আমাদের সাথে যোগাযোগ করুন

বিশ্ব

হিন্দি ভাষা দিবস উদযাপনের বিরুদ্ধে খোদ ভারতেরই নানা জায়গায় কেন বিরোধিতা?

মুম্বাইয়ের রাস্তায় হিন্দিতে গ্রাফিতি
মুম্বাইয়ের রাস্তায় হিন্দিতে গ্রাফিতি

ভারতে হিন্দি ভাষার প্রচার ও প্রসারের জন্য আজকের দিনটিকে সেখানে কেন্দ্রীয় সরকার হিন্দি দিবস হিসেবে পালন করছে।

১৯৪৯ সালে ভারতের কনস্টিটুয়েন্ট অ্যাসেম্বলি বা সংবিধান সভা সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, প্রতি বছর ১৪ সেপ্টেম্বর দিনটি ‘রাজভাষা দিবস’ হিসেবে পালন করা হবে – আর সেই রাজভাষাটি হবে হিন্দি।

সেই ধারাবাহিকতায় সত্তর বছরেরও বেশি সময় ধরে এই দিনটিতে রাজভাষা দিবস বা হিন্দি দিবস উদযাপিত হচ্ছে ঠিকই – কিন্তু বিশেষ করে দক্ষিণ ও পূর্ব ভারতে হিন্দি চাপিয়ে দেওয়ার বিরুদ্ধে আন্দোলনও অব্যাহত।

ভারতে প্রায় সব কেন্দ্রীয় সরকারই আগাগোড়া যুক্তি দিয়ে এসেছে বহুভাষাভাষী ওই দেশে ‘লিঙ্ক ল্যাঙ্গুয়েজ’ হিসেবে হিন্দি অপরিহার্য।

কিন্তু হিন্দি ভাষাভাষী নয় এমন বহু রাজ্যই পাল্টা দাবি করে থাকে হিন্দিকে গুরুত্ব দিতে গিয়ে তাদের ভাষাগুলো বঞ্চনার শিকার হচ্ছে।

তিন বছর আগে দিল্লিতে হিন্দি দিবস উদযাপনের অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রপতি ও তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
তিন বছর আগে দিল্লিতে হিন্দি দিবস উদযাপনের অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রপতি ও তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

ভারতের জনসংখ্যার প্রায় ৪৩ শতাংশ হিন্দি বা তার বিভিন্ন ডায়ালেক্ট বা উপভাষায় কথা বলেন, আর এই ভাষাটিকে সারা দেশের প্রধান সরকারি ভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠার তাগিদ চলছে সেই স্বাধীনতার পর থেকেই।

আর ‘হিন্দি, হিন্দু, হিন্দুস্তান’ যে বিজেপির ঘোষিত রাজনৈতিক এজেন্ডা, তাদের আমলে সেই উদ্যোগ আরও গতি পেয়েছে সহজবোধ্য কারণেই।

এবছরের হিন্দি দিবসের ভাষণেও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ বলেছেন, “হিন্দিই হল সেই ভাষা যা সমগ্র ভারতকে একতার সূত্রে বেঁধে রেখেছে।”

ভারতের সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের পেছনে হিন্দি ছাড়া আরও সব ভাষার ভূমিকাকেও স্বীকৃতি দিয়েছেন তিনি, কিন্তু সারা দেশে সরকারি কাজকর্ম যে স্থানীয় ভাষার পাশাপাশি হিন্দিতেই হওয়া বাঞ্ছনীয় – সরকারের সেই অভিপ্রায়ও গোপন করেননি।

কিন্তু সব সরকারি দফতর, অফিস-আদালত কিংবা ব্যাঙ্কে হিন্দিকে সরকার মূল ভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চাইলেও এর বিরুদ্ধে সবচেয়ে বেশি প্রতিরোধ তৈরি হয়েছে দক্ষিণ ভারতে।

যেমন তামিলনাডুর রাজনীতির একটা প্রধান ভিত্তিই হল হিন্দি-বিরোধিতা।

হিন্দি চাপিয়ে দেওয়ার বিরোধিতায় সরব ডিএমকে নেত্রী কানিমোঝি
হিন্দি চাপিয়ে দেওয়ার বিরোধিতায় সরব ডিএমকে নেত্রী কানিমোঝি

তামিল রাজনীতিবিদ ও এমপি কানিমোঝি মাসখানেক আগেই চেন্নাই এয়ারপোর্টে একজন নিরাপত্তাকর্মীর হিন্দি কথা বুঝতে না-পারায় তার অবাক প্রশ্নের মুখে পড়েছিলেন, “ভারতীয় হয়েও কীভাবে আপনি হিন্দি বুঝতে পারেন না?”

সেই অভিজ্ঞতার কথা বর্ণনা করে কানিমোঝি বলছিলেন, “একটা বিশেষ ভাষা না-জানলেই যে একজন কম ভারতীয় হয়ে যান না, সেই বোধটাই আসলে দেশের একটা বড় অংশে তৈরি হয়নি!”

হিন্দি যে কেন্দ্রীয় সরকারের বেশি ‘প্রশ্রয়’ পাচ্ছে, তার বিরুদ্ধে যথেষ্ঠ ক্ষোভ আছে পূর্ব ভারতেও। বাংলা ভাষার সুপরিচিত কবি ও ভাষাবিদ সুবোধ সরকার বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন, এটাও আসলে এক ধরনের বঞ্চনা।

সুবোধ সরকারের কথায়, “ভারতের অন্য সব ভাষার প্রতি আমার যতটা ভালবাসা, হিন্দির প্রতিও সেই সমান ভালবাসা আছে – এক চুলও কম নেই।”

“তবে কথা হল, ভারতের চব্বিশটা প্রধান ভাষাকেই কিন্তু অষ্টম তফসিলে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে – ফলে সংবিধানের চোখে, সাহিত্য অ্যাকাডেমির চোখে তাদের প্রতিটারই সমান মর্যাদা। তাহলে বাংলা ভাষা দিবস নয় কেন, তামিল ভাষা দিবস নয় কেন?”

