২০২৬ সালের ১৯ জুলাই জাগো নিউজ ২৪-এর কৃষি ও প্রকৃতি বিভাগে প্রকাশিত হয় গণ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী তাহমিদ হাসানের একটি ছোট আলোকচিত্র-রচনা। গণ বিশ্ববিদ্যালয় সাভারের একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, যা অলাভজনক প্রতিষ্ঠান গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করেছে। লেখাটির বিষয় ছিল লেখকের বাসার ঠিক পেছনের একটি অবহেলিত পুকুরে সংসার পাতা একঝাঁক ডাহুক। পুকুরের পানির ওপর পুরু হয়ে জমেছিল শ্যাওলা আর কলমিলতা, সবুজ গালিচার মতো যা ছড়িয়ে ছিল পাড় পর্যন্ত। সেই গাছগাছালির ফাঁকে আর পাড়ের ঝোপের আড়ালে পাখিগুলো দিনভর টুকটাক শব্দ করে ঘুরে বেড়াত, ছানাদের নিয়ে হাঁটত জলাশয়ের কিনারা ধরে। লেখার সঙ্গের ছবিগুলো লেখকের সৌজন্যে পাওয়া। লেখক পাখিটির যে বর্ণনা দিয়েছেন, অর্থাৎ শরীরের ওপরটা কালচে ধূসর, বুক আর মুখ সাদা, লেজের নিচে লালচে আভা, তা মেলে ধলাবুক ডাহুকের (Amaurornis phoenicurus) সঙ্গে। আইইউসিএন ২০১৫ সালে প্রকাশিত বাংলাদেশের লাল তালিকায় এই পাখির স্থানীয় নাম লিখেছে ডাহুক ও ধলাবুক ডাহুক।
পাখিদের হাতে ছেড়ে দেওয়া এক পুকুর
লেখাটি অনুযায়ী, বিস্তৃত শ্যাওলা ছাড়া পুকুরটি বহুদিন কারও ব্যবহারে আসতে দেখা যায়নি। লেখকের মূল কথা ছিল, মানুষের অযত্নে যে জলাশয় অকেজো হয়ে পড়ে থাকে, তা আসলে খালি থাকে না; সেখানেই জমে ওঠে আরেক জীবনের সংসার। কলমিলতার ফাঁকে ফাঁকে আর ঝোপের আড়ালে, কারও চোখে পড়ুক বা না পড়ুক, ডাহুকেরা সেখানেই বাস করছিল। লেখকের ভাষায়, অনাদরে কিংবা খুব আদরেই বাড়ছিল ডাহুকের সংসার।
তিনি লিখেছিলেন, ডাহুক বাংলার অতি পরিচিত নাম, অথচ পাখিটিকে চোখে দেখার সুযোগ পান কম মানুষই। রাতের বেলা বা বর্ষার ভোরে দূর থেকে ভেসে আসা তীক্ষ্ণ, খানিকটা কর্কশ ডাক শুনেই বেশির ভাগ মানুষ ডাহুককে চেনেন। না চাইতেই এই অস্থায়ী বাসিন্দার দেখা পেয়ে লেখক নিজেকে ভাগ্যবান মনে করেছিলেন, আর মুগ্ধ হয়েছিলেন তার রঙের বৈপরীত্যে: শরীরের ওপরটা কালচে ধূসর, বুক আর মুখ সাদা, লেজের নিচটায় লালচে আভা।
তাঁকে সবচেয়ে বেশি অবাক করেছিল জায়গাটি। যে পাখিকে তিনি চিনতেন গ্রামের ডোবা-পুকুর, ধানখেতের আল আর বাঁশঝাড়ের কিনারের বাসিন্দা হিসেবে, সেই পাখি বাস করছিল তাঁর ভাষায় এক বিষাক্ত নগরের কোলে, পরিত্যক্ত কালো জলের জলাশয়ের ঝোপের ভেতর, আর ছানাদের নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছিল পুকুরের কিনারা ধরে। লেখক এ প্রশ্নও তুলেছিলেন যে এই শহরে ডাহুক হয়তো পরিযায়ী। লেখায় শহরের নাম বা পুকুরের সঠিক অবস্থান উল্লেখ নেই, এই প্রতিবেদনেও তা যোগ করা হয়নি।
