আমাদের সাথে যোগাযোগ করুন

মৎস্য

দেশি সুস্বাদু লাভজনক শিং মাছের চাষ পদ্ধতি

দেশি সুস্বাদু লাভজনক শিং মাছের চাষ পদ্ধতি
দেশি সুস্বাদু লাভজনক শিং মাছের চাষ পদ্ধতি

এগ্রিকেয়ার ডেস্ক: মাছের বাজারে দেশি শিং বা জিয়ল মাছের চাহিদা ব্যাপক। সুস্থ-অসুস্থ সব শ্রেণীর মানুষের পছন্দের মাছ শিং। আমাদের খালবিলে এক সময় প্রচুর শিং মাছ পাওয়া যেত। বিভিন্ন কারণে এখন আর শিং মাছ তেমন একটা পাওয়া যায় না। আগে শিং মাছ পুকুরে চাষ করা হতো না। সে কারণে শিং মাছ প্রায় বিলুপ্তির পথে চলে গিয়েছিল। আমাদের দেশের মৎস্য খামারিরা কৃত্রিম প্রজননের মাধ্যমে পোনা উৎপাদন করে শিং মাছকে বিলুপ্তির হাত থেকে রক্ষা করতে পেরেছে। ময়মনসিংহের ত্রিশাল উপজেলার ধলার এলাকার মাছ চাষিরা দেশি শিং মাছ চাষ করে আর্থিকভাবে সচ্ছলতা অর্জন করেছেন। এক শতাংশের ছোট একটি পুকুরে শিং মাছ চাষ করে প্রতি ছয় মাস পর ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকা আয়ের দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন তারা। তাদের এ সফলতাকে সামনে রেখে আগ্রহী মাছ চাষিদের আর্থিকভাবে লাভবান হওয়ার পথ সুগম হয়েছে। বর্তমান সময়ে শিং মাছ চাষ বেশি লাভজনক হওয়ায় দিন দিন বাড়ছে এ মাছ চাষের ব্যাপকতা। মাছ চাষকে কেন্দ্র করে ধলায় গড়ে উঠেছে ৩৫টি মৎস্য হ্যাচারি। অন্তত ৫০০ পরিবার মাছ চাষের সঙ্গে সরাসরি জড়িত হয়েছে;কর্মসংস্থান হয়েছে প্রায় ১০ হাজার লোকের। দেশি ছোট ছোট পুকুর বা পরিত্যক্ত পুকুর শিং মাছের চাষের আওতায় আনা গেলে শিং মাছের চাষে বিপ্লব ঘটানো সম্ভব।

শিং চাষের সুবিধা : শিং মাছ সুস্বাদু এবং বাজার চাহিদা অনেক বেশি। ডোবা, ছোট ছোট পরিত্যক্ত পুকুর এবং পরিকল্পিত পুকুরে চাষ যোগ্য। অন্যান্য মাছের তুলনায় কম খাদ্যে বাঁচে। সাধারণ প্রতিকূল অবস্থা কাটাতে পারে। হ্যাচারিতে পোনা উৎপাদন করা যায়। সম্পূরক খাবারে সহজে অভ্যস্ত। একক এবং মিশ্র চাষ করা যায়।

দেশি সুস্বাদু লাভজনক শিং মাছের চাষ পদ্ধতি
দেশি সুস্বাদু লাভজনক শিং মাছের চাষ পদ্ধতি

পুকুর নির্বাচন: শিং মাছ চাষের জন্য পুকুর নির্বাচনের সময় কয়েকটা দিক লক্ষ্য রাখতে হবে-
১. পুকুর অবশ্যই বন্যামুক্ত হতে হবে। 
২. পুকুরের পাড় মজবুত হতে হবে। কোন প্রকার ছিদ্র থাকলে সমস্ত- শিং মাছ চলে যাবে। 
৩. বর্ষাকালে বৃষ্টির সময় পানির উচ্চতা ৪ ফুটের বেশি হবে না এই জাতীয় পুকুর নির্বাচন করতে হবে। 
৪. চাষের অভিজ্ঞতা থেকে দেখা গেছে যে, শিং মাছের পুকুর আয়তাকার হলে ভাল ফল পাওয়া যায়। বর্গাকার একটি পুকুরের চেয়ে আয়তাকার পুকুরে একই হারে খাদ্য ও ব্যবস্থাপনায় কমপক্ষে ১০ ভাগ বেশি উৎপাদন হয়। 
৫. পুকুরের আয়তন ৩০ থেকে ৫০ শতাংশের মধ্যে হতে হবে এবং পুকুরের এক প্রান্ত- অন্য প্রান্তের চেয়ে ১ ফুট ঢালু রাখতে হবে যাতে মাছ ধরার সুবিধাসহ পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা রাখা যায়।

পুকুর প্রস্তুতি : সাধারণত ৩০ থেকে ৫০ শতাংশের পুকুরে শিং চাষ অধিক উপযোগী,তবে এক একরের পুকুরেও চাষ করা যায়। প্রথমে পুকুরের পানি সেচ দিয়ে শুকিয়ে পুকুরের তলদেশে রোদ লাগাতে পারলে ভালো হয়। এ সময় পাড় কাটা পুকুরের ক্ষেত্রে নিজেদের মনের মতো পুকুর প্রস্তুত করা যায়। শুকানো সম্ভব না হলে পানিপূর্ণ পুকুরে প্রথমে রোটেনন ট্যাবলেট ব্যবহার করা যায়। ফসটঙ্নি (ম্যাজিক গোল্ড ট্যাবলেট প্রয়োগে অবাঞ্ছিত ও রাক্ষুসে মাছ অপসারণ বেশি কার্যকর। পরে প্রতি শতাংশে এক কেজি হারে চুন প্রয়োগের মাধ্যমে পুকুর প্রস্তুতির মূল কাজ শুরু করা হয়। প্রয়োগের পর প্রতি শতকে ২৫০ গ্রাম শিং ব্রাইট গোল্ড (দানাদার) প্রয়োগ করলে পানির রং স্থির থাকবে। এরপর প্রতি শতাংশে পাঁচ কেজি গোবর, ১০০ গ্রাম ইউরিয়া এবং ৫০ গ্রাম টিএসপি একত্রে গুলে প্রয়োগ করতে হবে। সার প্রয়োগের পাঁচ থেকে ছয় দিন পর শিং মাছের ২ ইঞ্চি থেকে ৩ ইঞ্চি সাইজের পোনা মজুদ করা যাবে।

পোনা মজুদ: পুকুর প্রস্তুতের পর গুণগতমানের পোনা উৎপাদনকারী হ্যাচারি থেকে প্রায় ২ ইঞ্চি সাইজের পোনা মজুদ করতে হবে। আজকাল পোনা উৎপাদন প্রযুক্তি সহজলভ্য হওয়ার কারণে অনেক হ্যাচারিই শিং মাছের পোনা উৎপাদন করে। কিন্তু পোনাকে কীভাবে মজুদ করলে পোনার মৃত্যহার কম হবে বা আনুসাঙ্গিক ব্যবস্থাপনা কি হবে তা অধিকাংশ হ্যাচারিই না জানার কারণে শিং মাছের পোনা মজুদের পর ব্যাপকহারে মড়ক দেখা দেয়। প্রথমে যা করতে হবে তা হল, হ্যাচারিতে পোনা তোলার পর কন্ডিশন করে এন্টিফাঙ্গাস মেডিসিনে গোসল দিয়ে তারপর পোনা ডেলিভারি দিতে হবে। পোনা পরিবহনের পর এন্টিফাঙ্গাস মেডিসিনে গোসল দিয়ে পুকুরে ছাড়তে হবে। আর তা না হলে পুকুরে ছাড়ার পর পোনা ক্ষতরোগে আক্রান্ত- হতে পারে। পুকুরে পোনা ছাড়ার ২/৩ দিন পর আবার একই জাতীয় ওষুধ দিয়ে চিকিৎসা দিতে হবে। এতে শিং মাছের পোনা মজুদের পর আর কোন রোগবালাই আসবে না।

পোনার পরিমাণ কত হবে : একক চাষে শিং মাছ প্রতি শতাংশে ৫০০ থেকে ১ হাজার পোনা ছাড়া যায়। এক্ষেত্রে পোনা ছাড়ার আগে এবং পরে পুকুরের পানির গুণাগুণ রক্ষা করতে হবে। পানি পরিবর্তনের সুযোগ না থাকলে পোনা কম ছাড়া ভালো। মিশ্র চাষে মাগুর এবং কৈ মাছের সঙ্গেও শিং মাছ ভালো হয়। এক্ষেত্রে মানসম্পন্ন স্বাস্থ্যবান পোনা অপরিহার্য।

কী খাবার দিতে হবে : শিং মাছের জন্য অধিক প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার সরবরাহ ভালো। শিং মাছ পুকুরের তলদেশের জলজ কীট খেয়ে থাকলেও লাভজনক চাষে মানসম্মত সম্পূরক খাবার (কমপক্ষে ৩২ ভাগ প্রোটিনসমৃদ্ধ) অপরিহার্য। এক্ষেত্রে কারখানায় প্রস্তুতি মানসম্মত খাবার উত্তম,তবে মানসম্মত ভাসমান খাবার প্রয়োগেরও শিং চাষ করা যায়। এক্ষেত্রে পুকুরের তলদেশের স্বাস্থ্যকর পরিবেশ রক্ষা করা যায়।

চাষের মেয়াদকাল : মানসম্মত পোনা,সুষম খাবার এবং আদর্শ চাষ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা গেলে ছয় থেকে সাত মাসে প্রতিটি শিং মাছ ৬০ থেকে ৭০ গ্রাম হয়ে থাকে। এ সময়ের মধ্যে নিয়মিত পানির গুণাগুণ আদর্শমাত্রায় রক্ষা করা গেলে আরও ভালো ফল প্রত্যাশা করা যায়।

চাষের আদর্শ সময় : এপ্রিল-মে মাস থেকে এ মাছ চাষ শুরু করা যায়। যারা আগের বছরের শেষ দিকে নার্সিংয়ে চাপে পোনা রাখেন,তারা ফেব্রুয়ারি মাসের শেষ থেকে পরিকল্পিত চাষ শুরু করতে পারেন। তবে প্রতি বছরে মে-জুন থেকে পোনাপ্রাপ্তি সুবিধা হয়।

