জলবায়ু সংকটের এই সময়ে পরিবেশ রক্ষার আন্দোলন এখন আর শুধু সভা-সেমিনার বা মাঠপর্যায়ে সীমাবদ্ধ নেই, ডিজিটাল মাধ্যমের শক্তিতে তা ছড়িয়ে পড়েছে সবার হাতের মুঠোয়। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্ম সোশ্যাল মিডিয়াকে কাজে লাগিয়ে তৃণমূল পর্যায়ে দারুণ সব পরিবেশবাদী উদ্যোগ গড়ে তুলছে। ভার্চুয়াল জগতের সচেতনতামূলক ক্যাম্পেইন কীভাবে বাস্তবে বৃক্ষরোপণ, পরিচ্ছন্নতা অভিযান বা জীববৈচিত্র্য রক্ষার আন্দোলনে রূপ নিচ্ছে, সেই গল্পগুলোই জানিয়েছে কয়েকজন তরুণ পরিবেশকর্মী।
প্রকৃতিকে ভালোবাসার ছোট অনুভূতি থেকেই পরিবেশবাদী সংগঠন 'রেজিলিয়েন্ট প্ল্যানেট সোসাইটি'-এর সঙ্গে আমার পথচলা শুরু। আগে পরিবেশবাদী আন্দোলন সেমিনার বা মাঠপর্যায়ের কিছু কার্যক্রমে সীমাবদ্ধ থাকলেও, এখন একটি ভিডিও বা অনলাইন ক্যাম্পেইন হাজারো মানুষের বিবেককে নাড়িয়ে দেয়। আমাদের সংগঠন শুরু থেকেই ডিজিটাল মাধ্যমকে শুধু প্রচারণার জায়গা হিসেবে নয়, তরুণদের সক্রিয় অংশগ্রহণের প্ল্যাটফর্ম হিসেবে ব্যবহার করছে। অনলাইনে সচেতনতামূলক কনটেন্ট প্রকাশের মাধ্যমে আমরা দেখেছি, কীভাবে নতুন স্বেচ্ছাসেবক তৈরি হচ্ছে। তবে শুধু অনলাইনে আলোচনা করে পরিবেশ রক্ষা সম্ভব নয়। তাই আমরা প্রতিটি ডিজিটাল প্রচারণার সঙ্গে মাঠপর্যায়ের কার্যক্রম, যেমন বৃক্ষরোপণ, পরিচ্ছন্নতা অভিযান ও তরুণদের প্রশিক্ষণ যুক্ত রাখি। ডিজিটাল মাধ্যমে ভুয়া তথ্য ও মনোযোগের স্বল্পতা বড় চ্যালেঞ্জ। তারপরও সঠিক উদ্দেশ্য ও নিরবচ্ছিন্ন প্রচেষ্টা থাকলে এটি পরিবেশ আন্দোলনের সবচেয়ে শক্তিশালী হাতিয়ার হতে পারে। পরিবেশ রক্ষা আমাদের সবার মানবিক অঙ্গীকার ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রতি দায়বদ্ধতা।
তৃণমূল পর্যায়ে পরিবেশবাদী আন্দোলন বেগবান করতে ডিজিটাল মাধ্যম এখন একটি শক্তিশালী হাতিয়ার। আমাদের সংগঠন 'প্রফুল্ল'-এর সঙ্গে কাজ করতে গিয়ে দেখেছি, সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে কত দ্রুত বিপুলসংখ্যক মানুষের কাছে সচেতনতার বার্তা পৌঁছে দেওয়া যায়। তরুণ প্রজন্মকে পরিবেশমুখী করতে আমরা অনলাইনে নিয়মিত তথ্যচিত্র ও কনটেন্ট প্রচার করি। তবে আমরা শুধু অনলাইনেই থেমে থাকি না। ক্যাম্পেইন দেখে উদ্বুদ্ধ হয়ে যখন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বা প্রত্যন্ত অঞ্চলে বৃক্ষরোপণে যাই, তখন সাধারণ মানুষের অভূতপূর্ব সাড়া পাই। অনলাইনের উদ্দীপনা আর মাঠের বাস্তবতার মধ্যে ভারসাম্য রাখাটাই আমাদের কাছে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। ভার্চুয়াল জগতে যে জনবল চোখে পড়ে, মাঠে নামলে অনেক সময় তাদের দেখা মেলে না। এই দূরত্ব ঘোচাতে আমরা অনলাইন প্ল্যাটফর্মকে শুধু প্রচারের জায়গা না ভেবে স্বেচ্ছাসেবক সংগ্রহের মূল উৎস হিসেবে কাজে লাগাচ্ছি। যারা নতুন করে পরিবেশ নিয়ে কাজ করতে চান, তাদের বলব, ভার্চুয়াল প্রচারণার পাশাপাশি মাটির কাছে যান। সাধারণ মানুষকে সঙ্গে নিয়ে ছোট ছোট উদ্যোগে যুক্ত হোন। কারণ, প্রকৃত পরিবর্তন আসে মাঠ থেকেই।
'মিশন গ্রীন বাংলাদেশ' তরুণদের নিয়ে দেশব্যাপী পরিবেশ সচেতনতা তৈরিতে কাজ করছে। পরিবেশ আন্দোলনকে তৃণমূলে ছড়িয়ে দিতে আমরা ৬৪ জেলায় অনলাইন নেটওয়ার্কিংয়ের মাধ্যমে সবাইকে 'সবুজ ছাতায়' যুক্ত করছি। পরিবেশের সৌন্দর্য, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ ও জলবায়ু সচেতনতা নিয়ে আমরা নিয়মিত দৃশ্যমান কনটেন্ট তৈরি করি। তবে অনলাইন ক্যাম্পেইনের পাশাপাশি মাঠে কাজ করতে গিয়ে মিশ্র অভিজ্ঞতা হয়েছে। যেমন-নদী দিবসে তুরাগ পাড়ের মানুষের সঙ্গে নদী রক্ষায় করণীয় নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে দেখেছি, অনেকেই শুনতে আগ্রহী নন। সোশ্যাল মিডিয়ায় মানুষের যে আগ্রহ দেখা যায়, বাস্তবে নিরবচ্ছিন্ন কাজ করার মতো স্বেচ্ছাসেবীর সংখ্যা তার চেয়ে বেশ কম। এমনকি অনলাইনে পরিচালিত জরিপের তথ্যের সাথে মাঠের বাস্তব চিত্র অনেক সময় মেলে না। নতুন যারা প্রকৃতি ও পরিবেশ রক্ষায় কাজ করতে চান, তাদের প্রতি আহ্বান থাকবে মা ও মাটিকে বুকে লালন করার। কেবল সনদ বা প্রশংসার মোহে আটকে না থেকে, নিজে সচেতন হয়ে অন্যকে অনুপ্রাণিত করতে হবে। পরিবেশবিষয়ক আইনকানুন জানার পাশাপাশি সবুজ সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত হলে আমাদের সবুজ ভবিষ্যতের পথচলা আরও মসৃণ হবে।
