আমাদের সাথে যোগাযোগ করুন

এগ্রোটেক

সার নিয়ে কারসাজি

ঠাকুরগাঁওয়ের সার বিক্রেতারা বিভিন্ন কৌশলে বেশি দামে রাসায়নিক সার বিক্রি করছেন সাধারণ চাষিদের কাছে। কোনো উপায় না পেয়ে ১১শ টাকার সার ১৪শ টাকায় কিনতে হচ্ছে চাষিদের।

সার ডিলারদের ক্যাশ মেমোর মাধ্যমে চাষিদের কাছে সার বিক্রির নিয়ম থাকলেও বেশি দামে বিক্রির কারণে তা করছেন না ডিলাররা। এমন নানা রকম কারসাজি চালালেও কৃষি বিভাগের কোনো তদারকি নেই বললেই চলে। কৃষি বিভাগ অপেক্ষায় আছে চাষিদের লিখিত অভিযোগের আশায়।

প্রতিটি ইউনিয়নে ২-৩ জন উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা নিযুক্ত আছেন চাষিদের সেবায়। তারপরও অদৃশ্য কারণে এসব দেখার যেন কেউ নেই।

উত্তরের সবজির জেলা হিসেবে পরিচিত ঠাকুরগাঁও। সকল প্রকার সবজি চাষ হয় এ জেলায়। জেলার চাহিদা পূরণ করে বিভিন্ন জেলাসহ বিদেশেও সবজি রফতানি করেন চাষিরা। তবে সবজি উৎপাদনে প্রয়োজনীয় রাসায়নিক সার অধিক দামে কেনার কারণে উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি পাচ্ছে বলে অভিযোগ চাষিদের।

চাষিদের অভিযোগ, সার ডিলারদের কাছে সরকারি দরে ক্যাশ মেমোসহ সার কিনতে গেলে সার টিএসপি সার নেই বলে জানিয়ে দেয়। আর বেশি দামে নিলেই পাওয়া যায় পর্যাপ্ত সার। তাই ডিলাররা সারের ১-৫ বস্তার মেমো না করে বিভিন্ন দোকানদারের নামে শত শত বস্তার মেমো করছেন। আর সাধারণ চাষিদের কাছে মেমো ছাড়া বেশি দামে বিক্রি করছেন।

বিভিন্ন প্রকার রাসায়নিক সারের সরকারি মূল্য ডিলার পর্যায়ে ৫০ কেজির ১ বস্তা ট্রিপল সুপার ফসফেট (টিএসপি) (সাদা-কালো) ১ হাজার টাকা আর চাষি পর্যায়ে ১ হাজার ১শ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে, কালো টিএসপি ১ হাজার ৪শ থেকে সাড়ে ৪শ টাক, সাদা টিএসপি ১ হাজার ২৫০ থেকে এক হাজার ৩শ টাকা, ডিএপি সার ডিলার পর্যায়ে ৭শ টাকা আর চাষি পর্যায়ে বিক্রি হচ্ছে ৮শ ২০-৫০ টাকা, নাইট্রোজেন জাতীয় সার (ইউরিয়া) ডিলার পর্যায়ে ৭শ টাকা আর চাষি পর্যায়ে বিক্রি হচ্ছে ৭শ ৬০ টাকা। ডিলার পর্যায়ে মিউরেট অব পটাশ (এমওপি) ৬শ ৫০ টাকা আর চাষি পর্যায়ে ৭শ ৫০ টাকা বিক্রি হচ্ছে ৭শ টাকা।

রাসায়নিক সারের ডিলার ও খুচরা বিক্রেতারা চাষিদের চাহিদার ওপর ভিত্তি করে একেক মৌসুমে একেক সারের দাম বৃদ্ধি করে কৃষকদের প্রতারিত করছে। গত আমন মৌসুমে ইউরিয়া ও ডিএপি সারের ৫০ কেজির বস্তায় ১শ টাকা বেশি নেয়া হচ্ছিল। পরে গণমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশের পর বাজার নিয়ন্ত্রণে আনে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর ও বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন (বিএডসি)।

কৃষি বিভাগ ও বিএডিসি সূত্রে জানা যায়, ঠাকুরগাঁওয়ে বাফারের নিবন্ধিত ডিলার ৬৩ জন, যারা জেলার প্রতিটি ইউনিয়নে ইউরিয়া সার বিক্রি করবে আর বিএডিসির ডিলার আছেন ২১০ জন তারা শুধু মাত্র নন-ইউরিয়া সার (টিএসপি, ডিএপি, এমওপি) বিক্রি করবেন।

কৃষি বিভাগের চাহিদা অনুযায়ী সারের সরবরাহ নিশ্চিত করবে বাফার ও বিএডিসি। তবে বিএডিসির ২১০ জন ডিলারের মধ্যেই বাফারের ৬৩ জন ডিলার অন্তর্ভুক্ত। তাই বাফারের ৬৩ জন ডিলার সকল প্রকার সারের বরাদ্দ পান। আর বিএডিসির ডিলাররা শুধুমাত্র নন-ইউরিয়া সারের বরাদ্দ পান।

বিএডিসির একাধিক ডিলার বলেন, বিএডিসির সাধারণ ডিলাররা প্রতি মাসে নন-ইউরিয়া সারের বরাদ্দ পান এক থেকে দেড় মেট্রিক টন আর বাফারসহ বিএডিসির ডিলাররা মাসে বরাদ্দ পান ৬০-৭০ মেট্রিক টন। তাই সারের বাজার তাদের হাতে।

গত শনিবার বালিয়াডাঙ্গী উপজেলা সদরে বাফার ও বিএডিসির ডিলার কবীর এন্ট্রারপ্রাইজের ম্যানেজার রফিকুল ইসলামের কাছে সার কিনতে গেলে তিনি প্রথমে টিএসপি সারের মূল্য চান এক হাজার চারশ টাকা। টাকার ক্যাশ মেমো চাইলে তিনি তা দিতে অস্বীকার করেন।

তিনি বলেন, বর্তমানে সারের মেমো দেয়া হয় না।

পরে সংবাদকর্মী পরিচয় পাওয়ার পর তিনি বলেন, সরকারি বরাদ্দের সার সরকারি দরে আর বাইরে থেকে আনা টিএসপি কালো সার এক হাজার ৪শ টাকা দরে বিক্রি করা হচ্ছে।