“আসলে হিন্দিকে গুরুত্ব দিতে গিয়ে বা হিন্দিকে নানা ক্ষেত্রে ছড়িয়ে দিতে গিয়ে বহু বছর ধরে কেন্দ্রীয় সরকার যে বিপুল অর্থ খরচ করে আসছে, অন্য ভাষাগুলোর ক্ষেত্রে কিন্তু তার ভগ্নাংশও করা হয়নি।”

কবি সুবোধ সরকার
কবি সুবোধ সরকার

“এ কারণেই আমার মনে হয় এ ক্ষেত্রে একটা ভাষা প্রবঞ্চনা তৈরি হচ্ছে”, বিবিসিকে বলছিলেন সুবোধ সরকার।

তবে হিন্দির সমর্থকরা অনেকেই যুক্তি দিয়ে থাকেন, এখানে প্রশ্নটা অবহেলা বা বঞ্চনার নয় – ভারতের মতো বহু ভাষার দেশে একটা অভিন্ন যোগসূত্র দরকার সেটা বাস্তবতা, আর তার প্রধান দাবিদার হিন্দিই।

দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও শিক্ষাবিদ গীতা ভাট যেমন বলছিলেন, “ঔপনিবেশিক ধ্যানধারণা আমাদের মধ্যে এমনভাবে শিকড় গেড়েছে যে স্বাধীনতার পরও আমরা বিশ্বাস করে গেছি একমাত্র ইংরেজিই হতে পারে এদেশের অভিন্ন যোগসূত্র।”

“প্রশ্ন হল, একটা স্বদেশি ভারতীয় ভাষা কেন সেই জায়গাটা নিতে পারবে না?”

হিন্দিকে সেই জায়গাটা দেওয়ার জন্যই দিল্লির কেন্দ্রীয় সরকার চেষ্টা চালাচ্ছে গত সাত দশক ধরে, আর তামিলনাডু-পশ্চিমবঙ্গ-অন্ধ্র বা কর্নাটকের অনেকেই ভাবছেন তাহলে আমাদের তামিল-বাংলা-তেলুগু-কন্নড়ই বা কী দোষ করল?

  • কবি সুবোধ সরকার

    কবি সুবোধ সরকার

  • হিন্দি চাপিয়ে দেওয়ার বিরোধিতায় সরব ডিএমকে নেত্রী কানিমোঝি

    হিন্দি চাপিয়ে দেওয়ার বিরোধিতায় সরব ডিএমকে নেত্রী কানিমোঝি

  • তিন বছর আগে দিল্লিতে হিন্দি দিবস উদযাপনের অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রপতি ও তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

    তিন বছর আগে দিল্লিতে হিন্দি দিবস উদযাপনের অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রপতি ও তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

  • মুম্বাইয়ের রাস্তায় হিন্দিতে গ্রাফিতি

    মুম্বাইয়ের রাস্তায় হিন্দিতে গ্রাফিতি

  • কবি সুবোধ সরকার
  • হিন্দি চাপিয়ে দেওয়ার বিরোধিতায় সরব ডিএমকে নেত্রী কানিমোঝি
  • তিন বছর আগে দিল্লিতে হিন্দি দিবস উদযাপনের অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রপতি ও তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
  • মুম্বাইয়ের রাস্তায় হিন্দিতে গ্রাফিতি
সম্পূর্ণ খবরটি পড়ুন
বিজ্ঞাপন
মন্তব্য করুন

অনুগ্রহ করে মন্তব্য করতে লগ ইন করুন লগ ইন

Leave a Reply

পরিবেশ

করোনাকালের বসন্ত

সাতসকালে ঘুম থেকে উঠে কাজে দৌড়াতে হয়। এ জন্য মোবাইল ফোনে অ্যালার্ম দিয়ে রাখতে হয়; না হলে দেরি হয়ে যাওয়ার সুযোগ আছে। গত কদিন অবশ্য অ্যালার্মের আগেই টের পেয়ে যাচ্ছি। কারণটা অনুসন্ধান করতে গিয়ে বুঝলাম, বাসার চারপাশের গাছে পাখিদের গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে। শীতকাল আনুষ্ঠানিকভাবে পাততাড়ি গুটিয়ে বিদায় নিয়েছে আগস্টের ৩১-এ। এমনিতে সিডনির আবহাওয়া যেন পাড়ার পাগলাটে খ্যাপা ছেলেটার মতো। একই দিনে কখনো ঠান্ডা, কখনো গরম, কখনো নাতিশীতোষ্ণ আবার কখনো বৃষ্টি; কিন্তু শীতের পর বসন্তের আগমনী বাতাস দিয়ে ঠিক ঠিক জানিয়ে যায় ঋতুরাজ আসছে। সেপ্টেম্বরের ১ তারিখেই প্রকৃতিতে এমন একটা বাতাস এসে সেই বার্তা জানিয়ে গেল, যে বাতাসকে বাংলাদেশের ভাষায় বলে লিলুয়া বাতাস। লিলুয়া বাতাসে মনটা হয় পাগলপারা। মনের মধ্যে একটা অব্যক্ত কাব্যভাব তৈরি হয়; মনে হয় ঘরবাড়ি ছেড়ে বাইরে চলে যাই। হাঁটতে থাকি গন্তব্যহীনভাবে। অকৃপণভাবে মাখতে থাকি এই লিলুয়া বাতাস। অবস্থাদৃষ্টে মনে হয়, যেন প্রেমটা এই বাতাসের সঙ্গেই, তাই অন্য কোনো সঙ্গীর দরকার নেই। অন্য কেউ থাকলে বরং লিলুয়া বাতাসের সঙ্গে এই নীরব কথোপকথনে ছেদ পড়তে পারে। এরপর থেকে তাপমাত্রা বাড়ছে। আজ যেমন জ্যাকেটটা বাসায়ই ফেলে আসলাম লিলুয়া বাতাসের সঙ্গে মাখামাখি ভালোবাসা করব বলে।

