আমাদের সাথে যোগাযোগ করুন

এগ্রোটেক

অনলাইন শপিং: অনলাইন বাণিজ্যের যাত্রা শুরুর অভিনব ও অজানা কাহিনি

অনলাইনে ব্যবসা হচ্ছে কয়েক দশক ধরে, কিন্তু সেটা মানুষের দৈনন্দিন কেনাকাটার অংশ হয়েছে হালে
অনলাইনে ব্যবসা হচ্ছে কয়েক দশক ধরে, কিন্তু সেটা মানুষের দৈনন্দিন কেনাকাটার অংশ হয়েছে হালে

করোনাভাইরাস মহামারির মধ্যে অনেকে এখন অনলাইনে বাজার করার দিকে ঝুঁকছেন, বিশেষ করে যাদের কম্প্যুটার বা স্মার্টফোন ব্যবহারের সুযোগ আছে। কারণ অনলাইনে কেনাকাটায় ঘরের বাইরে বেরনোর প্রয়োজন নেই, অপরিচিত মানুষের সাথে মেলামেশা বা ছোঁয়াছুঁয়ির আশঙ্কাও এড়ানো যায়।

অনেক মানুষ অবশ্য অনলাইন বাজারে অনেকদিন থেকেই অভ্যস্ত। তাদের কাছে আমাজন, ইবে এগুলো অতি পরিচিত নাম।

কিন্তু অনলাইনে কেনাকাটার শুরু কীভাবে? কীভাবে জনপ্রিয় হয়ে উঠল অনলাইনে সওদাপাতি?

আমাজন অনলাইনে ব্যবসা শুরু করেছে ৯০এর দশকের মাঝামাঝি, কিন্তু আমেরিকায় এমনকী ২০১০-এও খুচরা ব্যবসার মাত্র ৬% কেনাকাটা হতো অনলাইনে। তবে, যুক্তরাষ্ট্রে গত বছর মে মাসে অনলাইনে যত মানুষ কেনাকাটা করতেন, এবছর মে মাসে তা ৩১% বেড়ে গেছে।

চীনে খুচরা ব্যবসার পাঁচভাগের একভাগই হয় অনলাইনে
চীনে খুচরা ব্যবসার পাঁচভাগের একভাগই হয় অনলাইনে

এবার ব্রিটেনের হিসাব দেখা যাক- ২০০৬ সালে ইউকে-তে অনলাইনে বাজার করত ৩% মানুষ, ২০২০-র গোড়ায় তা দাঁড়ায় ১৯% আর করোনা মহামারির পর এবছর এপ্রিলে তা লাফিয়ে বেড়েছে ৩০ শতাংশে।

মানুষের ইন্টারনেট ব্যবহার বাড়ছে শুধু উন্নত বিশ্বেই নয় – ইন্টারনেট জনপ্রিয় ও সহজলভ্য হচ্ছে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে। ফলে ইন্টারনেটে বাজারের চাহিদাও বাড়ছে দ্রুত ও ব্যাপক মাত্রায়।

চীনে ইন্টারনেটে ব্যবসার পরিমাণ আমেরিকা, ব্রিটেন, ফ্রান্স এবং জার্মানির চেয়েও বেশি। চীনে খুচরা ব্যবসার পাঁচভাগের একভাগই হয় অনলাইনে।

বিশ্লেষকরা বলছেন যেসব দেশে অনলাইনে কেনাকাটার চল বেশি, সেসব দেশে ইন্টারনেটে খুচরা ব্যবসার মোট পরিমাণ ৪ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছতে যাচ্ছে বলে তাদের ধারণা।

দুদশক আগেও অনলাইনে বাজার করা একটা নতুন চমকের ব্যাপার ছিল। এমনকী কোভিড-১৯ মানুষের মাঝে তার থাবা বসানোর আগেও মানুষ ইন্টারনেটে বাজার করত কালেভদ্রে।

একটা সময় লোকে ভাবত যেসব দুর্লভ জিনিস দোকানে সহজে মেলে না, শুধু ইবে-র মত সাইটেই সেসবের সন্ধান পাওয়া যায়, সেগুলো কিনতে হলে অনলাইন বাজারের শরণাপন্ন হতে হবে।

তাহলে অনলাইন শপিং আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে উঠল কীভাবে? আর এটাই কি কোভিড পরবর্তী দুনিয়ায় আমাদের ভবিষ্যতের বাজার অভ্যাসে পরিণত হতে চলেছে? তার আগে একবার ফিরে তাকানো যাক্ এর শুরুর ইতিহাসে।

'ভিডিওটেক্স' নামে একটি সেবা ব্যবস্থা যা চালু করা হয়েছিল ১৯৮৪ সালে, ধারণা করা হয় সেটাই ছিল অনলাইনে কেনাকাটার উৎস
‘ভিডিওটেক্স’ নামে একটি সেবা ব্যবস্থা যা চালু করা হয়েছিল ১৯৮৪ সালে, ধারণা করা হয় সেটাই ছিল অনলাইনে কেনাকাটার উৎস

শুরু হল কীভাবে?

বছরটা ছিল ১৯৮৪। ইংল্যান্ডের ছোট এক শহর গেইটসহেডে ৭২ বছর বয়সী এক নারী জেন স্নোবল তার আরামকেদারায় বসে টিভি দেখছিলেন। এর মধ্যেই তার হাতের রিমোট কন্ট্রোল ব্যবহার করে তিনি অর্ডার দিলেন মাখন, কর্নফ্লেক্স আর ডিম।

মাইকেল অলড্রিচ নামে ব্রিটিশ একজন আবিষ্কারক ‘ভিডিওটেক্স’ নামে একটি পদ্ধতি বের করেছিলেন। ওই পদ্ধতি ব্যবহার করেই জেন টিভির মাধ্যমে খাবারের অর্ডার দিয়েছিলেন, বলছেন অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি ব্যবসা বিষয়ক কলেজের খুচরা বিপণন বিষয়ের সহকারী অধ্যাপক জনাথান রেনল্ডস্।

জেন ভিডিওটেক্স প্রযুক্তি ব্যবহার করে তার টিভির পর্দায় একটা বাজারের ফর্দ তৈরি করেছিলেন। তার পাড়ায় খাবারের একটি সুপারমার্কেটে ফোনের মাধ্যমে খবর পাঠানো হয়েছিল জেন কী কী চাইছেন, তারপর অনেকটা ম্যাজিকের মত জিনিসগুলো পৌঁছে গিয়েছিল জেনের বাসার দরজায়।

