বিশ্বের বড় অংশে মাটির অবক্ষয় আরও খারাপ হচ্ছে, অথচ তা ঠেকানোর পরীক্ষিত পদ্ধতিগুলো এখনো প্রয়োজনীয় গতিতে গ্রহণ করা হচ্ছে না—উলানবাটারে জাতিসংঘের মরুকরণবিরোধী সম্মেলনে প্রকাশিত এক বৈশ্বিক মূল্যায়নে এমনটাই জানিয়েছে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও)।
‘স্ট্যাটাস অব দ্য ওয়ার্ল্ডস সয়েল রিসোর্সেস ২০২৬’ প্রতিবেদনটি তৈরি হয়েছে ২০১৫ থেকে ২০২৫ সালের বৈজ্ঞানিক সাহিত্য এবং ৭৫টি দেশের বিশেষজ্ঞ মতামতের ভিত্তিতে; ২০১৫ সালে গ্লোবাল সয়েল পার্টনারশিপের মাধ্যমে প্রকাশিত প্রথম মূল্যায়নের হালনাগাদ এটি। মূল বার্তা জ্ঞান ও প্রয়োগের ফারাক: পর্যালোচিত আঞ্চলিক ও উপ-আঞ্চলিক মূল্যায়নের অর্ধেকের বেশিতে টেকসই মাটি ব্যবস্থাপনার প্রয়োগ কম বা খুব কম, ৫৮ শতাংশে ২০১৫ সালের পর অবস্থার অবনতি হয়েছে এবং উন্নতির কথা জানিয়েছে মাত্র ১০ শতাংশ।
এফএওর উপমহাপরিচালক বেথ বেকডল বলেন, “বিশ্বের মাটির ওপর কী কী চাপ পড়ছে এবং কোন পদ্ধতিগুলো মাটিকে রক্ষা ও পুনরুদ্ধার করতে পারে—দুটো বিষয়েই আজ আমাদের হাতে অনেক ভালো প্রমাণ আছে। কিন্তু এই প্রতিবেদন স্পষ্ট করছে, পরীক্ষিত সমাধানগুলো এখনো প্রয়োজনীয় গতিতে ও পরিসরে প্রয়োগ হচ্ছে না। এখন অগ্রাধিকার হলো দেশ, কৃষক ও অন্যান্য ভূমি ব্যবহারকারীকে সেই জ্ঞান, সক্ষমতা ও প্রণোদনা দেওয়া, যা দিয়ে তাঁরা সমাধানগুলো কাজে লাগাতে পারবেন।”
যে পদ্ধতিগুলোর কথা বলা হচ্ছে, সেগুলো পরীক্ষামূলক কিছু নয়। কম চাষ, সমন্বিত পুষ্টি ব্যবস্থাপনা, ফসলের বৈচিত্র্য, আচ্ছাদন ফসল, জৈব উপকরণ ও কৃষি-বনায়ন—সবই মাটির ওপর চাপ কমাতে পারে, একই সঙ্গে ফলন ধরে রাখতে বা বাড়াতে পারে। সমস্যা হলো পরিসর।
সবচেয়ে মারাত্মক ও সবচেয়ে বেশি আন্তঃসম্পর্কিত হুমকি হিসেবে উঠে এসেছে ভূমিক্ষয়। মূল্যায়ন করা সাতটি অঞ্চলে ৮১ শতাংশ ক্ষেত্রে ভূমিক্ষয় ব্যবস্থাপনাকে খারাপ বা খুব খারাপ বলা হয়েছে এবং ৬৫ শতাংশে ২০১৫ সালের পর অবনতি হয়েছে। পুষ্টি ব্যবস্থাপনার চিত্র অঞ্চলভেদে আলাদা—কোথাও অতিরিক্ত উপকরণ ব্যবহারে উদ্বৃত্ত, আবার কোথাও পুষ্টির ঘাটতি ফলন ও খাদ্য নিরাপত্তাকে আটকে রাখছে। এ কারণেই প্রতিবেদনটি একক সমাধানের বদলে স্থানভেদে উপযোগী পদ্ধতির ওপর জোর দিয়েছে।
চাপ বেড়েছে অনেক। ২০১৫ সালের পর বিশ্বের জনসংখ্যা বেড়েছে ৮০ কোটি এবং প্রধান ফসলের আবাদি এলাকা বেড়েছে ৮ কোটি হেক্টর; সেই সঙ্গে নগরায়ণ, অটেকসই কৃষি, শিল্প কার্যক্রম, সংঘাত ও দূষণ মাটির কার্যক্ষমতা কমিয়ে দিচ্ছে। মানুষের খাওয়া খাদ্যের ৯৫ শতাংশের বেশি আসে মাটি থেকে; পাশাপাশি মাটি পানি ধরে রাখে ও ছেঁকে দেয়, জলবায়ু নিয়ন্ত্রণ করে এবং জীববৈচিত্র্য টিকিয়ে রাখে।
প্রতিবেদনে পাঁচটি অগ্রাধিকার ঠিক করা হয়েছে—মাটি নিয়ে সুশাসন ও আইনি কাঠামো শক্তিশালী করা; শিক্ষা, সক্ষমতা উন্নয়ন ও জ্ঞান বিনিময়; সমন্বিত তথ্য, সূচক ও পদ্ধতির মাধ্যমে নজরদারি উন্নত করা; টেকসই মাটি ব্যবস্থাপনার জন্য প্রণোদনা বাড়ানো; এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক ও বহুবিষয়ক সিদ্ধান্ত গ্রহণ। নীতিনির্ধারকদের কাছে এর স্পষ্ট দাবি—সুস্থ মাটিকে কৌশলগত সম্পদ হিসেবে গণ্য করা।
একই দিনে প্রকাশিত দ্বিতীয় প্রকাশনা ‘লিভিং সয়েলস, প্রোডাক্টিভ ল্যান্ডস, রেজিলিয়েন্ট ল্যান্ডস্কেপস’ তৈরি হয়েছে জাতিসংঘ মরুকরণবিরোধী কনভেনশনের সঙ্গে যৌথভাবে। এটি ভূমি অবক্ষয় নিরপেক্ষতার কেন্দ্রে কৃষিজমিকে রাখে—একটি দীর্ঘদিনের ঘাটতি পূরণ করে, কারণ মানুষের কারণে হওয়া অবক্ষয়ের বড় অংশ কৃষিজমিতে হলেও পুনরুদ্ধার পরিকল্পনায় তা কম গুরুত্ব পেয়ে এসেছে। বিচ্ছিন্ন পুনরুদ্ধার প্রকল্পের বদলে উৎপাদনশীল ভূদৃশ্যের সমন্বিত ব্যবস্থাপনার ওপর জোর দিয়েছে নির্দেশিকাটি।
সূত্র: এফএও নিউজরুম





মন্তব্য
(০)