অ্যালার্মের আগেই ঘুম ভেঙে যাওয়ার কারণটা বের করেছি। ঠিক তখনই মনে পড়ে গেল বাংলাদেশের বসন্তকালের সবচেয়ে বড় অনুষঙ্গ শিমুল ফুলের কথা, আমাদের স্থানীয় ভাষায় বলে মাদার ফুল। কুষ্টিয়াতে আমাদের শোয়ার ঘরের ঠিক পেছনেই ছিল একটা বেলগাছ আর তার একটু পেছনেই ছিল একটা শিমুলগাছ। বসন্তের এই সময়টাতে বেল ও শিমুলগাছে ফুল ফুটতে শুরু করলে অনেক পাখি সকাল সকাল এসে হাজির হতো আর তাদের কিচিরমিচির শুনে আমাদের ঘুম ভেঙে যেত। বেলফুলের ঘ্রাণ যে একবার নিয়েছে, সে আর জীবনেও ভুলবে না। বেলগাছটাতেও অনেক পাখি বসত। বেল আর শিমুলগাছ একসময় সমান উচ্চতার ছিল কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় বেলগাছের কলেবর খুব একটা না বাড়লেও শিমুলগাছ ছাতার মতো তার ডালপালা ছড়িয়ে চারিদিক ঢেকে দিয়েছিল। আমরা ঘুম থেকে উঠেই শিমুলগাছের তলায় গিয়ে পড়ে থাকা শিমুল ফুলগুলো বেছে বেছে কুড়িয়ে নিতাম, যেগুলোর পুংকেশরগুলো তখনো শক্ত-সমর্থ আছে। ফুলের সেই অংশটাকে যে পুংকেশর বলে, সেটা জেনেছি অনেক পরে আর স্থানীয় ভাষায় আমরা কী বলতাম, সেটা আর এখন মনে নেই। তারপর শুরু হয়ে যেত আমাদের টানাটানি খেলা। আমার হাতের আঙুলে একটা ছোট পুংকেশর আর মেজোর হাতে একটা পুংকেশর। আমারটার সঙ্গে ওরটার ঘাড়ে ঘাড় লাগিয়ে এক টান৷ যার পুংকেশরের মাথাটা খুলে যাবে, সে হেরে যাবে আর বিপরীতজন জিতে যাবে। ছোটজন আমাদের এই খেলার নিবিষ্ট দর্শক। এভাবেই খেলা চলবে যতক্ষণ পর্যন্ত না ভেতর বাড়ি থেকে মায়ের ডাক পড়ছে।

এসব ভাবতে ভাবতেই দাঁত ব্রাশ করে, হাত-মুখ ধুয়ে ত্বরিত গতিতে তৈরি হয়ে নিলাম। বাইরের দরজা খুলতেই লিলুয়া বাতাসে শরীরটা শীতল হয়ে গেল। গাড়ি স্টার্ট দিতেই পাকিস্তানের নব্বইয়ের দশক কাঁপানো ব্যান্ডের ভোকাল আলী আজমতের কণ্ঠে বেজে উঠল ‘ইয়ার বিনা দিল মেরা নাহি লাগতা’ আসলেই দেশে সব ইয়ার ফেলে এসে বিদেশে আর মন লাগে না। আমি তাড়াতাড়ি গানটা বন্ধ করে দিয়ে গাড়ির কাচগুলো নামিয়ে দিলাম, কারণ বাইরে থেকে হাজারো পাখির গুঞ্জন ভেসে আসছে। কিছু দূর যাওয়ার পর পেম্ব্রুক রোড। এই রাস্তা ধরে সোজা পশ্চিম দিকে গেলেই মিন্টো স্টেশন।

সকালের সূর্যটা একেবারে পেছন দিকে ফেলে এগিয়ে যেতে হয় তখন গাড়ির বাম দিকের লুকিং গ্লাসে সূর্যের ছায়া পড়ে। এটাকে আমার কাছে মামা-ভাগনের লুকোচুরি খেলা মনে হয়। আমি মাথাটা সামনে-পেছনে করে সুয্যিমামার প্রতিবিম্বকে পাশ কাটানোর চেষ্টা করি। অবশ্য স্টেশনের পশ্চিম দিকের প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে যখন ট্রেনের জন্য অপেক্ষা করি, তখনই ঠিকই সুয্যিমামার কাছে ধরা পড়ে যাই। স্টেশনে গাড়ি পার্ক করে কিছু দূর হেঁটে গিয়ে প্ল্যাটফর্মে উঠতে হয়। দেখি স্টেশনমাস্টার একটা পিক আপ লাঠি নিয়ে স্টেশনের বেড়ার বাইরে থেকে আবর্জনাগুলো তুলে তুলে একটা বিন ব্যাগে ভরছেন।

মিন্টো স্টেশনে মোট তিনজন স্টেশনমাস্টার কাজ করেন; এঁদের দুজন প্রৌঢ় মহিলা আর একজন মধ্যবয়সী পুরুষ। আমি ওনাদের প্রত্যেককেই চিনি এবং ট্রেন আসার আগ পর্যন্ত ওনাদের সঙ্গে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলাপ করি। পুরুষ ভদ্রলোকের কথা বলার অসুখ আছে। উনি বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কথা বলেন। গত তিন দিন ছুটিতে ছিলেন। আমি জিজ্ঞেস করলাম, কী করে ছুটি কাটালেন?

– আর কি, সেই পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা অভিযান।

গতকাল বলছিলেন, ওনার মেয়ের বিয়ে উপলক্ষে ওনার শ্যালিকা আর ভায়রা এসেছিলেন ভারত থেকে কিন্তু করোনার কারণে আটকা পড়েছিলেন। সৌভাগ্যবশত গত পরশু তাঁরা যেতে পেরেছেন। আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম, ট্রানজিট কোথায় হবে? বললেন, ইরাকে, কারণ এখন নাকি শুধু এমিরেটস এয়ারওয়েজেরই কয়েকটা বিমান চলছে, বাকিদের পুরোপুরি বন্ধ। তা-ও স্টেশনে বিমানে চড়ার আগে অনেক ধরনের চেকআপ করতে হয়েছে।

গতকাল আমি তাঁকে বলেছিলাম, দেখেছেন তাপমাত্রা বাড়ছে। উনি বলেছিলেন, আজকে তো নাকি তাপমাত্রা ৩০ ডিগ্রি হয়ে যাবে।

আমি বলি, তার মানে তো গ্রীষ্মকাল চলেই এল, কী বলেন?

