সংরক্ষণ সময় কম হওয়ায় দেশে উৎপাদিত আমের ৩০ শতাংশই নষ্ট হয়। এজন্য ফলটির বিদেশে চাহিদা থাকা সত্ত্বেও কাঙ্ক্ষিত হারে রাপ্তানি করা যাচ্ছে না। সমস্যা সমাধানে এবার গরম পানিতে শোধনের মাধ্যমে আমের সংরক্ষণ ক্ষমতা বাড়িয়ে তা রপ্তানি উপযোগী করার প্রকল্প নিচ্ছে সরকার।
এছাড়া অনেক সময় সবজিও স্বাস্থ্যসম্মতভাবে রপ্তানি করা যায় না। আর তাই 'আম ও অন্যান্য সতেজ কৃষিপণ্য রপ্তানি বৃদ্ধিতে বাষ্প তাপ প্রয়োগ প্ল্যান্ট প্রকল্প' নেওয়া হচ্ছে। এরই মধ্যে প্রকল্পটি অনুমোদন দেওয়া হয়েছে বলে জানান পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান।
প্রকল্পের ব্যয় ২৭ কোটি ৬ লাখ টাকা হওয়ায় মন্ত্রী নিজ ক্ষমতাবলে এটা অনুমোদন করেছেন। জুলাই ২০২২ থেকে জুন ২০২৫ মেয়াদে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন (বিএডিসি)।
পরিকল্পনামন্ত্রী বলেন, আমরা সঠিকভাবে আম সংরক্ষণ করতে পারি না। অনেক সময় ৩০ শতাংশ নষ্ট করে ফেলি। এছাড়া যেভাবে আমরা আম সংরক্ষণ করি, এর ফলে বিদেশের অনেক মার্কেটে আমাদের আম ঢুকতে পারে না। গাবতলীতে একটা বাষ্প তাপ প্রয়োগ প্ল্যান্ট করে দেবো। এর মাধ্যমে আমসহ সতেজ সবজি বিদেশে বাধাহীনভাবে রপ্তানি করা যাবে।
বিএডিসি জানায়, বাংলাদেশ বিশ্বের প্রধান ১০টি আম উৎপাদনকারী দেশের মধ্যে অষ্টম স্থানে থাকলেও আম রপ্তানিকারক দেশ হিসেবে আমরা কোনো অবস্থানে নেই। আম একটি পচনশীল ফল হওয়ায় শুধু প্রক্রিয়াজাতকরণের অভাবে রপ্তানি কাঙ্খিত পর্যায়ে পৌঁছানো সম্ভব হয় না।
এছাড়া আমের মধ্যে রোগজীবাণু, পোকামাকড়, হেভিমেটাল ও দাগ থাকায় বিদেশিদের কাছে আমাদের আমের গ্রহণযোগ্যতাও কম। আম প্রক্রিয়াজাতকরণ প্রযুক্তি না থাকায় ফলটিকে উজ্জ্বল, দীর্ঘস্থায়ী করার পাশাপাশি বিভিন্ন জীবাণু, পোকামাকড় ও মাছিমুক্ত করা যায় না। ফলে ফাইটোস্যানিটারী সার্টিফিকেট পেতে বিড়ম্বনার শিকার হতে হয়।
দেশের বাজারজাতকারীরা আম পাকানো ও সংরক্ষণকালে ক্ষতিকর রাসায়নিক ব্যবহার করে। এটি স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। আর সেটি প্রতিরোধে একটি অটো কনভেয়ার প্যাকেজিং লাইন নির্মাণের মাধ্যমে বাজারজাতকরণ ব্যবস্থার উন্নয়ন করা হবে।
এ প্রকল্পের আওতায় গুণগত মানসম্পন্ন ১০ হাজার মেট্রিক টন আমের বিভিন্ন ছত্রাক, ব্যাকটেরিয়া ও পোকার ডিম এবং শুককীট মুক্ত করা হবে। এছাড়া গুণগত মানসম্পন্ন ২৫ হাজার মেট্রিক টন সবজি ও সতেজ কৃষিজাত পণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ করা হবে।