ধলাবুক ডাহুক চেনার উপায়
ধলাবুক ডাহুক রেল ও ক্রেক জাতীয় পাখির পরিবার রালিডির (Rallidae) একটি জলচর পাখি, দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াজুড়ে যার বিস্তৃত বিচরণ। ওয়েলসের প্রকৃতিবিদ টমাস পেনান্ট ১৭৬৯ সালে প্রজাতিটির বর্ণনা দেন। প্রজাতিটির বিশ্বকোষ নিবন্ধে উদ্ধৃত পক্ষীবিজ্ঞানের গ্রন্থ, যেমন রাসমুসেন ও অ্যান্ডারটনের বার্ডস অব সাউথ এশিয়া (২০০৫) এবং সালিম আলী ও রিপলির হ্যান্ডবুক অব দ্য বার্ডস অব ইন্ডিয়া অ্যান্ড পাকিস্তান (১৯৮০), অনুযায়ী প্রাপ্তবয়স্ক পাখির পিঠ ও দুই পাশ মূলত গাঢ় ধূসর, আর মুখ, গলা ও বুক সাদা। পেটের নিচের অংশ ও লেজের নিচটা দারুচিনি রঙের বা সাদা; লেখক যে লালচে আভা দেখেছিলেন, সেটি এই রং। পাখিটি প্রায় ৩২ সেন্টিমিটার লম্বা, পায়ের আঙুল লম্বা, লেজ খাটো, ঠোঁট ও পা হলুদ। শরীর দুই পাশ থেকে চাপা, ফলে নলখাগড়া ও ঝোপের ফাঁক দিয়ে সহজে চলাচল করতে পারে।
স্ত্রী ও পুরুষ পাখি দেখতে একই রকম, তবে স্ত্রী পাখি সামান্য ছোট। অপ্রাপ্তবয়স্ক পাখি প্রাপ্তবয়স্কের তুলনায় অনেক বেশি মলিন, আর তুলতুলে পালকের ছানারা কালো, যেমনটা সব রেল জাতীয় পাখির ক্ষেত্রেই দেখা যায়। আইইউসিএন বাংলাদেশের মূল্যায়নে বলা হয়েছে, প্রজাতিটির জানা চারটি উপপ্রজাতির মধ্যে বাংলাদেশে পাওয়া যায় মূল উপপ্রজাতি Amaurornis phoenicurus phoenicurus; সূত্র হিসেবে সেখানে ইসলাম ও চাকমার (২০০৮) কাজ উল্লেখ করা হয়েছে।
বিচরণ এলাকাজুড়ে পাখিটির নানা স্থানীয় নাম আছে। কিছু নাম তার ডাক অনুকরণ করে তৈরি, যেমন মালয় ভাষায় রুয়াক-রুয়াক আর সিংহলি ভাষায় কোরাওয়াক্কা। আবার কিছু নাম সে রকম নয়: বুসেরোস সাময়িকীতে ১৯৯৮ সালে প্রকাশিত পাখির আঞ্চলিক নামের এক সংকলন অনুযায়ী বাংলাদেশ ও ভারতের বাংলাভাষী অঞ্চলে পাখিটির নাম ডাহুক, অসমিয়ায় ডাউক আর ওড়িয়ায় ডাহুকা।
রেল জাতীয় অনেক পাখি খুব লাজুক ও আড়ালপ্রিয় হলেও ধলাবুক ডাহুক বেশির ভাগের চেয়ে সাহসী। প্রায়ই একে খোলা জায়গায় দেখা যায়, লেজ খাড়া করে ধীরে ধীরে পা ফেলে হাঁটে, হাঁটার সময় লেজ ঝাঁকায়; খোলা জলাভূমিতে, এমনকি ব্যস্ত সড়কের পাশের নালাতেও। এই স্বভাবের কারণেই শহরের পুকুরপাড়ের একটি বাসা থেকে একটি ডাহুক পরিবারকে দেখা সম্ভব হয়েছিল।
যে পাখির ডাক শোনা যায় বেশি, দেখা যায় কম