উনি বললেন, ঠিক তাই।

এরপর ট্রেন চলে আসায় উনি আমাকে বিদায় দিয়ে নিজের অফিসকক্ষের দিকে হাঁটা ধরলেন। মহিলা দুজনের মুখভঙ্গিটাই এমন থাকে যে কেউই সাহস করে তাঁদের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করেন না। তার মধ্যে একজনকে একদিন আমি ট্রেনে দেখে চিনে ফেলেছিলাম এবং জিজ্ঞেস করেছিলাম, আপনি কি আর মিন্টো স্টেশনে কাজ করেন না? শুনে উনি ভীষণ খুশি হয়েছিলেন এবং বলেছিলেন, আসলে শিফট অনুযায়ী কাজ তো, তাই সব সময় মিন্টোতে দেখা যায় না। সেদিন থেকে ওই ভদ্রমহিলার সঙ্গে দেখা হলেই কুশলবিনিময় করি। আর দ্বিতীয় মহিলার সঙ্গে আজ সকালে দেখা হলো।

আমি বললাম, কী সুন্দর একটা দিন এবং দেখেন তাপমাত্রা বাড়ছে।

ওনার উত্তর, হ্যাঁ, অস্ট্রেলিয়ার বসন্তকালটা আসলেই দারুণ। এরপর তাঁকে শুভকামনা জানিয়ে আমি প্ল্যাটফর্মের দিকে হাঁটা দিই। উনিও আমাকে ফিরতি শুভেচ্ছা জানিয়ে নিজের কাজে মন দেন।

ট্রেনে উঠেই ইউটিউব খুঁজে বসন্তের গান ছেড়ে দিই। গান শুরুই হলো শাহ আবদুল করিমের ‘বসন্ত বাতাসে সইগো’ দিয়ে। এরপর এল একটার পর একটা রবীন্দ্রসংগীত, ‘ওহে গৃহবাসী খোল দ্বার খোল’, ‘ফাগুন হাওয়ায় হাওয়ায় করেছি যে দান’, ‘আজি দখিন দুয়ার খোলা’, ‘আহা আজি এ বসন্তে’সহ আরও অনেক গান। তবে আমি বেছে বেছে দলীয় সংগীতগুলো শুনছিলাম; কারণ এর মধ্য দিয়ে উৎসবের আবহ পাওয়া যাচ্ছিল মনে মনে। করোনার ভয় কাটিয়ে ট্রেন-বাসে ভিড় বাড়ছে। অবশ্য আজকে শুক্রবার বলে ট্রেন অনেকটাই ফাঁকা ছিল

মাসকাট স্টেশনে নেমে বাসে করে অফিসে যেতে হয়। অফিসে যাওয়ার পথেই একটা হ্রদ; তার আগে আরও একটু খোলা জায়গা। সেখানে বেশ কয়েকটা পালতে মাদারগাছ। পালতে মাদারগাছেও বসন্তকালে লাল টকটকে ছোট ছোট ফুল ধরে। পালতে মাদারগাছেও বসন্তকালে লাল টকটকে ছোট ছোট ফুল ধরে। কুষ্টিয়া অঞ্চলে শিমুল ফুলকে বলে মাদার ফুল আর মাদার ফুলের চেয়ে ছোট এই ফুলগুলোকে বলে পালতে মাদার। আর অস্ট্রেলিয়ার বসন্তকালের সিগনেচার ফুল ‘ওয়াটল’ তো আছেই। ওয়াটল দেখতে হুবহু বাংলাদেশের বাবলা ফুলের মতো ছোট ছোট হলুদ বর্ণের এবং গাছের পাতার আকৃতিও একই রকম কিন্তু ওয়াটলগাছে বাংলাদেশের বাবলাগাছের মতো বড় বড় কাঁটা নেই।

ছোটবেলায় আমরা যখন রাখালদের সঙ্গে মাঠে গরু রাখতে যেতাম, তখন রাখালেরা একটা জিনিস শিখিয়ে দিয়েছিল। বাবলাগাছের কচি ডগা চিবিয়ে তারপর পানি খেলে পানি মিষ্টি লাগে। এরপর থেকে পানি খাওয়ার আগে সব সময়ই বাবলার ডগা খুঁজে বেড়াতাম। আমি ইচ্ছে করেই দুটো স্টপেজ আগে বাস থেকে নেমে পড়লাম। বাকি রাস্তা হেঁটে যেতে হবে। মিনিট পনেরোর হাঁটা পথ। ঠিক সময়ে অফিসে পৌঁছে যাব। বাস থেকে নেমে কিছু দূর যাওয়ার পর দেখি পালতে মাদারগাছের ফুলগুলো বাতাসে দুলছে আর হাসছে। আমি প্রথমে পুরো গাছটার এবং পরে কয়েকটা ডালের আলাদা ছবি তুলে নিলাম। আরও কিছু দূর যেতেই দেখা পেলাম ওয়াটলগাছের। ওয়াটল ফুলেরও বেশ কয়েকটা ছবি তুলে নিলাম।

হেঁটে হেঁটে অফিসের দিকে যাচ্ছি গায়ে বসন্তের লিলুয়া বাতাসের কোমল পরশ মাখতে মাখতে। গত পরশু দিন ছিল পূর্ণিমা। সারা দিন অফিসে বসে বসে পরিকল্পনা করলাম এবারের পূর্ণিমাটা সৈকতে গিয়ে উপভোগ করব। ব্যাপারটা জানার পর গুগল করে আমার বস ‘ব্রাইটন লে স্যান্ডস’ সৈকতটা দেখিয়ে বলল, এখানে পুরো জায়গাটাই সৈকত। এখানে যেতে পারো। যেখানে পার্কিং পাও, সেখানে নেমে পড়লে। আর কাছাকাছি বাচ্চাদের কয়েকটা খেলাধুলারও জায়গা আছে, তাই ওরাও বিরক্ত হবে না। আর সবচেয়ে ভালো ব্যাপার চাঁদটা উঠবে একেবারে জায়গাটার মাঝখানে দিয়ে, তাই পুরো সৌন্দর্যটা দেখতে পাবে। বাসায় ফিরে গিন্নিকে পরিকল্পনার কথা বলতেই বাতিল করে দিলে; কারণ পরের দিন বাচ্চা দুইটারই স্কুল আছে। সকালে ঘুম থেকে উঠে তাদের তৈরি করে কেয়ারে ড্রপ করে গিন্নি অফিসে যায়। ওরা কেয়ার থেকে স্কুলে যায়।