দেশি সুস্বাদু লাভজনক শিং মাছের চাষ পদ্ধতি
দেশি সুস্বাদু লাভজনক শিং মাছের চাষ পদ্ধতি

চাষ পরিচর্যা : শিং মাছ চাষে অনেক বেশি পানি দরকার হয় না। পোনা নার্সিংয়ের সময় ২ থেকে ২.৫ ফুট পানিই যথেষ্ট,পরে ৩ থেকে ৩.৫ ফুট পানিতে শিং মাছ চাষ করা যায়। পোনা ছাড়ার পর নিয়মিত ও পরিমিত খাবার দিতে হবে। মোট খাবারকে দুই থেকে তিনবারে ভাগ করে দেয়া ভালো। হ্যাচারি থেকে নেয়া ছোট পোনা সরাসরি চাষে না দিয়ে আলাদা নার্সিং করে ২ ইঞ্চি থেকে ৩ ইঞ্চি হলে চাষ পুকুরে দেয়া উত্তম। পুকুরের পানির গুণাগুণ এবং তলদেশের পরিবেশের ওপর শিং মাছের বৃদ্ধির সম্পর্ক রয়েছে। এ কারণেই পানির গুণাগুণ রক্ষা করা আবশ্যক। প্রতি মাসে একবার শিঙাইট ও প্রোবায়োটিঙ্রে সমন্বয়ে ‘অ্যাকোয়া ম্যাজিক প্লাস’ একবার প্রয়োগ করলে পুকুরের তলদেশ এবং পানির গুণাগুণ রক্ষা করতে সহায়ক হবে।

কখনও কখনও পোনার ত্বক ও ঠোঁটে তুলার মতো সাদা দাগ দেখা দিতে পারে। সেপ্রোলেগনিয়া নামক ছত্রাকের জন্য এমনটি হয়। এক্ষেত্রে প্রতি একরে প্রতি ৩ ফুট পানির জন্য ৫০০ থেকে ৬০০ মিলিলিটার ‘পলগার্ড প্লাস’ পরপর দুই দিন দুই ডোজ ব্যবহার করলে সুফল পাওয়া যাবে। তাছাড়া ফরমালিন বা ম্যালাকাইট গ্রিনের মাধ্যমেও চিকিৎসা করা যায়। পরজীবী বা প্রোটোজোয়া কর্তৃক শিং মাছ আক্রান্ত হলে ডেলেটিঙ্ প্রয়োগে চমৎকার সুফল পাওয়া যায়। বেশি খাবার প্রয়োগ বা জৈব পদার্থের পচনের মাধ্যমে পানিতে অ্যামোনিয়া গ্যাসের মাত্রা বেড়ে যেতে পারে, এ অবস্থায় মাছ মারা যেতে পারে খুব দ্রুত। এ সমস্যা দূরীকরণে প্রতি একরে ৩০০ থেকে ৪০০ গ্রাম গ্যাসোনেঙ্ প্লাস সারা পুকুরে (বালির সঙ্গে মিশিয়ে) ছিটিয়ে দিলে তাৎক্ষণিক সুফল পাওয়া যায়। একই সঙ্গে পানি পরিবর্তন করে দিতে পারলে ভালো হয়। মূলত অ্যামোনিয়াজনিত সমস্যাই শিং মাছের চাষে সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধক।

মানসম্মত খাবার ছাড়া শিং চাষ লাভবান হয় না। প্রাণিজ প্রোটিন হিসেবে মিট অ্যান্ড বোন মিলের ব্যবহারের পরিবর্তে ভালো মানের ফিশমিল ব্যবহার করা আবশ্যক। খাবারের সঙ্গে দ্রুত হজমের জন্য ‘বায়োজাইম’ এবং গ্রোথ প্রোমোটর (র‌্যাপিড গ্রো) প্রয়োগ করলে অত্যন্ত ভালো ফল লক্ষ করা যায়।

শিং মাছের পুকুরের মধ্যে বা একপাশে বাঁশের বেষ্টনীর মধ্যে কিছু কচুরিপানা রাখা গেলে পানির পরিবেশ এবং শিং মাছের জন্য উপযোগী হয়।

রোগ প্রতিরোধ করার জন্য চাষকালীন সময়ে দ্বিতীয় মাস থেকে প্রতি মাসের প্রথম সপ্তাহে পলগার্ড প্লাস অথবা পন্ড সেফ,দ্বিতীয় সপ্তাহে গ্যাসোনেঙ্ প্লাস এবং তৃতীয় সপ্তাহে অ্যাকোয়া ম্যাজিক প্লাস প্রয়োগ করলে রোগমুক্ত মাছ চাষ করা সম্ভব। মাঝে মধ্যে মাছের স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণ করা আবশ্যক।

শিং মাছ আহরণ পদ্ধতি : অন্যান্য মাছ জাল টেনে ধরা গেলেও শিং মাছ জাল টেনে ধরা যায় না। শিং মাছ ধরতে হলে শেষ রাতের দিকে পুকুর সেচ দিয়ে শুকিয়ে ফেলতে হবে। শিং মাছ ধরার উত্তম সময় হল ভোর বেলা থেকে সকাল ৮টা পর্যন্ত। রোদের সময় মাছ ধরলে মাছ মারা যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। মাছ ধরার পর মাছ থেকে গেলে শ্যালো দিয়ে কমপক্ষে ২ ফুট ঠাণ্ডা পানি দিয়ে পুকুর ভরে রাখতে হবে। পরের দিন আবার একই নিয়মে মাছ ধরতে হবে। শিং মাছ ধরতে একটা কৌশল অবলম্বন করতে হয়। একহাতে নুডুল্সের প্লাস্টিক ছাকনী আর অন্য হাতে স্টিলের ছোট গামলা দিয়ে মাছ ধরে প্লাস্টিকের বড় পাত্রে রাখতে হবে। এরপর মাছগুলো হাপায় নিয়ে ছাড়তে হবে। 

আমি আগেই উল্লেখ করেছি, শিং মাছের পুকুর এক পাশে ঢালু রাখা দরকার। এতে পুকুর সেচ দেয়ার পর সমস্ত মাছ একপাশে চলে আসবে। তা না হলে সমস্ত পুকুর জুড়ে মাছ ছড়িয়ে থাকবে। মাছ ধরায় খুব সমস্যা হবে। সাধারণত শিং মাছ ধরার সময় একটু সাবধানতা অবলম্বন করা দরকার। 
মাছের কাঁটা বিঁধলে সেখানে খুবই ব্যথা হয়। কাঁটা বিঁধানো জায়গায় ব্যথানাশক মলম লাগিয়ে গরম পানি দিলে সাথে সাথে কিছুটা উপশম হয়। এছাড়া মলম লাগিয়ে গরম বালির ছ্যাক দিলেও আরাম পাওয়া যায়। তাই শিং মাছ ধরার আগে এমন ব্যবস্থা রাখলে মন্দ হয় না। একটু সাবধানতা অবলম্বন করলে এসবের কিছুরই প্রয়োজন হয় না। 

শিং মাছ বাজারের একটি দামি মাছ। ডাক্তাররা বিভিন্ন রোগির পথ্য হিসেবে শিং মাছ খাবার উপদেশ দিয়ে থাকেন। কথায় আছে, শিং মাছে গায়ে দ্রুত রক্ত বৃদ্ধি করে থাকে। 
পুকুরে শিং মাছের কীভাবে চাষ করতে হয় তা আলোচনা করা হল। আলোচিত পদ্ধতিতে শিং মাছ চাষ করলে ১০ মাসে এক একরে প্রায় ৪ টন শিং মাছ উৎপাদন সম্ভব যা নিজের অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নতির পাশাপাশি বিলুপ্তির হাত থেকেও রক্ষা পাবে এই শিং মাছ। 

এক হেক্টর আয়তনের পুকুরে শিং-মাগুর চাষের জন্য বার্ষিক আয়-ব্যয়ের হিসাব
(১) পুকুর শুকানো/মাছ মারার ওষুধ ৪,০০০ টাকা, 
(২) চুন ২৫০ কেজি মূল্য ২,০০০ টাকা, 
(৩) জৈব সার ২,০০০ কেজি মূল্য ২,০০০ টাকা, 
(৪) ইউরিয়া ২৫০ কেজি মূল্য ২,০০০ টাকা, 
(৫) টিএসপি ১২৫ কেজি মূল্য ১,৮৭৫ টাকা, 
(৬) এমপি ১০০ কেজি মূল্য ৭০০ টাকা 
(৭) সম্পূরক খাদ্য ৩,৬০০ কেজি মূল্য ৫৪,০০০ টাকা, 
(৮) মাছের পোনা (৪-৬ সে.মি.) ২৫০০০ টি মূল্য ৩৭,০০০ টাকা, 
(৯) ওষুধ ও রাসায়নিক গুচ্ছ মূল্য ১,০০০ টাকা, 
(১০) মাছ আহরণ ও বাজারজাতকরণ গুচ্ছ মূল্য ৪,৫০০ টাকা, 
(১১) বিবিধ ১,৪০০ টাকা। মোট ব্যয় ১,১০,৪৭৫ টাকা।
পুকুর ভাড়া এবং ব্যাংক ঋণ নিয়ে চাষ করলে ২৮,০০০ টাকা বেশি ব্যয় হবে।
উত্পাদন ও আয় : উত্পাদন : ১,৮০০ কেজি মাছ। আয় : প্রতি কেজি ১২৫ টাকা হিসেবে ১,৮০০ কেজির মূল্য ২,২৫,০০০ টাকা।
মুনাফা : ২,২৫,০০০ থেকে ১,১০,৪৭৫ টাকা = ১,১৪,৫২৫/- টাকা।
টাকার হিসাব সমূহ সময়ের সাথে সম্বনয় করে নিতে হবে

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য করুন

অনুগ্রহ করে মন্তব্য করতে লগ ইন করুন লগ ইন

Leave a Reply

বাংলাদেশ

মাছের টিকা উদ্ভাবন করলেন সিকৃবি শিক্ষক ড. মামুন

দেশে মাছের রোগ প্রতিরোধী প্রথম টিকা উদ্ভাবন করেছেন সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (সিকৃবি) শিক্ষক ড. আব্দুল্লাহ আল মামুন। টিকাটি মাছের রোগ প্রতিরোধে ৮৪ শতাংশ কার্যকর হয়েছে বলে জানিয়েছেন এই মৎস্যবিজ্ঞানী। টিকাটি শরীরে পুশ করে নয় খাবারের সঙ্গে মিশিয়ে মাছকে খাওয়াতে হবে।