বেশির ভাগ মানুষ ডাহুককে ডাক শুনেই চেনেন, লেখকের এই কথার সঙ্গে পক্ষীবিজ্ঞানের তথ্য মেলে। প্রজাতিটি মূলত গোধূলিচর, অর্থাৎ ভোর ও সন্ধ্যায় বেশি সক্রিয়, আর এ সময় জোরালো, কর্কশ ডাকে বেশ সরব থাকে। প্রজনন মৌসুমে, প্রথম বৃষ্টির ঠিক পরে, এটি জোরে জোরে বারবার কর্কশ ডাক দেয়। প্রকৃতিবিষয়ক লেখক এডওয়ার্ড হ্যামিল্টন এইটকেন, যিনি ইহা নামে লিখতেন, এই ডাকের বর্ণনা দিয়েছিলেন এভাবে যে শুরুটা কর্কশ গর্জনের মতো, তারপর হঠাৎ তা বদলে যায় ঘুঘুর ডাকের মতো বারবার পুনরাবৃত্ত এক স্পষ্ট সুরে। বর্ণনাটি হিউ হুইসলারের পপুলার হ্যান্ডবুক অব ইন্ডিয়ান বার্ডস বইয়ে উদ্ধৃত হয়েছে।
লেখায় লেখক নিজের শোনা একটি বিশ্বাসের কথাও বলেছিলেন: কেউ খেতে বসলে ডাহুক যদি তা দেখে ফেলে আর তাকে ভাগ না দেওয়া হয়, তবে অভিশাপ লাগে। তাঁর মতে, এমন প্রবাদ-বিশ্বাস বহু প্রজন্ম ধরে মুখে মুখে চলে এসেছে এবং এই সাধারণ পাখিটিকে গ্রামীণ সংস্কৃতিতে এক ধরনের রহস্যময় মর্যাদা দিয়েছে; তবে এটি সত্যি কি না, সে প্রশ্ন তিনি খোলা রেখেছিলেন। এটি লোকবিশ্বাস, এখানে লোকবিশ্বাস হিসেবেই উল্লেখ করা হলো।
কোথায় থাকে, কী খায়
আইইউসিএন বাংলাদেশের প্রজাতি-পরিচিতিতে বলা হয়েছে, ধলাবুক ডাহুক সাধারণত একা বা জোড়ায় দেখা যায় জলাভূমি, খাল, পুকুর, ডোবা ও গাছপালায় ঢাকা অন্যান্য জলাশয়ে। প্রায়ই এটি মানুষের বসতির কাছের আবাস ব্যবহার করে, যেমন কৃষিজমি, নর্দমার পানির পুকুর, গ্রামের পুকুর, পার্ক ও বাগান। দেশজুড়ে ঘন গাছপালায় ঢাকা নানা ধরনের জলাভূমিতে এটি পাওয়া যায়। এই বর্ণনা অনুযায়ী, বাসার পেছনে আগাছায় ঢাকা একটি পুকুর, শহরে হলেও, প্রজাতিটির পরিচিত আবাসেরই একটি রূপ।
লেখকের বর্ণনাও এর সঙ্গে মেলে। তিনি লিখেছিলেন, ডাহুক জলাশয়প্রেমী পাখি হলেও তার পছন্দ ঝোপঝাড়, নলখাগড়া, কচুরিপানা বা ঘন জলজ উদ্ভিদে ঢাকা ডোবা-পুকুর, ধানখেতের আল আর বাঁশঝাড়ের কিনার। ঘন গাছপালার আড়াল তাকে নিরাপত্তা দেয়, শিকারির চোখ এড়িয়ে চলাফেরার সুযোগ করে দেয়। লম্বা পায়ে সে অনায়াসে কচুরিপানার ওপর দিয়ে হেঁটে বেড়ায়, প্রয়োজনে সাঁতরে পার হয় ছোট জলাশয়। আইইউসিএনের পরিচিতিতেও বলা হয়েছে, পাখিটি জলজ আগাছার ওপর হেঁটে খাবার খোঁজে।
খাবার প্রসঙ্গে লেখক উল্লেখ করেছিলেন পোকামাকড়, কেঁচো, শামুক, ছোট মাছ ও ব্যাঙাচি থেকে শুরু করে বীজ, ধানের দানা ও উদ্ভিদের নরম অংশ; তাঁর মতে এই বৈচিত্র্যময় খাদ্যাভ্যাসই পাখিটিকে গ্রামীণ পরিবেশে সহজে টিকে থাকতে সাহায্য করে। আইইউসিএন বাংলাদেশের পরিচিতিতে এর খাদ্য হিসেবে লেখা আছে পোকামাকড়, শূককীট, শামুক-ঝিনুক জাতীয় কম্বোজ প্রাণী, বীজ ও জলজ উদ্ভিদের কচি ডগা। প্রজাতিটির বিশ্বকোষ নিবন্ধে সংকলিত ভারতের বিভিন্ন গবেষণা আরও জানায়, পাখিটি কাদা বা অগভীর পানিতে ঠোঁট ঢুকিয়ে খাবার খোঁজে, আবার চোখে দেখেও খাবার তুলে নেয়; এর খাদ্যতালিকায় প্রচুর গুবরে পোকা পাওয়া গেছে; ছোট মাছ খাওয়ার আগে প্রায়ই যত্ন করে পানিতে ধুয়ে নেয়; আর কখনো কখনো জলমুরগির মতো গভীর পানিতেও খাবার খোঁজে।