সৈকতে যাওয়ার পরিকল্পনা বাতিল হয়ে যাওয়ায় আমরা পরিকল্পনা করলাম আমাদের মতো করে পূর্ণিমাটা উদযাপন করার। যেহেতু বসন্ত চলে এসেছে, তাই বাইরের তাপমাত্রা সহনীয়। আমরা আমাদের বাসার পেছনের জায়গাটায় বেরিয়ে পড়লাম। তারপর আমরা তিনজন মিলে কিছুক্ষণ লুকোচুরি (আমাদের এলাকার ভাষায় পলানটুক আর অস্ট্রেলিয়ার ভাষায় পিকাবু) খেললাম। ততক্ষণে চাঁদটা বেশ ওপরে উঠে এসেছে। আমাদের পেছনের প্রতিবেশী কেইনদের বাসায় একটা তালের মতো গাছ আছে আমাদের দুজনের জায়গার মাঝের বেড়া বরাবর। আমরা ইচ্ছে করেই তালগাছের ছায়ায় দাঁড়িয়ে চাঁদ মামার সঙ্গে লুকোচুরি খেলি। তালের পাতার আড়ালে কখনো চাঁদ মামা লুকিয়ে পড়েন আবার কখনোবা আমরা বেড়ার আড়ালে লুকিয়ে পড়ি। এভাবে খেলতে খেলতে ক্লান্ত হয়ে আমরা আমাদের বাইরের ঘরে চলে আসি। সেখানে বাচ্চাদের জন্য নানা ধরনের খেলনা রাখা—লুডু থেকে শুরু করে ক্যারম, দাবা, তাস আর আছে বাচ্চাদের অনেক খেলনা। আমি আর আমার মেয়ে তাহিয়া তাস নিয়ে বসলাম। রায়ান পাশে রাখা বিছানায় শুয়ে কিছুক্ষণের মধ্যেই নাক ডাকা শুরু করল। আমি আর তাহিয়া কল ব্রিজ খেললাম বেশ কিছুক্ষণ। তারপর রাত ১০টার দিকে ঘরে ফিরে এলাম।

কর্মব্যস্ত পাঁচ দিনের শেষে সপ্তাহান্তের দুটো দিন কেটে যায় বাচ্চাদের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের সঙ্গী হয়ে। আমাদের বাসার খুব কাছেই একটা পার্ক আছে; পাসফিল্ড পার্ক। নাম পার্ক হলেও কোনো রাইড নেই শুধু মাঠের মাঝ দিয়ে সরু কংক্রিটের রাস্তা বানানো। তার ওপর দিয়ে মানুষ হাঁটাহাঁটি করে আর বাচ্চারা সাইকেল চালায়। ৩০ আগস্ট রোববার ছেলে রায়ানকে নিয়ে সকালবেলা গেলাম পাসফিল্ড পার্কে। আমি একটা গাছের ছায়ায় একটা মরা গাছের ডালের ওপর বসে থাকলাম আর রায়ান সামনের কংক্রিটের চক্রাকার রাস্তা দিয়ে সাইকেল চালাচ্ছিল আর একটু পরপর এসে পানি খেয়ে যাচ্ছিল। বসন্তের আগমনী বার্তা নিয়ে পাশের গাছগুলোতে বিভিন্ন ধরনের পাখি গান গেয়ে যাচ্ছে। একটা পাখির স্বর শোনা যাচ্ছিল অবিরাম। হালকা হিমেল বাতাস উঁচু ঘাসের ডগাগুলোকে দোলা দিয়ে যাচ্ছিল। মনে হচ্ছিল সারা দিন বসে বাতাসের এই আদর মাখি। সবচেয়ে ভালো হতো ঘাসের বিছানায় শুয়ে পড়তে পারলে।

সে সময়ই বেশ কিছু মানুষ এসেছিল তাদের কুকুরকে নিয়ে হাঁটতে। প্রত্যেকে একই কথা বলছে, আজকে একটা দারুণ দিন। এক প্রৌঢ় দম্পতি আমাদের বললেন, বসন্তের আগমনী বার্তা আবহাওয়ায়। রায়ান অবশেষে ক্লান্ত হয়ে এসে আমার পাশে গাছের ডালটায় বসে বিশ্রাম নিল কিছুক্ষণ, তারপর আবারও ফিরে গেল সাইকেল চালাতে। কী এক অদ্ভুত মায়াময় পরিবেশ ছিল চারপাশে। আসলে প্রকৃতি তাঁর বুকে আমাদের জন্য বিশাল ভালোবাসা জমা করে রেখেছে। আমাদের শুধু একটু থেমে সেটা অনুভব করা দরকার।

অফিসে ঢুকেই আমাদের উদযাপনের কথা বললাম সহকর্মী মিককে (মাইকেলের ডাকনাম)। শুনে সে বলল, খুব ভালো করেছ। আমরা একটু পরে কফি খেতে বের হব। আবহাওয়ার সঙ্গে মানুষের মনের ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার সম্পর্ক খুবই নিবিড়। কফি আনতে যেতে যেতে মিককে বলছিলাম বাংলাদেশে কীভাবে বসন্ত বরণ করে নেওয়া হয়, তার গল্প। আমি বললাম, বসন্তকে আমরা বলি ঋতুরাজ ‘কিং অব অল সিজনস’। আর বসন্তকে বরণ করে নেওয়ার জন্য আছে আমাদের নানা আয়োজন। আর বসন্তকে নিয়ে কত যে গান-কবিতা রচিত হয়েছে, তার ইয়ত্তা নেই। আর প্রকৃতিতেও পরিবর্তনটা সহজেই চোখে পড়ে। সারা দেশ শিমুলের লাল ফুলে রাঙা হয়ে ওঠে। পাখির দৃষ্টিতে দেখলে মনে হবে কোনো অবুঝ শিশু লাল রং হাতে মেখে একটা সবুজ জমিনে ছিটিয়ে দিয়েছে; ঠিক অস্ট্রেলিয়াতে যেমন পথে প্রান্তরে বেগুনি জ্যাকারান্ডা ফুটে থাকে, আমাদের থাকে শিমুল। শুনে মিক বলল, তোমাদের সংস্কৃতি আসলেই অনেক সমৃদ্ধ। আমি বললাম, বহু ধর্মের, বহু মতের মানুষকে এই সংস্কৃতিটাই তো এক করে রেখেছে। আমাদের ইতিহাসও এই সংস্কৃতিনির্ভর কিন্তু এবার বসন্তকে বরণ করে নেওয়ার জন্য কোনো আয়োজন করা হয়নি করোনার প্রাদুর্ভাবের কারণে। মিক বলল, এইবার তো অস্ট্রেলিয়াতে তীব্র শীত পড়ল।