“বয়স্ক এবং যাদের চলাফেরার অসুবিধা আছে তাদের সুবিধার কথা ভেবে প্রাথমিকভাবে এই প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেন মি. অলড্রিচ,” বলছেন অধ্যাপক রেনল্ডস্।

“তখনও সাধারণের ব্যবহারের জন্য ইন্টারনেট পরিষেবা চালু হয়নি। সীমিত যে কম্পিউটার নেটওয়ার্ক তখন ছিল তার উপর নির্ভর করেই এই প্রযুক্তি তৈরি করা হয়েছিল।”

মাইকেল অলড্রিচের পরীক্ষায় জেন সহযোগিতা করেছিলেন। পরে জেনের টিভি সেটকে কম্পিউটার টার্মিনালে রূপান্তর করে তার মাধ্যমে মি. অলড্রিচ সুপারমার্কেটে খবর পৌঁছে দেন।

মাইকেল অলড্রিচ এবং জেন স্নোবল দুজনের কেউই তখন ভাবেননি তাদের ওই ছোট্ট প্রযুক্তির পরীক্ষা ভবিষ্যতে ব্রিটেনে ১৮৬ বিলিয়ন ডলারের একটা শিল্পের কাঠামো তৈরি করবে।

জেনের সেই খাবার কেনার পরীক্ষার পর বলা হয় অনলাইনে কেনাকাটা নিয়ে পরবর্তী বড় ধরনের আবিষ্কার হয়েছিল ১৯৯৪ সালে। সে বছর ড্যানিয়েল এম কোহন নামে ২১ বছরের একজন কম্পিউটার উৎসাহী তরুণ ‘নেটমার্কেট’ নামে একটা অনলাইন বাজার গড়ে তোলে।

সেই বাজারকে আখ্যা দেয়া হয় “সাইবার জগতে একটা শপিং মল গড়ে তোলার নতুন উদ্যোগ” হিসাবে। শুধু তাই নয়, বলা হয় অনলাইনে বা কোন ডিজিটাল মাধ্যমে সেটাই ছিল প্রথম নিরাপদ আর্থিক লেনদেন।

কী বিক্রি করা হয়েছিল ওই বাজারে? স্টিং পপ গোষ্ঠীর একটি সিডি- দাম ছিল ১২.৪৮ ডলার।

জাপানের ই-বাণিজ্য সাইট রাকুতেন যখন চালু হয় তখন সেটাকে বলা হতো "অনলাইন শপিং মল''।
জাপানের ই-বাণিজ্য সাইট রাকুতেন যখন চালু হয় তখন সেটাকে বলা হতো “অনলাইন শপিং মল”।

এরপর ধীরে ধীরে মানুষের ঘরে গিয়ে পৌঁছল ইন্টারনেট পরিষেবা। শুরুর সেই প্রথমদিকে ইন্টারনেট সেবা বলতে ছিল ক্যাঁচকেঁচে ডায়াল করার শব্দ- সংযুক্ত হবার কঠিন চেষ্টা। প্রথমদিকে মাত্র হাতে গোনা কয়েকটি বড় কোম্পানি ই-বাণিজ্যের ব্যাপারে উৎসাহী এবং প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ছিল আর এখন বড় বড় সব করপোরেট প্রতিষ্ঠানই অনলাইনে হাজির।

গোড়ার দিকে যারা অনলাইন ব্যবসায় আগ্রহী ছিল তাদের একটি ছিল পিৎসা হাট। ১৯৯৪ সালে আমেরিকার এই পিৎসা ব্যবসার চেইন প্রতিষ্ঠান অনলাইনে পিৎসা বেচতো। তাদের সেসময়কার অনলাইন পোর্টালের নাম ছিল ‘পিৎসানেট’। আদ্যিকালের ধূসর ম্যাড়মেড়ে চেহারার ওয়েবসাইটটা স্বভাবতই সেকেলে ছিল। সেখানে লেখার জায়গা ছিল দুটি- ক্রেতার ঠিকানা আর ফোন নম্বর।

তবে ওই ১৯৯৪ সালটাই ছিল অনলাইন শপিংয়ের জন্য যুগান্তকারী বছর। অনলাইনে কেনাকাটার জয়যাত্রা শুরু হল সেসময় থেকেই। ওই বছরই বাজারে এল আমাজন। সেসময় আমাজন শুধু বই বিক্রি করত।

পরের বছর ১৯৯৫ সালে এল ইবে, জাপানে এল বৃহত্তম ই-বাণিজ্য সাইট রাকুতেন। পরের কয়েক বছর রাকুতেন পশ্চিমা বাজারও দখল করে নিয়েছিল। জাপানে ব্যবসা শুরুর দুবছর পর রাকুতেন পশ্চিমা বিশ্বে তাদের ব্যবসা প্রসারিত করে।

এরপর ১৯৯৯ সালে আসে চীনের আলিবাবা।

এই কোম্পানিগুলোই অনলাইনে কেনাকাটার জগতের দরোজা খুলে দিল। তাদের হাত ধরেই এল অনলাইনে নানাধরনের পণ্য কেনাকাটার সুযোগ, ক্রেতারা অনলাইনে পণ্য পছন্দের সুযোগ পেল, সঙ্গে এল সৃজনশীল নানা প্রযুক্তি।

১৯৯০এর মাঝামাঝি বিশ্বায়নের ঢেউও এই অনলাইন বাণিজ্যের ক্ষেত্রে বড় অনুঘটক হিসাবে কাজ করেছে। “ই-বাণিজ্য একটা লাভজনক এবং ব্যবসাসফল বাজার চ্যানেল”-এর মডেলে পরিণত হয়েছে, বলছেন নিউ ইয়র্ক ইউনিভার্সিটির স্টার্ন বিজনেস স্কুলের অধ্যাপক থমাই সেরদারি। বৈশ্বিক যোগাযোগ সহজ হয়ে ওঠার কারণে এসব প্রতিষ্ঠান তাদের উৎপাদনও বাড়াতে শুরু করল এবং বিভিন্ন দেশের বাজার উপযোগী পণ্য মূল্যের কাঠামোও তৈরি করল।

