সরাসরিবাজারদর
আটা (প্যাকেটজাত)৫৮আদা - আমদানিকৃত১৬৭আদা - দেশী১৫৪আমন চাল - মাঝারি৫৬আমন চাল - মোটা৪৮আমন চাল - সরু৭২আয়োডিনযুক্ত লবণ (প্যাকেটজাত)৩২কাঁচা মরিচ২১৮খামারের মুরগী১৬২খাসী৯০০চিনি (দেশী)১৩২ছোলা - গোটা৮৫ডিম ফার্ম - লাল৪৭পেঁয়াজ - দেশী৬০বোরো চাল - মাঝারি৫৫বোরো চাল - মোটা৪৭বোরো চাল - সরু৬৬মাংসঃ– গরু৭২৯মুগ ডাল১২২রসুন - আমদানিকৃত১৯২রসুন - দেশী১৭৩সয়াবিন তেল১৬৩
হালনাগাদ ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬
ঢাকা২৮°মূলত পরিষ্কারআর্দ্রতা ৮২%বাতাস কিমি/ঘ

দুয়ার খুললো সুন্দরবন: তীরে ঋণের ভার, বনে দস্যুর ভয়

নদীর পাড়ে সারি সারি নৌকা। কোথাও পুরোনো কাঠ বদলানো হচ্ছে, কোথাও দেওয়া হচ্ছে আলকাতরা। কেউ ছেঁড়া জাল সেলাই করছেন, কেউ পরীক্ষা করছেন ইঞ্জিন। তিন মাস ধরে ঘাটে পড়ে থাকা নৌকাগুলো আবারো প্রস্তুত হচ্ছে লোনা পানির দীর্ঘ যাত্রার জন্য।

পরিবেশ

নদীর পাড়ে সারি সারি নৌকা। কোথাও পুরোনো কাঠ বদলানো হচ্ছে, কোথাও দেওয়া হচ্ছে আলকাতরা। কেউ ছেঁড়া জাল সেলাই করছেন, কেউ পরীক্ষা করছেন ইঞ্জিন। তিন মাস ধরে ঘাটে পড়ে থাকা নৌকাগুলো আবারো প্রস্তুত হচ্ছে লোনা পানির দীর্ঘ যাত্রার জন্য।

সাতক্ষীরার শ্যামনগরের বুড়িগোয়ালিনী, মুন্সিগঞ্জ, গাবুরাসহ সুন্দরবনসংলগ্ন জনপদে এখন এমনই ব্যস্ততা। দীর্ঘ তিন মাসের অপেক্ষা শেষে মঙ্গলবার, ১ সেপ্টেম্বর খুলছে সুন্দরবনের দুয়ার। বন বিভাগের অনুমতিপত্র নিয়ে আবারো মাছ-কাঁকড়া আহরণে নদী-খালে নামবেন জেলে-বাওয়ালিরা। একইসঙ্গে পর্যটকদের জন্যও খুলে যাবে সুন্দরবনের পর্যটনকেন্দ্রগুলো।

তিন মাসের অপেক্ষা শেষে বনের দুয়ার খুলছে, এই খবর উপকূলের হাজারো পরিবারের কাছে কেবল একটি প্রশাসনিক নিষেধাজ্ঞা শেষ হওয়ার সংবাদ নয়, বরং আবার ঘরে চুলা জ্বালানোর নিশ্চয়তা, সন্তানের স্কুলের খরচ জোগানোর সুযোগ, বৃদ্ধ বাবা-মায়ের ওষুধ কেনার আশা এবং গত তিন মাসে জমে যাওয়া ধারদেনা শোধ করার লড়াই শুরুর স্বপ্ন।

তবে নতুন মৌসুমের এই আশার পাশেই আছে অনেক হিসাব। নৌকা ও জাল মেরামতের খরচ, মহাজনের দেনা, এনজিও ঋণের কিস্তি, আর সবচেয়ে বড় করে সামনে আসছে বনের ভেতরে নিরাপত্তা নিয়ে সেই পুরোনো দস্যুদের ভয়।

সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য, মৎস্যসম্পদ ও বন্যপ্রাণীর প্রজনন সুরক্ষায় প্রতিবছর জুন, জুলাই ও আগস্টে বনাঞ্চলে মানুষের প্রবেশ সীমিত রাখা হয়। এসময় মাছ-কাঁকড়া আহরণ, বনজ সম্পদ সংগ্রহ এবং অধিকাংশ পর্যটন কার্যক্রম বন্ধ থাকে। কোনো জেলে-বাওয়ালিকেও নতুন পাস বা পারমিট দেওয়া হয় না।

বন বিভাগের তথ্যমতে, জুন থেকে আগস্ট সুন্দরবনের নদী-খালের অধিকাংশ মাছ ও জলজ প্রাণীর গুরুত্বপূর্ণ প্রজনন সময়। একই সময়ে বিভিন্ন বন্যপ্রাণী প্রজনন করে এবং সুন্দরী, গেওয়া, গরানসহ নানা উদ্ভিদের বীজ অঙ্কুরোদ্গম ও নতুন চারা গজানোর প্রক্রিয়াও চলে।

মানুষের উপস্থিতি, ইঞ্জিনচালিত নৌযানের শব্দ, মাছ ও বনজ সম্পদ আহরণের চাপ এবং পর্যটকদের চলাচল কমিয়ে বনকে কয়েক মাস তুলনামূলক নিরিবিলি রাখাই এই নিষেধাজ্ঞার অন্যতম উদ্দেশ্য। সমন্বিত সম্পদ ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনার সুপারিশে প্রথম দিকে জুলাই ও আগস্টে এ নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করা হলেও ২০২২ সাল থেকে সময়সীমা বাড়িয়ে ১ জুন থেকে ৩১ আগস্ট করা হয়।

কাগজে-কলমে সুন্দরবনে প্রবেশ বন্ধ থাকলেও পুরো তিন মাস যে শতভাগ অবৈধ প্রবেশ ঠেকানো গেছে, তা বলার কোনো সুযোগ নেই। বরং বন বিভাগের অভিযান ও জব্দের পরিসংখ্যানই দেখায়, নিষেধাজ্ঞার সময়েও একটি অংশ অবৈধভাবে বনে ঢোকার চেষ্টা করেছে।

বন বিভাগের হিসাবে, চলতি জুন থেকে আগস্টের মধ্যে বনরক্ষীরা ৬৩টি অভিযান পরিচালনা করেছেন। এসব ঘটনায় ৩৯টি মামলা হয়েছে এবং ৩৭ জনকে আটক করা হয়েছে। জব্দ করা হয়েছে ১২টি ট্রলার, ৫০টি নৌকা, ৫৫টি মাছ ধরার জাল, বিষের বোতল ও তরল বিষ এবং বন্যপ্রাণী শিকারে ব্যবহৃত ৬ হাজারের বেশি ফাঁদ। বিষ দিয়ে ধরা মাছ ও কাঁকড়াসহ বিভিন্ন অবৈধ সরঞ্জামও উদ্ধার করা হয়েছে। বন বিভাগের দাবি, গত বছরের একই সময়ের তুলনায় এবার বন অপরাধ কমেছে।

এই তথ্যের দুটি দিক রয়েছে। একদিকে টহল ও অভিযানের কারণে অবৈধ কার্যক্রমের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে; অন্যদিকে এত বিপুল পরিমাণ ফাঁদ, জাল ও বিষ উদ্ধার হওয়া বলে দেয়, নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও অবৈধভাবে মাছ ধরা ও বন্যপ্রাণী শিকারের চেষ্টা পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব হয়নি।

