বর্তমানে মরুকরণ পরিবেশের জন্য অন্যতম চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে। চরম খরা এবং জলবায়ু পরিবর্তন দ্রুত এ অঞ্চলগুলোকে অনুর্বর মরুভূমিতে রূপান্তর করছে। বিশ্বের এক-তৃতীয়াংশ মানুষ এ শুষ্ক ভূমিগুলোতে বাস করে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, ভূমির 'অবনতি'র কারণে খাদ্য নিরাপত্তা, দারিদ্র্য এবং ব্যাপক উদ্বাস্তু সমস্যার মুখোমুখি হতে হবে।
মরুকরণ হলো এমন একটি প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে উর্বর ভূমি জীববৈচিত্র্য এবং উৎপাদনশীলতা হারিয়ে মরুভূমিতে পরিণত হয়। জাতিসংঘের মতে, বর্তমানে বিশ্বের অন্তত ৪০ শতাংশ ভূমি মরুকরণের শিকার। বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি, বন ধ্বংস এবং অপ্রত্যাশিত কৃষি কার্যক্রমের পাশাপাশি নগরায়ণ এ সমস্যার প্রধান কারণ। জাতিসংঘের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০৫০ সালের মধ্যে খরা বিশ্বের ৭৫ শতাংশ জনসংখ্যাকে প্রভাবিত করতে পারে।
মরুকরণের ফলে খাদ্য নিরাপত্তা এবং টেকসই কৃষি ব্যবস্থা ঝুঁকিতে পড়ছে। প্রতিনিয়ত উর্বর ভূমি অবনতির শিকার হওয়ায় জীববৈচিত্র্য হ্রাস, ক্ষুধা এবং দারিদ্র্য বাড়ছে। জাতিসংঘের মতে, সীমিত সম্পদের কারণে সংঘাত এবং বাধ্যতামূলক স্থানান্তরের মতো সামাজিক সমস্যা দেখা দিতে পারে।
জাতিসংঘের মেরুকরণবিরোধী সংস্থা ইউনাইটেড নেশন্স কনভেনশন টু কমব্যাট ডেজার্টিফিকেশনের (ইউএনসিসিডি) নির্বাহী সচিব ইব্রাহিম থিয়াও বলেন, 'ভূমি আমাদের জীবনধারণের ভিত্তি—এটি আমাদের খাদ্য সরবরাহ করে, অর্থনীতি শক্তিশালী করে এবং আমাদের পরিবেশকে সুরক্ষিত রাখে।'
জাতিসংঘ মাটি পুনরুদ্ধার এবং টেকসই কৃষি ব্যবস্থা উন্নয়নের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। পশ্চিম আফ্রিকায় 'হাফ-মুন' তৈরির মাধ্যমে পানি ধারণক্ষমতা বাড়ানো হচ্ছে, যা স্থানীয়ভাবে সহজে তৈরি করা সম্ভব। অন্যদিকে আফ্রিকার সাহেল অঞ্চলে 'গ্রেট গ্রিন ওয়াল' প্রকল্পের মাধ্যমে প্রায় ৮ হাজার কিলোমিটার এলাকাজুড়ে গাছপালা রোপণ করা হচ্ছে। তবে অর্থের অভাবে প্রকল্পটি ধীরগতিতে এগোচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সমন্বিত বৈশ্বিক প্রচেষ্টা ছাড়া এ সংকট মোকাবিলা সম্ভব নয়। জলবায়ু পরিবর্তন এবং ভূমির অবনতির এ চ্যালেঞ্জ মানবতার ভবিষ্যৎকে বিপন্ন করে তুলেছে। অন্যদিকে বাংলাদেশের ২ কোটি মানুষ বাস্তুচ্যুত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছেন। জাতিসংঘের জলবায়ু সম্মেলন কপ২৭-এ এক আলোচনায় এ চিত্র উঠে আসে। এটা সারাবিশ্বের জন্য নিরাপত্তা ঝুঁকি। এ অবস্থায় বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তন সহনশীলতা বা অভিযোজনের জন্য তহবিল দ্বিগুণ করার দাবি জানিয়েছে। মিশরের শারম আল শাইখে কপ২৭-এ জলবায়ু পরিবর্তনের প্রেক্ষিতে অভিবাসন বিষয়ে আলোচনায় বাংলাদেশের প্রতিনিধি এ বিষয়ে আলোকপাত করেন। সেখানে তিনি জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে অভ্যন্তরীণ অভিবাসনের চিত্র তুলে ধরেন। তিনি বলেন, 'আজকে সাড়ে ৬ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত। বিভিন্ন হিসেবে দেখা গেছে, এ সংখ্যা ২ কোটিতে গিয়ে পৌঁছাবে।'