শহরের ডাহুকেরা পরিযায়ী কি না, লেখকের এই প্রশ্নের উত্তরে আইইউসিএনের মূল্যায়ন প্রজাতিটিকে বাংলাদেশের একটি সুলভ আবাসিক পাখি বলেছে। পক্ষীবিজ্ঞানের সাহিত্যেও ধলাবুক ডাহুককে বিচরণ এলাকাজুড়ে স্থায়ী বাসিন্দা বলা হয়েছে, যারা অল্প দূরত্বে চলাচল করে এবং নতুন এলাকায় বসতি গড়তে পারে বলে জানা যায়। জান ও দারজোনোর ১৯৯২ সালের এক গবেষণা অনুযায়ী ইন্দোনেশিয়ার আগ্নেয় দ্বীপ আনাক ক্রাকাতাউয়ে প্রথম দিকে বসতি গড়া পাখিদের মধ্যে এটি ছিল, আর উইলসন জার্নাল অব অর্নিথোলজিতে ২০১০ সালে প্রকাশিত বুডেন ও রেতোগ্রালের নিবন্ধে মাইক্রোনেশিয়ায় প্রজাতিটির বিস্তারের কথা লেখা হয়েছে। অর্থাৎ সূত্রগুলো মৌসুমি পরিযানের নয়, এ রকম স্বল্প দূরত্বের চলাচলের কথাই বলে।
জুলাইয়ের সঙ্গে মিলে যায় প্রজননকাল
লেখায় যে ছানাদের কথা এসেছে, তা পাখিটির প্রজনন-পঞ্জির সঙ্গে মিলে যায়। ১৯৮৩ সালে জার্নাল অব দ্য বোম্বে ন্যাচারাল হিস্ট্রি সোসাইটিতে প্রকাশিত ধিন্দসা, সান্ধু ও তুরের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী এর বাসা বাঁধার মৌসুম মূলত জুন থেকে অক্টোবর, যদিও স্থানভেদে তা বদলায়। ওই পর্যবেক্ষণে জলাভূমির গাছপালার মধ্যে মাটির ওপর শুকনো জায়গায় বাসা এবং ছয় থেকে সাতটি ডিমের কথা আছে; ডিম ফোটে প্রায় ১৯ দিনে। প্রণয়ের সময় পাখিরা মাথা নুইয়ে অভিবাদন জানায়, ঠোঁটে ঠোঁট ছোঁয়ায় ও আলতো করে ঠোকরায়।
সালিম আলী ও রিপলির হ্যান্ডবুক অনুযায়ী স্ত্রী ও পুরুষ দুজনেই ডিমে তা দেয় এবং ছানাদের দেখাশোনা করে, আর শিকারির হাত থেকে বাঁচতে ছানারা প্রায়ই পানিতে ডুব দেয়। দ্বাদশ বিশ্ব হ্রদ সম্মেলনে ২০০৮ সালে উপস্থাপিত গোপাকুমার ও কাইমালের এক কেস স্টাডিতে বলা হয়েছে, প্রাপ্তবয়স্ক পাখিরা বিশ্রাম বা ছানা লালনের জন্য আলাদা একটি বাসা বানায়, যেখানে ছোট ছানা ও বড় পাখিরা রাত কাটায়। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে আইইউসিএনের পরিচিতি, ইসলাম ও চাকমা (২০০৮) এবং আখতার ও সহকর্মীদের (২০১৩) উদ্ধৃত করে জানায়, এখানে পাখিটি পানির কাছের গাছে ও বাঁশঝাড়ে মাটি থেকে দুই থেকে পাঁচ মিটার উঁচুতে বাসা বাঁধে।


পুকুরের শ্যাওলা আর কলমিলতা