তথ্যপ্রযুক্তির এ যুগে ডিজিটাল মাধ্যম পরিবেশবাদী আন্দোলনের অন্যতম হাতিয়ার। 'গ্রীন ভয়েস, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়'-এর সঙ্গে কাজ করতে গিয়ে দেখেছি, অনলাইন প্রচারণা সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। ক্যাম্পাসে বৃক্ষরোপণ বা পরিচ্ছন্নতা অভিযানের ছবি ও তথ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারের ফলে তরুণরা পরিবেশবিষয়ক কাজে যুক্ত হতে উৎসাহিত হয়। তবে আমাদের কার্যক্রম শুধু অনলাইনে সীমাবদ্ধ নয়। মাঠপর্যায়ে কাজ করতে গিয়ে সাধারণ শিক্ষার্থী ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছ থেকে আমরা দারুণ সাড়া পেয়েছি। অনলাইন ও বাস্তব কাজের মধ্যে সমন্বয় রাখতে আমরা কর্মসূচি নির্ধারণের পর থেকেই ডিজিটাল মাধ্যমে প্রচারণা চালাই। তবে এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো মানুষের আগ্রহ ধরে রাখা। অনলাইনে অনেকে সমর্থন জানালেও বাস্তব কার্যক্রমে অংশগ্রহণ তুলনামূলক কম থাকে। তারপরও ধারাবাহিক প্রচারণা ও মাঠপর্যায়ের উদ্যোগের মাধ্যমে আমরা এই দূরত্ব কমানোর চেষ্টা করছি। পরিবেশ রক্ষায় বড় পরিকল্পনার অপেক্ষায় না থেকে নিজের আশপাশের সমস্যাগুলো আগে চিহ্নিত করা প্রয়োজন। ছোট ছোট উদ্যোগ ও নিয়মিত অংশগ্রহণের মাধ্যমেই দীর্ঘমেয়াদে বড় পরিবর্তন আনা সম্ভব।
সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে না পারলে যে কোনো ভালো উদ্যোগও পিছিয়ে পড়ে। বর্তমান তথ্যপ্রযুক্তির যুগে ডিজিটাল মাধ্যম শুধু যোগাযোগের উপায় নয়, এটি সামাজিক যে কোনো পরিবর্তনের বড় হাতিয়ার। একটি সাধারণ বার্তা বা উদ্যোগ অনলাইনের মাধ্যমে মুহূর্তেই দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে পৌঁছে যায়।
বিগত দুই বছর বর্ষাকালে বাংলাদেশ তরুণ কলাম লেখক ফোরাম, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় শাখার উদ্যোগে দেশব্যাপী বৃক্ষরোপণ কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়। আমাদের সংগঠনের সদস্য ৬৪ জেলায় নেই। তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উদ্যোগটির প্রচার চালিয়ে আমরা তা অনেকের কাছে পৌঁছে দিতে সক্ষম হই। এর ফলে সংগঠনের সদস্য ছাড়াও অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে বৃক্ষরোপণে অংশ নেন। প্রথমবার সব জেলায় পুরোপুরি বাস্তবায়ন করতে না পারলেও, দ্বিতীয়বার আমরা অনেকটা সফল হই। ৬৪ জেলা থেকে সুনির্দিষ্ট ৬৪ জনকে নিশ্চিত করতে না পারলেও শতাধিক তরুণ আমাদের এই উদ্যোগে যুক্ত হন।
এর পাশাপাশি বৃক্ষরোপণের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আমরা নিয়মিত ফটোকার্ড প্রচার ও লেখালেখি করি। এটা ঠিক যে, অনলাইনে আমরা যত মানুষের সাড়া পাই, তাদের সবাইকে বাস্তবে পাওয়া যায় না। তবে অনলাইনের এই প্রচারণার মাধ্যমেই হয়তো নতুন কোনো উদ্যমী মানুষকে আমরা আমাদের কার্যক্রমে পেয়ে যাই। যারা নতুন করে পরিবেশ নিয়ে কাজ করতে চান, তাদের বলব ডিজিটাল মাধ্যমকে শুধু প্রচারের জন্য নয়, জনসম্পৃক্ততা বাড়ানোর কাজে লাগান। প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার আর আমাদের সামান্য একটু সচেতনতাই আগামী দিনে একটি সুন্দর ও সবুজ পৃথিবীর ভিত্তি গড়ে দিতে পারে।





মন্তব্য
(০)