খরা, মরুকরণ ও জলবায়ু পরিবর্তনে বিপর্যস্ত ভূদৃশ্যের উৎপাদনক্ষমতা ফিরিয়ে আনার কাজে ব্রাজিল, সাহেল অঞ্চল ও সৌদি আরবের তিনটি উদ্যোগকে নতুন ‘ওয়ার্ল্ড রেস্টোরেশন ফ্ল্যাগশিপ’ ঘোষণা করেছে জাতিসংঘ। তিনটি উদ্যোগ মিলে ২০৩০ সালের মধ্যে প্রায় ৫০ লাখ হেক্টর জমি পুনরুদ্ধারের অঙ্গীকার করেছে, যা প্রায় ৭০ লাখ ফুটবল মাঠের সমান।
জাতিসংঘ পরিবেশ কর্মসূচি (ইউএনইপি) ও জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) যৌথ নেতৃত্বে ‘জাতিসংঘ বাস্তুতন্ত্র পুনরুদ্ধার দশক (২০২১–২০৩০)’-এর আওতায় এই স্বীকৃতি দেওয়া হয়; মঙ্গোলিয়ায় জাতিসংঘ মরুকরণবিরোধী কনভেনশনের ১৭তম সম্মেলনের একটি উচ্চপর্যায়ের আয়োজনে তা ঘোষণা করা হয়।
এফএওর মহাপরিচালক কু ডংইউ বলেন, “খাদ্য নিরাপত্তা, ভূমি অবক্ষয় নিরপেক্ষতা, জীববৈচিত্র্য, খাদ্যবৈচিত্র্য ও জলবায়ু সংকট নিয়ে বৈশ্বিক অঙ্গীকার পূরণ করতে চাইলে বিশ্বের অবক্ষয়িত জমি পুনরুদ্ধারকেই অগ্রাধিকার দিতে হবে। পুনরুদ্ধার হওয়া প্রতিটি হেক্টরই টেকসই ভবিষ্যতের দিকে এক ধাপ।” ইউএনইপির নির্বাহী পরিচালক ইঙ্গার অ্যান্ডারসেন যোগ করেন, তিনটি উদ্যোগ “দেখিয়ে দিচ্ছে বাস্তুতন্ত্র পুনরুদ্ধার সবার জন্যই বড় সুফল আনে—খাদ্য নিরাপত্তা, নতুন কর্মসংস্থান এবং লাখো মানুষের বাড়তি সহনশীলতা।”
ব্রাজিলে ‘আরাতিকুম ইনিশিয়েটিভ’ পুনরুদ্ধার করছে সেরাডো—বিশ্বের সবচেয়ে জীববৈচিত্র্যময় ক্রান্তীয় সাভানা। প্রাকৃতিক পুনরুজ্জীবন, সরাসরি বীজ বপন এবং দেশীয় প্রজাতির কৃষি-বনায়ন পদ্ধতিতে কাজ করছে ১৮০টিরও বেশি সংগঠন, আদিবাসী জনগোষ্ঠী, স্থানীয় সম্প্রদায়, কৃষক, গবেষক ও সরকারি প্রতিষ্ঠান; বিস্তৃতি নয়টি রাজ্যে। ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত ২৭ হাজারেরও বেশি হেক্টর পুনরুদ্ধারের আওতায় এসেছে এবং ১৫০টির বেশি দেশীয় উদ্ভিদ প্রজাতির বীজ সংগ্রহ ও ব্যবহার করা হয়েছে; লক্ষ্য ২০৩০ সালের মধ্যে ২০ লাখ হেক্টর।
সৌদি আরবের ‘ন্যাশনাল গ্রিনিং প্রোগ্রাম’-এর লক্ষ্য ২০৩০ সালের মধ্যে ২৫ লাখ হেক্টর পুনরুদ্ধার এবং ২১ কোটি ৫০ লাখ গাছ রোপণ—চারণভূমি, বন, মরুভূমি, নগর এলাকা ও উপকূলীয় ম্যানগ্রোভজুড়ে; এতে সর্বোচ্চ ১ লাখ ৮৭ হাজার কর্মসংস্থান হতে পারে। জাতীয় উদ্ভিজ্জ আচ্ছাদন উন্নয়ন ও মরুকরণ প্রতিরোধ কেন্দ্রের নেতৃত্বে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত ১০ লাখ হেক্টর পুনরুদ্ধারের আওতায় এসেছে এবং ১৫ কোটি ৯০ লাখ গাছ রোপণ হয়েছে। কাজের মধ্যে আছে বনায়ন, প্রাকৃতিক পুনরুজ্জীবন, নিয়ন্ত্রিত চারণ, আরবীয় অরিক্স, গ্যাজেল ও আইবেক্সসহ দেশীয় বন্যপ্রাণী পুনঃপ্রবর্তন, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ এবং শোধিত বর্জ্যপানির ব্যবহার।
বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির নেতৃত্বে বুরকিনা ফাসো, চাদ, মালি, মৌরিতানিয়া ও নাইজারজুড়ে চলা ‘সাহেল ইন্টিগ্রেটেড রেজিলিয়েন্স ইনিশিয়েটিভ’ ভূমি পুনরুদ্ধারকে সরাসরি খাদ্যব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করেছে। ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত এটি ৩ লাখ ৩৫ হাজারেরও বেশি হেক্টর পুনরুদ্ধার করেছে, লক্ষ্য ২০৩০ সালের মধ্যে ৪ লাখ ৭০ হাজার হেক্টর। ভূমি সংস্কার, মাটি ও পানি ব্যবস্থাপনা, জীবিকা সহায়তা ও স্কুল ফিডিং কর্মসূচি মিলিয়ে ৪০ লাখেরও বেশি মানুষ এর সুফল পেয়েছে, যাদের মধ্যে সুদান থেকে আসা শরণার্থীরাও আছেন।
ইউএনসিসিডির নির্বাহী সচিব ড. ইয়াসমিন ফুয়াদ বৃহত্তর পরিবর্তনটি তুলে ধরে বলেন, “ভূমি অবক্ষয়, খরা ও বাস্তুতন্ত্রের ক্ষয় আর কেবল পরিবেশগত উদ্বেগ নয়—এগুলো খাদ্য নিরাপত্তা, পানি নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার মৌলিক চ্যালেঞ্জ।”
প্যারিস জলবায়ু চুক্তি, আইচি জীববৈচিত্র্য লক্ষ্য, ভূমি অবক্ষয় নিরপেক্ষতা লক্ষ্যমাত্রা ও বন চ্যালেঞ্জের আওতায় দেশগুলো ইতিমধ্যেই ১০০ কোটি হেক্টর জমি পুনরুদ্ধারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে; কিন্তু সেই কাজের অগ্রগতি বা মান সম্পর্কে জানা যায় সামান্যই। বর্তমানে ২৭টিতে দাঁড়ানো ফ্ল্যাগশিপগুলোর অগ্রগতি দেখা হয় ‘ফ্রেমওয়ার্ক ফর ইকোসিস্টেম রেস্টোরেশন মনিটরিং’-এর মাধ্যমে।
সূত্র: এফএও নিউজরুম





মন্তব্য
(০)