বাংলাদেশের প্রতিনিধি আরও বলেন, 'এর বাইরে নিজের স্বাভাবিক আবাস হারাবার ঝুঁকিতে আছেন এর প্রায় দ্বিগুণ।' বিশ্ব ব্যাংক বলছে, লবণাক্ততা, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি ও জলবায়ু পরিবর্তনজনিত অন্যান্য কারণে ২০৫০ সাল নাগাদ ৪ কোটি মানুষ তাদের স্বাভাবিক বাসস্থান থেকে সরে যেতে বাধ্য হবেন। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাস্তুচ্যুতি অন্যান্য যে কোনো অভ্যন্তরীণ বাস্তুচ্যুতির চেয়ে বেশি হওয়ার আশঙ্কা আছে। এ মানুষগুলোর বাস্তুচ্যুতি বিশ্বকে ঝুঁকিতে ফেলবে বলে মনে করেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রণালয়। তারা বলেন, এর দায়িত্বও তাই সবাইকে নিতে হবে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে তৈরি হওয়া উদ্বাস্তুদের পুনর্বাসনের দায়ের ভাগ নিতে বিশ্ব নেতৃত্বের এগিয়ে আসতে হবে এখনই। ...আমরা যদি এখনই সংশোধনমূলক ব্যবস্থা না নিই, তাহলে এটা শুধু বাংলাদেশের জন্য নয়। বিশ্বের জন্য একটা নিরাপত্তা ইস্যুতে পরিণত হবে।
বাংলাদেশ বলছে, বৈশ্বিক অর্থায়ন এখনো পর্যন্ত কার্বন নিঃসরণ কমানোর প্রকল্পেই যাচ্ছে। সেখানে বাংলাদেশের প্রয়োজন এ পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাওয়াবার জন্য অর্থ। কপের শুরুতে বাংলাদেশ ন্যাশনাল এডাপটেশন প্ল্যান বা জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনা তুলে ধরে। সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে ২০৫০ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশের প্রতি বছর গড়ে প্রয়োজন সাড়ে আট বিলিয়ন ডলার বা পঁচাশি হাজার কোটি টাকা। কোপেনহেগেন সম্মেলনে যে প্রতিশ্রুতি করা হয়েছিল, তা বাস্তবায়িত হয়নি। এর মধ্যে যা পাওয়া গেছে, এর প্রায় ৮০ ভাগ যাচ্ছে কার্বন নিঃসরণ কমানোর খাতে। ৭০ ভাগেরও বেশি ঋণ হিসেবে সরবরাহ করা হয় এবং তা বাজারমূল্যে দেওয়া হয়। জলবায়ু অর্থায়নের নামে, অর্থ প্রবাহের এমন ধারা অব্যাহত থাকলে তা দুর্বল অর্থনীতির ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য নতুন করে ঋণের বোঝা তৈরি করতে পারে। আমরা জোরালোভাবে প্যারিস চুক্তির সাথে সামঞ্জস্য রেখে অভিযোজন ও প্রশমনের মধ্যে সুষমভাবে বরাদ্দ এবং অভিযোজনের জন্য অনুদান-ভিত্তিক অর্থায়নের পক্ষে।
বাংলাদেশের পক্ষে যে দাবিগুলো তোলা হয়, তা হলো—২০৩০ সালের মধ্যে বৈশ্বিক কার্বন নিঃসরণ ৪৫% হ্রাস করার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ চূড়ান্ত করা। ডব্লিউএমও মহাসচিব পেটেরি তালাস বলেছেন, সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ সম্প্রদায়গুলো কীভাবে আবহাওয়া, জলবায়ু ও পানিসম্পর্কিত বিপদের শিকার হয়, তা দেখিয়ে দিয়েছে মিয়ানমার-বাংলাদেশের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া ঘূর্ণিঝড় মোখা। তিনি বলেন, অতীতে মিয়ানমার এবং বাংলাদেশ উভয়েই (প্রাকৃতিক দুর্যোগে) হাজার হাজার এমনকি কয়েক লাখ মানুষের প্রাণহানির শিকার হয়েছে। তবে প্রাথমিক সতর্কতা এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার জন্য এ বিপর্যয়মূলক মৃত্যুর হার এখন ইতিহাস।
তাই আগাম সতর্কতা জীবন বাঁচায়। ডব্লিউএমওর মতে, বিশ্বজুড়ে ক্রান্তীয় ঘূর্ণিঝড়গুলোই প্রাণহানি ও অর্থনৈতিক ক্ষতির বড় কারণ। সংস্থাটির হিসাবে, গত অর্ধশতাব্দীতে আফ্রিকায় আবহাওয়া, জলবায়ু ও পানির সঙ্গে সম্পর্কিত ১ হাজার ৮০০টির বেশি দুর্যোগ এবং ৭ লাখ ৩৩ হাজার ৫৮৫টি প্রাণহানি রেকর্ড করা হয়েছে। সবচেয়ে বেশি ২ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলারের ক্ষতি করেছিল ২০১৯ সালের ঘূর্ণিঝড় ইদাই। একই সময়ে দক্ষিণ-পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরে আঘাত হেনেছে প্রায় দেড় হাজার দুর্যোগ, ফলে ৬৬ হাজার ৯৫১ জন মারা গেছেন এবং ১৮৫ দশমিক ৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়েছে। এশিয়া ৩ হাজার ৬০০টিরও বেশি বিপর্যয়ের মুখোমুখি হয়, যাতে প্রাণ গেছে ৯ লাখ ৮৪ হাজার ২৬৩ জনের। অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়েছে ১ দশমিক ৪ ট্রিলিয়ন ডলারের। এ অঞ্চলে বেশিরভাগ ক্ষয়-ক্ষতিই হয়েছে ঘূর্ণিঝড়ের কারণে।





মন্তব্য
(০)