বালিয়াডাঙ্গী উপজেলা সদরের খুচরা সার বিক্রেতা জুয়েল রানা বলেন, ডিলারদের কাছ থেকে এক হাজার ৪শ টাকায় কিনে বাইরে ১০-২০ টাকা লাভ করে বিক্রি করছি। সার নিলে ডিলাররা ক্যাশ মেমো দেয় না।

ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার হরিহরপুর এলাকার চাষি বেলাল হোসেন বলেন, এখন শুধুমাত্র আগাম সবজির চাষ শুরু হয়েছে, তাতেই বাজারগুলোতে তিন থেকে সাড়ে তিনশ টাকা বেশি দিয়ে সারের বস্তা কিনতে হচ্ছে। বেশি পরিমাণে আলু, গম ও ভুট্টা লাগাতে শুরু হলে আরও যে কী অবস্থা হয় তা বলতে পারছি না।

তিনি বলেন, আলু লাগাব, তাই তিন দিন থেকে সদর রোড, শিবগঞ্জ ও পল্লী বিদ্যুৎ বাজারে বিএডিসির ডিলারসহ অনেক সারের দোকানে সার কিনতে গিয়েছি, সবার দাম এক। তারা বস্তায় ৩শ টাকা বেশি নেবে কিন্তু মেমো দেবে না।

আলুসহ বিভিন্ন সবজি ও দানা জাতীয় ফসল উৎপাদনে রাসায়নিক সারের মধ্যে বেশি প্রয়োজনীয় ট্রিপল সুপার ফসফেট (টিএসপি) সরকার নির্ধারিত মূল্যে জেলার কোথাও সার বিক্রি হচ্ছে না।

জেলায় সারের ব্যবসা হাতেগোনা কয়েকজন ডিলারের মাধ্যমে চলার কারণে বেশির ভাগ সময় কৃষকরা প্রতারিত হচ্ছে বলে অভিযোগ ভুক্তভোগিদের।

এ বিষয়ে বিএডিসি ফার্টিলাইজার অ্যাসোসিয়েশনের ঠাকুরগাঁও জেলা শাখার সভাপতি এনামুল হক সরকার বলেন, সার ডিলারদের কোনো সিন্ডিকেট নেই, তবে সমিতি আছে। নিয়ম অনুযায়ী ডিলাররা সার উত্তোলন করে সরকারি দরে বিক্রি করছে। তবে চাহিদার চেয়ে টিএসপি সারের সরবরাহ কম, সেজন্য ডিএপি সার ব্যবহার করতে চাষিদের উৎসাহ দিচ্ছি।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক আফতাব হোসেন বলেন, সরকারের মূল্যের চেয়ে অতিরিক্ত মূল্যে সার বিক্রির বিষয়ে কেউ অভিযোগ করেননি। কৃষি বিভাগ চাষিদের টিএসপি সারের পরিবর্তে ডিএপি সার ব্যবহার করতে বেশি উৎসাহি করছে। মাঠপর্যায়ে কর্মকর্তাদের তদারকি জোরদার করা হয়েছে। কোনো ডিলারের বিরুদ্ধে বেশি দামে সার বিক্রি করার অভিযোগ পাওয়া গেলে তার লাইসেন্স বাতিল করা হবে।

সম্পূর্ণ খবরটি পড়ুন
বিজ্ঞাপন
মন্তব্য করুন

অনুগ্রহ করে মন্তব্য করতে লগ ইন করুন লগ ইন

Leave a Reply

এগ্রোটেক

রপ্তানি বাড়াতে পূর্বাচলে প্যাক হাউস ও অ্যাক্রেডিটেশন ল্যাব

ঢাকা: কৃষিপণ্যের রপ্তানি বাড়াতে বিশ্বমানের সর্বাধুনিক প্যাক হাউজ এবং অ্যাক্রেডিটেশন ল্যাবরেটরি স্থাপন করা হবে বলে জানিয়েছেন কৃষিমন্ত্রী ড. মো. আব্দুর রাজ্জাক। এ লক্ষ্যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আধুনিক প্যাক হাউস স্থাপনের জন্য পূর্বাচলে দুই একর জমি কৃষি মন্ত্রণালয়কে দিয়েছেন বলেও জানান তিনি।

মঙ্গলবার (১০ নভেম্বর) রাজধানীর ফার্মগেটে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের মিলনায়তনে হর্টিকালচার এক্সপোর্ট ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশন (হর্টেক্স) আয়োজিত কৃষিপণ্যের রপ্তানি বাড়তে ‘আধুনিক প্যাক হাউজ সুবিধা এবং অ্যাক্রিডিটেড ল্যাবরেটরি নির্মাণ বিষয়ে পরামর্শ কর্মশালা’ শীর্ষক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি একথা বলেন।

এই প্যাক হাউস নির্মাণের জন্য দ্রুত উদ্যোগ ও প্রকল্প নেওয়া হবে। এটি নির্মিত হলে ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্যসহ বিদেশে এদেশের ফলমূল ও শাকসবজি রপ্তানি বহুগুণ বাড়বে। দেশের সার্বিক অর্থনীতিতে কৃষি বিরাট অবদান রাখতে সক্ষম হবে।

কৃষিমন্ত্রী বলেন, কৃষি যান্ত্রিকীকরণ ও বাণিজ্যিকরণের দিকে যাচ্ছে। কৃষি অবশ্যই আধুনিক হবে। সেজন্য একই সঙ্গে কৃষিপণ্যের আন্তর্জাতিক বাজার বাড়াতে হবে। এটির ক্ষেত্রে অন্তরায় হলো প্যাকেজিং এবং নিরাপদ ফুড হিসেবে আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য সার্টিফিকেটের অভাব। পূর্বাচলে এই প্যাক হাউস ও ল্যাব স্থাপিত হলে এসব অন্তরায় দূর হবে। এছাড়া, বিমানবন্দরের কাছে হওয়ায় পণ্য পরিবহন হবে সহজতর।  

কর্মশালায় সভাপতিত্ব করেন কৃষিসচিব মো. মেসবাহুল ইসলাম। কৃষি মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (সম্প্রসারণ) মো. হাসানুজ্জামান কল্লোল, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের নির্বাহী চেয়ারম্যান শেখ মোহাম্মদ বখতিয়ার, হর্টেক্স ফাউন্ডেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মনজুরুল হান্নান, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক মো. হামিদুর রহমান প্রমুখ বক্তব্য রাখেন।  

সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্যানতত্ত্ব  বিভাগের প্রফেসর ড. মোহা. কামরুল হাছান। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠানের বিশেষজ্ঞ, গবেষক, ফল ও সবজি রপ্তানিকারক অ্যাসোসিয়েশন, ভ্যালু চেইন এক্সপার্ট, ল্যাবরেটরি এক্সপার্ট/বিজ্ঞানী ও প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।

বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাজ্য, ইতালি, ফ্রান্স, গ্রিস, জার্মানি, সুইডেন, ফিনল্যান্ড, সুইজারল্যান্ড, অস্ট্রিয়া, নেদারল্যান্ডস, মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো, মালয়েশিয়া, হংকং, শ্রীলংকাসহ প্রায় ৪৩টি দেশে তাজা শাকসবজি ও ফলমূল রপ্তানি হয়।  

এছাড়া প্রক্রিয়াজাত খাদ্যের চাহিদা দিন দিন বেড়েই চলছে। সারা পৃথিবীজুড়ে এ বাজারের পরিমাণ প্রায় ১০ হাজার বিলিয়ন মার্কিন ডলার। ২০১৯-২০ অর্থবছরে ১৬৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার মূল্যের তাজা শাকসবজি ও ফলমূল এদেশ থেকে রপ্তানি হয়েছে। পাশাপাশি ২৩ মিলিয়ন মার্কিন ডলার মূল্যের আলুও রপ্তানি হয়েছে।

সম্পূর্ণ খবরটি পড়ুন

এগ্রোটেক

জমি চাষেই যান্ত্রিকীকরণ, ছোঁয়া লাগেনি রোপণ ও কর্তনে

ঢাকা: জমি চাষে এখন প্রায় ৯০ শতাংশের বেশি যান্ত্রিকীকরণের ছোঁয়া লাগলেও পিছিয়ে রয়েছে রোপণ ও কর্তনে। মাত্র ০.১ শতাংশ জমিতে রোপণ করতে ব্যবহার করা হচ্ছে যন্ত্রের। 

অন্যদিকে, মাত্র ০.৮ শতাংশ জমিতে কর্তনে ব্যবহার করা হচ্ছে যন্ত্রের। যন্ত্রের ব্যবহার না থাকায় আর্থিক ক্ষতির মুখোমুখি হচ্ছে কৃষকেরা।

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএইউ) ফার্ম পাওয়ার অ্যান্ড মেশিনারি বিভাগের গবেষণায় এসব তথ্য উঠে এসেছে।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্ম পাওয়ার অ্যান্ড মেশিনারি বিভাগের অধ্যাপক মো. মঞ্জুরুল আলম বাংলানিউজকে বলেন, গত কয়েক দশকের ব্যবধানে কৃষিতে বেড়েছে শ্রমিক সংকট তেমনি ধারাবাহিকভাবে কমছে কৃষি জমি। বর্তমানে ধান কাটা ও রোপণ মৌসুমে শ্রমিকের অভাব তীব্র থাকে। সামনের দিনে এ সংকট আরও বাড়বে। কেননা গত কয়েক দশকের ব্যবধানে কৃষিতে শ্রমশক্তি কমছে। জমি তৈরিতে যন্ত্রের ব্যবহার বাড়লেও চারা রোপণ, কর্তন, মাড়াইসহ বেশ কিছু খাতে যন্ত্রের ব্যবহার এখনও পিছিয়ে রয়েছে। যন্ত্রের ব্যবহার না থাকার কারণে ব্যাপক আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে কৃষকেরা।  

তিনি আরও বলেন, এ অবস্থায় শ্রম ও সময় সাশ্রয়ের জন্য কৃষকের কাছে জনপ্রিয় করতে হবে কৃষি যন্ত্রপাতি। সরকারের ভর্তুকি সহায়তা আরও বেশি সম্প্রসারণের পাশাপাশি যান্ত্রিক অর্থায়ন ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনতে হবে। আর দীর্ঘমেয়াদী ও টেকসই যন্ত্রের ব্যবহার বাড়াতে হবে।
 
জানা যায়, কৃষকের খরচ কমাতে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে ট্রান্সপ্লান্টার ও হারভেস্টার মেশিন। চার সারি বিশিষ্ট রাইস ট্রান্সপ্লান্টার এক মেশিনেই একঘণ্টায় আড়াই বিঘা জমিতে চারা রোপণ করা যায়। অন্যদিকে, জিপিএস প্রযুক্তি সুবিধা সম্পন্ন হারভেস্টার দিয়ে একই সঙ্গে প্রতি ঘণ্টায় দেড় থেকে ২ একর জমির ধান কাটা, মাড়াই, ঝাড়াই ও বস্তাবন্দি করা যায়।
 


হারভেস্টারের মাধ্যমে খরচের পরিমাণ ৭০-৮০ শতাংশ কম, সময়ও ৭০-৮২ শতাংশ বাঁচানো সম্ভব। যন্ত্রটি ব্যবহার করলে ৭৫ শতাংশ কম শ্রমিকের প্রয়োজন হবে। ধানের চারা রোপণে এখন সারা বিশ্বেই উন্নত প্রযুক্তি ও যন্ত্রের ব্যবহার বাড়ছে। কৃষিতে শ্রমিক সংকট মেটানো ও কৃষকের অর্থের অপচয় কমিয়ে আনতে যান্ত্রিকীকরণের কোনো বিকল্প নেই।
 
তবে দেশে এ দুটি যন্ত্রের ব্যবহার বাড়াতে কাজ করে যাচ্ছে এসিআইসহ বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান। তাছাড়া যন্ত্র দুটিতে সরকারের ৫০-৭০ শতাংশ ভর্তুকি সহায়তা রয়েছে।

 
এ বিষয়ে এসিআই লিমিটেডের নির্বাহী পরিচালক সুব্রত রঞ্জন দাস বাংলানিউজকে বলেন, ধানের চারা রোপণ, কর্তন ও বস্তাবন্দি একটি শ্রমঘন কাজ। কৃষকের শ্রম, অর্থ ও সময় বাঁচাতে আমরা জাপানী প্রতিষ্ঠান ইয়ানমারের উন্নত মডেলের যন্ত্র দেশে চালু করেছি। শুকনো জমির পাশাপাশি এসিআই হারভেস্টার দিয়ে মাটিতে শুয়ে পড়া ধান কাটার পাশাপাশি ১ ফুট পর্যন্ত কাদা পানির ধান কাটা সম্ভব। তবে যন্ত্রগুলো কৃষকের কাছে জনপ্রিয় করতে ব্যাংকগুলোকে যান্ত্রিকীকরণে ঋণে উৎসাহ দিতে হবে। এজন্য সুদের হার ৪-৫ শতাংশে নির্ধারণের পাশাপাশি মোট সরবরাহকৃত ঋণের অন্তত ৩-৪ শতাংশ কৃষি যান্ত্রিকীকরণে দেবার সুপারিশ করা যেতে পারে।