স্থানীয় বনজীবীদেরও অভিযোগ, বৈধ জেলেদের বনে যাওয়া বন্ধ থাকলেও সুযোগ নিয়ে কিছু অসাধু ব্যক্তি গোপনে নদী-খালে ঢুকে বিষ প্রয়োগ করে মাছ ধরে। ফলে তাদের দাবি, শুধু বৈধ বনজীবীদের বনে প্রবেশ বন্ধ রাখলেই হবে না; নিষেধাজ্ঞার তিন মাসে দুর্গম নদী-খাল ও অভয়ারণ্য এলাকায় আরও বেশি নজরদারি থাকা দরকার।

তিন মাস মানুষের চলাচল ও নৌযানের চাপ কম থাকার প্রভাব সুন্দরবনের ভেতরে দৃশ্যমান হয়েছে বলে দাবি করছে বন বিভাগ।

বন কর্মকর্তাদের ভাষ্য, নিষেধাজ্ঞার সময় নদীর পাড়ে হরিণের দলকে তুলনামূলক নির্বিঘ্নে বিচরণ করতে দেখা গেছে। বিভিন্ন খালের চরে বাঘ ও কুমিরের উপস্থিতি, গাছের ডালে পাখির আনাগোনা এবং গভীর বনে বন্যপ্রাণীর স্বাভাবিক চলাচলও বেড়েছে। বৃষ্টির পানিতে বনাঞ্চলে নতুন উদ্ভিদ ও চারার বৃদ্ধিও হয়েছে।

বন বিভাগের কর্মকর্তারা আরও বলছেন, মানুষের চাপ ও নৌযানের শব্দ কমায় মাছের প্রজনন নির্বিঘ্ন হয়েছে এবং বাঘ, হরিণসহ বিভিন্ন প্রাণী নিরাপদ পরিবেশ পেয়েছে। সুন্দরী, কেওড়া, বাইনসহ বিভিন্ন প্রজাতির নতুন চারা বেড়ে ওঠার ক্ষেত্রেও এই নিরিবিলি সময় ইতিবাচক ভূমিকা রেখেছে।

তবে এসব ইতিবাচক পরিবর্তনের বড় অংশই এখন পর্যন্ত বন বিভাগের পর্যবেক্ষণভিত্তিক। একটি নিষেধাজ্ঞা মৌসুমে মাছের মজুত বা নির্দিষ্ট বন্যপ্রাণীর সংখ্যা ঠিক কতটা বেড়েছে, সে বিষয়ে দীর্ঘমেয়াদি বৈজ্ঞানিক জরিপ ও তুলনামূলক তথ্য থাকলে নিষেধাজ্ঞার প্রকৃত সুফল আরও স্পষ্টভাবে মূল্যায়ন করা সম্ভব।

পরিবেশ রক্ষায় নিষেধাজ্ঞার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে বনজীবীদের বড় ধরনের আপত্তি নেই। তাদের প্রশ্ন অন্য জায়গায়, বনকে তিন মাস বিশ্রাম দেওয়া হলে বননির্ভর মানুষগুলো সেই সময় কীভাবে বাঁচবে?

শ্যামনগরের বুড়িগোয়ালীনি এলাকার বাসিন্দা বনজীবী মানিক মোড়ল জাগো নিউজকে বলেন, 'বন বন্ধ রাখা যদি মাছের প্রজনন আর সুন্দরবনের ভালোর জন্য হয়, আমরা সেটা মেনে নিয়েই চলতে চাই। কিন্তু এই তিন মাস আমাদের কোনো কাজ থাকে না। আয়ের সুযোগ থাকে না। ঘরে চাল লাগবে, ছেলে-মেয়ের পড়ার খরচ আছে, ওষুধ আছে। বাধ্য হয়ে উচ্চ সুদে টাকা ধার করতে হয়। বন খোলার আগেই আমরা বড় অংকের ঋণের মধ্যে ডুবে যাই।'

তার ভাষ্য, 'তিন মাস সংসার চালানোর জন্য যেমন ঋণ নিতে হয়েছে, তেমনি এখন বনে যাওয়ার জন্য নৌকা, ইঞ্জিন ও জাল মেরামত করতেও নতুন করে টাকা ধার করতে হচ্ছে।'

