বগুড়ার নারী উদ্যোক্তা তানিয়া আক্তার। তার যাত্রা শুরু হয়েছিল মাত্র ২ কেজি বরইয়ের আচার দিয়ে। সেই ছোট্ট উদ্যোগই এখন পরিণত হয়েছে একটি ব্র্যান্ডে।
তানিয়া আক্তারের তৈরি আচার এখন দেশের বিভিন্ন জেলার পাশাপাশি পৌঁছে যাচ্ছে সৌদি আরব, অস্ট্রেলিয়া ও মালয়েশিয়ায়। মাত্র ৫ হাজার টাকা পুঁজি নিয়ে শুরু করা ব্যবসায় বর্তমান বিনিয়োগ চার লাখ ছাড়িয়েছে। কাজ করছেন একাধিক কর্মী।
তানিয়ার ফেসবুকভিত্তিক প্রতিষ্ঠান 'আরিয়ানা'স ড্রিমস' এখন বিভিন্ন ধরনের আচার, ঘি ও ঘরোয়া খাদ্যপণ্য উৎপাদন করে। আম, বরই, তেঁতুল, চালতা, জলপাই, রসুন, মরিচ, মিক্সড আচার থেকে শুরু করে গরু ও মুরগির মাংসের আচারও রয়েছে তার পণ্যের তালিকায়। তৈরি হয়েছে স্থায়ী গ্রাহক।
চলতি মৌসুমে তিনি ৩০ কেজির বেশি আমের আচার বিক্রি করেছেন। প্রতি কেজি আমের আচার বিক্রি হয় ৮০০ থেকে ১ হাজার টাকায়। বরই ও তেঁতুলের আচার ৬০০ টাকা, রসুনের আচার ৭০০ টাকা, মিক্সড আচার ৭০০ টাকা, মরিচের আচার ৫০০ টাকা এবং গরুর মাংসের আচার বিক্রি হয় ১ হাজার ৬০০ টাকায়। ২৫০ গ্রাম, ৫০০ গ্রাম ও ১ কেজির প্যাকেজে বিক্রি হওয়া এসব পণ্য এক বছর পর্যন্ত সংরক্ষণ করে খাওয়া যায়।
ব্যবসার বর্তমান অবস্থান অনুযায়ী এটি একটি সফলতার গল্প। কিন্তু এই সাফল্যের পেছনে রয়েছে দীর্ঘ সংগ্রাম, অনিশ্চয়তা আর টিকে থাকার লড়াই।
তানিয়া আক্তারের স্বপ্ন ছিল ব্যাংকার হওয়ার। উচ্চশিক্ষা শেষ করে চাকরির প্রস্তুতিও নিচ্ছিলেন। কিন্তু একটি দুর্ঘটনা তার জীবনের গতিপথই বদলে দেয়। ২০১১ সালে ব্যবসায়ী আদনান হোসেনের সঙ্গে বিয়ে হয়। সংসার চলছিল স্বাভাবিকভাবেই। কিন্তু ২০১৮ সালে এক সড়ক দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হন আদনান। দীর্ঘ চিকিৎসা, আয় বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং সংসারের বাড়তি ব্যয়ের চাপ পুরো পরিবারকে সংকটে ফেলে।
অসুস্থ স্বামী, বয়স্ক শ্বশুর-শাশুড়ি এবং ছোট্ট মেয়েকে নিয়ে তখন পাঁচ সদস্যের পরিবারে অনিশ্চয়তা নেমে আসে। সংসারের ব্যয় মেটানোই হয়ে ওঠে বড় চ্যালেঞ্জ। সেই সময় তানিয়া সিদ্ধান্ত নেন, ছোটোবেলা থেকে ভালোবাসার রান্নাকেই জীবিকার মাধ্যম বানাবেন।
২০১৮ সালে মাত্র ৫ হাজার টাকা হাতে নিয়ে শুরু হয় তার উদ্যোক্তা জীবন। প্রথম অর্ডারটি আসে এক আত্মীয়ের মাধ্যমে সৌদিপ্রবাসী একজন বাংলাদেশির কাছ থেকে। তিনি ২ কেজি বরইয়ের আচার তৈরি করে পাঠান।
প্রবাসে বসে দেশের স্বাদ পেয়ে ক্রেতার প্রশংসা তাকে নতুন আত্মবিশ্বাস দেয়। তানিয়া বুঝতে পারেন ঘরোয়া খাবারের একটা বাজার রয়েছে, যেখানে গুণগত মান ধরে রাখতে পারলে টিকে থাকা সম্ভব। এরপর মেয়ে আরিয়ানার নাম অনুসারে ফেসবুকে চালু করেন 'আরিয়ানা'স ড্রিমস' নামের অনলাইন পেজ।
ব্যবসার শুরুটা মোটেও সহজ ছিল না। সংসার চালাতে তিনি একটি কিন্ডারগার্টেন স্কুলে সাড়ে তিন হাজার টাকা বেতনে চাকরি নেন। দিনের বেলা স্কুলে পাঠদান, আর রাতভর আচার তৈরি এভাবেই কেটেছে তার জীবনের অনেকগুলো বছর।
একদিকে অসুস্থ স্বামীর চিকিৎসা, অন্যদিকে ব্যবসা টিকিয়ে রাখার লড়াই। ক্লান্তি বা হতাশা তাকে থামাতে পারেনি। ধীরে ধীরে আচারের পাশাপাশি কেক, পেটিস, পিজ্জা এবং অন্যান্য ঘরোয়া খাবারও যুক্ত করেন পণ্যের তালিকায়। এতে বাড়তে থাকে অর্ডার।
অনলাইনভিত্তিক ব্যবসার বড় শক্তি হলো ক্রেতাদের আস্থা। তানিয়ার ক্ষেত্রেও সেটিই হয়েছে। বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা তার নিয়মিত ক্রেতা।