 
সূত্র জানায়, দেশে গত অর্থ বছরে ধান ও গমের আবাদ হয়েছে প্রায় ১ কোটি ১৫ লাখ হেক্টর। ট্রান্সপ্লান্টিংয়ের ক্ষেত্রে যন্ত্রের ব্যবহার এখন শুধুমাত্র ধানের ক্ষেত্রেই করা সম্ভব হবে। দেশে যেহেতু বোনা ধানের প্রচলন রয়েছে। তাই রোপনের ক্ষেত্রে প্রায় ৭০ লাখ হেক্টর জমিতে ধানের রোপন করতে হয়।

 
এক হেক্টর জমির ধান ও গম হারভেস্টিং করতে প্রথাগত পদ্ধতিতে খরচ হয় প্রায় ৬ হাজার ৫০০ থেকে ৭ হাজার টাকা। যদিও যন্ত্রের মাধ্যমে এটি করলে খরচ হবে মাত্র ৮০০-৯০০ টাকা। একইভাবে ধান রোপণে প্রথাগত পদ্ধতিতে হেক্টর প্রতি খরচ ৮ হাজার ৪০০ টাকা। সেখানে যন্ত্রের মাধ্যমে করলে খরচ হবে মাত্র ৭৫০ টাকা। ফলে যান্ত্রিকীকরণের অভাবে কৃষককে হেক্টর প্রতি বাড়তি খরচ হচ্ছে ১৩-১৪ হাজার টাকা বাড়তি খরচ করতে হচ্ছে।
 

সম্পূর্ণ খবরটি পড়ুন

এগ্রোটেক

১৪০০০ বর্গমিটারে ফরাসি কৃষক প্যাসকেল হার্ডির সুবিশাল কৃষি উদ্যোগ

১৪০০০ বর্গমিটারে ফরাসি কৃষক প্যাসকেল হার্ডির সুবিশাল কৃষি উদ্যোগ

সম্পূর্ণ খবরটি পড়ুন

এগ্রোটেক

কৃষিতে আধুনিক পদ্ধতি যেভাবে এলো

মনিরুজ্জামান কবির

অরণ্যচারী ও যাযাবর জনগোষ্ঠীকে আধুনিক সমাজ স্রোতে যুক্ত করেছিল কৃষি। প্রথমদিকে কৃষি ছিল বন-জঙ্গল ঘুরে ঘুরে ফসল সংগ্রহ ও পশু-পাখি শিকার করে জীবিকা নির্বাহ। পরে যখন গুহাবাসী দেখলো ফসলের বীজ থেকে নতুন ফসল জন্মে এবং সে ফসল থেকে অনুরূপ ফলন পাওয়া যায়, বন্য পশু-পাখি পোষ মানে- তখনই মূলত আধুনিক কৃষির সূচনাকাল। প্রথমদিকে কৃষকরা জমিতে কৃষিকর্ম ও বন্য পশু-পাখি পোষ মানিয়ে নিজেদের পরিবারের চাহিদা মেটাতো। যে উর্বর ভূমিতে ফসল উৎপাদন হতো, সেখানে মানববসতির গোড়াপত্তন ঘটতো। সে সঙ্গে স্থায়ী সমাজ ও পরিবার কাঠামোর বিকাশ ঘটতো।

পরিবারের খাদ্য চাহিদার নিশ্চয়তায় পরে সমাজের একটি বৃহৎ জনগোষ্ঠী আধুনিক সভ্যতার বিনির্মাণ ও শিল্প বিপ্লবের নেতৃত্ব দিয়েছিল। আদিম, মধ্য এবং আধুনিক যুগে কৃষি ক্ষেত্রে নিত্যনতুন কলাকৌশল ও যন্ত্রপাতির আবিষ্কারে কৃষির বিকাশ বর্তমান অবস্থায় রয়েছে।

১০ হাজার বছর আগে মিসর, মধ্যপ্রাচ্য ও ভারতবর্ষের উর্বর ভূমিতে সর্বপ্রথম কৃষিকাজ শুরু হয়। আদিমানুষ তখন বন্য ফসলের বীজ পরিকল্পনামাফিক বপন ও ফসল সংগ্রহের কলাকৌশল আয়ত্ত করতে পেরেছিল। স্বাধীনভাবে কৃষির উন্নয়ন ঘটেছিল উত্তর-পশ্চিম চীন, আফ্রিকা, নিউগিনি ও আমেরিকার কিছু অংশে। এ অঞ্চলে বসবাসকারী জনগোষ্ঠী প্রথমে গম ও কর্নের এবং পরে বার্লি, মটর, মসুর ও ছোলার আবাদ করতো।

খ্রিস্টপূর্ব সাত হাজার বছর আগে মিসরের কিছু অংশ ও ভারতবর্ষের বেলুচিস্তানে ক্ষুদ্র পরিসরে গম ও বার্লির চাষাবাদ শুরু করে এ অঞ্চলের আদিবাসীরা। তখন আদিবাসী গোষ্ঠীগুলোর চাষাবাদ মূলত পারিবারিক চাহিদা মেটানোই মুখ্য ছিল। খ্রিস্টপূর্ব ছয় হাজার বছর আগে মধ্যম আকারে কৃষির সূচনা ঘটে নীল নদের তীরকে ঘিরে। সে সময়ে দূরপ্রাচ্যের দেশগুলো নিজেদের প্রয়োজনে ধান, গম মৌলিক ফসলগুলোর আবাদ শুরু করে। চীন ও ইন্দোনেশিয়ার কৃষকরা কচু, শিম, মুগডাল, সয়াবিন, আজুকির চাষাবাদ শুরু করে। তখন কার্বোহাইড্রেডের চাহিদা মোটামুটি পূরণ হলে মানুষ অন্যান্য চাহিদা পূরণের জন্য সংঘবদ্ধ হয়।