“পণ্যের গুণগত মান এবং দাম নিয়ে একটা বাজার প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র তৈরি হল, যেটা খদ্দেরদের কাছেও গ্রহণযোগ্য হল। ইন্টারনেট সুবিধার দৌলতে কোন একটা পণ্য কেনার আগে সে বিষয়ে খোঁজখবর নেয়া, এবং গবেষণার সুযোগও এল ক্রেতাদের জন্য। দাম আর মানের তুল্যমূল্য হিসাব করার যে সুযোগটা খদ্দেরদের জন্য আগে ছিল না- ইন্টারনেট মানুষের হাতে সেই নতুন অস্ত্র পৌঁছে দিল।”

বলা হচ্ছে পৃথিবীর অনেক দেশে যেখানে অনলাইনের বাজার প্রসারিত হচ্ছে সেসব দেশে ২০২২এর মধ্যে সার্বিক খুচরা ব্যবসার পাঁচভাগের একভাগ কেনাকাটা হবে অনলাইনে।
বলা হচ্ছে পৃথিবীর অনেক দেশে যেখানে অনলাইনের বাজার প্রসারিত হচ্ছে সেসব দেশে ২০২২এর মধ্যে সার্বিক খুচরা ব্যবসার পাঁচভাগের একভাগ কেনাকাটা হবে অনলাইনে।

প্রথমদিকের সফল দুটি অনলাইন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান আমাজন আর ইবে আজও এই বাজারে আধিপত্য বিস্তার করে আছে। মি. সেরদারি বলছেন অনলাইনে কেনাকাটার সম্ভাবনা এই দুটি প্রতিষ্ঠান তৈরি করে দিলেও আসলে ক্রেতাদের কারণেই অনলাইন শপিং-এর রমরমা ভবিষ্যত তৈরি হয়েছে।

“আসলে খদ্দেররাই এধরনের বাজারের সম্ভাবনাকে লুফে নিয়েছে। তাদের কারণেই অনলাইনে কেনাকাটা একটা সম্ভাবনাময় ব্যবসা হয়ে উঠেছে,” তিনি বলছেন।

জনপ্রিয়তা বাড়ছে

অনলাইনে কেনাকাটা বলতে আমরা আজকে যেটা বুঝি, সত্যিকার অর্থে তা জনপ্রিয় হয়ে উঠতে শুরু করে ২০১৭ সাল নাগাদ।

পিউ রিসার্চ সেন্টারের তথ্য বলছে, ২০১৬-র শেষ দিকে দেখা গেছে আমেরিকায় প্রতি দশজনের মধ্যে আটজন কম্পিউটার বা মোবাইল ফোন ব্যবহার করে সে বছর অনলাইনে কিছু না কিছু কিনেছে। ২০০০ সালে এটা ছিল মাত্র ২২%।

সারা পৃথিবীতে মানুষের হাতে স্মার্টফোন পৌঁছে যায় ২০১৭ সাল নাগাদ। স্মার্টফোনের ব্যবহার ওই বছর প্রায় ৮০%এ পৌঁছলে অনলাইনে কেনাকাটার হারও ব্যাপকহারে বাড়তে শুরু করে।

এখন ২০১৯ সালের তথ্যে দেখা যাচ্ছে আমেরিকায় বিক্রিবাটার ১৬% হচ্ছে ই-বাণিজ্যের মাধ্যমে। ব্যয়ের হিসাবে সেটা ৬০১.৭৫ বিলিয়ন ডলার।

শপিফাই নামে ই-বাণিজ্য বিষয়ক একটি সফটওয়্যার কোম্পানি বলছে ২০১৯য়ে বিশ্বব্যাপী অনলাইন ব্যবসায় মানুষ ব্যয় করেছে ৩.৫ ট্রিলিয়ন ডলার। এর থেকে বোঝা যাচ্ছে কীভাবে অনলাইন ব্যবসা বিস্তার লাভ করছে।

কিন্তু ২০২০তে অনলাইনে বাজার করার প্রয়োজনীয়তা এর বিস্তারে বড় ভূমিকা রেখেছে। আমেরিকায় পেনসিলভেনিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি বিজনেস স্কুলের বিপণন বিষয়ক অধ্যাপক বারবারা কান বলছেন অনলাইন ব্যবসায় আগামী দুই থেকে তিন বছর যে প্রবৃদ্ধি স্বাভাবিক নিয়মে হতো, করোনাভাইরাস মহামারির কারণে এক বছরেই তা হয়ে গেছে।

আলিবাবার চেয়ারম্যন জ্যাক মা তার কোম্পানিকে খুচরা ব্যবসার বাইরে আরও অনেকদূর এগিয়ে নিয়ে গেছেন
আলিবাবার চেয়ারম্যন জ্যাক মা তার কোম্পানিকে খুচরা ব্যবসার বাইরে আরও অনেকদূর এগিয়ে নিয়ে গেছেন

এবং এবছর অনলাইনের বিক্রিতে এই বিশাল প্রবৃদ্ধির পেছনে যেসব পণ্য রয়েছে সেগুলোই ছিল ১৯৮৪ সালে অনলাইনে প্রথম বিক্রি হওয়া জিনিস – যেগুলো জেন স্নোবল অর্ডার করেছিলেন – অর্থাৎ খাবারদাবার।

আমেরিকায় এবছর মার্চ আর এপ্রিলের মধ্যে অনলাইনের বিক্রি এক লাফে বেড়েছে ৪৯%। আর এর কারণ প্রতিদিনের খাবার জিনিসের বিক্রিতে ১১০% বৃদ্ধি।

মিস কান বলছেন অনলাইন বিক্রির এই বিশাল প্রবৃদ্ধির মূল কারণ মানুষ ইন্টারনেটে খাদ্যপণ্য কেনা বেশি পছন্দ করছে।

“এটা বেশ ইন্টারেস্টিং। কারণ কোভিডের আগে অনলাইন শপিং মূলত দৈনন্দিন খাবার দাবারে কেন্দ্রীভূত ছিল না।”

তিনি বলছেন আগে মানুষ অনলাইনে কিনত বই, ইলেকট্রনিকের জিনিস যেমন কম্পিউটার। কিন্তু কম্পিউটার তো মানুষ রোজ কেনে না। খাবার বা নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিস সবসময় কেনে।

চিরস্থায়ী ট্রেন্ড?