মৎস্য বিজ্ঞান অনুষদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. মামুনের উদ্ভাবিত টিকাটি মাছের ব্যাকটেরিয়াজনিত একাধিক রোগের প্রতিষেধক হিসেবে কাজ করবে। এছাড়া মাছের মৃত্যুহার কমিয়ে উৎপাদন বাড়াবে।

এমন আশার কথা জানিয়ে টিকার উদ্ভাবক জাগো নিউজকে বলেন, ২০১৬ সাল থেকে মাছের টিকা উদ্ভাবন নিয়ে গবেষণা করছিলেন তিনি। ২০২১ সালে এসে তিনি এর সফলতার মুখ দেখেন।

ড. মামুন জানান, এরোমোনাস হাইড্রোফিলা নামে এক ধরনের ব্যাকটেরিয়ায় আক্রান্ত হয়ে মাছের ক্ষত রোগ, পাখনা পচাসহ বিভিন্ন রোগ দেখা দেয়। এতে প্রতি বছর প্রচুর মাছ মারা যায়। তবে এই উপমহাদেশে মাছের টিকা নিয়ে তেমন কাজ হয়নি।আব্দুল্লাহ আল মামুন তার উদ্ভাবিত এই টিকার নাম দিয়েছেন বায়োফ্লিম।

তিনি বলেন, ‘আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণাগারে কিছু পাঙ্গাশ মাছের শরীরে এই টিকা প্রবেশ করিয়ে ৮৪ শতাংশ সফলতা পেয়েছি। এরপর মাঠপর্যায়ে এটি প্রয়োগ করা হবে।

‘আগামী মার্চ থেকে সিলেটের বিভিন্ন পুকুরের মাছের শরীরে এই টিকা প্রয়োগ করা হবে। এর মধ্যে কয়েকটি পুকুরও নির্ধারণ করা হয়েছে। মাঠ পর্যায়ে প্রয়োগে সফলতা মিললেই বাণিজ্যিক উৎপাদনের উদ্যোগ নেওয়া হবে।’

ড. মামুন বলেন, এই টিকা ব্যাপকভাবে উৎপাদনের সক্ষমতা আমাদের নেই। আমাদের যে সক্ষমতা আছে তাতে প্রতি মাসে ১০০ মিলিলিটার উৎপাদন করতে পারবো। এই পরিমাণ টিকা এক কেজি মাছের খাবারের সঙ্গে মেশানো যাবে।

‘এই গবেষণা কাজে সহযোগিতার জন্য বাংলাদেশ অ্যাকাডেমি অব সায়েন্সে একটি প্রকল্প প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে।’

সিলেট জেলা মৎস্য কর্মকর্তা আবুল কালাম আজাদ বলেন, এই অঞ্চলের বেশিরভাগ মাছই ক্ষত রোগে আক্রান্ত হয়। এ রোগকে মাছের ক্যান্সার হিসাবে দেখা হয়। প্রতি বছর অনেক মাছ ক্ষত রোগে মারা যায় বা পচে নষ্ট হয়।

তিনি বলেন, ইউরোপসহ বিভিন্ন দেশে মাছের শরীরে টিকা প্রয়োগ করা হলেও বাংলাদেশে এখনও শুরু হয়নি। ক্ষত রোগ থেকে মাছ মুক্ত রাখতে আমরা সাধারণত জলাশয়ে চুন ও লবণ ব্যবহার করে থাকি। মাছের টিকাটি উদ্ভাবন পুরোপুরি সফল হলে মাছের উৎপাদন অনেক বাড়বে।

সিকৃবির মৎস্য অনুষদ সূত্রে জানা যায়, জাপান, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, নরওয়ে, ফিনল্যান্ড, চিলিসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে মাছের জন্য ২৮ ধরনের টিকা বাণিজ্যিক ভিত্তিতে ব্যবহার হয়। বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো এ ধরনের টিকা উদ্ভাবন হলো। স্বাদু পানিতে চাষযোগ্য মাছে এই টিকা প্রয়োগ করা যাবে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক মতিয়ার রহমান হাওলাদার জানান, মাছের এই টিকা তৈরিতে গবেষণার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে ২৫ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। এই টাকায় আধুনিক যন্ত্রপাতি কেনা হয়েছে। আশা করি, আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের উৎপাদিত টিকা মাছের উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি দেশের আমিষের চাহিদা পূরণ করবে।

তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশে প্রতি বছর প্রায় ৪০ লাখ টন মাছ উৎপাদন হয়। মাছ উৎপাদনে বাংলাদেশের অবস্থান পঞ্চম। তবে বিভিন্ন রোগের কারণে প্রচুর পরিমাণ মাছ মারা যায়।

সম্পূর্ণ খবরটি পড়ুন

মৎস্য

মাগুর মাছ চাষ করে বিপুল অর্থ উপার্জন করুন

দেশি মাগুর মাছ সুস্বাদু ও উপাদেয়। দেশের প্রায় সব শ্রেণির মানুষের পছন্দের মাছ। এছাড়া পুষ্টিকর খাদ্য হিসেবেও সর্বত্র দেশি মাগুরের চাহিদা রয়েছে। সর্বোপরি, মাগুর একটি জিওল মাছ | অতিরিক্ত শ্বাসযন্ত্রের উপস্থিতির ফলে এই মাছ জলের বাইরে অনেকক্ষণ বেঁচে থাকতে পারে এবং বাতাস থেকে সরাসরি অক্সিজেন গ্রহণ করতে পারে। তাই এই ধরণের মাছগুলিকে জিওল মাছ বলা হয়। এই মাছগুলির বাজারে মূল্য এবং চাহিদাও বেশি | তাই, মাগুর চাষ করে কৃষকরা আর্থিক দিক থেকে লাভবান হয়ে থাকেন

পুকুর নির্মাণ(Pond preparation):

মাছ চাষের প্রথমেই সঠিকভাবে পুকুর নির্বাচন করতে হবে | পুকুরের আয়তন ১০ শতাংশ থেকে ৩৩ শতাংশ এবং গভীরতা ৮০ থেকে ১২০ সেন্টিমিটার (৩ ইঞ্চি থেকে ৪ ফুট) হতে হবে। অধিক গভীরতা উৎপাদনের জন্য অসুবিধাজনক। কারণ মাগুর মাছকে শ্বাস নেওয়ার জন্য সবসময় উপরে আসতে হয়। এতে অতিরিক্ত শক্তিক্ষয়ের কারণে মাছের বৃদ্ধি প্রতিক্রিয়ায় ব্যাঘাত ঘটে।

তবে, অবশ্যই খেয়াল রাখতে হবে পাড়ের ঊর্ধ্বসীমা অবশ্যই সর্বোচ্চ বন্যার লেভেল থেকে ৩০ সেন্টিমিটার (১ ফুট) উপরে রাখতে হবে। এতে বৃষ্টির সময় মাছ বুকে হেঁটে বাইরে যেতে পারে না। আবার বাইরে থেকে সাপ-ব্যাঙ ইত্যাদি মৎস্যভুক প্রাণিও পুকুরে প্রবেশের সুযোগ পায় না। এছাড়া পুকুরের চারদিকের পাড়ের ওপর ৩০ সেন্টিমিটার উঁচু নেটের বেড়া দেওয়া বাঞ্ছনীয়।

চুন প্রয়োগ:

পুকুরের তলদেশ শুকিয়ে হাল্কাভাবে চাষ দিয়ে তলার মাটির পিএইচ পরীক্ষা করে প্রতি শতাংশে ১ থেকে দেড় কেজি হারে চুন প্রয়োগ করতে হবে। চুন প্রয়োগের পর পুকুরে ১৫ সেন্টিমিটার (৬ ইঞ্চি) পরিমাণ জল ঢুকিয়ে সপ্তাহ খানিক ধরে রাখা প্রয়োজন।

সার প্রয়োগ(Fertilizer):

জৈব সার প্রয়োগের ৭ দিন পর জলের উচ্চতা ৬০ সেন্টিমিটার পর্যন্ত বজায় থাকা অবস্থায় প্রতি শতাংশ ২০০ গ্রাম ইউরিয়া ১০০ গ্রাম টিএসপি ও ২০ গ্রাম এমপিও সার ব্যবহার করতে হবে। জলের  রং বাদামি সবুজ, লালচে বাদামি, হাল্কা সবুজ, লালচে সবুজ অথবা সবুজ থাকাকালীন অজৈব সার প্রয়োগের কোনো প্রয়োজন নেই।

পোনা মজুদ:

পুকুরে ৫-৮ সেন্টিমিটার দৈর্ঘের সুস্থ-সবল পোনা প্রতি বর্গমিটারে ৫০ থেকে ৮০টি ছাড়া যেতে পারে। মে-জুন মাসে মাগুরের পোনা ছাড়ার যথার্থ সময়।

খাদ্য ব্যবস্থাপনা(Food):

মাগুর মূলত জলাশয়ের তলদেশের খাদ্য খেয়ে জীবন ধারণ করে। প্রাকৃতিক এই খাদ্যগুলো হচ্ছে জলাশয়ের তলায় আমিষ জাতীয় পচনশীল দ্রব্যাদি। প্রাণি প্লাঙ্কটন ও কেঁচো জাতীয় ক্ষুদ্রাকার প্রাণি ইত্যাদি।

খাদ্য সরবরাহ:

অধিক ঘনত্বে চাষের ক্ষেত্রে পুকুরে সম্পূরক খাদ্য প্রয়োগ করতে হবে। সহজলভ্য দেশীয় উপকরণের মাধ্যমে সম্পূরক খাদ্য প্রস্তুত করা যায়। এ ক্ষেত্রে চালের কুড়া ৪০ শতাংশ, তৈলবীজের খোল ৩০ শতাংশ ও শুঁটকি ৩০ শতাংশ মিশিয়ে গোলাকার বল তৈরি করে মাছকে সরবরাহ করা যেতে পারে। তাছাড়া শামুক ও ঝিনুকের মাংস মাগুরের অত্যন্ত প্রিয় খাবার। পুকুরে মজুদকৃত মাছের মোট ওজনের ৫-১০ শতাংশ হারে দৈনিক খাদ্যের এক-চতুর্থাংশ সকালে এবং বাকি তিন-চতুর্থাংশ সন্ধ্যায় প্রয়োগ করতে হয়।