সংঘবদ্ধ মানুষ প্রোটিনের চাহিদা পূরণের জন্য নদী, খাল, বিল ও সমুদ্র সৈকত থেকে জাল দিয়ে মাছ শিকার শুরু করে। নতুন পদ্ধতিতে চাষাবাদ ও মাছ শিকার অতিমাত্রায় জনসংখ্যা বৃদ্ধির সূচনা করে, যা বর্তমানেও অব্যাহত রয়েছে। পাঁচ হাজার খ্রিস্টপূর্বে টাইগ্রিস এবং ইউফ্রেটিস অঞ্চলে বিশাল এলাকাজুড়ে চাষাবাদ করার জন্য কিছু মৌলিক পদ্ধতির উদ্ভাবন করা হয়েছিল। পদ্ধতিগুলো হলো একক ফসল চাষ, জমিতে সেচ দেয়া, শ্রমশক্তি ব্যবহার করা ইত্যাদি। এ অঞ্চলের কৃষকরা কৃষিকর্মের পাশাপাশি বন্য গরু ও ভেড়ার জাত পোষ মানায়। বিশাল পরিমাণে পোষ মানানো এসব পশু-পাখি তারা ব্যবহার করতো মাংস ও তন্তুর চাহিদা মেটাতে। তখন দক্ষিণ আমেরিকার পাহাড়ের ঢালুতে আলু, টমেটো, মরিচ, স্কোয়াশ ও কিছু প্রজাতির শিম, তামাক জাতের চাষ শুরু হয়।

দক্ষিণ গ্রিসের কৃষকরা তাদের অনুর্বর ভূমিতে নতুন চাষাবাদের কলাকৌশল তৈরি ও প্রয়োগ করে উচ্চ ফলন পায়। রোমানরা খাদ্যশস্য নিজেদের চাহিদা মিটিয়ে কিছু পরিমাণ বিক্রি শুরু করে।

মধ্যযুগে উত্তর আফ্রিকা ও পূর্বের মুসলিম কৃষকরা যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে সেচের পদ্ধতি উদ্ভাবন করে এবং তা পরে বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে দেয়। মাটির নিচ থেকে পানি উত্তোলন যন্ত্র, ডোবা, কৃত্রিম জলাধার কৃষিজমিতে সেচের জন্য বহুল ব্যবহৃত হতে শুরু করে। মধ্যযুগে তারা অঞ্চলভিত্তিক চাষাবাদ পদ্ধতি ও যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে আখ, লেবুজাতীয় ফসল, তুলা, সাফরান ইত্যাদি ফসল খাপ খাওয়ানোর ওপর বই প্রকাশ করে। মুসলমানরা লেবু, কমলা, কলার জাত স্পেন থেকে এনে চাষাবাদ শুরু করে। মধ্যযুগে এক জমিতে তিন ফসল ক্রমপরিবর্তন চাষাবাদ পদ্ধতি উদ্ভাবিত হয়। চীন তখন চাষাবাদ পদ্ধতি সহজতর করার জন্য মোলবোর্ড চাষাবাদ যন্ত্র উদ্ভাবন করে। মোলবোর্ড চাষাবাদ যন্ত্র পরে চাষাবাদ প্রক্রিয়া সহজ করে দেয় এবং ফলন বৃদ্ধি করে।

১৪৯২ সালের পরে স্থানীয় ফসলের জাত ও পোষা প্রাণী এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে স্থানান্তর ঘটে। টমেটো, ভুট্টা, আলু, তামাক ইত্যাদি প্রধান ফসল অগ্রসর অঞ্চল থেকে অনগ্রসর অঞ্চলে আগমন ঘটে। অন্যদিকে গম, মসলা, কফি ও আখ অনগ্রসর থেকে অগ্রসর অঞ্চলে আগমন ঘটে। কলাম্বিয়ান আমেরিকায় কিছু কুকুরের জাত পালন করা হতো, যা বিভিন্ন কাজকর্মের উপযুক্ত ছিল না। তাই পশ্চাৎপদ অঞ্চল থেকে তারা কিছু কুকুর ও ঘোড়ার জাত আমদানি করে। ঘোড়া ও কুকুরের জাতগুলো পশ্চিমাঞ্চলে কৃষি উৎপাদনে ভূমিকা রাখে। ষোড়শ শতাব্দীতে পর্তুগিজ কর্তৃক চাষ সূচনাকারী আলু উত্তর ইউরোপের প্রধান খাদ্যশস্যে পরিণত হয়। সে সময়ে ভুট্টা আফ্রিকার স্থানীয় খাদ্যশস্যের জায়গা দখল করে নেয়।

অষ্টাদশ শতাব্দীর প্রথমদিকে গঠন বা প্রয়োজনীয় বৈশিষ্ট্যের ওপর ভিত্তি করে কৃষিকৌশল, যন্ত্রপাতি, বীজ ও মাঠ ফসলের নামকরণ করা হয় এবং তাদের গঠনগত পরিবর্তন গঠতে থাকে। এ সময় মধ্যযুগ থেকে কয়েকগুণ মাঠ ফসলের উৎপাদন বৃদ্ধি পায়। অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষে এবং ঊনবিংশ শতাব্দীর শুরুতে ট্রাক্টর ও উন্নত কলাকৌশল ব্যবহার করে আমেরিকা, ইসরাইল, জার্মানি ও অগ্রসর দেশ প্রতি একর ভূমি ব্যবহার করে সর্বোচ্চ ফলন ফলায়। হেবার বোস পদ্ধতি ব্যবহার করে অ্যামোনিয়াম নাইট্রেট উৎপাদন ফসল উৎপাদনের সব প্রতিবন্ধকতা দূর করে কৃষিতে ফলন বৃদ্ধিতে বিপ্লব ঘটায়। ফলন বৃদ্ধি, সার, কীটনাশক, জাত উন্নতকরণ, যন্ত্রপাতির ব্যবহার, পানি দূষণ এবং কৃষিতে ভর্তুকি গত শতাব্দীর আলোচিত বিষয় ছিল।

সাম্প্রতিককালে উন্নত দেশগুলো পরিবেশের ওপর কৃষির বিরূপ প্রতিক্রিয়ার কথা চিন্তা করে জৈব কৃষির সূচনা করছে। নতুন নতুন ফসলের জাত ও কলাকৌশল উদ্ভাবনের কারণে বিংশ শতাব্দীর শেষদিকে পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে কৃষির বিপ্লব ঘটতে থাকে। আমেরিকা তাদের সাবিনের জাত উন্নয়নের জন্য চীন, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া থেকে জার্মপ্লাজম সংগ্রহ করে। এবং চীন ও জাপান বিভিন্ন ফল ও নাটজাতীয় ফসলের জার্মপ্লাজম সংগ্রহ করে। ২০০৫ সালে কৃষির সবচেয়ে বেশি উৎপাদন ছিল চীনে। বর্তমানে সারা পৃথিবীর উৎপাদনের এক-ষষ্ঠাংশের নিয়ন্ত্রণকারী দেশ হলো ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ভারত এবং আমেরিকা।