অনলাইনে কেনাকাটার ধরণ গত কয়েক বছরে অনেক বদলেছে। শুধু নিত্য প্রয়োজনীয় নয়, বিক্রেতারা নানা ধরনের পণ্য সম্ভার নিয়ে এসেছে অনলাইনে, যা মানুষকে আকৃষ্ট করেছে এবং ইন্টারনেটে কেনাকাটায় উদ্বুদ্ধ করেছে।

মিজ সেরদারি বলছেন, “প্রায় ৩০% ব্যবসা অনলাইনে হচ্ছিলই, কিন্তু কোভিড-১৯এর পর অনলাইন ব্যবসা অনেকের জীবন ধারণের জন্য অপরিহার্য হয়ে উঠেছে।”

অনলাইনে ব্যবসা বাড়ার আর একটা কারণ মানুষ নিজের ঘরে বসে, নিজের সময়ে, নিজের পছন্দের জিনিস কিনতে পারছে। বেশিরভাগ গ্রোসারি বা নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসের দোকানগুলো অনলাইনে অর্ডার নিয়ে ঘরের দরজায় বাজার পৌঁছে দিয়ে যাচ্ছে।

এই সুবিধাটা অনেকেই লুফে নিয়েছেন। মানুষের এই নতুন মানসিকতা, নতুন আচরণ ই-বাণিজ্যের হাত দিনকে দিন শক্ত করছে।

করোনাভাইরাসের কারণে অনলাইনে নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসের কেনাকাটা বহু গুণ বেড়ে গেছে।
করোনাভাইরাসের কারণে অনলাইনে নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসের কেনাকাটা বহু গুণ বেড়ে গেছে।

তবে অনলাইন শপিংয়ের এই রমরমা ট্রেন্ডের পরেও ক্রেতারা তাদের খরচের ওপর সবসময়ই নজর রেখে চলবেন এটাই স্বাভাবিক।

অনলাইনে কেনাকাটার প্রবৃদ্ধি দীর্ঘমেয়াদে একইরকম থাকবে কিনা সেটা দেখার।

মানুষ যে ঘরে বসেই সবসময় বাজার করতে আগ্রহী হবে এমনটাও হলফ করে বলা যাবে না।

দোকনে ঘুরে ঘুরে বাজার করাও অনেকের জন্য আনন্দদায়ক অভিজ্ঞতা। অনেকে যা কিনছেন তা হাত দিয়ে ছুঁয়ে দেখতে, নেড়েচেড়ে দেখতে পছন্দ করেন।

সে অভিজ্ঞতা মানুষ পুরোপুরি বিসর্জন দিতে চাইবেন এমনটাও ধরে নেয়া ঠিক হবে না।

মিস কান বলছেন আমাজনের ব্যবসায়িক মডেল হয়ত মানুষের এই মনমানসিকতার সাথে খাপ খাইয়ে নিতে উপযোগী হতে পারে- অর্থাৎ অনলাইন ব্যবসার পাশাপাশি আমাজনগো-র মত দোকানও চালু রাখা যেখানে গিয়ে জিনিস কেনার সুযোগও মানুষের জন্য থাকবে।

অনলাইনে ব্যবসা যারা করেন, তারা ক্রেতাদের মনমানসিকতার ওপরও নজর রাখেন।

কাজেই কোভিড পরবর্তী দুনিয়ায় মানুষ কীভাবে দোকানবাজার করা পছন্দ করছেন তা খতিয়ে দেখেই তারা সম্ভবত তাদের ব্যবসাকে সময়োপযোগী করে তুলবে বলে মিস কান মনে করছেন।

সম্পূর্ণ খবরটি পড়ুন

এগ্রোটেক

কৃষিযন্ত্রের কারিগর

ধান কাটা ও মাড়াইয়ের যন্ত্র কম্বাইন্ড হার্ভেস্টারের পাশে ওলি উল্লাহ (বাঁয়ে)। সম্প্রতি চুয়াডাঙ্গা সদরের শাহাপুরে। প্রথম আলো
ধান কাটা ও মাড়াইয়ের যন্ত্র কম্বাইন্ড হার্ভেস্টারের পাশে ওলি উল্লাহ (বাঁয়ে)। সম্প্রতি চুয়াডাঙ্গা সদরের শাহাপুরে। প্রথম আলো

তরুণ বয়সে নদীভাঙনে সব হারিয়েছেন। মাথা গুঁজতে গেলেন অন্য জেলায়। গায়ে-গতরে খেটে কোনোরকমে চলছিল। একসময় যন্ত্রপাতি মেরামতের একটি ওয়ার্কশপে যোগ দেন। কিছুদিনের মধ্যেই কাজটা রপ্ত করে ফেলেন। বছর চারেকের মাথায় নিজেই একটি ওয়ার্কশপ খুলে বসেন। মাত্র ৪ হাজার টাকা পুঁজি ও অভিজ্ঞতা দিয়ে শুরু করা সেই ওয়ার্কশপ এখন দেশের অন্যতম কৃষিযন্ত্র উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান। যে প্রতিষ্ঠান থেকে বছরে ২০ কোটি টাকার যন্ত্রপাতি বিক্রি হয়।

সাফল্যের এই গল্প চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলার কুতুবপুর ইউনিয়নের উদ্যোক্তা মো. ওলি উল্লাহর। দেশি উপকরণ ও প্রযুক্তি ব্যবহার করে কৃষি যন্ত্রপাতি বানান। এসব যন্ত্রপাতির দাম কম। আবার চাষাবাদে খরচও কম। বিদেশি যন্ত্র দেখে দেখে ওলি উল্লাহ এখন পর্যন্ত ১৮ রকমের কৃষিযন্ত্র বানিয়েছেন। তাঁর প্রতিষ্ঠানে এখন কাজ করছেন ৩২ জন। তাঁকে দেখে আশপাশের জেলার অনেকে কৃষি যন্ত্রপাতি বানানোর দিকে ঝুঁকেছেন।