সম্পূর্ণ খবরটি পড়ুন

মৎস্য

আগামী ৫ বছরে দেশে ইলিশ উৎপাদন বাড়বে ১৬ শতাংশ

দেশে ইলিশের উৎপাদন বাড়াতে মৎস্য অধিদপ্তর ২০২০ সালের জুলাই মাস থেকে ইলিশ সম্পদ উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। বাংলাদেশ সরকারের নিজস্ব অর্থায়নে বাস্তবায়ন করা এই প্রকল্পটি ২০২৪ সালের জুন মাসে শেষ হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

[৩] প্রকল্পটির পরিচালক মো. জিয়া হায়দার চৌধুরী বলেন, প্রকল্পটি বাস্তবায়নে মোট ২৪৬ কোটি ২৭ লাখ ৫৩ হাজার টাকা খরচ হবে। এ পর্যন্ত প্রকল্পের শতকরা ২০ ভাগ কাজ শেষ হয়েছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই প্রকল্পের সব কাজ শেষ হবে।

[৪] প্রকল্পের পটভূমি তুলে ধরে তিনি বলেন, ইলিশ আমাদের জাতীয় মাছ এবং নবায়নযোগ্য প্রাকৃতিক সম্পদ। দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, রপ্তানি আয় ও আমিষ সরবরাহে ইলিশের গুরুত্ব অপরিসীম। দেশের মোট মৎস্য উৎপাদনে ইলিশের অবদান সর্বোচ্চ (প্রায় ১১ ভাগ) এবং জিডিপিতে অবদান ১শতাংশ। উপকূলীয় মৎস্যজীবীদের জীবিকার প্রধান উৎস হচ্ছে ইলিশ।

[৫] প্রায় ৫ লাখ লোক ইলিশ আহরণে সরাসরি নিয়োজিত এবং ২০ থেকে ২৫ লাখ লোক প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িত। বিশ্বে ইলিশ আহরণকারী ১১টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান এখন শীর্ষে। সারা বিশ্বের মোট উৎপাদিত ইলিশের প্রায় ৮০ শতাংশ আহরিত হয় এ দেশের নদ-নদী থেকে।

[৬] এক সময় দেশের প্রায় সব নদ-নদী এবং নদীগুলোর শাখা ও উপনদীতেও প্রচুর পরিমান ইলিশ মাছ পাওয়া যেত। বন্যা বা প্লাবনের বছরে নদীর সঙ্গে সংযোগ আছে এমন সব বিল ও হাওরেও ইলিশ মাছ কখনও কখনও পাওয়া যেত। গুরুত্বপূর্ণ এ মৎস্য সম্পদ আশির দশকে সংকটে পড়ে। আশির দশকের আগে মোট মৎস্য উৎপাদনের ২০শতাংশ ছিল ইলিশের অবদান।

[৭] ২০০২-২০০৩ সালে ইলিশের অবদান দাঁড়ায় জাতীয় উৎপাদনের মাত্র ৮শতাংশ (১.৯৯ টন)। ইলিশ উৎপাদনের গতিধারায় লক্ষ্য করা যায় যে, বিগত ২০০০-২০০১ সালে ইলিশের উৎপাদন ২.২৯ টন থাকলেও ২০০১-০২ ও ২০০২-০৩ সালে তা ক্রমান্বয়ে কমে যথাক্রমে ২.২০ টন এবং ১.৯৯ টনে পৌঁছে। প্রাকৃতিক ও মনুষ্যসৃষ্ট উভয় কারণেই ইলিশের উৎপাদন কমেছিলো।

[৮] এর অন্যতম কারণ হলো অভ্যন্তরীণ জলাশয়ের পরিবেশগত পরিবর্তনের ফলে বিশেষ করে বিভিন্ন নদ-নদীতে অপরিকল্পিতভাবে বাঁধ ও কালভার্ট বা ব্রিজ নির্মাণের কারণে এবং উজান হতে পরিবাহিত পলি জমার জন্য পানি প্রবাহ ও নদ-নদীর নাব্য কমছে এবং জলজ পরিবেশ দূষিত হয়ে পড়ছে। ফলে ইলিশ মাছের পরিভ্রমণ পথ, প্রজননক্ষেত্র, বিচরণ ও চারণক্ষেত্র (ফিডিং এবং নার্সারি গ্রাউন্ড) দিন দিন পরিবর্তিত ও বিনষ্ট হচ্ছে এবং অভ্যন্তরীণ জলাশয়ে ইলিশ মাছের উৎপাদন কমছে।

[৯] এছাড়াও বর্তমানে ক্রমাগত বর্ধিত জনসংখ্যার চাপ, কর্মসংস্থানের অভাব, অতি কার্যকরী একতন্তু বিশিষ্ট ফাঁস জাল এবং মাছ আহরণের উন্নত পদ্ধতির প্রবর্তন ও নৌকা যান্ত্রিকীকরণের ফলে সামুদ্রিক জলাশয়ে ইলিশ মাছের আহরণ মাত্রা বেড়েছে।

[১০] দেশের ইলিশ সম্পদ ধ্বংসের এবং উৎপাদন কমে যাওয়ার পিছনে যে কারণগুলো রয়েছে তার মধ্যে অন্যতম কারণটি হচ্ছে নির্বিচারে ক্ষতিকর জাল ও সরঞ্জাম দিয়ে জাটকা ও মা ইলিশ আহরণ। ইলিশের জন্য খ্যাত এক সময়ের পদ্মা, ধলেশ্বরী, গড়াই, চিত্রা, মধুমতি ইত্যাদি নদীতে বর্তমানে শুষ্ক মৌসুমে ইলিশ মাছ প্রায় পাওয়া যায় না বলা যেতে পারে।

[১১] এসব কারণের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো নির্বিচারে অবৈধ কারেন্ট জাল, বেহুন্দি জাল, বেড় জাল, চর ঘড়া জাল, মশারী জাল, পাইজাল ইত্যাদির ব্যবহার। যদি এই ক্ষতিকর অবৈধ জাল ও সরঞ্জাম নির্মূল না করা যায় তাহলে ইলিশের কাংখিত উৎপাদন বাধাগ্রস্ত হবে।

[১২] তাই প্রকল্পের অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য নির্ধারণ করা হয়েছে জাটকা ও মা ইলিশ সংরক্ষণের মাধ্যমে উৎপাদন বৃদ্ধি করা। এই উদ্দেশ্য অর্জনের জন্য ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনাসহ নদী, মাছ বাজার, মাছ ঘাট, হাট, আড়ৎ ইত্যাদিতে অভিযান পরিচালনা করা অপরিহার্য।

[১৩] ইলিশ ও জাটকাসহ অন্যান্য ছোট মাছ, পোনা মাছ নির্বিচারে ধ্বংসের অপতৎপরতায় কেবল ইলিশ সম্পদ বিনষ্ট হচ্ছে তা নয়, উপকূলীয় ইকোসিস্টেম প্রতিকূল অবস্থায় পড়েছে এবং ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। ইলিশ জেলেদের এক বিরাট অংশ বেকার হয়ে পড়ছে, তাদের পরিবার পরিচালনা কঠিন হচ্ছে। ইলিশ সম্পদ কমার কারণে এর আহরণ কমে যাওয়ায় জীবন ধারণ করাই কঠিন হয়ে পড়ছে।

[১৪] মৎস্যজীবী সম্প্রদায়ের আবাসস্থল দূরে ও দূর্গম হওয়ায় সরকারের সেবামূলক কার্যক্রম এবং সম্প্রসারণ কর্মকান্ডে তাদের অংশগ্রহণ খুবই সীমিত। এছাড়াও এ অঞ্চলের জনসাধারণকে প্রায় প্রতিবছর প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলা করতে হয় অনেক জীবন ও সম্পদের বিনিময়ে।

[১৫] প্রাকৃতিক ঝুঁকি হ্রাসকরণ এবং জীবনের নিরাপত্তা বিধান তথা আর্থ সামাজিক অবস্থার উন্নয়নে তাদের যৌথ উদ্যোগ বা প্রচেষ্টা খুবই দরকার। এভাবে ইলিশ সম্পদ স্থায়িত্বশীল হবে এবং উপকূলীয় মৎস্যজীবী সম্প্রদায়ের অধিক ক্ষমতায়ন ঘটবে। জাতীয় মাছ ইলিশ উৎপাদনের পরিমাণ ও প্রাপ্যতা বাড়ানোর পাশাপাশি স্থায়িত্বশীল আহরণ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে দেশের ইলিশসমৃদ্ধ ২৯ জেলার ১৩৪টি উপকূলীয় উপজেলায় ‘ইলিশ সম্পদ উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা’ প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।

[১৬] সমাজে জেলেদের স্থান দারিদ্র্যস্তরের অনেক নীচে। প্রতিদিন তিনবেলা খাবার জোগাড় করা তাদের জন্য কষ্টসাধ্য। আর যখন জাটকা ও মা ইলিশ রক্ষার সময় মাছ ধরা বন্ধ রাখা হয় তখন তাদের কষ্ট চরম শিখরে পৌঁছে। এই দারিদ্র্য নিরসনে প্রকল্পটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

[১৭] প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে উপকূলীয় এলাকার ৩০ হাজার জেলে পরিবার স্বাবলম্বী হবে এবং জীবিকা নির্বাহের জন্য বিকল্প অয়ের পথ খুঁজে পাবে যা তাদের দারিদ্র্য কমাবে। সেই সঙ্গে জেলেসহ অন্যান্য পেশাজীবী জনসাধারণের প্রায় ৪ লাখ সুফলভোগী ইলিশ ও জাটকা রক্ষা কার্যক্রমের সুফল সম্পর্কে সচেতন হবে।

[১৮] অর্থাৎ প্রকল্প হতে দরিদ্র জেলেরা প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষ উভয় প্রকারে উপকৃত হবে। ফলে প্রকল্পটি ইলিশের উৎপাদন বাড়ানোর মাধ্যমে আমিষের চাহিদা পূরণে সহায়তা করবে।