বর্তমানে আমেরিকার প্রতি হেক্টর জমিতে উৎপাদন ১৯৪৮ সালের উৎপাদন থেকে আড়াই গুণের বেশি। বর্তমানে সারাবিশ্বে রপ্তানিকৃত খাদ্যশস্যের নব্বই ভাগ আসে আমেরিকা, কানাডা, ফ্রান্স, অস্ট্রেলিয়া, আর্জেন্টিনা এবং থাইল্যান্ড থেকে। পানির দুষ্প্রপ্যতার জন্য মধ্য আকারের দেশ আলজেরিয়া, ইরান, মিসর, মেক্সিকো এবং উন্নয়নশীল কিছু দেশের খাদ্যশস্য আমদানি করতে হচ্ছে। পরিবেশ ও মানব শরীরের বিরূপ প্রতিক্রিয়ার জন্য জিএমও এবং হাইব্রিড ফসল নিয়ে বিতর্ক চলছে। অন্যদিকে সারাবিশ্বে খাদ্যের চাহিদা মেটাতে ফসলের উন্নত জাত উৎপাদন কৃষি ও জিন বিজ্ঞানীদের গবেষণা অব্যাহত রয়েছে। একদিকে আমেরিকা ও আফ্রিকার বায়োফুয়েলের উৎপাদন প্রক্রিয়া খাদ্য নিরাপত্তাকে হুমকিতে ফেলছে, অন্যদিকে কিউবাসহ লাতিন আমেরিকার জৈব কৃষি চাষ প্রযুক্তি পরিবেশের জন্য আশাব্যঞ্জক।

সম্পূর্ণ খবরটি পড়ুন

এগ্রোটেক

অ্যাকোয়াপনিকস: মাছ চাষ ও মাটি ছাড়া সবজি আবাদ করার যে সমন্বিত পদ্ধতি বাংলাদেশে জনপ্রিয় হচ্ছে

ড্রামে মাছ আর উপরে সবজি
অ্যাকোয়াপনিকস বাগানে করল্লার চাষ
অ্যাকোয়াপনিকস বাগানে করল্লার চাষ

ছোট একটি জায়গায় কেবল একটি অবকাঠামো ব্যবহার করে মাছ এবং সবজি চাষের একটি পদ্ধতি বাংলাদেশে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে এবং বিশেষ করে তরুণ উদ্যোক্তাদের অনেকেই এখন এটা ব্যবহার করছেন।

এই পদ্ধতিটি পরিচিত অ্যাকোয়াপনিকস হিসেবে, যেখানে মাটি ছাড়াই সবজি উৎপাদন হয়।

বাংলাদেশ সরকারের কৃষি তথ্য সার্ভিস বলছে, অ্যাকোয়াপনিকস হলো মাছ ও সবজি চাষের একটি সমন্বিত পদ্ধতি।

আর বাংলাদেশে এ পদ্ধতির অগ্রদূত হিসেবে বিবেচনা করা হয় বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের মৎস্য চাষ বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক এম এ সালামকে।

তবে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে আরও আগে থেকেই অ্যাকোয়াপনিকস পদ্ধতি প্রচলিত রয়েছে।

অধ্যাপক সালাম মনে করেন যে বাংলাদেশে যেহেতু চাষযোগ্য জমির পরিমান ক্রমশই কমে আসছে, তাই এ দেশে অ্যাকোয়াপনিকস-এর একটি উজ্জ্বল ভবিষ্যত রয়েছে মাছ চাষ ও সবজি আবাদের ক্ষেত্রে।

“যারা ছাদ বাগান করেন বা অল্প জায়গায় মাছ চাষ বা সবজি আবাদ করেন, তাদের জন্য এটি একটি দারুণ বিষয়। একই জায়গায় মাছ ও সবজির ফলন করা সম্ভব এবং তাও একেবারে কম খরচে,” বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন তিনি।

অধ্যাপক সালাম সেই ২০১০ সালে নিজের বাড়ির ছাদে সবজি চাষ শুরু করেছিলেন, আর পরে এর সাথে ২০১১ সালে যোগ করেন মাছ। তবে অ্যাকোয়াপনিকস পদ্ধতি তাকে যে সাফল্য এনে দিয়েছে, তা তাকে তাকে কৃষিক্ষেত্রে পদকও এনে দিয়েছে।

অ্যাকোয়াপনিক কী?

সরকারের কৃষি তথ্য সার্ভিস বলছে যে অ্যাকোয়াপনিকস হলো টেকসই একটি খাদ্য উৎপাদন ব্যবস্থা।

এতে মাছ চাষ থেকে আসা ময়লা তথা দূষিত পানি গাছের খাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত হয় এবং সেখান থেকে স্বচ্ছ পরিষ্কার পানি পুনরায় মাছের ট্যাংকে ফিরে আসে।

এখানে লক্ষণীয় যে, এ পদ্ধতিতে মাটি ছাড়াই সবজি উৎপাদন করা যায় এবং ব্যাকটেরিয়া পানির সমুদয় বর্জ্য, ময়লা ইত্যাদি তাৎক্ষণিকভাবে দূরীভূত করে – যেভাবে প্রাণীর কিডনি ও লিভার এ কাজটি সম্পন্ন করে থাকে।

অধ্যাপক সালাম বলছেন যে এটি পুরোপুরি একটি প্রাকৃতিক পদ্ধতি।

তিনি বলেন, মূলত মাটি ছাড়া পানিতে গাছপালা ও শাক-সবজি উৎপাদন করার একটি কৌশল হলো অ্যাকোয়াপনিকস। এখানে প্রাকৃতিক ব্যাকটেরিয়া অনুঘটক হিসাবে কাজ করে মাছের বর্জ্য থেকে গাছকে নিজের খাদ্য উৎপাদনে সহায়তা করে থাকে।

একবার সিস্টেম দাড়িয়ে গেলে পরে আর খরচ নেই বলে জানাচ্ছেন এম এ সালাম
একবার সিস্টেম দাড়িয়ে গেলে পরে আর খরচ নেই বলে জানাচ্ছেন এম এ সালাম

যেভাবে কাজ করে এই পদ্ধতি

অধ্যাপক সালাম জানান, হাইব্রিড এই পদ্ধতি একবার স্থাপন করা গেলে এরপর আর খুব একটা রক্ষণাবেক্ষণের দরকার হয় না।