গোড়ার কথা
চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলার সরোজগঞ্জ বাজারে ওলি উল্লাহর প্রতিষ্ঠান; নাম জনতা ইঞ্জিনিয়ারিং। ১৯৯২ সাল থেকে কারখানার যাত্রা শুরু। এলাকায় তিনি ‘ওলি হুজুর’ নামে পরিচিত। আদি বাড়ি তাঁর কুমিল্লার দেবীদ্বারে। ১৯৮৮ সালে নদীভাঙনে বসতভিটাসহ সব হারিয়ে চলে আসেন চুয়াডাঙ্গায়। তখন তিনি ২৪ বছরের তরুণ। শুরুতে দিনমজুরের কাজ করতেন। কিছুদিন পর সরোজগঞ্জ বাজারের ইসলাম মেকানিকে কাজ শুরু করেন।
বছর চারেকের মধ্যে তিনি যন্ত্র বানানো ও মেরামতের কাজ রপ্ত করে ফেলেন। তারপর সিদ্ধান্ত নেন, নিজেই একটি ওয়ার্কশপ দেবেন। কিন্তু পুঁজি তো নেই। চার বছরের কাজের অভিজ্ঞতা আর ৪ হাজার টাকা পুঁজি দিয়ে শুরু করলেন ওলি। এরপর তাঁকে আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি। তিলে তিলে গড়া জনতা ইঞ্জিনিয়ারিং এখন দেশের কৃষিপ্রযুক্তি ও যন্ত্রপাতি খাতের অন্যতম একটি প্রতিষ্ঠান। বীজ বপন যন্ত্র, কম্বাইন্ড হার্ভেস্টার মেশিন (ধান কাটা ও মাড়াইয়ের যন্ত্র), খড় ও ঘাস কাটার যন্ত্র, আলু লাগানো ও উত্তোলনের যন্ত্র, রাইস ট্রান্সপ্লান্টারসহ ১৮ রকমের কৃষিযন্ত্র বানায় জনতা ইঞ্জিনিয়ারিং। এর মধ্যে বাজারে ১৬টি যন্ত্রের চাহিদা বেশি। সারা দেশে তাদের আছে ৫০টি ডিলার।
বাজারের সাধারণ কম্বাইন্ড হার্ভেস্টার মেশিনের দাম ১২ থেকে ২৮ লাখ টাকা। আর তাঁর তৈরি একটি কম্বাইন্ড হার্ভেস্টার মেশিনের দাম পড়ে ৬ থেকে ৭ লাখ টাকা। জানালেন ওলি।

জনতা ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে একদিন
ওলি উল্লাহ এখন জনতা ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ব্যবস্থাপনা পরিচালক। দুটি কারখানা আছে তাঁর। তৃতীয় কারখানার কাজ শুরু হয়েছে। সেটি হবে স্বয়ংক্রিয়। ওলি জানান, নতুন কারখানায় উৎপাদন শুরু হলে কৃষিযন্ত্রের উৎপাদন খরচ কমবে এবং কৃষকেরা কম খরচে মানসম্মত যন্ত্র কিনতে পারবেন।
২০১০ সাল পর্যন্ত জনতা ইঞ্জিনিয়ারিং কেবল প্যাডেল থ্রেশার বানাত। এটি দিয়ে ধান থেকে তুষ আলাদা করে চাল বের করা হয়। ওই বছর এই যন্ত্রটি বানাতে জনতা ইঞ্জিনিয়ারিং বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বারি) ও বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিরি) থেকে সহযোগিতা পায়। ওলি উল্লাহ ও তাঁর জনতা ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের উদ্যোগকে শুরু থেকে আর্থিক সহায়তা দিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক উন্নয়ন সংস্থা ইউএসএইড। সে সহযোগিতা এখনও অব্যাহত আছে। আর কারিগরি সহায়তা দিচ্ছে ইন্টারন্যাশনাল মেইজ অ্যান্ড হুইট ইমপ্রুভমেন্ট সেন্টার (সিমিট) ও ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট এন্টারপ্রাইজ।জনতা ইঞ্জিনিয়ারিং ও বিরি ২০১৫ সালে যৌথভাবে দেশি প্রযুক্তিতে বানানো কৃষিযন্ত্র দিয়ে চাষাবাদ করেছে। তাতে খরচ হয় ৭ লাখ টাকা। অথচ বিদেশ থেকে আনা যন্ত্র দিয়ে একই চাষাবাদ করলে খরচ পড়ত ১৫ লাখ টাকা।

২০১৫ সালের মধ্যেই জনতা ইঞ্জিনিয়ারিং খুলনা ও বরিশাল বিভাগে কৃষিযন্ত্র বিক্রির বাজারে আধিপত্য বিস্তার করে। ২০১৬ সাল নাগাদ তাদের বাজার ছড়িয়ে পড়ে সারা দেশে। দারিদ্র্যের সঙ্গে মোকাবিলা করে সফল উদ্যোক্তা হওয়ায় চলতি বছরের ৩ মার্চ ওলিকে বর্ষসেরা ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা হিসেবে স্বীকৃতি দেয় এসএমই ফাউন্ডেশন।

গত বুধবার সরোজগঞ্জ বাজারে জনতা ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের প্রধান কার্যালয়ে গিয়ে দেখা গেল, কাচের শোকেসে থরে থরে সাজানো শতাধিক ক্রেস্ট ও সম্মাননা স্মারক। এসবই ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা হিসেবে ওলির পাওয়া নানা পুরস্কার। ওলি বলেন, ‘আমরা শুধু যন্ত্র বানাই না। এর পাশাপাশি যন্ত্র বানাতি ৪৫টি কর্মশালার মাধ্যমে ২২০ জনকে প্রশিক্ষণও দিয়েছি। আমাদের প্রাতিষ্ঠানিক জ্ঞান নেই, ইডা ঠিক। তবে আমরা কাজ করতি করতি মেলা কিছু শিখিছি।’

কৃষক ও ব্যবসায়ীদের কথা
ওলির কাছ থেকে একটি সিডার মেশিন, ধান কাটার রিপার মেশিন ও ধান মাড়াইয়ের ড্রাম থ্রেশার মেশিন কিনেছেন কুতুবপুর ইউনিয়নের কৃষক মাহবুবুর রহমান। নিজের জমিতে কাজের পর তিনি এসব যন্ত্র অন্যের জমিতে ভাড়ায় খাটান। মাহবুবুরের কথায়, ‘আমি তাঁর কাছ থেকে তিনটা মেশিন কিনিছি ৯৫ হাজার টাকায়। অন্য কোম্পানির একই মেশিন কিনতে আমার ১ লাখ ৭০ হাজার টাকা লাগত। ওলি হুজুর মানুষ ভালো। এ এলাকায় তাঁর খুব নামডাক। এসব যন্ত্রে কোনো সমস্যা হলে উনি নিজেই ঠিক করে দেন।’