একই এলাকার আরেক বনজীবী বাচ্চু গাইন জাগো নিউজকে বলেন, 'সুন্দরবন খুললে প্রথমে যে টাকা আয় হবে, সেটা আমাদের নিজের থাকবে না। মহাজনের টাকা দিতে হবে, এনজিওর কিস্তি দিতে হবে। এরপর যদি কিছু থাকে, সেটা দিয়ে সংসার চলবে। আমরা চাই, সুন্দরবনও বাঁচুক, মাছ বাড়ুক; কিন্তু বন্ধের তিন মাস আমাদের জন্য নিয়মিত সরকারি সহায়তার ব্যবস্থা থাকুক।'

বনজীবীদের কেউ কেউ মৌসুমের বাইরে দিনমজুরি, কৃষিকাজ কিংবা ছোটখাটো অন্য কাজে যুক্ত হওয়ার চেষ্টা করেন। তবে সুন্দরবনসংলগ্ন লবণাক্ত উপকূলীয় অনেক এলাকায় নিয়মিত বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ সীমিত। ফলে কয়েক মাসের আয়হীনতা তাদের দ্রুত ঋণনির্ভর করে তোলে।

সরকারি তথ্য অনুযায়ী, সুন্দরবনসংলগ্ন এলাকায় তালিকাভুক্ত প্রায় ১৮ হাজার ৫০০ জেলে পরিবারের মধ্যে প্রথম পর্যায়ে ৮ হাজার ২৭১ পরিবারকে জুলাই ও আগস্টের জন্য পরিবারপ্রতি ৮০ কেজি করে ভিজিএফ চাল দেওয়া হয়েছে। মোট ৬৬১ দশমিক ৬৮ মেট্রিক টন চাল বিতরণের তথ্য জানানো হয়েছে। বাকি যোগ্য পরিবারগুলোকে পর্যায়ক্রমে সহায়তার আওতায় আনার কথা বলা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় এটিকে সুন্দরবননির্ভর নিবন্ধিত জেলেদের জন্য প্রথম বিশেষ খাদ্যসহায়তা উদ্যোগ হিসেবে উল্লেখ করেছে।

এই উদ্যোগকে ইতিবাচক বললেও বনজীবীদের দাবি, সহায়তার পরিধি আরও বাড়াতে হবে। কারণ সুন্দরবনের ওপর নির্ভরশীল সবাই নিবন্ধিত জেলে নন। বাওয়ালি, মৌয়ালি, নৌকার মাঝি, শ্রমিক, পর্যটকবাহী ট্রলারের কর্মীসহ বিপুল সংখ্যক মানুষের আয়ও এই তিন মাসে কমে যায় বা বন্ধ থাকে। সবাই যদি সহযোগিতার আওতায় না আসে তাহলে এর সুফল মিলবে না।

তাদের দাবি, নিষেধাজ্ঞাকে শুধু বন সংরক্ষণের কর্মসূচি হিসেবে না দেখে বননির্ভর মানুষের জন্য একটি সমন্বিত 'বন্ধ মৌসুম সহায়তা' কর্মসূচি তৈরি করা দরকার। খাদ্যসহায়তার পাশাপাশি বিকল্প কর্মসংস্থান, সহজ শর্তের ঋণ, প্রশিক্ষণ কিংবা নগদ সহায়তা থাকলে মহাজন ও উচ্চ সুদের ঋণের ওপর নির্ভরতা কমবে।

কথা বলতে বলতে বনজীবীদের অনেকের কণ্ঠে ঋণের দুশ্চিন্তার সঙ্গে উঠে আসে আরেকটি পুরোনো আতঙ্ক, নিরাপত্তা।

সুন্দরবন সংলগ্ন কালিঞ্চি এলাকার বনজীবী শহিদুল গাজী বলেন, 'ঋণ করে নৌকা তৈরি করেছি, জাল ঠিক করেছি। এখন বনে গিয়ে নিরাপদে মাছ ধরতে পারলেই আমরা ঘুরে দাঁড়াতে পারব। কিন্তু নদীর ভেতরে যদি আবার দস্যুদের চাঁদা দিতে হয়, নৌকা আটকায় বা মানুষ ধরে নিয়ে যায়, তাহলে আমরা যাব কোথায়? আমাদের একটাই দাবি, বৈধ পাস নিয়ে বনে গেলে যেন নিরাপদে কাজ করে বাড়ি ফিরতে পারি।'