[১৯] প্রকল্পের সুনির্দিষ্ট উদ্দেশ্য সম্পর্কে প্রকল্প পরিচালক মো. জিয়া হায়দার চৌধুরী বলেন, মা ইলিশ ও জাটকা সংরক্ষণে মৎস্য সংরক্ষণ আইন বাস্তবায়ন এবং অভয়াশ্রম ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে ইলিশের উৎপাদন বৃদ্ধিকরণ; দক্ষতা বৃদ্ধিপূর্বক জাটকা ও মা ইলিশ আহরণকারী ৩০ হাজার জেলে পরিবারের জন্য বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি এবং জেলেদের ১০ হাজার বৈধ জাল বিতরণ ও ব্যাপক প্রচার-প্রচারণার মাধ্যমে মা ইলিশ ও জাটকা সংরক্ষণে জনসচেতনতা সৃষ্টি।

[২০] প্রকল্পের লক্ষ্য তুলে ধরে তিনি বলেন, মোট ১০ হাজার জেলে পরিবারকে বৈধ জাল সরবরাহ এবং ৩০ হাজার ইলিশ ও জাটকা জেলে পরিবারকে তাদের চাহিদা অনুযায়ী বিকল্প কর্মসংস্থানের উপকরণ বিতরণ ও প্রশিক্ষণ দেওয়ার মাধ্যমে দক্ষতা উন্নয়নের মাধ্যমে দারিদ্র্য কমানো হবে।

[২১] দেশের ২৯ জেলার ১৩৪ উপজেলায় প্রকল্পের এলাকা বিস্তার লাভ করায় পদ্মাসহ অন্যান্য নদীতে ইলিশের পরিমাণ বাড়বে। জেলে, মৎস্যজীবী, বিক্রেতা, আড়তদার, মাছ পরিবহনকারী অর্থাৎ ইলিশ আহরণ ও বাজারজাতকরণে সম্পৃক্ত সবাই প্রকল্পের সুবিধাভোগী হবে।

[২২] প্রকল্পের ফলাফল প্রসঙ্গে তিনি জানান, মা ইলিশ ও জাটকা সংরক্ষণে মৎস্য সংরক্ষণ আইন বাস্তবায়ন এবং ইলিশ জেলেদের বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টির মাধ্যমে ইলিশের উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে এবং পদ্মা নদীসহ অন্যান্য নদীতেও ইলিশের প্রাপ্যতা বাড়বে।

[২৩] জাটকা আহরণকারী জেলে পরিবারের জন্য বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা হবে। জাটকা ও ইলিশ জেলেদের মাঝে গণসচেতনতা সৃষ্টি হবে। ইলিশ অভয়াশ্রম ব্যবস্থাপনায় সমাজভিত্তিক ব্যবস্থাপনা বিষয়ক কারিগরি জ্ঞান সম্পন্ন দক্ষ জনবল গড়ে উঠবে এবং দেশে মাছের ক্রমবর্ধমান চাহিদা পূরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে এবং জাটকা ও ইলিশ জেলেদের জীবনমান উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে পারবে।

[২৪] মা ইলিশ ও জাটকা সংরক্ষণে প্রয়োজন এক হাজার ৭২টি জনসচেতনতা সভা ও ৬০টি কর্মশালা আয়োজন; জাটকা ও মা ইলিশ সংরক্ষণে ১৬ হাজার ৬১৬টি অভিযান বা মোবাইল কোর্ট পরিচালনা; মা ইলিশ সংরক্ষণে ১ হাজার ২৭৮টি সম্মিলিত বিশেষ অভিযান পরিচালনা; প্রকল্প মেয়াদে ৬টি জেলার ২৩টি উপজেলার ১৫৪ টি ইউনিয়ন সংলগ্ন ছয়টি ইলিশ অভয়াশ্রম পরিচালনা; ৩০ হাজার জাটকা জেলে পরিবারের বিকল্প কর্মসংস্থান সৃষ্টি; জেলে পরিবারের বিকল্প কর্মসংস্থানের লক্ষ্যে ১৮ হাজার জন জেলেকে প্রশিক্ষণ দেওয়া; প্রকল্প মেয়াদে প্রকল্প বাস্তবায়নাধীন এলাকার ৪ লাখ জেলেসহ অন্যান্য পেশাজীবী জনসাধারণের মাঝে জাটকা সংরক্ষণের গুরত্ব ও প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে সচেতনতা সৃষ্টি।

সম্পূর্ণ খবরটি পড়ুন

মৎস্য

মাছ দ্রুত বৃদ্ধিতে যত রকম পদ্ধতি

মাছের বৃদ্ধি বাড়ানোর কিছুু কৌশল রয়েছে। মাছচাষিরা প্রায়ই মাছ দ্রুত বৃদ্ধিতে করণীয় বিষয়ে জানতে চান। মাছ দ্রুত বৃদ্ধিতে যা যা করবেন এ বিষয়ে আজকের আয়োজন…

মাছের কৌলিত্বাত্তিক গবেষণার অগ্রগতির সাথে সাথে দৈহিক বৃদ্ধি ত্বরান্বিত করার বিভিন্ন কৌশল মৎস্য বিজ্ঞানীরা উন্মোচন করে যাচ্ছেন। এর মধ্যে মনোসেক্স পপুলেশন তৈরী, সিলেকটিভ ব্রিডিং, লাইন ব্রিডিং, ক্রস ব্রিডিং পদ্ধতিগুলো অনেকক্ষেত্রে সফলভাবে ব্যবহার করে অধিক বর্ধনশীল মাছের পোনা উৎপাদন করা সম্ভব হচ্ছে। এসব পদ্ধতির মাধ্যমে উৎপাদিত পোনা চাষ করে শতকরা ২৫-৬০ ভাগ পর্যন্ত উৎপাদন বৃদ্ধি করা সম্ভব হয়েছে। আসুন জেনে নেই মাছের বৃদ্ধি বাড়ানোর কৌশলগুলো সম্পর্কে-

গাইনোজেনেসিস পদ্ধতিঃ

এমন একটি ফার্টিলাইজেশন প্রক্রিয়া যেখানে কেবল স্ত্রী মাছ থেকে সকল ক্রোমোসোম বা জীন গ্রহন করে পোনা উৎপাদন করা হয়। ফলে উৎপাদিত সব পোনা হয় মাতার বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন। এক্ষেত্রে পিতা থেকে আগত ক্রোমোসোম সেট ফার্টিলাইজেশনে অংশগ্রহন করেনা তবে ফার্টিলাইজেশন প্রক্রিয়াকে সক্রিয় করতে ভূমিকা রাখে।

পরবর্তীতে নিষিক্ত ডিম বা জাইগোট বিভাজনের সময় প্রথম ক্লিভেজ সম্পূর্ণ হওয়ার আগেই (মাতা থেকে প্রাপ্ত ক্রোমোসোম সেট ডুপ্লিকেট হওয়ার পর নব সৃষ্ট কোষ হিসেবে পৃথক হয়ে যাওয়ার মূহুর্তে) কোল্ড শক বা হিট শক দিতে হবে। ফলে ইরেডিয়েটেড বা রাসায়নিক উপায়ে নিষ্ক্রিয় ক্রোমোসোম সেট (পিতা থেকে প্রাপ্ত) বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে এবং মাতা থেকে প্রাপ্ত ক্রোমোসোম সেট (ডিম্বাণু থেকে প্রাপ্ত) এবং তার ডুপ্লিকেট ক্রোমোসোম সেট (নিষিক্ত ডিমের কোষ বিভাজনের সময় ডিম্বাণুর ক্রোমোসোমের কার্বন কপি হিসেবে সৃষ্ট) সংযোজিত হয়ে নতুন একটি নিষিক্ত কোষ তৈরী হবে।

উক্ত নব সৃষ্ট নিষিক্ত কোষে কেবল মাতা থেকে প্রাপ্ত ক্রোমোসোমই থাকবে। ফলে সব পোনা হবে স্ত্রী ও ১০০% ইনব্রেড। অর্থ্যাৎ তারা মাতার ক্রোমোসোমে সংরক্ষিত বংশগত বৈশিষ্ট্য হুবহু বহন করবে। সুতরাং গাইনোজেনেসিস সেসব মাছের ক্ষেত্রে লাভজনক হবে যাদের পুরুষ অপেক্ষা স্ত্রীদের বৃদ্ধি উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি।

এভাবে পোনা তৈরী করে অধিক বর্ধনশীল পোনা উৎপাদন করা সম্ভব। আবার মাছের ক্ষেত্রে মিয়োসিস কোষ বিভাজনের সময় সৃষ্ট সেকেন্ড পোলার বডি ডিম্বানু নিষিক্ত হওয়ার পরও কিছু সময় ডিম্বানুর সাথে লেগে থাকে। সুতরাং ডিম্বানু নিষিক্ত হওয়ার পরপর কোল্ড শক বা হিট শক দিয়ে যদি সেকেন্ড পোলার বডিকে নিষিক্ত ডিম্বানুর সাথে মার্জ করে দেয়া যায় তাহলেও গাইনোজেন (সব স্ত্রী) পোনা তৈরী করা সম্ভব।

সেকেন্ড পোলার বডিকে মার্জ করা সম্ভব হলে নিষিক্ত ডিম্বানু পুনঃ বিভাজিত হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করার প্রয়োজন হবেনা। কারণ, ডিম্বানুর ক্রোমোসোম সেট আর সেকেন্ড পোলার বডির ক্রোমোসোম সেট মিলে নতুন জাইগোট সৃষ্টি হবে। যা পরবর্তীতে বিভাজিত হয়ে যথানিয়মে গাইনোজেন পোনা উৎপাদন করবে। এই পদ্ধতিতে যেহেতু মিয়োসিস প্রক্রিয়ায় উৎপাদিত সেকেন্ড পোলার বডিকে নিষিক্তকরণে কাজে লাগানো হয় তাই একে মিয়োটিক গাইনোজেনেসিস বলে। এক্ষেত্রে ১০০% স্ত্রী পোনা উৎপাদিত হবে কিন্তু ১০০% ইনব্রেড তৈরী করা সম্ভব হবেনা।