লেখক যে সবুজ আস্তরণকে শ্যাওলা বলেছেন, তা নিয়ে একটি তথ্য জানা দরকার। বাংলাদেশের জাতীয় জ্ঞানকোষ বাংলাপিডিয়ার স্বাদুপানির উদ্ভিদ নিবন্ধে বলা হয়েছে, দেশের স্বাদুপানিতে ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া, ছত্রাক, শৈবাল ও লাইকেন থেকে লিভারওয়ার্ট, মস, ফার্ন ও আবৃতবীজী পর্যন্ত সব জাতের উদ্ভিদই আছে, নেই শুধু নগ্নবীজী। তবে একই নিবন্ধ জানায়, এদেশে এখনও কোনো জলজ মসের খোঁজ পাওয়া যায়নি, যদিও পৃথিবীর নানা অঞ্চলে Fissidens, Fontinalis, Sphagnum ইত্যাদি জলজ মস আছে। অন্যদিকে স্বাদুপানির শৈবালের সংখ্যা অজস্র। সেই হিসেবে স্থির পুকুরের ওপর যে সবুজ আস্তরণকে চলতি কথায় শ্যাওলা বলা হয়, তা মস নয়, বরং শৈবাল বা ছোট ভাসমান উদ্ভিদ হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। বাংলাপিডিয়া দেশের জলজ ফার্নের তালিকায় ভাসমান ফার্ন Azolla pinnata ও কয়েকটি Salvinia প্রজাতির নাম দিয়েছে।
অবহেলিত পুকুরের আরেকটি পরিচিত দৃশ্যের ব্যাখ্যাও দিয়েছে বাংলাপিডিয়া। প্লাঙ্কটনের অতিবৃদ্ধির ফলে পানি কখনো কখনো সবুজ বা লাল হয়ে ওঠে, একে পানিস্ফুটন (water bloom) বলে। এটি স্বল্পস্থায়ী হলেও এতে পানিদূষণ ঘটে এবং মাছ মারা পড়ে। বাংলাদেশে পানিস্ফুটন ঘটায় Microcystis aeruginosa, Oscillatoria, Anabaena, Euglena, Volvox, Carteria ইত্যাদি অণুজীব ও শৈবাল।
কলমি বাংলাদেশের অতি পরিচিত উদ্ভিদ। বাংলাপিডিয়া কলমিকে (Ipomoea aquatica, কনভলভুলেসি পরিবার) দেশের শাকসবজির তালিকায় রেখেছে, একই পরিবারের গিমা কলমি (Ipomoea reptans) ও মিষ্টি আলুর সঙ্গে; আবার শাপলা, পদ্ম ও মাখনার সঙ্গে দেশের স্বাদুপানির উল্লেখযোগ্য জলজ দ্বিবীজপত্রী উদ্ভিদের তালিকাতেও এর নাম আছে। উদ্ভিদবিজ্ঞানের বর্ণনায় কলমি একটি আধা-জলজ গ্রীষ্মমণ্ডলীয় উদ্ভিদ, যা পানিতে বা ভেজা মাটিতে জন্মায়। এর কাণ্ড দুই থেকে তিন মিটার বা তারও বেশি লম্বা হয় এবং গিঁট থেকে শিকড় গজায়; কাণ্ডের ভেতরের ফাঁপা অংশ গাছটিকে ভাসিয়ে রাখে। পাতা তীরের ফলার মতো থেকে বর্শার আকৃতির, ৫ থেকে ১৫ সেন্টিমিটার লম্বা; শিঙার মতো ফুল ৩ থেকে ৫ সেন্টিমিটার চওড়া, সাধারণত সাদা, মাঝখানে হালকা বেগুনি। আইইউসিএনের বৈশ্বিক লাল তালিকায় ২০১৮ সালে প্রজাতিটিকে ন্যূনতম বিপদাপন্ন হিসেবে মূল্যায়ন করা হয়েছে।
