই কেন্দ্রগুলো যাঁরা চালান, তাঁরা সরকারি সম্প্রসারণ কর্মীও নন, কোনো কোম্পানির এজেন্টও নন। তাঁরা প্রতিবেশী—প্রশিক্ষিত এবং বিশ্বস্ত; আর সে কারণেই পরামর্শটা কাজে লাগে। একজন সম্প্রসারণ কর্মকর্তা গ্রামে আসেন কালেভদ্রে, কিন্তু কেন্দ্রটি খোলা থাকে প্রতিদিন, একই জায়গায়, পরিচিত একজন মানুষের হাতে।
যে দেশে তরুণদের বেকারত্ব বড় বোঝা এবং কৃষিকে প্রায়ই ‘ছেড়ে আসা কাজ’ বলে ধরা হয়, সেখানে দ্বিতীয় ফলটিও প্রথমটির মতোই গুরুত্বপূর্ণ। মেহেদী পেয়েছেন একটি স্থায়ী জীবিকা, আর প্রমাণ পেয়েছেন—কাজ বলতে কী বোঝায় তা নতুন করে ভাবতে রাজি তরুণদের জন্য কৃষি সত্যিই একটি পেশা হতে পারে।
সূত্র: বিশ্বব্যাংক





মন্তব্য
(০)