হরমোন ট্রিটমেন্ট মনোসেক্স তেলাপিয়া তৈরীর কৌশলঃ

অধিকাংশ প্রাণীর দুই ধরণের যৌন বৈশিষ্ট্য থাকে। প্রাইমারী সেক্সচুয়াল ক্যারেক্টার এবং সেকেন্ডারী সেক্সচুয়াল ক্যারেক্টার। প্রাইমারী সেক্সচুয়াল ক্যারেক্টার বলতে তার পুরুষ ও স্ত্রী নির্দেশক যৌনাংগ গঠিত হওয়া বুঝায়। এক্ষেত্রে হরমোনের তেমন কোন প্রভাব নেই। কিন্তু সেকেন্ডারী সেক্সচুয়াল ক্যারেকটার উন্নয়নের ক্ষেত্রে সেক্স হরমোনের প্রত্যক্ষ প্রভাব পরিলক্ষিত হয়। যেমন, শুক্রাণু ও ডিম্বাণু তৈরী হওয়া, বিপরীত লিংগের প্রতি আকর্ষণ অনুভব করা, আনুষাংগিক পুরুষ স্ত্রী বিভেদক দৃশ্যমান দৈহিক পরিবর্তন (মাছের ক্ষেত্রে দেহের রং, আঁইশ) ইত্যাদির ক্ষেত্রে সেক্স হরমোনের প্রত্যক্ষ প্রভাব দেখা যায়।

মাছের ক্ষেত্রে যেহেতু জন্মের সাথে সাথে গোনাড ডেভেলপ হয়না সেহেতু যদি তার পোনাকে ইয়ক স্যাক (কুসুম থলি) শেষ হওয়ার অব্যবহিত পূর্বে হরমোন মেশানো খাবার খাওয়ানো নিশ্চিত করা যায় তাহলে সঠিক ফলাফল আশা করা যায়। কারণ, একবার গোনাড ডেভেলপ হয়ে গেলে হরমোন মেশানো খাবার খাওয়ালে ফলাফল আশানুরূপ হবেনা। এমনকি উল্লেখযোগ্য কোন ফল পাওয়া যাবেনা।

অন্য খাদ্য গ্রহনের সুযোগ থাকলে পোনা হরমোন মেশানো খাদ্য নাও খেতে পারে। তাই ঐ সময় পোনাকে নিয়ন্ত্রিত স্থানে রাখতে হবে। আবার অধিকাংশ হ্যাচারী মালিক বলে থাকেন মনোসেক্স তৈরীর জন্য একটানা ২১ দিন হরমোন মেশানো খাদ্য খাওয়াতে হবে। তথ্যটি বিজ্ঞানসম্মত নয়। আসল কথা হলো গোনাড ডেভেলপ হওয়ার আগ পর্যন্ত খাওয়াতে হবে। অর্থ্যাৎ প্রতিটি পোনার ওজন ৫ গ্রাম হওয়া পর্যন্ত খাওয়াতে হবে। প্রতিটি পোনা ৫ গ্রাম ওজন হতে যতদিন সময় লাগে ততদিন।

কেননা একবার গোনাড ডেভেলপ হয়ে গেলে আর হরমোন খাওয়ানোর প্রয়োজন নেই। সব পুরুষ পোনা তৈরীর জন্য খাওয়াতে হবে পুরুষ হরমোন, ১৭ আলফা মিথাইল টেস্টোস্টেরন। আর সব স্ত্রী পোনা তৈরীর জন্য খাওয়াতে হবে স্ত্রী হরমোন, ইস্ট্রোজেন। নির্দিষ্ট মাত্রায় (সাধারণত ২ মিলিগ্রাম/কেজি খাদ্য) নির্ধারিত মেয়াদে হরমোন মেশানো খাদ্য খাওয়ালে আশানুরূপ ফল পাওয়া যাবে।

মনোসেক্স তেলাপিয়া তৈরীর জন্য প্রথম থেকেই প্যারেন্ট স্টকের যতœ নিতে হবে। পুরুষ এবং স্ত্রী মাছকে একই জলাশয়ে পৃথক হাপায় রাখতে হবে। যখন পুরুষ এবং স্ত্রী মাছ পরিপক্ক হবে তখন তাদের প্রজনন ঘটানোর জন্য এক নেটে বা হাপায় রাখতে হবে। এক হাপায় রাখার পর তারা প্রাকৃতিক নিয়মে প্রজননে অংশগ্রহন করবে এবং ডিম নিষিক্ত হওয়ার পর স্ত্রী তেলাপিয়া নিষিক্ত ডিমকে তাদের মুখের মধ্যে নিয়ে নেবে।

প্রথম অবস্থায় নিষিক্ত ডিমের রং হবে গোলাপী, তারপর কমলা, তারপর বাদামী, সবশেষে কালচে বাদামী। ডিমের রং কালচে বাদামী হলে বুঝতে হবে ২/১ দিনের মধ্যে ডিম ফেটে রেণু বের হবে। সুতরাং এখনই তাদের তেলাপিয়ার মুখ থেকে হ্যাচিং ট্রেতে স্থানান্তর করতে হবে। হ্যাচিং ট্রেতে পরিস্ফুটনযোগ্য ডিম রাখার পর পানির প্রবাহ অব্যাহত রাখতে হবে। ট্রেতে অধিকাংশ ডিমের হ্যাচিং শেষ হলে ১/২ দিন পর পূর্ব থেকে প্রস্তুতকৃত হাপায় রেণু স্থানান্তর করতে হবে। এবং প্রথম দিন থেকেই হরমোন মেশানো খাদ্য খাওয়াতে হবে।

সাধারণত রেণুকে বডি ওয়েটের ৩০-৪০ ভাগ খাদ্য প্রদান করতে হয়। এবং ঐ খাদ্য দিনে ৩/৪ বার সরবরাহ করতে হয়। ভাল এরেশনের ব্যবস্থা রাখতে হয়। অনেকে সতর্কতার জন্য স্ত্রী তেলাপিয়ার মুখ থেকে বাদামী বা কমলা রংয়ের নিষিক্ত ডিম সংগ্রহ করেন। এক্ষেত্রে নিষিক্ত ডিম হ্যাচিং ট্রেতে বেশিদিন রাখতে হয়। নিষিক্ত হওয়ার পর থেকে রেণু হ্যাচ হওয়া পর্যন্ত প্রায় ২০-২১ দিন সময় লাগে। সুতরাং মায়ের মুখে নির্দিষ্ট সময় থাকার পর বাকি দিনগুলো ডিমগুলোকে হ্যাচিং ট্রেতে রাখতে হয়।

কোন কোন ক্ষেত্রে মুখের ভেতরেই রেণুর পরিস্ফুটন শুরু হয়ে যায়। প্রজননের পূর্বে হ্যাচারী মালিক সাধারণত ৫০-১০০ জোড়া পুরুষ স্ত্রী মাছ একই হাপায় রেখে দেয়। এবং প্রতি সপ্তাহে নিষিক্ত ডিম সংগ্রহ করে হ্যাচিং ট্রেতে স্থানান্তর করে। ফলে কোন কোন হ্যাচারী মালিক/অপারেটর বলে থাকেন তেলাপিয়া প্রতি ১০ দিন পরপর ডিম দিয়ে থাকে। এটা ভুল ধারণা। তেলাপিয়া বছরে ৩/৪ বার ডিম দিয়ে থাকে। এর বেশি নয়।

এক্ষেত্রে অনেকগুলো প্রজননক্ষম পুরুষ স্ত্রী মাছ একই হাপায় থাকায় এমন বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়ে থাকে। কেননা সব সময় কোন না কোন জোড়া প্রজননে অংশ নেয়ায় তারা ধারাবাহিকভাবে নিষিক্ত ডিম পেতেই থাকে। যে মাছ থেকে নিষিক্ত ডিম একবার সংগ্রহ করা হয়েছে সেসব মাছ তারা যদি আলাদা হাপায় রাখে এবং ১০ দিন পর আবারও ডিম সংগ্রহ করতে সক্ষম হয় তাহলে তাদের ধারণা সঠিক বলা যাবে। একবার প্রজননে অংশ নেয়া মাছ পুনরায় প্রজননক্ষম মাছের হাপায় রেখে এটা কোনক্রমেই নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয় যে তেলাপিয়া ১০ দিন পরপর ডিম দিয়ে থাকে।

সুপারমেল তৈরীর কৌশলঃ

ওয়াইওয়াই মেল বা সুপার মেল তৈরীর বিভিন্ন পদ্ধতি আছে। তার মধ্যে একটি হলো এন্ড্রোজেনেসিস। সফলভাবে এন্ড্রোজেনেসিস সম্পন্ন করা গেলে যে পোনা উৎপাদিত হবে তার ৫০% হবে সুপার মেল (ওয়াইওয়াই মেল)। প্রথমে হরমোন ট্রিটমেন্ট করে পরে সাধারণভাবে প্রজননের মাধ্যমে সুপারমেল তৈরী করা সম্ভব। আবার প্রথমে হরমোন ট্রিটমেন্ট করে পরে গাইনোজেনেসিস প্রক্রিয়ায়ও সুপারমেল তৈরী করা যেতে পারে।

সুপারমেল তৈরীর পদ্ধতিঃ

প্রথমে এফ ওয়ান জেনারেশন কে ইস্ট্রোজেন হরমোন ট্রিটমেন্ট দিতে হবে। ফলে পুরুষ পোনাগুলোও স্ত্রী পোনাতে পরিণত হবে কিন্তু তাদের জেনোটাইপ থাকবে এক্স ওয়াই। এরপর প্রজেনি টেস্টে যেতে হবে। হরমোন ট্রিটমেন্টের পর উৎপাদিত এক্স-ওয়াই স্ত্রী পোনাগুলোর সাথে একটি সাধারণ এক্স ওয়াই পুরুষের প্রজনন করাতে হবে।

যদি এফ টু জেনারেশনে উৎপাদিত পুরুষ:স্ত্রী পোনার অনুপাত ৫০:৫০ হয় তাহলে বুঝতে হবে এফ ওয়ান জেনারেশনের হরমোন ট্রিটমেন্ট এর ফলে কাঙ্খিত পরিবর্তন ঘটেনি, অর্থ্যাৎ উৎপাদিত পোনারা ছিল এক্সএক্স স্ত্রী। আর যদি উৎপাদিত সুপারমেল:মেল:স্ত্রী পোনার অনুপাত হয় ২৫: ৫০:২৫ তাহলে বুঝতে হবে এফ ওয়ান জেনারেশনে (হরমোন ট্রিটমেন্ট সফল হওয়ায়) এক্সওয়াই স্ত্রী পোনা উৎপাদিত হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত ছিল।

