সিলেটে প্রাকৃতিক দুর্যোগ বন্যা থেকে রেহাই পায়নি পশুপাখিও। প্রচণ্ড ঝড়বৃষ্টির কবলে পড়ে প্রাণ বাঁচাতে নগরের এক শিক্ষকের বাসায় আশ্রয় নেয় একটি লক্ষ্মীপ্যাঁচা।
বিরল প্রজাতির বিপদগ্রস্ত লক্ষ্মীপ্যাঁচাটি না তাড়িয়ে সেবা-যত্ন দিয়ে সুস্থ করে তোলেন সিলেটের স্কলার্স হোমের প্রাণিবিজ্ঞান বিভাগের প্রভাষক নাসরিন জাহান মাধুরী ও তার মেয়ে। মা-মেয়ের ভালোবাসায় সুস্থ হয়ে পরদিন পাখিটি তার নীড়ে ফিরে যায়।
শিক্ষিকা মা মাধুরীর মেয়ে তাহসিন তারান্নুম প্রত্যাশা পেশায় একজন চাকরিজীবী। তিনি নগরের সোবহানীঘাট এলাকায় একটি ভিসা পরামর্শক হিসেবে কর্মরত। সিলেট নগরের শাহী ঈদগাহ এলাকার অনামিকা ১৪/এ নম্বর চা-বাগান সংলগ্ন বাসার বাসিন্দা প্রভাষক নাসরিন জাহান মাধুরী লক্ষ্মীপ্যাঁচার ছবি দিয়ে বৃহস্পতিবার রাতে নিজের ফেসবুক ওয়ালে স্ট্যাটাস দেন, 'আজ অঝোর বর্ষণে ডুবে আছে শহর। আষাঢ়ের চিরচেনা রূপ। মন যখন বৃষ্টি কদম কেয়ায় ভিজে কাঁথা মুড়ি দিয়ে ওম খুঁজে, তখন ভর সন্ধ্যায় এক লক্ষ্মীপ্যাঁচা এসে আশ্রয় নিলো আমার ঘরে।'
তিনি আরও লেখেন, 'সন্ধ্যা থেকে মা-মেয়ে প্যাঁচা নিয়েই ব্যস্ত। কী খাবার দেওয়া যায়! কীভাবে কম্ফোর্ট দেওয়া যায়। আমরা ওই রুমে গেলেই চোখ গোল করে তাকিয়ে থাকে। দেখতে ভয়ঙ্কর মনে হলেও পাখিটি একেবারেই নিরীহ।' তিনি উল্লেখ করেন, 'উইকিপিডিয়ায় এটিকে ব্রাউন বুবুক বলা হচ্ছে। মূলত পোকামাকড় এদের খাবার। তাই কী খাওয়ানো যায় ভাবছি। পানি দিয়েছি, খাচ্ছে না যদিও।'
প্রভাষক নাসরিন জাহান মাধুরী জাগো নিউজকে বলেন, তীব্র ঝড়বৃষ্টির কারণে লক্ষ্মীপ্যাঁচাটি আমাদের বাসায় প্রবেশ করে। কিন্তু আমরা মা-মেয়ে এটিকে না তাড়িয়ে আলাদা কক্ষে রেখে স্বাভাবিক হওয়ার সুযোগ দেই। এছাড়া তার বেঁচে থাকার জন্য কিছু খাবার দিয়ে উম্মুক্ত কক্ষে তাকে বন্দি না করেই রাখি। পরদিন শুক্রবার দুপুরে লক্ষ্মীপ্যাঁচাটি উড়াল দিয়ে তার নীড়ে চলে যায়।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) সিলেট কমিটির সাধারণ সম্পাদক আব্দুল করিম কিম জাগো নিউজকে বলেন, নিশাচর পাখি লক্ষ্মীপ্যাঁচা। এটি আমাদের একটি উপকারী প্রাণী। দেশে ১৬ প্রজাতির প্যাঁচা রয়েছে। এর মধ্যে লক্ষ্মীপ্যাঁচা দেখতে আকর্ষণীয়।