একাধিক বনজীবীর অভিযোগ, আগের মৌসুমে সুন্দরবনের কিছু নদীপথে দস্যুদের চাঁদা দিতে হয়েছে। তাদের আরও অভিযোগ, চাঁদা দেওয়ার প্রমাণ বা পরিচয় হিসেবে কখনো কখনো নির্দিষ্ট সিরিয়াল নম্বরের টাকার নোট দেওয়া হয় এবং সেটি এক ধরনের 'কোড' হিসেবে ব্যবহৃত হয়।

বনজীবীদের দাবি, নির্দিষ্ট সংকেত বা পরিচয় দেখাতে না পারলে কোনো কোনো এলাকায় নৌকা থামানো, জিজ্ঞাসাবাদ, মারধর কিংবা অপহরণের ভয় থাকে।

বনজীবীরা বলছেন, নতুন মৌসুম শুরু হওয়ার পর বিশেষ করে দুর্গম নদীপথে বন বিভাগ, কোস্ট গার্ড ও নৌ পুলিশের সমন্বিত টহল বাড়ানো জরুরি। শুধু ঘাটে পাস পরীক্ষা নয়, বনের ভেতরেও যেন তারা দ্রুত নিরাপত্তা সহায়তা পান, এটাই তাদের চাওয়া।

শুধু জেলে-বাওয়ালিদের মাঝে নয়, ব্যস্ততা ফিরেছে সুন্দরবনকেন্দ্রিক পর্যটন ব্যবসায়ও। তিন মাস ধরে পড়ে থাকা পর্যটকবাহী ট্রলার ও নৌযান পরিষ্কার করা হচ্ছে। লোনা পানিতে ক্ষতিগ্রস্ত কাঠ ও যন্ত্রাংশ মেরামত, ইঞ্জিন পরীক্ষা, রং করা, আসন ও নিরাপত্তাসামগ্রী ঠিক করার কাজ চলছে। নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার হলে সাতক্ষীরা রেঞ্জের কলাগাছিয়া, দোবেকি, কটকা, কচিখালী, হিরণ পয়েন্ট, দুবলার চর, নীলকমলসহ বিভিন্ন পর্যটন স্পটগুলো খুলে দেওয়া হবে। এসব পর্যটন কেন্দ্রে বন বিভাগের অফিস রয়েছে। নিরাপত্তার দায়িতে রয়েছেন বনবিভাগের সদস্যরা। দর্শনার্থীদের সুবিধা বাড়াতে নতুন হাঁটার পথ, সেতু ও তথ্যকেন্দ্রসহ কিছু অবকাঠামোও তৈরি করা হয়েছে বলে জানিয়েছে বন বিভাগ।

সুন্দরবন ঘুরতে আসা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল শিক্ষার্থী বলেন, সুন্দরবন শুধু ঘোরার জায়গা নয়, প্রকৃতিকে খুব কাছ থেকে দেখার সুযোগ। তিন মাস বন্ধ থাকার পর আগামীকাল সুন্দরবনে যাওয়ার ইচ্ছা আছে। তবে আমরা চাই পর্যটকদের জন্য নিরাপত্তা, পরিচ্ছন্নতা এবং বনের পরিবেশ রক্ষায় নিয়ম মানার ব্যবস্থা আরও কঠোর হোক।