এফ টু জেনারেশনে পুরুষ স্ত্রী অনুপাত ৭৫:২৫ হলে দ্বিতীয় প্রজননে এক্সওয়াই পুরুষ ও ওয়াইওয়াই সুপার মেল মাছের উপস্থিতি নিশ্চিত হওয়া যাবে। পরে প্রজেনি টেস্ট করতে হবে। এফ টু জেনারেশনে উৎপাদিত পুরুষ পোনা কেবল এক্সওয়াই মেল হলে প্রজেনি টেস্টে পুরুষ:স্ত্রী পোনার অনুপাত হবে ৫০:৫০।

আর এফ টু জেনারেশনে উৎপাদিত পুরুষ পোনার মধ্যে ওয়াইওয়াই মেল (২৫%) থাকলে এফ থ্রি জেনারেশনে উৎপাদিত সব পোনা হবে পুরুষ (১০০% এক্সওয়াই)। এই পদ্ধতিতে সুপারমেল তৈরী করতে হলে আমাদের কমপক্ষে তিনটি প্রজনন কাল অতিক্রম করতে হবে।

মাছের সংকরায়নঃ

সাধারণত দুটি ভিন্ন প্রজাতির মাছের মধ্যে মিলন ঘটানোকে সংকরায়ণ বলে। অবস্থানের ভিন্নতার কারণে যখন একই প্রকার দুটি মাছের মধ্যে স্বাভাবিক মিলন সম্ভব হয় না, তখন এদের মধ্যে মিলন ঘটানোকেও সংকরায়ণ বলা যায়। সংকরায়ণের ফলাফল সম্পর্কে ভবিষ্যৎ বাণী করা সম্ভব নয়। দুটি ভাল গুণাগুণ সম্পন্ন মাছের সংকরায়ণের ফলে প্রাপ্ত সংকর বিশিষ্ট গুণসম্পন (হাইব্রিড ভিগর) নাও হতে পারে।

সংকরায়ণের সফলতা দুটি মাছের ক্রোমোজোম সংখ্যার উপর অনেকাংশে নির্ভর করে। ক্রোমোজোম সংখ্যার ভিন্নতা বেশি হলে সংকরায়ণ সফল হয় না। প্রজাতি ভিন্নতার কারণে দুটি মাছের ক্রোমোজোম সংখ্যায় যে ভিন্নতা পরিলক্ষিত হয় তা গণ ভিন্নতার চেয়ে কম। ফলে গণ ভিন্নতার চেয়ে প্রজাতি ভিন্নতা সম্পন্ন দুটি মাছের সংকরায়ণ ভাল হয়।

উদাহরণস্বরূপ বলা যায় যে, দেশীয় মাগুর ও আফ্রিকান মাগুর একই গণ এর দুটি প্রজাতির মাছ। এদের মধ্যে সংকরায়ণ সম্ভব। কিন্তু এদের যেকোন একটির সহিত ভিন্ন গণের অন্য একটি মাছের মধ্যে সংকরায়ণ করা হলে তার সফলতা কম হবে।

বর্তমানে বাংলাদেশের হ্যাচারীগুলোতে বিভিন্ন কার্প জাতীয় মাছের মধ্যে নির্বিচারে সংকরায়ণ করা হচ্ছে। মৎস্য প্রজনন মৌসুমের শুরুতেই কতিপয় পুরুষ বা স্ত্রী মাছ একই সময়ে প্রজনন উপযোগী হয় না। অথচ তাদের পোনার চাহিদা বেশি থাকে। তখন কোন কোন হ্যাচারী অপারেটর অনিয়মিতভাবে এক প্রজাতির পুরুষ ও অন্য প্রজাতির স্ত্রী মাছের প্রজনন ঘটিয়ে থাকে।

হ্যাচারীসমূহে ঠান্ডা মাথায় কাতলার সাথে রুই বা মিরর কার্প, রুই এর সাথে মৃগেল বা ঘনিয়া, মৃগেলের সাথে ঘনিয়া বা কালিবাউস, সিলভার কার্পের সাথে বিগহেড ইত্যাদি মাছের সংকর উৎপাদন করে থাকে। ফলে দেশে কার্প জাতীয় মাছের বংশগত শুদ্ধতার সমস্যা দেখা যাচ্ছে।

এ ধরণের পোনা বিক্রেতাগণ মৎস্য চাষিদের অনেক সময় প্রতারণা করে থাকে। যেমন কাতলা ও রুইয়ের সংকর পোনা বিক্রেতাগণ পোনার বড় মাথা দেখিয়ে বলে এটা কাতলার পোনা। আবার ঐ স্টকের রুইয়ের দেহের মত পোনা দেখিয়ে বলে এটা রুইয়ের পোনা।

সরল বিশ্বাসে মৎস্য চাষিগণ সংকর পোনাকে বিশুদ্ধ পোনা বলে ক্রয় করে থাকেন। প্রথম দিকে দ্রুত বৃদ্ধি পেলেও এরূপ সংকর পোনার উৎপাদন আশানুরূপ হয় না। সরকারের এবং জনগণের উদ্যোগে উন্মুক্ত জলাশয়ে মাছ চাষ করা হয়।

তাছাড়াও বন্যার কারণে ঐ সকল অবিশুদ্ধ মাছ নদ নদী খালে বিলে ছড়িয়ে যাচ্ছে। সুতরাং এ ধরণের অবিশুদ্ধ পোনা উৎপাদন বন্ধ করতে আইন করা প্রয়োজন। পোনা বিক্রেতাগণ জানান-এই সমস্ত সংকর পোনা যে হারে বিক্রি হয় সেই হিসেবে খাবার মাছ হিসেবে বাজারে বিক্রি হয় না। অর্থ্যাৎ সংকর পোনার বাঁচার হার খুবই কম।

বাংলাদেশের প্রধান প্রধান কার্প জাতীয় মাছের প্রজাতিগুলোর মধ্যে সংকরায়ণ করা সম্ভব কিন্তু এদের কোন সংকরই মাতা পিতার চেয়ে অধিক বৃদ্ধি পায় বলে জানা যায় না। তদুপরি এসব সংকর প্রজননক্ষম হওয়ার কারণে পরবর্তীতে তারা মাতা পিতা প্রজাতির যে কোনটির সংগে প্রজননে অংশগ্রহণ করতে পারে।

মাছ দ্রুত বৃদ্ধিতে যা যা করবেন শিরোনামে সংবাদের তথ্য ফিশারিজ এক্সটেসন থেকে নেওয়া হয়েছে।

সম্পূর্ণ খবরটি পড়ুন

মৎস্য

চাহিদা বাড়ছে কুঁচিয়ার, চাষের পদ্ধতি জেনে নিন

বাংলাদেশের মানুষ কুঁচিয়া চিনলেও মাছ হিসেবে খেতে বেশির ভাগই পছন্দ করে না। তবে বিদেশে এটির অনেক চাহিদা রয়েছে। বাংলাদেশের কোথাও কোথাও এর জনপ্রিয়তা আছে। কুঁইচা, কুইচ্চা, কুঁচে, কুঁচো, কুঁচিয়া ইত্যাদি নামে বিভিন্ন এলাকায় এটি পরিচিত। এর বৈজ্ঞানিক নাম Monopterus cuchia।

ইল প্রজাতির, অনেকটা বাইন মাছের মতো এটি সাধারণত পুকুর, হাওর, বাঁওড়, খাল বা ধানক্ষেতের তলদেশে বাস করে। অনেক সময় মাটিতে গর্ত করেও কুঁচিয়া বসবাস করে।বাংলাদেশের বেশির ভাগ মানুষ অপছন্দ করলেও কৃষি তথ্য সার্ভিসে বলা হয়েছে, এটি শারীরিক দুর্বলতা, রক্তশূন্যতা, অ্যাজমা, ডায়াবেটিস, বাতজ্বর, পাইলসসহ অনেক রোগ সারাতে মহৌষধের মতো কাজ করে।

ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর কনজারভেশন অব নেচার অ্যান্ড ন্যাচারাল রিসোর্সেস (আইইউসিএন) এর ২০০০ সালের তালিকা অনুযায়ী, এই মাছটিকে বিলুপ্তপ্রায় হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। তার পরেও বিদেশেও এই মাছের যথেষ্ট চাহিদা থাকায় ব্যাপক হারে প্রাকৃতিক উৎস থেকে সংগ্রহ করা হয়।তবে গত কয়েক বছর ধরে বাংলাদেশেও বাণিজ্যিকভাবে কুঁচিয়ার চাষাবাদ শুরু হয়েছে।

সাধারণত বাংলাদেশে প্রকৃতি থেকেই কুঁচিয়া আহরণ করা হতো। খাবার হিসাবে তেমন জনপ্রিয়তা না থাকায় কোনোরূপ চাষাবাদ ছাড়াই প্রচুর কুঁচিয়া মাছ পাওয়া যেত। কিন্তু বিদেশে এই মাছের রপ্তানি বৃদ্ধি পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কুঁচিয়ার চাহিদাও বৃদ্ধি পেয়েছে।

ফলে গত কয়েক বছর ধরে বাণিজ্যিকভাবেই অনেকে কুঁচিয়ার চাষ করতে শুরু করেছেন। তাদের একজন দিনাজপুরের বিরামপুরের পুতুল রানী রায়।

তিনি তার বাড়ির পাশে পতিত জমিতে চৌবাচ্চা করে প্রথম ছোট আকারে কুঁচিয়ার চাষ শুরু করেন। পরে চাহিদা দেখে আকার আরো বাড়িয়েছেন।

‘প্রথমে অল্প করে শুরু করেছিলাম। তারপর দেখলাম লাভ ভালোই হচ্ছে। নিজেরাই খেতে পারছি আবার টাকাও আয় হচ্ছে। পরে আমি আরো কয়েকটি চৌবাচ্চা তৈরি করেছি।’