আত্মীয়-স্বজন এবং প্রবাসীদের মাধ্যমে তার পণ্য পৌঁছেছে সৌদি আরব, অস্ট্রেলিয়া ও মালয়েশিয়ায়। দেশের ভেতর শুরুতে নিজেই পণ্য পৌঁছে দিতেন। বর্তমানে কয়েকজন ডেলিভারি কর্মী রয়েছে। পাশাপাশি তিনজন কর্মী উৎপাদন ও প্যাকেজিংয়ের কাজে সহায়তা করছেন।
সফলতা এলেও ব্যবসার পথে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে। তেল, চিনি, মশলা এবং অন্যান্য কাঁচামালের দাম বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদন খরচ অনেক বেড়েছে। কিন্তু অনেক ক্রেতাই আগের দামে পণ্য কিনতে চান। ফলে লাভের পরিমাণ কমে যাচ্ছে। তারপরও থেমে যেতে চান না তানিয়া।
তিনি বলেন, শুরুতে অনেকেই বলেছিলেন এসব করে কিছু হবে না। কিন্তু আমি বিশ্বাস করতাম, ভালো পণ্য তৈরি করতে পারলে মানুষ কিনবেই। আজ সেই বিশ্বাসই আমাকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।
তানিয়ার মতে, এই দীর্ঘ পথচলায় সবচেয়ে বড় শক্তি তার পরিবার। স্বামী সুস্থ হওয়ার পর এখন কাঁচামাল সংগ্রহসহ ব্যবসার বিভিন্ন কাজে সহযোগিতা করেন। আর ঘরের ভেতরে বড় সহায়তা হয়ে উঠেছেন ৬০ বছর বয়সি শাশুড়ি জোবেদা।
শাশুড়ি জোবেদা বলেন, 'বউমা কখনো রান্নার ব্যস্ততায় কিছু ভুলে গেলে আমি মনে করিয়ে দিই। কোথা থেকে অর্ডার আসে, কীভাবে বিক্রি হয় এসব দেখতে ভালো লাগে। এখন তো ওর কাজ দেখে গর্ব হয়।'
তবে পরিবারের দায়িত্বও কম নয়। ৯৫ বছর বয়সি শ্বশুর খয়বর রহমান বসারী স্ট্রোকজনিত কারণে অসুস্থ। পাশাপাশি তৃতীয় শ্রেণি পড়ুয়া ১০ বছরের মেয়ে আরিয়ানার পড়াশোনার দায়িত্বও রয়েছে। ব্যবসা, পরিবার এবং অসুস্থ সদস্যদের দেখভাল সবকিছুই সামলাতে হয় তাকে।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়েও আশাবাদী তানিয়া আক্তার। তিনি বলেন, অনলাইনের পাশাপাশি বগুড়া শহরে একটি শোরুম করতে চাই। সেখানে আমার নিজের পণ্যের পাশাপাশি আরও কয়েকজন নারী উদ্যোক্তার পণ্যও থাকবে। অন্তত পাঁচ থেকে ১০ জন নারীর কর্মসংস্থান তৈরি করতে চাই। আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে সরাসরি বিদেশে আচার রপ্তানির লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছি।
তরুণদের উদ্দেশে তার পরামর্শ, অন্যের পথ অনুসরণ না করে নিজের দক্ষতা ও ভালো লাগার জায়গাটিকে কাজে লাগাতে হবে। নিজেকে উদাহরণ হিসেবে টেনে তিনি বলেন, সংসারের কঠিন বাস্তবতা, স্বামীর দুর্ঘটনা, অর্থনৈতিক সংকট আর সামাজিক প্রতিবন্ধকতা সবকিছু জয় করে আমি নিজেই প্রমাণ করেছি সংকট কখনও কখনও নতুন সম্ভাবনারও জন্ম দেয়। আমি মনে করি যে কারো আত্মবিশ্বাস, অধ্যবসায় তার জীবনের ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প হবে।
তানিয়া আক্তার বগুড়া সেন্ট্রাল হাই স্কুল থেকে ২০০৬ সালে এসএসসি এবং ২০০৮ সালে বগুড়া কমার্শিয়াল কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেন। এরপর সরকারি আজিজুল হক কলেজের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ থেকে অনার্স ও মাস্টার্স সম্পন্ন করেন। উচ্চশিক্ষিত হয়েও তিনি কোনো চাকরির পরিচয়ে নয়, বরং নিজের উদ্যোগের মাধ্যমেই পরিচিতি পেয়েছেন।
ব্যবসাকে আরও পেশাদার করতে তিনি সরকারি প্রতিষ্ঠান বিসিক এবং উন্নয়ন সংস্থা গাকসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রশিক্ষণে অংশ নেন। ডিজিটাল মার্কেটিং, সোশ্যাল মিডিয়া মার্কেটিং, উদ্যোক্তা উন্নয়ন এবং দুগ্ধজাত পণ্য ব্যবস্থাপনা বিষয়ে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন।





মন্তব্য
(০)