পর্যটন ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত মুন্সিগঞ্জ ফরেস্টঘাট ট্রলার মালিক সমিতির সভাপতি আনিছুর রহমান জাগো নিউজকে বলেছেন, তিন মাস ট্রলার বন্ধ থাকলেও রক্ষণাবেক্ষণের খরচ বন্ধ থাকে না। চালক, শ্রমিকসহ অনেক মানুষ এই ব্যবসার ওপর নির্ভরশীল। বন খুললে পর্যটক বাড়লে পুরো এলাকায় আবার অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়বে। তবে নিরাপদ নৌপথ, ভালো যোগাযোগ এবং বন বিভাগের নিয়ম মেনে পর্যটন পরিচালনা নিশ্চিত করতে হবে।

সাতক্ষীরা রেঞ্জে পর্যটননির্ভর শত শত নৌযান ও ট্রলারের সঙ্গে চালক, সহকারী, বাবুর্চি, গাইড, দোকানদারসহ বহু মানুষের জীবিকা এই পর্যটনের সঙ্গে যুক্ত। ফলে পর্যটন মৌসুম শুরু হলে স্থানীয় অর্থনীতিতেও নতুন গতি তৈরি করবে বলে আশা ব্যবসায়ীদের।

তিন মাসের নিষেধাজ্ঞা বনকে মানুষের চাপ থেকে সাময়িক মুক্তি দিলেও ১ সেপ্টেম্বরের পর আবার জেলে, নৌযান ও পর্যটকদের চলাচল শুরু হবে। পরিবেশ সংশ্লিষ্টদের মতে, এখানেই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

পর্যটন বাড়ানোর পাশাপাশি নৌযানের সংখ্যা, শব্দদূষণ, প্লাস্টিক ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং বন্যপ্রাণীর আবাসস্থলের কাছে পর্যটকদের আচরণ কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা প্রয়োজন। তা না হলে তিন মাসে প্রকৃতি যে বিশ্রামের সুযোগ পেয়েছে, কয়েক মাসের অনিয়ন্ত্রিত পর্যটনেই তার একটি অংশ নষ্ট হতে পারে।

বন বিভাগও পর্যটক ও বনজীবীদের নির্ধারিত বিধিনিষেধ মেনে চলার আহ্বান জানিয়েছে।

বন বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, ১ সেপ্টেম্বর থেকে বৈধ পাস ও পারমিটের মাধ্যমে জেলে-বাওয়ালি ও পর্যটকবাহী নৌযানকে সুন্দরবনে প্রবেশ করতে দেওয়া হবে। একইসঙ্গে নৌযান চলাচল নিয়ন্ত্রণ, প্রবেশ ব্যবস্থাপনা এবং বনের জীববৈচিত্র্য ও সম্পদ রক্ষায় নজরদারি জোরদার থাকবে।

সুন্দরবন পশ্চিম বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা এ জেড এম হাছানুর রহমান জাগো নিউজকে বলেছেন, তিন মাসের নিষেধাজ্ঞার মূল উদ্দেশ্য ছিল মাছ, বন্যপ্রাণী ও উদ্ভিদের প্রজননের জন্য সুন্দরবনকে নিরিবিলি রাখা। আগামীকাল ১ সেপ্টেম্বর থেকে নিয়ম মেনে পাস (অনুমতি পত্র) দেওয়া হবে। তবে এরপরও বনজীবীদের নিরাপত্তা, অবৈধ প্রবেশ, বিষ দিয়ে মাছ ধরা ও বন্যপ্রাণী শিকার ঠেকাতে নিয়মিত টহল ও নজরদারি অব্যাহত থাকবে। দস্যু দমন ও অপরাধ প্রতিরোধে প্রয়োজন অনুযায়ী অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গেও সমন্বয় করা হবে।

তিনি আরও বলেন, নিষেধাজ্ঞার সময় স্মার্ট প্যাট্রোলিং, বিশেষ অভিযান এবং দুর্গম এলাকায় প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারির কারণে বন অপরাধ আগের চেয়ে অনেক বেশি নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হয়েছে।

