করোনাকালে যখন অনেক তরুণ অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তায় ছিলেন, তখন বরিশালের তরুণ সৈকত রায়হান সাকিন বেছে নেন ভিন্ন পথ। টিউশনি করে জমানো অল্প কিছু টাকা আর ফলচাষের প্রতি প্রবল আগ্রহকে পুঁজি করে বাড়ির পাশেই শুরু করেছিলেন ছোট্ট একটি ফলবাগান। সময়ের সঙ্গে সেই ছোট উদ্যোগই এখন বড় পরিসরের নার্সারি ও মিশ্র ফলবাগানে পরিণত হয়েছে। বর্তমানে এই বাগান থেকেই বছরে প্রায় ৫ থেকে ৭ লাখ টাকা আয় করছেন তিনি।
বরিশাল সদর উপজেলার কাশিপুর ইউনিয়নের তিলক গ্রামের বাসিন্দা সাকিনের এই উদ্যোগ এখন এলাকায় অনুপ্রেরণার প্রতীক। পড়াশোনার পাশাপাশি শুরু করা তার এই পথচলা আজ শুধু ব্যক্তিগত আয়ের উৎস নয়, বরং অনেক তরুণের উদ্যোক্তা হওয়ার স্বপ্নও জাগিয়ে তুলছে।
ছোটবেলায় বাবাকে হারানোর পর সংসারের পুরো দায়িত্ব এসে পড়ে তার মায়ের কাঁধে। সেই কঠিন সময়ে মায়ের সাহস, অনুপ্রেরণা ও সহযোগিতাই সাকিনের এগিয়ে যাওয়ার প্রধান শক্তি হয়ে ওঠে। উদ্যোক্তা হয়ে ওঠার পুরো যাত্রায় পাশে রয়েছেন তার মা ও ছোট ভাই সিহাব হাসান সান্নিন।
সাকিন ২০২৩ সালে বিএম কলেজ থেকে মার্কেটিং বিষয়ে এমবিএ সম্পন্ন করেন। পড়াশোনা শেষ করে চাকরির পেছনে না ছুটে নিজ বাড়ির এক একর জমিতে গড়ে তোলেন নার্সারি ও মিশ্র ফলবাগান। বর্তমানে তার বাগানে দেশি-বিদেশি মিলিয়ে রয়েছে ৮০টিরও বেশি আমের জাত।
বাগানে প্রবেশ করলেই চোখে পড়ে নানা জাতের আমগাছের সমাহার। বিভিন্ন রং, আকার ও স্বাদের এই আমগাছগুলো যেন আলাদা বৈশিষ্ট্যে ভরপুর। কোথাও লম্বাটে, কোথাও গোল বা চ্যাপ্টা, কোনোটি লালচে, কোনোটি সবুজ, আবার কিছু গাছে ঝুলছে হলুদাভ আম।
সাকিনের বাগান ঘুরে দেখা যায়, তার সংগ্রহে থাকা বিদেশি ও উচ্চমূল্যের আমের জাতগুলোর মধ্যে রয়েছে বানানা ম্যাঙ্গো, চাকাপাত, সূর্যডিম, অস্টিন, বারি-৪, ভ্যালেন্সিয়া প্রাইড, আমেরিকান পালমার, অ্যাম্বিশ, পুসা সুরিয়া ও অরুণিমা। প্রায় প্রতিটি গাছেই এখন ফল এসেছে।
এছাড়া দেশীয় জনপ্রিয় জাতের মধ্যে রয়েছে হিমসাগর, ল্যাংড়া, ফজলি, আম্রপালি, গোপালভোগ, খিরসাপাত, আশ্বিনা, মল্লিকা, কাটিমন, হারিভাঙ্গা, রানিপছন্দ, মোহনভোগ, দিলপসন্দ, কোহিতুর, সুরমা ফজলি ও বোম্বাই।
শুধু আম নয়, তার বাগানে রয়েছে আরও বৈচিত্র্যময় ফলের সমাহার। আঠাবিহীন কাঁঠাল, লাল জামরুল, মাল্টা, রাম্বুটান, অ্যাভোকাডো, আঙুর, আনার, কমলা ও আপেলসহ প্রায় ৭০ প্রজাতির বিদেশি ফলের চারা রয়েছে সেখানে। বিশেষ আকর্ষণ হিসেবে রয়েছে মাত্র তিন ফুট উচ্চতার গাছে ফল ধরা আঠাবিহীন কাঁঠাল।
নিজের বাগান পরিচালনার পাশাপাশি সাকিন অন্যদেরও ফলচাষে উৎসাহিত করছেন। তার পরামর্শ ও সহযোগিতায় এরই মধ্যে বরিশালের বিভিন্ন এলাকায় ১০টির বেশি ফলবাগান গড়ে উঠেছে। অনেকে তার কাছ থেকে চারা সংগ্রহ করে ছাদবাগানও করেছেন।
সৈকত রায়হান সাকিন জাগো নিউজকে বলেন, 'করোনার সময়ে টিউশনির টাকা দিয়ে শখের বসে ছোট্ট একটি বাগান শুরু করি। ধীরে ধীরে সেটিকে বড় করেছি। আমের প্রতি আমার আলাদা ভালোবাসা আছে। এখন বিভিন্ন এলাকার মানুষ আমার কাছ থেকে চারা নিয়ে বাগান করছেন। পরিকল্পিতভাবে ফলচাষ করলে বছরে সহজেই ৫ থেকে ৭ লাখ টাকা আয় করা সম্ভব।'
তিনি আরও বলেন, 'বরিশালের মাটিতে বিদেশি ফলের চাষ সম্ভব এটা প্রমাণ করাই আমার লক্ষ্য। সঠিক জাত নির্বাচন, ভালো চারা, নিয়মিত পরিচর্যা ও পরিকল্পনা থাকলে তরুণরা চাকরির পেছনে না ছুটে সফল উদ্যোক্তা হতে পারে।'
স্থানীয়দের মতে, সাকিনের এই ফলবাগান এখন শুধু একটি নার্সারি নয় এটি তরুণদের জন্য সফলতার এক জীবন্ত উদাহরণ। স্বপ্ন, পরিশ্রম ও ধৈর্যের সমন্বয়ে সফলতা অর্জনের বাস্তব প্রমাণ হয়ে উঠেছে এই বাগান।
বরিশাল সদর উপজেলার কৃষি কর্মকর্তা উত্তম ভৌমিক জানান, সাকিনের ফলবাগানের বিষয়ে এরই মধ্যে উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তারা খোঁজ নিয়েছেন। প্রয়োজন হলে আবারও পরিদর্শন করে সহযোগিতা ও পরামর্শ দেওয়া হবে।
বরিশাল জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপ-পরিচালক মোঃ মামুনুর রহমান জাগো নিউজকে বলেন, 'এ ধরনের উদ্যোক্তাদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ, কারিগরি সহায়তা এবং কৃষিঋণ পেতে সহযোগিতা করা হয়। সাকিনের বাগানের বিষয়েও প্রয়োজনীয় সহায়তার ব্যবস্থা নেওয়া হবে।'
শাওন খান/কেএসকে





মন্তব্য
(০)