সরোজগঞ্জ বাজারের মীম ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কশপের মালিক মিলন মিয়া বলেন, ‘ওলি হুজুরের কারখানায় কাজ করার সুমায় উনি নিজি হাতে আমার সবকিচু শিখিয়েলো। অ্যাকন আমি নিজিই এট্টা কারখানার মালিক।’

ওলির সাফল্যে অনুপ্রাণিত হয়ে চুয়াডাঙ্গা এবং পাশের ঝিনাইদহ ও মেহেরপুরের অন্তত ৮৬ জন উদ্যোক্তা কৃষি যন্ত্রপাতি উৎপাদন ও বিপণন করছেন। যাঁদের বেশির ভাগই একসময় ওলির কারখানার কর্মচারী ছিলেন।

কৃষিযন্ত্র বানাতে ৭০ শতাংশ যন্ত্রাংশ নিজেই বানান ওলি। আর ৩০ শতাংশ যন্ত্রাংশ দেশের বাইরে থেকে আমদানি করেন। দেশে তৈরি শতভাগ যন্ত্রাংশ দিয়ে কৃষিযন্ত্র বানানোর স্বপ্ন দেখেন ওলি উল্লাহ।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর চুয়াডাঙ্গার অতিরিক্ত উপপরিচালক সুফি মো. রফিকুজ্জামান বলেন, ওলি উল্লাহ স্বল্পমূল্যে কৃষককে কৃষিযন্ত্র সরবরাহ করছেন, তা কৃষিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

সম্পূর্ণ খবরটি পড়ুন

এগ্রোটেক

ধান শুকানোর নতুন যন্ত্র, খরচ কম

ধান শুকানো ও ধান থেকে চাল বানাতে শতকরা ১৪ ভাগ অপচয় হয়। প্রচলিত পদ্ধতিতে ধান শুকানো অনেকটা সময় ও ব্যয়সাপেক্ষ। তা ছাড়া প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় ধান শুকাতে প্রচুর দুর্ভোগও পোহাতে হয়।

এ পরিস্থিতিতে ‘বাউ-এসটিআর’ নামে ধান শুকানো যন্ত্র দিয়ে মাত্র তিন থেকে চার ঘণ্টায় ৫০০ কেজি পর্যন্ত ধান শুকানো সম্ভব। বিদ্যুৎ ব্যবহারে এই যন্ত্রে এক মণ ধান শুকাতে খরচ হবে মাত্র ২৮ টাকা। আর জ্বালানি তেল ব্যবহারে খরচ পড়বে ৩৩ টাকা।

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে আয়োজিত কর্মশালায় উদ্ভাবিত যন্ত্রের কর্মদক্ষতা সম্পর্কে এসব কথা বলেন গবেষক মো. মঞ্জুরুল আলম। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি প্রকৌশল ও প্রযুক্তি অনুষদের কৃষিশক্তি ও যন্ত্র বিভাগের অধ্যাপক। বিশ্ববিদ্যালয়ের সৈয়দ নজরুল ইসলাম সম্মেলনকক্ষে গতকাল বুধবার ‘সাসটেইনেবল অ্যাগ্রিকালচার মেকানাইজেশন অ্যান্ড পোস্টহারভেস্ট প্রাকটিস ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক এ কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয়।

কর্মশালায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনকালে গবেষক মঞ্জুরুল আলম বলেন, স্বল্প খরচে কম সময়ে বিপুল পরিমাণ ধান শুকাবে বাউ-এসটিআর নামের যন্ত্রটি। দেশের বিভিন্ন জায়গায় এ যন্ত্র পরীক্ষামূলকভাবে ব্যবহার হয়েছে। এতে ধানবীজের অঙ্কুরোদ্‌গম ক্ষমতাও পাওয়া গেছে প্রায় ৯০ ভাগ। এখন এ প্রযুক্তি সম্প্রসারণ করা দরকার। এতে চালের উৎপাদন খরচ অনেকাংশে কমে যাবে।

কৃষি প্রকৌশল ও প্রযুক্তি অনুষদের ডিন অধ্যাপক মো. নুরুল হকের সভাপতিত্বে কর্মশালায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক এম এ সাত্তার মণ্ডল। প্রধান পৃষ্ঠপোষক ছিলেন উপাচার্য অধ্যাপক লুৎফুল হাসান।

কর্মশালার বৈজ্ঞানিক সেশনে অংশ নেন বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষিশক্তি ও যন্ত্র বিভাগের অধ্যাপক মো. আবদুস সাত্তার ও মো. আবদুল আওয়াল, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক বি কে বালা, বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের মুখ্য প্রকৌশলী মো. লুৎফুর রহমান।

প্রধান অতিথি সাত্তার মণ্ডল বলেন, আগে বিদেশ থেকে আনা যন্ত্রের গুণগত মান পরীক্ষা করা হতো না। এখন এ বিষয়গুলোর ওপর নজর রাখা হচ্ছে। দেশে অনেক ভালো, টেকসই ও সাশ্রয়ী যন্ত্র উদ্ভাবন করা হচ্ছে। এতে আমদানিনির্ভরতা কমলেও প্রযুক্তি সম্প্রসারিত হচ্ছে না। প্রযুক্তিগুলো কৃষকের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে সরকারকে এগিয়ে আসতে হবে। তাহলেই যান্ত্রিকীকরণের মাধ্যমে কৃষির উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব হবে।

সম্পূর্ণ খবরটি পড়ুন

এগ্রোটেক

কৃষিযন্ত্রে গ্রামেই তরুণদের কর্মসংস্থান

কৃষিকাজের আধুনিক যন্ত্রপাতির ব্যবহার বাড়ছে। ইয়ানমার কম্বাইন্ড হারভেস্টরের সাহায্যে মাঠে ধান কাটছেন কৃষক। ছবি: সৌজন্যে
কৃষিকাজের আধুনিক যন্ত্রপাতির ব্যবহার বাড়ছে। ইয়ানমার কম্বাইন্ড হারভেস্টরের সাহায্যে মাঠে ধান কাটছেন কৃষক। ছবি: সৌজন্যে