দূষিত শহরের কালো পানির পুকুরের প্রসঙ্গে কলমি নিয়ে গবেষণার একটি দিক প্রাসঙ্গিক। কলমি ক্যাডমিয়াম, সিসা ও পারদ দক্ষতার সঙ্গে শোষণ করে জমা রাখে বলে জলজ আবাস পরিশোধনের উপায় হিসেবে একে নিয়ে গবেষণা হয়েছে; থাইল্যান্ডের ব্যাংককের আশপাশে চাষ করা কলমি নিয়ে গথবার্গ, গ্রেগার ও বেংটসনের ২০০৯ সালের গবেষণাসহ বিভিন্ন গবেষণা দেখিয়েছে, দূষিত পানিতে মানুষের বা পশুর খাবারের জন্য কলমি চাষ করলে এই বৈশিষ্ট্য বিপজ্জনক হতে পারে। কম্বোডিয়ার নমপেনে শহুরে বর্জ্যপানিতে চাষ করা কলমিতে মলবাহিত জীবাণু ও প্রোটোজোয়া পরজীবীর দূষণ পেয়েছিল ভুয়ং ও সহকর্মীদের ২০০৭ সালের এক গবেষণা। এসব গবেষণা অন্য দেশের; লেখাটিতে এই নির্দিষ্ট পুকুরের পানির মান সম্পর্কে কোনো তথ্য নেই।

সুলভ পাখি, তবু কমছে গ্রামের পুকুর
লেখক লিখেছিলেন, বাংলাদেশে ডাহুক এখনো তুলনামূলক সহজলভ্য আবাসিক পাখি, বিপন্ন তালিকায় এখনো নাম ওঠেনি; কিন্তু নগরায়ণের চাপে আর ছোট জলাশয় একে একে হারিয়ে যাওয়ায় তার আবাস সংকুচিত হচ্ছে, তাই দীর্ঘ মেয়াদে পাখিটি টিকে থাকবে কি না, সেটি চিন্তার বিষয়। সরকারি মূল্যায়ন এই দুই কথাকেই সমর্থন করে। বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী বাংলাদেশে ৬২৮ প্রজাতির পাখি আছে, যার ৩৮৮টি আবাসিক ও ২৪০টি পরিযায়ী। আইইউসিএনের বাংলাদেশ কান্ট্রি অফিস বন অধিদপ্তরের জন্য যে লাল তালিকা প্রণয়ন করে, তার তৃতীয় খণ্ড (পাখি) ২০১৫ সালে প্রকাশিত হয়। তাতে ৫৬৬ প্রজাতির পাখি মূল্যায়ন করা হয়: ৪২৪টি ন্যূনতম বিপদাপন্ন, ২৯টি প্রায়-বিপদাপন্ন, ৩৯টি বিপদাপন্ন (১০টি মহাবিপন্ন, ১২টি বিপন্ন ও ১৭টি সংকটাপন্ন), ৫৫টি তথ্য-অপ্রতুল এবং ১৯টি আঞ্চলিকভাবে বিলুপ্ত।
ধলাবুক ডাহুককে ২০১৪ সালের ১৫ নভেম্বর ন্যূনতম বিপদাপন্ন (Least Concern) হিসেবে মূল্যায়ন করা হয়। যুক্তি হিসেবে বলা হয়েছে, এটি বাংলাদেশের নানা ধরনের জলাভূমিতে বিস্তৃত একটি সুলভ আবাসিক প্রজাতি; তবে এর একটি ঐতিহ্যবাহী আবাস, অর্থাৎ গ্রামের পরিত্যক্ত পুকুর, হারিয়ে যাচ্ছে এবং সেখানে এর সংখ্যাও কমছে, যদিও অন্যান্য জলাশয়, পানিতে ডোবা ধানখেত ও জলাভূমিতে এর সংখ্যা এখনো ভালো। পরিচিতিতে মোট সংখ্যা অজানা, প্রবণতা নিম্নমুখী এবং প্রজন্মকাল ৩.৭ বছর বলা হয়েছে। ২০০০ সালের প্রথম জাতীয় মূল্যায়নে প্রজাতিটি ছিল ‘বিপদমুক্ত’ (Not Threatened)। বৈশ্বিকভাবে বার্ডলাইফ ইন্টারন্যাশনাল ২০১৬ সালে আইইউসিএন লাল তালিকার জন্য একে ন্যূনতম বিপদাপন্ন হিসেবে মূল্যায়ন করে।
গ্রামের পুকুর কেন গুরুত্বপূর্ণ, তা-ও ব্যাখ্যা করেছে আইইউসিএনের একই খণ্ড। সেখানে বলা হয়েছে, ঐতিহ্যগতভাবে বাংলাদেশের গ্রামের প্রতিটি পরিবারের একটি ফলের বাগান, বাঁশঝাড়, সবজিবাগান ও একটি ছোট পুকুর থাকত, আর গ্রামগুলো ছিল বহু পাখির ভালো আবাস; জনসংখ্যা বৃদ্ধি ও ভোগবাদের ফলে অনেক গ্রাম ছোট শহর বা বস্তিতে রূপ নিচ্ছে, যদিও কিছু গ্রাম এখনো তার ঐতিহ্যবাহী চেহারা ধরে রেখেছে। বসতভিটার গাছপালায় সাধারণত যেসব পাখি দেখা যায়, সেই তালিকায় ডাহুকের নাম আছে। সেই অর্থে বাসার পেছনের আগাছায় ঢাকা পুকুরের ডাহুক পরিবারটি বাস করছিল মূল্যায়নে বর্ণিত বসতভিটার আবাসেরই একটি অবশিষ্ট অংশে।