তিনি জানান, স্থানীয় বেসরকারি সংস্থা গ্রাম বিকাশ কেন্দ্রের সহযোগিতায় ২০১৮ সালে তিনি প্রথমে দুটি চৌবাচ্চা করে কুঁচিয়া চাষ শুরু করেন। সেই সঙ্গে কুঁচিয়ার খাবার হিসাবে দেওয়ার জন্য পাশেই দুটি রিং স্ল্যাবের ভেতরে কম্পোস্ট সার তৈরি করে কেঁচোর চাষাবাদও শুরু করেন।

‘কুঁচিয়া তো রাক্ষুসে ধরনের মাছ, কিন্তু থাকে একেবারে মাটির নিচের দিকে। সেখানে কিছু পাইপ দিয়ে রেখেছি, ওরা সেই পাইপের মধ্যে ঢুকে থাকে। ওদের খাবারের জন্য পুকুরে তেলাপিয়া মাছ ছেড়েছি। সেগুলোর বাচ্চা হলে কুঁচিয়া খেয়ে ফেলে। তেলাপিয়া বড় হলে আমরাও খাই। এ ছাড়া খাবার হিসাবে কেঁচো দেই’ বলছিলেন রায়।কুঁচিয়ার খাবার হিসাবে দেয়ার জন্য তিনি কেঁচোর চাষ শুরু করেছিলেন। কিন্তু এখন সেটাই তার আরেকটা আয়ের উৎস হয়ে উঠেছে।

‘গত ছয় মাসে কেঁচো আর কম্পোস্ট সার বিক্রি করেছি প্রায় এক লাখ টাকার। আর কুঁচিয়া তো আমরাও ধরে খাই। না হলে কুঁচিয়া বিক্রি হতো ২০/৩০ হাজার টাকার।’‘আমার স্বামী চাষাবাদ করে। কিন্তু এখন আমার ইনকাম আমার স্বামীর চেয়েও বেশি,’ হাসতে হাসতে বলছিলেন পুতুল রানী রায়।

কুঁচিয়া চাষের পদ্ধতি
সাধারণত চৌবাচ্চা বা বাড়িতে কংক্রিটের স্থাপনা বা ডিচ তৈরি করে কুঁচিয়ার চাষাবাদ করা হয়। পুতুল রানী জানান, তার বাড়িতে প্রথমে মাটিতে পাঁচ ফিট গর্ত করে নিচে ও চারপাশে মোটা পলিথিন বিছিয়ে দেওয়া হয়েছে। চাইলে এটা বাধাই করেও ফেলা যায়। কুঁচিয়া যাতে গর্ত খুঁড়ে চলে না যায়, তাই এই ব্যবস্থা। এ ছাড়া পানি যেন নেমে না যায়, সেটার জন্যও এটা কাজ করে।

এরপর সেই পলিথিনের ওপর মাটির স্তর তৈরি করে দেয়া হয়। এরপর কয়েকটি মোটা পাইপ ফেলে রাখা হয়। কুঁচিয়া যেহেতু অন্ধকার পছন্দ করে, তাই তারা এসব পাইপের ভেতর ঢুকে থাকতে পারে।

এরপর পানি দিয়ে চৌবাচ্চা বা ডিচ ভর্তি করে রাখা হয়। কুঁচিয়ার খাবার হিসাবে তেলাপিয়া বা মলা মাছ জাতীয় ছোট মাছ ছেড়ে দেয়া হয়। তেলাপিয়ার বাচ্চা কুঁচিয়া খেয়ে থাকে। অনেকে মুরগির উচ্ছিষ্ট দিতে পারেন, কিন্তু তাতে পানি ময়লা হয়ে যায়।প্রাকৃতিক উৎস থেকে মা কুঁচিয়া ধরে এসব চৌবাচ্চায় ছেড়ে দেয়া হয়। সাধারণত মে, জুন বা জুলাই মাসে এগুলো বাচ্চা ছাড়ে।

এসব বাচ্চা পরের বছর জুন মাস নাগাদ বিক্রির উপযোগী হয়ে যায়। অনেকে আবার প্রাকৃতিক উৎস থেকে ছোট কুঁচিয়া সংগ্রহ করে চৌবাচ্চায় লালনপালন করে বড় করে বিক্রি করেন।

কৃষকদের মধ্যে কুঁচিয়া চাষের চাহিদা বাড়ছে
বাংলাদেশ সরকার কয়েক বছর আগে কুঁচিয়া চাষে কৃষকদের উৎসাহিত করতে কয়েকটি প্রকল্প গ্রহণ করেছিল। এর মাধ্যমে কুঁচিয়া চাষে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। সেই সঙ্গে পল্লী দারিদ্র বিমোচন ফাউন্ডেশনের অর্থায়নে কয়েকটি বেসরকারি সংস্থা কুঁচিয়া চাষে কৃষকদের প্রশিক্ষণ ও সহায়তা দিতে শুরু করে।

দেশের অন্তত ৩০টি জেলায় এখন বাণিজ্যিকভাবে কুঁচিয়ার চাষ হচ্ছে। পিকেএসএফ ২১টি জেলার ৩৩টি উপজেলায় কুঁচিয়া চাষের জন্যই ঋণ দিচ্ছে। এসব প্রকল্পের আওতায় কয়েকশ কৃষককে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়।

এরকম একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান দিনাজপুরের গ্রাম বিকাশ কেন্দ্রের কর্মকর্তা রবিউল ইসলাম বলেন, ২০১৭ সাল থেকে তারা ৩০০ পুকুর বা চৌবাচ্চার মতো তৈরি করে কৃষকদের প্রশিক্ষণ দিতে শুরু করেন।

”প্রথম প্রথম অনেকে আগ্রহী হয়নি। পরে অন্যদের লাভ করতে দেখে তারা আগ্রহী হয়ে ওঠেন। বিশেষ করে এখানে যে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী আছে, তারা নিজেরাও কুঁচিয়া খায়। ফলে চাষ করার কারণে একদিকে যেমন তাদের একটা পছন্দের খাবার পাচ্ছে, আবার ঘরে টাকা আয়ের সুযোগ তৈরি হয়েছে”, বলেন তিনি। এর ফলে প্রাকৃতিক উৎস থেকে বিলুপ্তির ঝুঁকিতে থাকা এই মাছের আহরণও কমে যাবে বলে তিনি আশা করছেন।

তিনি জানান, ৯ হাজার টাকা বিনিয়োগ করে কেউ যদি ছোট আকারেও কুঁচিয়ার চাষাবাদ করে, তাহলে বছরে অন্তত ছয় হাজার টাকা লাভ থাকবে। কুঁচিয়ার খাবার হিসাবে তেলাপিয়ার পোনা আর কেঁচো দেওয়া হয়। ফলে একদিকে তেলাপিয়াও তারা পাবে, আবার কেঁচো বা কম্পোস্ট সার বিক্রি বাড়তি লাভ আনবে।

তিনি জানান, এখন পাইকাররা সরাসরি এসব খামারে এসে কুঁচিয়া কিনে নিয়ে ঢাকায় বিক্রি করেন। ফলে কৃষকদেরও এটি চাষে আগ্রহ বাড়ছে।

দিনাজপুরের কুচিয়ার ব্যবসায়ী বাবলু মিয়া বলছেন, ”এখন বছরে দেড়শো দুইশও মণ কুঁচিয়া বিক্রি করি। কিন্তু চাহিদা আছে আরও অনেক বেশি। যদি দুই হাজার মণ কুঁচিয়াও পাওয়া যায়, তাও বিক্রি হয়ে যাবে। ঢাকার ব্যবসায়ীরা যত চায়, সবসময় তো সেই জোগানও দিতে পারি না।”

ঢাকার একজন পাইকারি বিক্রেতা ফজলু মিয়া বলছেন, ”সারাদেশ থেকেই তাদের কাছে কুঁচিয়া আসে। তবে এখনো বেশিরভাগ কুঁচিয়া প্রাকৃতিক উৎস থেকে ধরে নিয়ে আসা হয়। গুটিকয়েক জায়গা থেকে তারা চাষের কুঁচিয়া পান।”

বিদেশে আরও বেশি রপ্তানির সুযোগ রয়েছে
বাংলাদেশে কুঁচিয়া তেমন জনপ্রিয় মাছ না হলেও অনেক দেশে এটি অত্যন্ত জনপ্রিয় একটি খাবার।

বাংলাদেশ থেকে প্রধানত চীন, দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান, থাইল্যান্ড, হংকং, কানাডা, কুয়েত, মালয়েশিয়া, কাতার, সিঙ্গাপুর, যুক্তরাষ্ট্র, তাইওয়ান ও মিয়ানমারে কুঁচিয়া রপ্তানি হয়ে থাকে। এই রপ্তানি চাহিদা বেশির ভাগের জোগান আসে প্রাকৃতিক উৎস থেকে।

রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ থেকে ২০১৯-২০২০ সালে জ্যান্ত ও শুকনো মিলিয়ে মোট কুঁচিয়া রপ্তানি হয়েছে এক কোটি ১৩ লাখ ৩৩ হাজার ডলারের বেশি। সবচেয়ে বেশি রপ্তানি হয়েছে চীনে, এক কোটি ডলারের ওপরে।

বাংলাদেশ লাইভ অ্যান্ড চিলড ফুড এক্সপোটার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক কাজী মাহবুবুল আলম বলেন, ‘বিশ্বে কুঁচিয়া এবং কাঁকড়ার যে চাহিদা আছে, সব তো আমরা দিতে পারছি না। জোগান পাওয়া গেলে আমরা যত রপ্তানি করি, এর চেয়েও বেশি রপ্তানি করা সম্ভব।’

তিনি জানান, করোনাভাইরাসের কারণে আপাতত চীনসহ কয়েকটি দেশে রপ্তানিতে ভাটা পড়েছে। তবে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে আবার রপ্তানি বাড়বে বলে তিনি আশা করছেন।

সম্পূর্ণ খবরটি পড়ুন
বিজ্ঞাপন

শীর্ষ সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক: শাইখ সিরাজ
© ২০২১ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। দা এগ্রো নিউজ, ফিশ এক্সপার্ট লিমিটেডের দ্বারা পরিচালিত একটি প্রতিষ্ঠান। ৫১/এ/৩ পশ্চিম রাজাবাজার, পান্থাপথ, ঢাকা -১২০৫
ফোন: ০১৭১২-৭৪২২১৭
ইমেইল: info@theagronews.com, theagronewsbd@gmail.com