দেশের কৃষিকাজে যুক্ত হচ্ছেন শিক্ষিত তরুণেরা। কৃষিকাজের প্রথাগত পদ্ধতির বিপরীতে তাঁরা করছেন আধুনিক যন্ত্রপাতির ব্যবহার। এতে একদিকে কৃষিশ্রমিক–সংকটের চ্যালেঞ্জ যেমন মোকাবিলা করা যাচ্ছে, তেমনি নতুন কর্মসংস্থানও হচ্ছে। পাশাপাশি কমে আসছে ফসল উৎপাদনের খরচ ও সময়।

তেমনই এক তরুণ কৃষি উদ্যোক্তা নেত্রকোনার আটপাড়া উপজেলার সামসুল কবির। ২০০৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর শেষে তিনি কৃষিকাজ শুরু করেন। তবে ধান কাটার সময় পড়তেন বিপাকে। চড়া দাম দিয়েও কৃষিশ্রমিক মিলত না। কষ্টের ফসল কখনো কখনো মাঠেই নষ্ট হতো, ক্ষতি হতো প্রায় প্রতি মৌসুমেই। পরে জানতে পারলেন এক নতুন কৃষিযন্ত্রের কথা, যা দিয়ে গত ধানের মৌসুমে তিনি আয় করেছেন ১১ লাখ টাকা। লাভ হয়েছে সাত লাখ টাকার বেশি।

যে কৃষিযন্ত্রটি সামসুলের ভাগ্য বদলাচ্ছে, সেটি হচ্ছে কম্বাইন্ড হারভেস্টর। সামসুল কিনেছেন জাপানের ইয়ানমার ব্র্যান্ডের হারভেস্টর। এ যন্ত্র দিয়ে একই সঙ্গে ধান কাটা, মাড়াই, ঝাড়া ও বস্তায় ভরা যায়। এতে ধান কাটার প্রচলিত পদ্ধতির তুলনায় সময় ও খরচ অনেক কম লাগে। মাঠে–ঘাটে ছড়িয়ে ধানের অপচয়ও হয় না।

দেশের বাজারে এই কম্বাইন্ড হারভেস্টর এসেছে বেশ কয়েক বছর হলো। তবে ইয়ানমার কম্বাইন্ড হারভেস্টর বাজারে এসেছে গত বছর। বাংলাদেশে এর একমাত্র পরিবেশক কৃষি খাতে যন্ত্র সরবরাহকারী শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান এসিআই মোটরস। এসিআইয়ের বাইরে আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠান বাণিজ্যিকভাবে কম্বাইন্ড হারভেস্টর দেশের বাজারে এনেছে, সেটা অন্য ব্র্যান্ডের। পাশাপাশি ব্যক্তি উদ্যোগে ২০১২ সালের দিকে দিনাজপুরের ফুলবাড়ীর কৃষক আনোয়ার হোসেনও এমন একটি কৃষিযন্ত্র তৈরি করেছেন।

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএইউ) কৃষি শক্তি ও যন্ত্র বিভাগের এক গবেষণা বলছে, ফসল আবাদে চাষ, সেচ, নিড়ানি, কীটনাশক প্রয়োগে ৮০ থেকে ৯৫ শতাংশ যান্ত্রিকীকরণ হয়েছে। অথচ ফসল রোপণ, সার দেওয়া, কাটা, মাড়াই, ঝাড়াই ও শুকানোর ক্ষেত্রে যন্ত্রের ব্যবহার ১ শতাংশের কম।

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএইউ) কৃষি শক্তি ও যন্ত্র বিভাগের অধ্যাপক মঞ্জুরুল আলম বলেন, গ্রামীণ শ্রমশক্তির ৪০ শতাংশ এখন কৃষিকাজ করে। ২০৩০ সাল নাগাদ তা কমে ২০ শতাংশ হবে। ফলে কৃষি যান্ত্রিকীকরণ ছাড়া আর বিকল্প নেই। কায়িক শ্রমের বদলে যন্ত্রের মাধ্যমে কৃষিকাজে তরুণদের আগ্রহ বাড়ছে। এখনকার প্রান্তিক কৃষিকে বাণিজ্যিক কৃষিতে রূপান্তর ঘটাতে তরুণেরা অন্যতম ভূমিকা পালন করতে পারেন।

উৎপাদন খরচ কমছে

তরুণ কৃষি উদ্যোক্তা সামসুল কবির জানান, প্রথাগত পদ্ধতিতে কৃষিশ্রমিকদের দিয়ে ফসল কাটানো, মাড়াই, ঝাড়াই ও বস্তাবন্দী করতে এক একর জমিতে খরচ হয় ১১ থেকে ১২ হাজার টাকা। এতে প্রতি ১০০ কেজি ধানে প্রায় ৭ কেজি ধান নষ্ট হয়। অথচ ইয়ানমার কম্বাইন্ড হারভেস্টর ব্যবহারে একই কাজ করতে খরচ হয় পাঁচ থেকে ছয় হাজার টাকা। আর ধান নষ্ট হয় প্রতি একরে কেবল ১ কেজি। প্রথাগত পদ্ধতিতে যেখানে ১ একর জমির ধান কাটার সব কাজ করতে ১০ থেকে ১২ জন শ্রমিকের ২ দিন লাগত, কম্বাইন্ড হারভেস্টর দিয়ে একই কাজ করা যাচ্ছে কেবল এক ঘণ্টার মধ্যেই।

সামসুল কবির এ বছরের এপ্রিল মাসে ইয়ানমার কম্বাইন্ড হারভেস্টর যন্ত্রটি কেনেন। তিনি বলেন, ‘এই বছরের মে মাসে আমি নিজের ৭ একর জমিসহ প্রায় ১৭০ একর জমির ধান কাটা, মাড়াই ও বস্তাবন্দীর কাজ করেছি। সামনের মৌসুমে আমি আরেকটি কম্বাইন্ড হারভেস্টর কেনার চিন্তা করছি।’

দাম কত

কৃষি যন্ত্রপাতি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান এসিআই মোটরস বলছে, সারা দেশে এ পর্যন্ত ৭০টি কম্বাইন্ড হারভেস্টর বিক্রি হয়েছে। তাদের দুই ধরনের কম্বাইন্ড হারভেস্টরের মধ্যে ট্যাংক টাইপের দাম পড়বে ২৯ লাখ ৫০ হাজার টাকা এবং ব্যাগ টাইপের দাম পড়বে ২৮ লাখ টাকা। সারা দেশে এসিআই মোটরসের ডিলার ৮২টি।