২০২৬ সালের ১৯ জুলাই বলবৎ আইনে যা ছিল
লেখাটি প্রকাশের দিন বাংলাদেশে বন্য পাখির সুরক্ষা দিত বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন, ২০২৬। এটি ২০২৬ সনের ৮৬ নং আইন, তারিখ ২০২৬ সালের ১০ এপ্রিল, এবং ২০২৬ সালের ৭ জানুয়ারি থেকে কার্যকর হয়েছে বলে গণ্য। আইনটি বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন, ২০১২ রহিত করেছে। এর প্রস্তাবনায় সংবিধানের ১৮ক অনুচ্ছেদের কথা বলা হয়েছে, যেখানে রাষ্ট্র কর্তৃক জীববৈচিত্র্য, বন ও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা বিধানের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত। আইনের রক্ষিত প্রাণীর তফসিলে ধলাবুক ডাহুক (White-breasted Waterhen, Amaurornis phoenicurus) তফসিল ১(গ)-তে তালিকাভুক্ত, আর ২ ধারা অনুযায়ী তফসিল ১(ক), ১(খ), ১(গ) ও ২-এ উল্লিখিত বন্যপ্রাণীই রক্ষিত বন্যপ্রাণী।
সরকারি পাঠ অনুযায়ী তফসিল ১(গ)-এর পাখির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য বিধানগুলো এমন:
- ধারা ৪১(৪): কোনো ব্যক্তি তফসিল ১(গ)-এ উল্লিখিত বন্যপ্রাণী শিকার করতে পারবেন না। ২ ধারা অনুযায়ী শিকার মানে কোনো বন্যপ্রাণীকে হত্যা করা, ধরা, বিষ প্রয়োগ করা বা অনুরূপ কোনো উদ্যোগ; এই উদ্দেশ্যে বন্যপ্রাণীকে তাড়িয়ে নেওয়া; কোনো বন্যপ্রাণীকে আহত বা ক্ষতিগ্রস্ত করা, তার কোনো অংশ নেওয়া, কিংবা বন্য পাখি বা সরীসৃপের বাসা বা ডিম সংগ্রহ বা ধ্বংস করা।
- ৪৪ ধারা অনুযায়ী ৪১(৪) ধারা লঙ্ঘনের দণ্ড সর্বোচ্চ দুই বছর কারাদণ্ড বা সর্বোচ্চ ১ লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড; একই অপরাধের পুনরাবৃত্তিতে সর্বোচ্চ চার বছর কারাদণ্ড বা সর্বোচ্চ ২ লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড।
- ধারা ৪১(৫): ২৬ ধারার অধীন পারমিট ছাড়া তফসিল ১(খ) ও ১(গ)-এর বন্যপ্রাণীর ট্রফি, মাংস বা দেহের অংশ সংগ্রহ, দখলে রাখা, কেনা বা বেচা যাবে না; দণ্ড সর্বোচ্চ এক বছর কারাদণ্ড বা ১ লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয়, পুনরাবৃত্তিতে সর্বোচ্চ দুই বছর বা ২ লাখ টাকা বা উভয়।
- ধারা ১০(১): লাইসেন্স, পজেশন সার্টিফিকেট বা পারমিট ছাড়া কোনো বন্যপ্রাণী লালন-পালন, আবদ্ধ রাখা, দখলে রাখা, কেনা, বেচা বা পরিবহন করা যাবে না; ধারা ১০(২) অনুযায়ী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিজ্ঞাপন দিয়ে, হাট-বাজারে বা অন্য কোনো মাধ্যমে বন্যপ্রাণী কেনাবেচা নিষিদ্ধ।