তার মতে, অ্যাকোয়াপনিকসের প্রাথমিক মূলনীতি হলো মাছ বর্জ্য উৎপাদন করে গাছকে খাদ্যের জোগান দেয় আর গাছপালা মাছের জন্য পানি পরিষ্কার করে – এইভাবে এটি একটি ক্রমাগত চক্র তৈরি করে চলতে থাকে।

তিনি বলেন, যখন মাছ বর্জ্য (অ্যামোনিয়া) উৎপাদন করে, তখন ব্যাকটেরিয়া তাকে নাইট্রেটে পরিণত করে। একটি পাম্প তারপরে এই পানি বহন করে গাছের ট্রেতে নিয়ে যায়। গাছ ওই পানি থেকে নাইট্রোজেন গ্রহন করে পানি পরিষ্কার করে এবং ওই পরিষ্কার পানি আবার মাছের ট্যাঙ্কে ফিরে আসে, যা মাছের জন্য নিরাপদ পানি হিসেবে বিবেচিত হয়।

“এই চক্রটি বারবার নিজেকে পুনরাবৃত্তি করে”, বিষয়টি ব্যাখ্যা করে বলছিলেন কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের এই শিক্ষক।

“একদিকে মাছ যেমন ব্যাকটেরিয়ার জন্য পুষ্টি সরবরাহ করে, অন্যদিকে ব্যাকটেরিয়া মাছের বর্জ্য ভেঙ্গে নাইট্রেট তৈরি করে গাছের খাদ্যের যোগান দেয়। গাছ আবার পানি পরিষ্কার করে মাছের বসবাস নিরাপদ করে তোলে”।

অ্যাকোয়াপনিকস কোন বর্জ্য উৎপাদন করে না
অ্যাকোয়াপনিকস কোন বর্জ্য উৎপাদন করে না

অ্যাকোয়াপনিকসের বৈশিষ্ট্য:

বিশেষজ্ঞদের মতে, অ্যাকোয়াপনিকস পদ্ধতিতে মাছ ও সবজি চাষ করে নিচের সুবিধাগুলো পাওয়া যায় –

* সহজ প্রযুক্তি ও সম্পূর্ণ পরিবেশ বান্ধব

* অ্যাকোয়াপনিকস কোন বর্জ্য উৎপাদন করে না

* জৈব খাদ্য উৎপাদন পদ্ধতি হওয়ায় পুষ্টিকর খাদ্য উৎপাদনের সুযোগ

* কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই সবজি উৎপাদন সম্ভব

* পলিথিন দিয়ে ঘর তৈরি করে সারা বছরই মাছ ও সবজি চাষ করা যায়

* পানি সাশ্রয়ী

* অনুর্বর মাটির চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে পারে

* অনুর্বর এবং পতিত জমির সদ্ব্যবহার করে

* পদ্ধতিটি প্রাকৃতিক এবং সারের উৎসস্থল

* খাদ্য পরিবহনজনিত দূষণ হ্রাস করে

* একবার সিস্টেম দাড়িয়ে গেলে পরে আর খরচ নেই

* যে কোন এলাকায় ও যে কোনো আবহাওয়ায় এটি করা সম্ভব

* কোন ধরণের সার ক্রয়-বিক্রয় বা গুদামজাতের দরকার হয় না

অধ্যাপক এম এ সালাম প্রথম অ্যাকোয়াপনিকসের চর্চা শুরু করেন বাংলাদেশে
অধ্যাপক এম এ সালাম প্রথম অ্যাকোয়াপনিকসের চর্চা শুরু করেন বাংলাদেশে

অ্যাকোয়াপনিকসের চ্যালেঞ্জ:

তবে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করেই কেবল অ্যাকোয়াপনিকসে সাফল্য পাওয়া যেতে পারে। এগুলো হলো –

* নিয়মিত বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা

* প্রযুক্তি-নির্ভর পদ্ধতি, তাই এ সম্পর্কে ভালোভাবে জানা

* যন্ত্রপাতি সময়মত রক্ষণাবেক্ষণ ও পরীক্ষা করা

* মাছকে ঠিক মতো খাবার দেয়া

* মাছ ও সবজি দ্রুততম সময়ে বাজারজাতের ব্যবস্থা

কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই সবজি উৎপাদন সম্ভব
কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই সবজি উৎপাদন সম্ভব

উৎপাদন কেমন হয়?

কৃষি তথ্য সার্ভিস বলছে, অ্যাকোয়াপনিকস পদ্ধতিতে চাষের জন্য তেলাপিয়া মাছই সবচেয়ে উপযোগী, কারণ এই মাছ দ্রুত বৃদ্ধি পায় এবং এগুলো অধিক ঘনত্বেও চাষ করা সম্ভব।

এতে করে দুই হাজার লিটারের একটি ট্যাংক থেকে আট মাসেই ১০০-১২০ কেজি তেলাপিয়া উৎপাদন সম্ভব। এর সাথে পুরো বছর ধরে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে টমেটো, লেটুস, কচু ও পুদিনা ইত্যাদি ফসল উৎপাদন করাও সম্ভব।

অধ্যাপক এম এ সালাম বিবিসি বাংলাকে অবশ্য বলেন যে তেলাপিয়ার পাশাপাশি কই মাছের চাষের জন্যও দারুণ কার্যকর অ্যাকোয়াপনিকস পদ্ধতি, আর এর সঙ্গে থাকতে পারে যে কোন ধরণের সবজি।

তিনি জানান, পুকুরে বা অন্য পদ্ধতিতে চাষের চেয়ে দশগুনের বেশি পরিমাণ মাছ উৎপাদন হতে পারে অ্যাকোয়াপনিকস পদ্ধতিতে।

অধ্যাপক এম এ সালাম বলেন, যে কোন এলাকায় ও যে কোনো আবহাওয়ায় এটি করা সম্ভব
অধ্যাপক এম এ সালাম বলেন, যে কোন এলাকায় ও যে কোনো আবহাওয়ায় এটি করা সম্ভব

অন্য উদ্যোক্তারা যা বলছেন

তিন বছর ধরে মিরপুরে নিজের বাড়ির ছাদে অ্যাকোয়াপনিকস পদ্ধতি সবজি ও মাছ চাষ করছেন বাংলাদেশ বিমানের সাবেক কর্মকর্তা মাহবুবুর রহমান।