আমি বললাম, হ্যাঁ, এমনকি শীতকালের শেষের কদিনও ভোরবেলা আমি গাড়ির ওপর থেকে পুরু বরফের আস্তরণ সরিয়েছি। ঠান্ডাটা এতই বেশি ছিল যে পানি ঢেলে বরফ পরিষ্কার করার পর আবার সেই পানিটাই বরফে পরিণত হয়ে যাচ্ছিল। আমি বললাম, তবুও দেখো প্রাকৃতিক নিয়মে বসন্ত কিন্তু ঠিকই চলে এল। আমার কেন জানি মনে হয়, করোনার এই প্রাদুর্ভাব তা সে যতই দীর্ঘ হোক না কেন, একদিন না একদিন ঠিক শেষ হবে এবং আমরা আবারও স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যাব। আমরা আবারও আগের মতো নির্ভাবনায় চলাফেরা করতে পারব, সাগরে, সৈকতে, পাহাড়ে বেড়াতে যেতে পারব, সিনেমা দেখতে হলে যেতে পারব।

মিক তখন বলল, গুড ও ইউ মেট।

সম্পূর্ণ খবরটি পড়ুন

পরিবেশ

গরু-ছাগলেই খাচ্ছে ফুল

  • করোনায় বেচাবিক্রি বন্ধ। পাঁচ মাসে নষ্ট হয়েছে ৪৫০ কোটি টাকার ফুল। তাই প্রণোদনা ঋণ পেতে চান ফুলচাষি ও ব্যবসায়ীরা।
  • করোনার কারণে গত ২৪ মার্চ থেকে গদখালী ফুলের বাজার বন্ধ রয়েছে। আর মে মাসের তৃতীয় সপ্তাহে ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড় আম্পানের তাণ্ডবে তছনছ হয়ে গেছে ফুলখেত।
  • বাংলাদেশ ফ্লাওয়ার সোসাইটি জানায় দেশে করোনার কারণে গত পাঁচ মাসে ৪৫০ কোটি টাকার ফুল নষ্ট হয়েছে।

করোনাভাইরাস ও ঘূর্ণিঝড় আম্পান যশোরের গদখালীর ফুলচাষি ও ব্যবসায়ীদের চরম আর্থিক সংকটের মুখে ঠেলে দিয়েছে। কারণ, মাঠে তেমন ফুল নেই, যাও–বা আছে, তা-ও বিক্রি হচ্ছে না। ফলে গরু-ছাগলকেই খাওয়ানো হচ্ছে ফুল। এখন অবস্থা এতটাই সঙিন যে সংসারের দৈনন্দিন খরচ মেটাতেও হিমশিম খাচ্ছেন ফুলচাষি ও ব্যবসায়ীরা। এর ওপর রয়েছে ব্যাংক ও এনজিওগুলোর ঋণ পরিশোধের চাপ।


করোনার কারণে গত ২৪ মার্চ থেকে গদখালী ফুলের বাজার বন্ধ রয়েছে। আর মে মাসের তৃতীয় সপ্তাহে ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড় আম্পানের তাণ্ডবে তছনছ হয়ে গেছে ফুলখেত, ধ্বংস হয়েছে ফুল ও নার্সারির শত শত শেড।

বাংলাদেশ ফ্লাওয়ার সোসাইটির সভাপতি আবদুর রহিম প্রথম আলোকে বলেন, দেশে করোনার কারণে গত পাঁচ মাসে ৪৫০ কোটি টাকার ফুল নষ্ট হয়েছে। এর মধ্যে শুধু যশোর অঞ্চলেই অন্তত ৩০০ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। এতে এই অঞ্চলের ফুলচাষি ও ব্যবসায়ীরা চরম বিপর্যয়ে পড়েছেন।

আবদুর রহিম বলেন, ‘দেশের প্রায় ৩০ লাখ মানুষের জীবিকা ফুলের চাষ ও ব্যবসার ওপর নির্ভরশীল। ফুলচাষিদের প্রায় ৭০ ভাগ বর্গাচাষি। করোনাভাইরাস ও আম্পানের কারণে এই খাতে যে পরিমাণ ক্ষতি হয়েছে, তা পুষিয়ে নিতে ৫০০ কোটি টাকার কৃষি প্রণোদনা ঋণ প্রয়োজন। ক্ষতিগ্রস্ত বর্গাচাষি ও ফুল ব্যবসায়ীদের সহজ শর্তে ৪ শতাংশ সুদে ঋণ দিতে হবে। তা না হলে এই খাতকে বাঁচানো কঠিন হয়ে পড়বে।

২৫ বছর ধরে ফুলের চাষ করা প্রতিবন্ধী ইমামুল হোসেন-সাজেদা দম্পতি জানান, সংসার ও দুই ছেলেমেয়ের লেখাপড়ার ব্যয় মেটাতে ভেঙে পড়া শেডের টিন বিক্রি করে দিয়েছেন। সাজেদা বেগম বলেন, ‘ঋণের কিস্তির জন্য ব্যাংক ও এনজিওর লোকজন নিয়মিত বাড়িতে আসছেন। কিন্তু কিস্তি পরিশোধ করতে পারছি না। কী খাব আর কী করে ঋণ শোধ করব, ভাবতেই মাথায় যেন আকাশ
ভেঙে পড়ে।’

ঝিকরগাছা উপজেলার পানিসারা গ্রামের মহিদুল ইসলাম বলেন, ‘চার বিঘা জমিতে রজনীগন্ধার চাষ করেছি। বিঘাপ্রতি প্রায় তিন লাখ টাকার ফুল বিক্রি হওয়ার কথা। কিন্তু করোনাভাইরাস ও আম্পান আমাদের পথে বসিয়েছে।’

পানিসারার আরেক চাষি মো. জালাল উদ্দীনের একটি ফুলের দোকানও আছে। তিনি জানান, দিনে ১০০ টাকাও বিক্রি হয় না। অথচ আগে ২-৩ হাজার টাকা বেচাকেনা হতো।

ফুলের দোকানি তারেক রহমান বলেন, ‘আগে দিনে ১০-২০ হাজার টাকার এবং বিশেষ দিনগুলোতে ১ লাখ টাকা পর্যন্ত ফুল বিক্রি করেছি। এখন দিনে সর্বোচ্চ ৭০০ টাকার ফুল বিক্রি হয়। এতে চলছে না।’

১৯৮২ সালে একটি নার্সারির মাধ্যমে ঝিকরগাছা উপজেলার পানিসারা এলাকায় ফুলের চাষ শুরু করেন শের আলী সরদার। দেশে বাণিজ্যিকভাবে ফুল চাষের পথিকৃৎ বলা হয় তাঁকে। তাঁকে দেখে পানিসারা ও গদখালী এলাকায় ৭৫টি গ্রামের প্রায় ১০ হাজার চাষি ফুল চাষে এসেছেন। তিনি বলেন, ‘৪১ বছরের ফুল চাষের জীবনে এমন অবস্থা আমি কখনো দেখিনি।’