- ধারা ১০(৪): বন্যপ্রাণীর প্রতি নিষ্ঠুর আচরণ শাস্তিযোগ্য অপরাধ; ব্যাখ্যায় প্রহার, উত্ত্যক্ত করা, অপ্রয়োজনে আটকে রাখা, পরিবহনে কষ্ট দেওয়া এবং বন্যপ্রাণীর প্রতি নিষ্ঠুরতা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করার কথা আছে। ১০ ধারা লঙ্ঘনের দণ্ড সর্বোচ্চ এক বছর কারাদণ্ড বা ১ লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয়, পুনরাবৃত্তিতে সর্বোচ্চ দুই বছর বা ২ লাখ টাকা বা উভয়।
পুকুরে ছানাসহ একটি ডাহুক পরিবারের ক্ষেত্রে শিকারের সংজ্ঞাটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ: আইন অনুযায়ী ছানা ধরা কিংবা বাসা বা ডিম সংগ্রহ বা ধ্বংস করাও রক্ষিত পাখি শিকার হিসেবে গণ্য।
বাংলার সংস্কৃতিতে ডাহুক
লেখাটি শেষ হয়েছিল বাংলার সংস্কৃতিতে ডাহুকের জায়গা নিয়ে। লেখক লিখেছিলেন, বাংলা কবিতা ও গানের জগতে ডাহুকের ডাক গ্রামবাংলার সন্ধ্যা বা রাতের নিসর্গচিত্রের একটি অবিচ্ছেদ্য অনুষঙ্গ হিসেবে বারবার ফিরে এসেছে; প্রকৃতিকেন্দ্রিক কবিতায়, বিশেষত রূপসী বাংলার নিসর্গ বর্ণনায়, রাতজাগা পাখির ডাক প্রায়ই ব্যবহৃত হয়েছে নির্জনতা, গ্রামীণ জীবনের ছন্দ আর নিসর্গের প্রতীক বোঝাতে। রূপসী বাংলা সেই কাব্যগ্রন্থ, যেখানে জীবনানন্দ দাশ গ্রামবাংলার সৌন্দর্য বর্ণনা করেছেন; বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী এ কারণেই তিনি ‘রূপসী বাংলার কবি’ অভিধা পেয়েছেন। কথাসাহিত্যেও পাখিটির নাম এসেছে: বাংলাপিডিয়া কবি আল মাহমুদের উপন্যাসের তালিকায় ডাহুক (১৯৯২) নামটি রেখেছে।
বাংলাপিডিয়ার পাখি নিবন্ধে দেশের পরিচিত পাখিদের ছবির মধ্যে ডাহুকও আছে। সেখানে বলা হয়েছে, পাখির প্রাচীন সংস্কৃত নামের কিছু তৈরি হয়েছে ডাক থেকে, যেমন কাউয়ার জন্য ধ্বন্যাত্মক শব্দ ‘কাক’, আর অন্যগুলো রং, আচরণ বা চলনভঙ্গি থেকে। লেখকের চোখে, গ্রামের কবিতার যে পাখি, সে-ই কলকারখানার ধোঁয়ায় ভরা শহরের এক পুকুরকে বেছে নিয়েছে জোড়া আর ছানাদের নিয়ে সংসার পাতার জায়গা হিসেবে। লেখক লেখাটি শেষ করেছিলেন এই বলে যে তিনি কেবল ভাবছেন আর ভাবছেন, আর ডাহুকেরা তাঁর মেহমান।
ছবি: Frameofashik / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, আইইউসিএন বাংলাদেশ (বাংলাদেশের লাল তালিকা, তৃতীয় খণ্ড: পাখি, ২০১৫), লেজিসলেটিভ ও সংসদবিষয়ক বিভাগ (বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন, ২০২৬), বাংলাপিডিয়া, উইকিপিডিয়া





মন্তব্য
(০)