আম রপ্তানি বৃদ্ধির লক্ষ্যে দ্রুত পচন রোধ করে সেলফ্ লাইফ বৃদ্ধি ও ফাইটোস্যানিটারী সার্টিফিকেটপ্রাপ্তি সহজীকরণের লক্ষ্যে পাইলট কার্যক্রম হিসেবে ঢাকার গাবতলীতে একটি বাষ্প তাপ প্রয়োগ প্রযুক্তি সুবিধাসম্পন্ন প্লান্ট স্থাপনের জন্য প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হবে।
প্রকল্পের উদ্দেশ্য: ঢাকা জেলার গাবতলীতে বাষ্প তাপ প্রয়োগ প্রযুক্তি স্থাপনের জন্য ২০২৩ সালের মধ্যে একটি প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্র স্থাপন। আর ২০২৫ সালের মধ্যে আম ও অন্যান্য কৃষিজাত পণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ সুবিধার উন্নয়নের মাধ্যমে রপ্তানি বৃদ্ধিকরণ।
প্রকল্পের প্রধান কার্যক্রম: দুই হাজার ৫০০ বর্গমিটার আয়তনের একটি প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্র নির্মাণ করা হবে। একটি বাষ্প তাপ প্রয়োগ প্রযুক্তি মেশিন ও একটি অটো কনভেয়ার প্যাকেজিং লাইন মেশিন স্থাপনা প্রক্রিয়াজাতকরণ প্ল্যান্টের জন্য বিদ্যুৎ সাবস্টেশন স্থাপন করা হবে। এছাড়া রপ্তানিকারক, উদ্যোক্তা, মেকানিক ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা কর্মচারীদের জন্য সংশ্লিষ্ট বিষয়ে স্থানীয় প্রশিক্ষণ আয়োজন করা হবে।
কৃষি সার্ভিসের তথ্যমতে, দেশে বর্তমানে বছরে ২৮ হাজার হেক্টর জমিতে নয় লাখ টন আম উৎপাদন হয়। কিন্তু তা থেকে রপ্তানি হয় অতি সামান্য, যা মাত্র এক হাজার টনের মতো। রপ্তানির প্রধান সমস্যা হচ্ছে, আম পাকানো ও সংরক্ষণকাল বৃদ্ধিতে ক্ষতিকর রাসায়নিক বস্তুর ব্যবহার, সংগ্রহোত্তর ব্যবস্থাপনা (সন্তোষজনক প্যাকেজিং ও পরিবহন ব্যবস্থা না থাকা, কৃষকদের রপ্তানি মান সম্পর্কে জ্ঞান না থাকা ইত্যাদি)।
প্রকল্প প্রস্তাবে বলা হয়, দেশে যথেষ্ট আম উৎপাদন হলেও উপযুক্ত প্রক্রিয়াজাতকরণ ও সংরক্ষণ ব্যবস্থার অভাবে প্রচুর আম নষ্ট হয়, যা মোট উৎপাদনের প্রায় ৩০ শতাংশ। আবার সংগ্রহ মৌসুমে আর্দ্রতা ও তাপমাত্রার কারণে আমের সংরক্ষণ সময় কম থাকে যার কারণে দ্রুত পচে যায়। আমের মৌসুমের সময় কম এবং শোধন ব্যবস্থা অপ্রতুল হওয়ায় এমনটি হয়ে থাকে।
তবে গরম পানিতে শোধন করলে আমের সংরক্ষণ ক্ষমতা বাড়বে এবং আমে থাকা রোগ-বালাই ও জীবাণুও নষ্ট হবে। একই সঙ্গে সংরক্ষণ ব্যবস্থাও আন্তর্জাতিক পর্যায়ের হবে, যা আমের রপ্তানি উপযোগিতা বাড়াবে। এর মাধ্যমে আধুনিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে আমের সংগ্রহোত্তর অপচয় ১০ শতাংশ হ্রাস পাবে। একই সঙ্গে গুণগত মান নিশ্চিতকরণ ও বিপণন দক্ষতা বৃদ্ধির মাধ্যমে আমের রপ্তানি বাজার সম্প্রসারিত হবে।
এমওএস/এমপি/এএসএম





মন্তব্য
(০)