মিস্টার রহমান বিবিসি বাংলাকে জানান যে তিনি তেলাপিয়া মাছ চাষের সাথে সবজি হিসেবে ধুন্ধুল, চিচিঙ্গা, লাউ, ঢেঁরস, শিম, কচুশাক, পালংশাক ও কলমিশাক আবাদ করেন।

“ঠিকভাবে যত্ন নিলে দারুণ ফল পাওয়া যায়। আমার আটশো’ লিটারের দু’টি ড্রামে মাছ আছে। ভালোভাবে খাবার দিলেন ৩/৪ মাসেই মাছ প্রত্যাশিত আকার নেয়। আসলে এটিই আগামীর কৃষি হিসেবে জনপ্রিয় হবে,” বলছিলেন তিনি।

তিনি জানান, তার জানা মতে আরও অনেকেই এখন এ পদ্ধতিতে চাষাবাদে এগিয়ে আসছেন, এমনকি দু’একটি প্রতিষ্ঠানও এই পদ্ধতিতে উৎপাদিত পণ্য বাজারে আনতে শুরু করেছে।

যে কোন ধরণের সবজি হতে পারে অ্যাকোয়াপনিকস পদ্ধতিতে
যে কোন ধরণের সবজি হতে পারে অ্যাকোয়াপনিকস পদ্ধতিতে

অ্যাকোয়াপনিকসের যত পদ্ধতি:

বাংলাদেশ সরকারের কৃষি তথ্য সার্ভিসের ওয়েবসাইটে অ্যাকোয়াপনিকস পদ্ধতিগুলো সম্পর্কে বেশ কিছু পরামর্শ দেয়া হয়েছে।

পুকুরে মাচা পদ্ধতি: এ পদ্ধতিতে বাঁশের চটি দিয়ে মাচা তৈরি করা হয়। মাচাটি প্রতিটি আধা লিটার পানি ভর্তি চল্লিশটি বোতল দিয়ে ভাসিয়ে রাখতে হয়। এরপর বোতলের তলায় অনেক ছিদ্র করে তার মধ্যে নারিকেলের ছোবড়া ও নুড়ি পাথর স্তরে স্তরে সাজিয়ে তাতে সবজির চারা লাগিয়ে মাছের পুকুরে স্থাপন করতে হয়।

প্রতিটি মাচায় চারটি করে কচু, পুদিনা, কলমিশাক, ঢেঁড়স ও টমেটোর সর্বমোট ২০টি চারা ব্যবহার করা যায়।

প্লাস্টিকের ড্রাম পদ্ধতি: এ পদ্ধতিতে প্লাস্টিকের ড্রাম লম্বালম্বিভাবে কেটে অর্ধেক করে নুড়ি পাথর ও মাটি স্তরে স্তরে সাজিয়ে কচু, পেঁপে ও বেগুনের চারা রোপণ করা হয়। এ ক্ষেত্রে মাছের ট্যাংকের ময়লা পানি পাম্প করে প্রতিদিন দু’বার ড্রামের নুড়ি পাথরের মাঝে সরবরাহ করা হয়।

এ প্রক্রিয়ায় গাছের শেকড় প্রয়োজনীয় খাদ্য সংগ্রহ করে এবং পরিষ্কার পানি পুনরায় মাছের ট্যাংকে ফিরে আসে। এ পদ্ধতিতে সবজি উৎপাদন অন্য যে কোনো পদ্ধতির চেয়ে ফলপ্রসূ ও আশাব্যঞ্জক প্রতীয়মান হয়েছে বলে কৃষি তথ্য সার্ভিস বলছে।

ড্রামে মাছ আর উপরে সবজি
ড্রামে মাছ আর উপরে সবজি

আলনা পদ্ধতি: এ পদ্ধতিতে পরিত্যক্ত প্লাস্টিক বোতল ভবনের ছাদে আলনায় স্থাপন করা হয়। সাড়ে পাঁচ ফুট উচ্চতা বিশিষ্ট একটি কাঠের আলনায় আনুভূমিকভাবে ৬টি, উপরে নিচে তিন সারিতে ১৮টি এবং উভয় পাশে মোট ৩৬টি বোতল সাজিয়ে রাখা হয়।

বোতলগুলোর ছিপির ভেতরে এক টুকরো স্পঞ্জ দিয়ে তার ওপর নুড়ি পাথর বসিয়ে প্রতি বোতলে দু’টি করে সবজির চারা রোপণ করতে হয়। এতে একটি আলনায় ৩৬টি বোতলে ৭২টি চারা লাগানো যায়।

এভাবে ৫০০ লিটার পানির ট্যাংকে ৩৫০ লিটার পানি দিয়ে তাতে ৬০টি তেলাপিয়া মাছ মজুদ করা যায়।

গ্যালভানাইজড পদ্ধতি: এ পদ্ধতিতে গ্যালভানাইজড পাত দ্বারা ৫”x২”-৫”x১০” আকারের ট্রে তৈরি করে সেখানে পানি নির্গমনের জন্য একটি ৪ ইঞ্চি লম্বা পাইপ স্থাপন করা হয়। এরপর পানিভর্তি একটি ট্রের সাহায্যে ভাসমান মাচা পদ্ধতিতে এবং অপর একটিতে নুড়ি পাথর সাজিয়ে সবজি চাষ করা হয়।

ট্রেগুলোকে একটি ভাসমান বাঁশের মাচার ওপর রাখা হয়। ভাসমান মাচা পদ্ধতিতে চারটি করে টমেটো, লেটুস ও পুদিনার চারা একটি শোলার পাতের মাঝে রোপণ করা হয়। অন্যদিকে, নুড়ি পাথরের ট্রেতে কচু, টমাটো, লেটুস ও কলমিশাক রোপণ করে যথা নিয়মে মাছের ট্যাংকের পানি সরবরাহ করা হয়।

এভাবে আরও কিছু পরিচর্যা করার পর উভয় পদ্ধতিতেই সবজির চারা দ্রুতগতিতে বৃদ্ধি পায় বলে কৃষি তথ্য সার্ভিস জানিয়েছে।

সম্পূর্ণ খবরটি পড়ুন
বিজ্ঞাপন

শীর্ষ সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক: শাইখ সিরাজ
© ২০২০ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। দা এগ্রো নিউজ, ফিশ এক্সপার্ট লিমিটেডের দ্বারা পরিচালিত একটি প্রতিষ্ঠান। ৫১/এ/৩ পশ্চিম রাজাবাজার, পান্থাপথ, ঢাকা -১২০৫
ফোন: ০১৭১২-৭৪২২১৭
ইমেইল: info@theagronews.com, theagronewsbd@gmail.com