এসিআই মোটরসের নির্বাহী পরিচালক সুব্রত রঞ্জন দাস বলেন, সাড়ে ২৯ লাখ টাকা দিয়ে একটি হারভেস্টর কিনলে তিন মৌসুমে বিনিয়োগ উঠে যাবে। আরও পাঁচ বছরের (বছরে তিন মৌসুম) মতো এটি চালানো যাবে। তিনি আরও বলেন, কাস্তে দিয়ে ধান কেটে তরুণদের কৃষিতে আকৃষ্ট করা যাবে না। এ জন্য দরকার কৃষি যন্ত্রপাতির ব্যবহার বাড়ানো। সরকার এ ক্ষেত্রে ভর্তুকি দিচ্ছে। পাশাপাশি কৃষি খাতে স্বল্প সুদে যে ব্যাংকঋণ দেওয়া হয়, তার আওতায় হারভেস্টরকে আনতে হবে।

কাজ করা যায় কাদাপানিতেও

টাঙ্গাইলের আরেক তরুণ কৃষি উদ্যোক্তা সোহেল ইমু এ বছরের শুরুতে একটি ইয়ানমার কম্বাইন্ড হারভেস্টর কিনেছেন। সোহেল বলেন, ‘জাপানি প্রযুক্তির এই হারভেস্টর দিয়ে জমিতে শুয়ে পড়া ধান এবং কাদাপানির ধানও কাটা সম্ভব। যন্ত্রটিতে ছয়টি সেন্সর আছে, যাতে কোনো ময়লা বা শক্ত কিছু আটকে গেলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বন্ধ হয়ে যায়। তখন এটি আবার পরিষ্কার করে কাজ শুরু করি।’

সম্পূর্ণ খবরটি পড়ুন

এগ্রোটেক

যান্ত্রিকীকরণ বাড়াবে কৃষির উন্নয়ন

শ্রমিক সংকটসহ কৃষি কাজের সার্বিক উন্নয়নে যান্ত্রিকীকরণ ইতিবাচক প্রভাব রাখবে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. সাত্তার মণ্ডল। সম্প্রতি মানিকগঞ্জ জেলার সিঙ্গাইর উপজেলার আজিমপুর গ্রামে ইয়ানমার কম্বাইন হারভেস্টারের মাঠ প্রদর্শনী অনুষ্ঠানে তিনি এই কথা বলেন।

বরেণ্য এই কৃষি অর্থনীতিবিদ আরও বলেন, আমাদের কৃষিতে যে কয়টি বড় সমস্যা আছে তার মধ্যে শ্রমিকের মজুরি বেড়ে যাওয়া একটি বড় সমস্যা যার ফলে কৃষকের খরচ বেড়ে যায়। ফসল সংগ্রহে যন্ত্র ব্যবহার করায় একদিকে যেমন শ্রমিকের খরচ বাঁচছে, অন্যদিকে অত্যন্ত অল্প সময়ের মধ্যে শস্য ঘরে তোলা যাচ্ছে, কাজটা সূক্ষ্মভাবে হওয়ায় ফসল অপচয় কম হচ্ছে এবং দ্রুত মাঠ খালি হয়ে যাওয়ায় আরেকটি ফসলের জন্য মাঠকে তৈরি করা যাচ্ছে।

ড. সাত্তার মণ্ডল বলেন, ধান কাটার এসব যন্ত্র ব্যবহারে শুধু ধান উৎপাদন সহজতর হচ্ছে না বরং এসব যন্ত্র ভাড়া দেওয়ার মাধ্যমে একটি উদ্যোক্তা শ্রেণি তৈরি হচ্ছে এবং এর ফলে কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ছে।

উৎপাদনের অগ্রগতিতে বাংলাদেশে এখন ফসল কাটার মৌসুমে শ্রমিক সংকট প্রকট হতে দেখা যাচ্ছে। গত আউশ মৌসুমে শ্রমিক সংকট ছিল পায় ৪০% যার ফলে কৃষক ধানের ন্যায্য মূল্য থেকে বঞ্চিত হয়।

ইয়ানমার কম্বাইন্ড হারভেস্টারের আমদানিকারক এসিআই মটরস। প্রতিষ্ঠানটির নির্বাহী পরিচালক সুব্রত রঞ্জন দাস বলেন, এই হারভেস্টার মেশিনটি ধান কেটে মাড়াই, ঝাড়াই করে খড় আস্ত রাখে। ফলে ধান উৎপাদন এবং খড়ের চাহিদা রয়েছে এমন দেশগুলোতে এটি ব্যবহৃত হয়।

তিনি আরও বলেন, কম্বাইন হারভেস্টারটি ঘণ্টায় এক একর ধান কেটে মাড়াই, ঝাড়াই করে বস্তাবন্দী করে দেয়। খরচ বাদ দেওয়ার পরে এক একর জমি থেকে তিন-চার হাজার টাকা লাভ করতে পারে। কেউ যদি যন্ত্রটি তিন মৌসুম চালায় তবে বিনিয়োগ উঠিয়ে আনা সম্ভব।

এসিআই মটরস, ইয়ানমার কম্বাইন হারভেস্টার যন্ত্রটি সঠিকভাবে চালানোর জন্য সার্ভিস এবং ট্রেনিং এর ব্যবস্থাও করছে।

ইয়ানমার কম্বাইন হারভেস্টারের একজন ব্যবহারকারী মানিকগঞ্জ জেলার শফিকুল ইসলাম জানান, আমি যন্ত্রটি ছয় মাস ধরে ব্যবহার করছি। এখন পর্যন্ত তিন শ একরের মতো ধান কাটা হয়েছে। যন্ত্রটি ভালো কাজ করছে। শফিকুল ইসলাম দেশের বিভিন্ন জেলায় হারভেস্টার পাঠিয়ে ধান কাটানোর কাজও করেন।

সম্পূর্ণ খবরটি পড়ুন

শীর্ষ সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক: শাইখ সিরাজ
© ২০২০ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। দা এগ্রো নিউজ, ফিশ এক্সপার্ট লিমিটেডের দ্বারা পরিচালিত একটি প্রতিষ্ঠান। ৫১/এ/৩ পশ্চিম রাজাবাজার, পান্থাপথ, ঢাকা -১২০৫
ফোন: ০১৭১২-৭৪২২১৭
ইমেইল: info@theagronews.com, theagronewsbd@gmail.com