তবে সুন্দরবন সংশ্লিষ্টদের দাবি, বন বাঁচানো আর বনজীবীকে বাঁচানো, দুই চ্যালেঞ্জ একসঙ্গে সুন্দরবনের সামনে। তাই এখন দুটি সমান্তরাল বাস্তবতা। একদিকে তিন মাসের নীরবতায় নদী-খালে মাছের প্রজনন, বন্যপ্রাণীর অবাধ বিচরণ এবং নতুন গাছপালার বেড়ে ওঠার সুযোগ তৈরি হয়। পৃথিবীর বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বনকে টিকিয়ে রাখতে এই বিশ্রামের প্রয়োজন অস্বীকার করার সুযোগ নেই। অন্যদিকে সেই বনকে ঘিরেই প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বেঁচে থাকা বননির্ভর মানুষের জীবনে এই তিন মাস আসে আয়হীনতা, ঋণ আর অনিশ্চয়তা নিয়ে।

তাই শুধু নিষেধাজ্ঞা দিয়েই সুন্দরবন সংরক্ষণ দীর্ঘমেয়াদে সফল করা কঠিন। তাদের মতে, প্রকৃত বনজীবীদের বিকল্প জীবিকা ও নিয়মিত সহায়তার আওতায় আনা গেলে তারা অবৈধ আহরণের চাপ থেকে দূরে থাকতে পারবেন। একই সঙ্গে বন অপরাধ ও দস্যুতার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিশ্চিত করা গেলে বৈধভাবে জীবিকা নির্বাহও সহজ হবে।

সোমবার শেষ হচ্ছে তিন মাসের অপেক্ষা। মঙ্গলবার ভোর থেকে আবারো সুন্দরবনের দিকে ছুটবে নৌকা। কোনো নৌকায় থাকবে জাল, কোনো নৌকায় কাঁকড়া ধরার সরঞ্জাম, পর্যটন ট্রলারে উঠবেন দর্শনার্থীরা।

কিন্তু সেই নৌকাগুলোর সঙ্গে সুন্দরবনের নদীপথে যাবে আরও অনেক কিছু তিন মাসের ধারদেনা, সন্তানদের ভবিষ্যতের হিসাব, পরিবারের প্রত্যাশা আর নিরাপদে ঘরে ফেরার প্রার্থনা। বনজীবীদের কাছে তাই ১ সেপ্টেম্বর শুধু সুন্দরবনের দুয়ার খোলার দিন নয়। এটি আবার জীবনের চাকা ঘোরানোর দিন। তাদের প্রত্যাশা, সুন্দরবনের প্রাণও বাঁচুক, আর সুন্দরবনের উপর নির্ভর করে বেঁচে থাকা মানুষগুলোও যেন বাঁচতে পারেন।

জাগো নিউজ ২৪দা এগ্রো নিউজ

পরিবেশ

সম্পর্কিত খবর

পরিবেশ

বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি দেখা যায় যে ১০ সাপ, যেগুলো বিষধর

সাপ মানেই সেটি বিষধর- এমন ধারণা আমাদের অনেকের মধ্যে রয়েছে। বাড়ির উঠান, ঝোপঝাড়, কৃষিজমি কিংবা জলাশয়ের পাশে সাপের দেখা গেলে আতঙ্কিত হয় আমরা। অনেকে সাপটি চেনার আগেই সেটিকে মেরে ফেলে। অথচ বাংলাদেশে নিয়মিত দেখা যায় এমন সাপের একটি বড় অংশই বিষধর নয়।

জাগো নিউজ ২৪১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬৮ মিনিটের পড়া
পরিবেশ

সঙ্গী হারালে একাকী জীবন, বংশবৃদ্ধি থমকে হারিয়ে যাচ্ছে শকুন

একসময় ভাগাড়ে তাকালেই দেখা মিলতো শকুনের। মৃত প্রাণী খেয়ে জীবন ধারণ করে বলে ‌'প্রকৃতির ঝাড়ুদার' বলা হয় এই প্রাণীকে। তবে দিন দিন কমছে শকুনের সংখ্যা। বলতে গেলে বিলুপ্তির পথে প্রাণীটি।

জাগো নিউজ ২৪১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬৫ মিনিটের পড়া

মন্তব্য

()