শরীরের তুলনায় মুখমণ্ডল অনেকাংশেই বড়। এদের দৈহিক বৈশিষ্ট্যের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক হলো বড় বড় গোল চোখ আর তীক্ষ্ণ দৃষ্টি। মাথা ঘুরিয়ে এরা প্রায় পুরোপুরি পেছনের দিকেও তাকাতে পারে। তীক্ষ্ণ দৃষ্টির কারণে রাতের অন্ধকারেও শিকার ধরতে কোনো অসুবিধা হয় না। এ কারণেই লক্ষ্মীপ্যাঁচা এক জায়গায় চুপচাপ বসে চারদিকে নজর রাখতে পারে।
কিম বলেন, এ পাখির চোখের পুরো অংশই হলুদ রঙের। চোখের তারা এবং পা হলুদ রঙের হয়। পিঠের দিক গাঢ় বাদামি, বুকের ওপর সাদা সাদা অনেক ফোটা থাকে। এরা জোড়ায় জোড়ায় এক জায়গায় থাকতে পছন্দ করে। সন্ধ্যা কিংবা রাতে এ পাখির ডাক শোনা যায়। অন্ধকারে নড়াচড়ার শব্দ শুনেই তারা শিকারের অবস্থান বুঝতে পারে।
তিনি বলেন, বেশির ভাগ প্যাঁচারই লম্বা ও ধারালো নখ আছে। শিকারের সন্ধান পেলে বাঁকানো নখের থাবায় শিকার ধরে। এরা জীবনধারণ করতে ছোট ইঁদুর, শুঁয়াপোকা, ছোট পাখি, টিকটিকি, ধোড়া সাপ, ব্যাঙ খেয়ে থাকে। দিনের আলো একেবারেই সহ্য করতে পারে না। তাই বড় বড় গাছের কোটরে, বন-জঙ্গল, দালানের ফাঁকফোকর কিংবা গাছগাছালির ঘনপাতার আড়ালে লুকিয়ে থাকে।
কিম জানান, সনাতন ধর্মাবলম্বীদের কাছে দেবী লক্ষ্মীর বাহন হচ্ছে লক্ষ্মীপ্যাঁচা। তাই অনেক গৃহস্থ ঘরে লক্ষ্মীপ্যাঁচা ঢুকলে যেন উড়ে না যায় সেই চেষ্টা করেন। তাদের বিশ্বাস, ঘরে লক্ষ্মীপ্যাঁচা থাকলে ধন-সম্পদে পূর্ণ হবে। আবার কোনো কোনো অঞ্চলে প্যাঁচার গুরুগম্ভীর ডাককে অশুভ প্রতীক বলে মনে করা হয়। প্যাঁচা ডাকলে ঘরে ওঠার সিঁড়িতে জল ঢেলে দেওয়া হয়। তাদের বিশ্বাস, এতে সব ধরনের অকল্যাণ থেকে মুক্তি পাওয়া যায়।
উইকিপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, পৃথিবীজুড়ে ১৭০ প্রজাতির প্যাঁচা দেখা গেলেও বাংলাদেশে রয়েছে ১৬ প্রজাতির। এর মধ্যে দেখতে আর্কষণীয় হলো লক্ষ্মীপ্যাঁচা। সারাবিশ্বে লক্ষ্মীপ্যাঁচার মোট ২৮টি শনাক্ত হওয়া উপপ্রজাতির মধ্যে বাংলাদেশে তিনটি পাওয়া গেছে। সেগুলো হলো-অস্ট্রেলেশিয়ান গ্রাস-আউল, লক্ষ্মীপ্যাঁচা এবং অরিয়েন্টাল বে-আউল।
ছামির মাহমুদ/এফএ/জেআইএম





মন্তব্য
(০)