পানিসারা গ্রামের আজিজুর সরদার জানান, আগে প্রতি মাসে যেখানে দেড় থেকে পৌনে দুই লাখ টাকার ফুল ও চারা বিক্রি হতো, সেখানে গত পাঁচ মাসে হয়েছে মাত্র ৯৫০ টাকা। ব্যাংকে ১৩ লাখ টাকা এবং দুটি এনজিওতে ৭ লাখ টাকার ঋণ রয়েছে তাঁর। ঋণের কিস্তি দিতে ব্যাংক ও এনজিও থেকে চাপ দিচ্ছে। তিনি ঝড়ে ভেঙে পড়া শেডের ৩০০ পিস টিন ৬০ হাজার টাকায় বিক্রি করে এখন সংসার চালাচ্ছেন। আজিজুরের স্ত্রী তপুরা বেগম বলেন, খুব দুশ্চিন্তা হয়। রাতে ভালো ঘুম হয় না।
শফিকুল ইসলাম নামের একজন বলেন, ‘দুই বিঘা জমিতে জারবেরার চাষ করেছি। করোনায় বিক্রি বন্ধ ও আম্পানে জমি লন্ডভন্ড হওয়ায় ধারদেনায় জর্জরিত হয়ে পড়েছি। এভাবে জীবন চলছে না।’

জানতে চাইলে ঝিকরগাছার কৃষি কর্মকর্তা মাসুদ হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, এই উপজেলার ছয়টি ইউনিয়নে প্রায় ৬২৫ হেক্টর জমিতে বাণিজ্যিকভাবে ফুলের চাষ হচ্ছে। ফুল চাষের সঙ্গে ৭ থেকে ১০ হাজার কৃষক ও প্রায় ১ লাখ শ্রমিক সম্পৃক্ত রয়েছেন।

যশোর শহর থেকে ১৮ কিলোমিটার পশ্চিমে যশোর-বেনাপোল মহাসড়কের পাশে ঝিকরগাছা উপজেলার গদখালী ও আশপাশে গড়ে উঠেছে ফুল চাষ ও পাইকারি বিক্রির বৃহত্তম মোকাম। ফুল সবচেয়ে বেশি কেনাবেচা হয় বিজয় দিবস, একুশে ফেব্রুয়ারি, স্বাধীনতা দিবস, পয়লা ফাল্গুন, বসন্ত দিবস, বিশ্ব ভালোবাসা দিবস, বাংলা নববর্ষ ও দুই ঈদ উপলক্ষে। দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশেও রপ্তানি হচ্ছে এখানকার ফুল।

গদখালী বাজারের দোকানি উজ্জ্বল হোসেন বলেন, ‘আগে অনেক ফুল বিক্রি হতো। এখন ফুল কেনার লোক নেই। এভাবে আর চলতে পারছি না।’

সম্পূর্ণ খবরটি পড়ুন

পরিবেশ

জলজ ফুলের স্বাদ

ফুল মানেই সৌন্দর্যের ডালি, মনের খোরাক, পবিত্রতার প্রতীক। ফলে যুগে যুগে কবিরা ফুল নিয়ে লিখে গেছেন বিস্তর কবিতা। কালিদাস থেকে দ্বিজ কানাই, রবীন্দ্রনাথ-নজরুল-জীবনানন্দ সবাই সৌন্দর্যের সঙ্গে ফুলের রূপকল্প চিত্রিত করেছেন দুহাত খুলে। কিন্তু কোনো কবিই লেখেননি, পাকা রাঁধুনির হাতে পড়ে ফুলও হয়ে উঠতে পারে এক অনির্বচনীয় কবিতা, স্বাদ কোরকে তুলতে পারে স্বর্গীয় অনুরণন।

বর্ষাবিদায়ের ক্ষণ চলছে। আকাশে মেঘের ঘনঘটা থাকলেও শুরু হয়েছে শরৎকাল। সাধারণভাবে এ সময় জলমগ্ন বাংলাদেশে থাকে নিরাগ পানির জলজ সৌন্দর্য। খালে-বিলে, থরে-বিথরে ফুটে থাকে লাল, সাদা, বেগুনি রঙের শাপলা ফুল। তার ওপর ফড়িংয়ের ওড়াউড়ি। মনমাতানো এ দৃশ্যের রাজা শাপলা ফুল খাদ্য হিসেবেও মনমাতানো। খাল-বিলের এই দেশে জলজ ফুল শাপলা খাদ্য হিসেবে জনপ্রিয় হবে, এটাই স্বাভাবিক। জলাভূমিতে অনায়াসে জন্মানো সাদা বা লাল রঙের শাপলার পাপড়ি থেকে কাণ্ড পুরোটাই বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় খাওয়া হয়। এর জনপ্রিয় রান্না সম্ভবত চিংড়ি মাছ দিয়ে।

তাজা শাপলার ভেতরের হলুদ অংশটুকু সাবধানে ফেলে দিন। ওপরের সবুজ পাপড়িগুলোও ফেলে দিতে পারেন। ফুলটি ধুয়ে পানি ঝরিয়ে নিন। চালের গুঁড়া অথবা বেসনে লবণ, হালকা হলুদ, রসুনবাটা আর ডিম ভেঙে দিয়ে ঘন ব্যাটার বানিয়ে নিন। এই ব্যাটারে শাপলা চুবিয়ে ডুবো তেলে ভেজে নিন। ঝাল খেতে চাইলে মরিচের গুঁড়া কিংবা কাঁচা মরিচ স্বাদমতো বেটে ব্যাটারে মিশিয়ে নিতে পারেন। শরতের অকালবৃষ্টি আর করোনাকালের জন্য বিস্তৃত বৈকালিক অবসরে একবার খেয়ে দেখতে পারেন। অথবা গরম ভাতের সঙ্গে গরম গরম বড়াও খেয়ে দেখতে পারেন।

আর একটি রান্নার প্রণালি বলে দিই আপনাদের। শাপলার ডাঁটা ছোট ছোট করে কেটে নিয়ে ওপরের আঁশ ছাড়িয়ে নিয়ে ধুয়ে হালকা সেদ্ধ করুন, যাতে ডাঁটা গলে না যায়। এরপর মসুর ডাল সেদ্ধ করে নিন। কড়াইতে তেল গরম করে শুকনো মরিচ, কালিজিরা ফোড়ন দিন। চাইলে এর মধ্যে গোটা কয়েক রসুনের কোয়া দিয়ে হালকা করে নেড়েচেড়ে সেদ্ধ শাপলাগুলো দিয়ে দিন। লবণ, হলুদগুঁড়া দিয়ে ধীরে ধীরে নাড়াচাড়া করুন যাতে শাপলা ডাঁটা গলে না যায়। শাপলা যেহেতু জলজ উদ্ভিদ তাই এটা রান্নার সময় পানি দেওয়ার প্রয়োজন নেই। সবকিছু ফুটে উঠলে সেদ্ধ করা ডাল মিশিয়ে অল্প আঁচে জ্বাল দিয়ে শুকনো শুকনো করে নিন। ঘ্রাণেই বুঝে যাবেন কখন আপনার শাপলার তরকারি হয়ে গেছে। নামিয়ে গরম ভাতের সঙ্গে খাবেন। এ রান্নাটির সঙ্গে আপনি চিংড়ি মিশিয়ে দিতে পারেন। সে ক্ষেত্রে ছোট চিংড়ি ভেজে নিতে হবে আগে। তারপর মিশিয়ে দিতে হবে রান্নায়।

শুধু কি শাপলা? কচুরিপানার ফুলও সুখাদ্য, যদি আপনি রান্নাটা করতে পারেন। তবে এর জন্য আপনাকে নিতে হবে পরিষ্কার পানির খাল-বিলে ফুটে থাকা কচুরিপানার ফুল। এর চাটনি বেশ সুস্বাদু। বিভিন্নভাবেই চাটনি বানানো সম্ভব। আপনি নিজেই ভেবে বের করুন চাটনিটা তৈরি করবেন কীভাবে।

বর্ষাকালে কচুর ফুল ফোটে। তবে এই ভাদ্র মাসের ঝিরি ঝিরি বৃষ্টিতেও কচুর ফুল পাবেন। আঁটি হিসেবে বাজারে কিনতে পাবেন এ সময়। কচুর ফুল থেকে সবুজ রঙের ডাঁটা এবং ভেতরের পুষ্পমঞ্জরি বাদ দিন। তারপর হলুদ ফুল ছোট ছোট টুকরা করে কেটে সেদ্ধ করে নিন। এরপর পাঁচফোড়ন অথবা শুধু জিরা এবং কাঁচা মরিচ ফোড়ন দিয়ে সেদ্ধ কচুর ফুল কষিয়ে নিন। এর সঙ্গে অনেক কিছুই যোগ করতে পারেন আপনি। পারেন কাঁঠালের বিচি যোগ করতে, ছোট চিংড়ি মাছ যোগ করতে। কাঁঠাল বিচি যোগ করলে আগেই সেদ্ধ করে নেবেন। তারপর কষানোর সময় যোগ করে দেবেন। আর চিংড়ি যোগ করতে চাইলে ভেজে নেবেন।

একটি বিষয় স্মরণ রাখবেন, সেটি মসলার ব্যবহার। ফুলের মতো নাজুক জিনিসে ভারী মসলা, যেমন, রসুন, গরমমসলা ইত্যাদি ব্যবহার করবেন না। জিরা, গোলমরিচের মতো হালকা মসলা ব্যবহার করুন। পাঁচফোড়নের ব্যবহারে খাবারের স্বাদ হবে একেবারে ভিন্ন রকম।

ফুল সুন্দর, খাদ্যও সুন্দর। সৌন্দর্যের উপাসনা করতে গিয়ে দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভুগবেন না। কবি কিংবা রাঁধুনি উভয়েই সৌন্দর্যের পূজারি। ন্দর্যে থাকুন। সুন্দর থাকুন।

সম্পূর্ণ খবরটি পড়ুন

পরিবেশ

পাখি নামের ফুল

সবুজ পাতার আড়ালে বাদুড়ের মতো উল্টো হয়ে ঝুলে থাকে পাখি। তবে এই পাখি পক্ষীকূলের কেউ নয়, এটি একটি ফুলের নাম। পাখিফুলের বৈজ্ঞানিক নাম (Brownea Coccinea)। জন্মস্থান ভেনেজুয়েলায়। তাই এর প্রচলিত নাম রোজ অব ভেনেজুয়েলা। প্রজাতিটি গায়ানা, ভেনেজুয়েলা, ব্রাজিল এবং ত্রিনিদাদ ও টোবাগোর স্থানীয়। পাখি ফুল আমাদের দেশে বেশ দুর্লভ। জানা মতে, ঢাকার সবচেয়ে পুরোনো গাছটি আছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যানটিনের পাশে। বর্তমানে রমনা পার্ক, শিশু একাডেমিসহ বিভিন্ন পার্ক ও উদ্যানে নতুন কিছু গাছ লাগানো হয়েছে। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের বোটানিক্যাল গার্ডেন ও মহেশখালীর আদিনাথ মন্দিরসহ চট্টগ্রামের বৌদ্ধ বিহারগুলোতেও এই গাছ চোখে পড়ে।


সম্পূর্ণ খবরটি পড়ুন

পরিবেশ

ফুলের রাজ্যে

পাহাড়ে এখন নানা প্রজাতির ফুল ফুটছে। খাগড়াছড়ি জেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে ফুলের ছবি সংগ্রহ করেছেন প্রথম আলোর ফটোসাংবাদিক নীরব চৌধুরী। খাগড়াছড়ি সদরের খেজুরবাগান হর্টিকালচার সেন্টারের উপপরিচালক মোয়াজ্জেম হোসেন এই ফুলগুলোর বৈজ্ঞানিক নাম জানিয়েছেন।

সম্পূর্ণ খবরটি পড়ুন
বিজ্ঞাপন

শীর্ষ সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক: শাইখ সিরাজ
© ২০২০ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। দা এগ্রো নিউজ, ফিশ এক্সপার্ট লিমিটেডের দ্বারা পরিচালিত একটি প্রতিষ্ঠান। ৫১/এ/৩ পশ্চিম রাজাবাজার, পান্থাপথ, ঢাকা -১২০৫
ফোন: ০১৭১২-৭৪২২১৭
ইমেইল: info@theagronews.com, theagronewsbd@gmail.com