আমাদের সাথে যোগাযোগ করুন

দৈনন্দিন

মহামারিতেও পরিবর্তন হয়নি বাংলাদেশের ‘ভিআইপি সংস্কৃতি’

করোনাভাইরাস সংক্রমণের টেস্ট করাতে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয় সাধারণ মানুষকে।
করোনাভাইরাস সংক্রমণের টেস্ট করাতে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয় সাধারণ মানুষকে।

একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন বুশরা বিনতে বাতেন।

সম্প্রতি অসুস্থ হয়ে তার শ্বশুর এবং শাশুড়ি দুজনই একদিনের ব্যবধানে মারা যান।

বাসায় অসুস্থ হবার পরে এ দু’জনকে হাসপাতালে ভর্তি করাতে রীতিমতো বেগ পেতে হয়েছে মিস্‌ বাতেন এবং তার পরিবারকে।

একজন সাধারণ রোগী হিসেবে কোন হাসপাতালেই রোগী ভর্তি করানো সম্ভব হয়নি।

পরিচিত ব্যক্তিদের মাধ্যমে যোগাযোগ করে এ কাজ সমাধান করতে হয়েছে।

“ওনাদের যে কয়েকটা হাসপাতালে ভর্তি করেছি, প্রতিটি জায়গায় রেফারেন্সের মাধ্যমে যেতে হয়েছে। কোন হাসপাতালে সরাসরি গিয়ে আমরা সেবা পাইনি,” বলেন মিস্‌ বাতেন।

“আমরা ১০ দিনের মধ্যে চারটা হাসপাতালে নিয়ে গেছি। প্রতিটি হাসপাতালে যাবার আগে আমাদের একটা রেফারেন্স লেগেছে।”

বাংলাদেশের সমাজে ক্ষমতাবান না হলে সাধারণ মানুষের পক্ষে যে কোন সেবা পাওয়া দুষ্কর।

মিস্ বাতেনের পরিবার এর একটি উদাহরণ মাত্র। এই ক্ষমতা বিভিন্ন ধরণের হতে পারে।

রাজনৈতিক ক্ষমতা, বিত্তশালী হবার ক্ষমতা এমনকি ঊর্ধ্বতন সামরিক-বেসামরিক কর্মকর্তা হবার ক্ষমতা।

করোনাভাইরাস মহামারির এ সময়টিতে ক্ষমতার জোর আরো প্রকট ও দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে।

সব জায়গায় ‘ভিআইপি’ দাপট

ঢাকার আরেক বাসিন্দা ইয়াসমিন ইতি বলছিলেন, দেশের ভেতরে তথাকথিত ভিআইপি সংস্কৃতির কারণে সাধারণ মানুষের জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে।

নিজের একটি অভিজ্ঞতা বর্ণনা করে মিস ইতি বলেন, অতি নগণ্য বিষয় নিয়েও তথাকথিত ভিআইপি এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে পার্থক্য তৈরি করা হয়।

ইয়াসমিন ইতি
ইয়াসমিন ইতি

মিস্ ইতি একবার নওগাঁর আত্রাই এলাকায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের একটি কাছারি বাড়িতে বেড়াতে গিয়েছিলেন। সেখানে তিনি দর্শনার্থী হিসেবে টিকিট কেটে ঢুকে ঘুরছিলেন।

“এমন সময় সিকিউরিটি গার্ডরা দৌড়ে এসে বললো, অমুক সাংসদ এসেছে তার আত্মীয়-স্বজন নিয়ে, এখন সাধারণ যারা আছে তাদের বাইরে অপেক্ষা করতে হবে। সাংসদ ঘুরে চলে গেলে আপনারা আবার ঢুকতে পারবেন। খুব অপমানিত বোধ করেছি তখন,” বলেন মিস্ ইতি।

এয়ারপোর্ট, পাসপোর্ট অফিস, ট্রেন, বিমান, লঞ্চ – সবজায়গাতেই তথাকথিত ভিআইপি কালচারের চর্চা চোখে পড়ার মতো।

ভিআইপ সংস্কৃতি কেন টিকে আছে?

ক্ষমতার সাথে যারা নানাভাবে সম্পৃক্ত তারা নিজেদের সুবিধার জন্য আলাদাভাবে লিখিত কিংবা অলিখিত একটি সিস্টেম চালু করেছেন, যেটি সাধারণ মানুষের চেয়ে আলাদা।

বাংলাদেশের রাষ্ট্রব্যবস্থায় তথাকথিত এই ভিআইপি সংস্কৃতিকে সযত্নে লালন করা হয়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের শিক্ষক ও বিশ্লেষক গোবিন্দ চক্রবর্তী ব্যাখ্যা করছিলেন এই সংস্কৃতি দিনকে দিন কেন শক্তিশালী হয়ে উঠছে?

মি: চক্রবর্তী বলেন, রাষ্ট্র ক্ষমতার সাথে সম্পৃক্ত কিছু পকেটস আছে। এগুলো বিভিন্ন শাসনামলে শক্তিশালী হয়েছে।

“আমাদের এখানে নীতি প্রণয়নের ক্ষেত্রে এলিটরা যেটা প্রেফার করে, শেষ পর্যন্ত সেটাই বাস্তবায়ন হয়। বাংলাদেশের নীতি প্রণয়নের ক্ষেত্রে বিভিন্ন ইন্টারেস্ট গ্রুপ বেশ শক্তিশালী। যারা নীতি প্রণয়ন করছেন, তারা এই গ্রুপগুলোর মধ্যে ভারসাম্য বাজায় রাখার চেষ্টা করছেন,” বলেন মি: চক্রবর্তী।

বাংলাদেশে যে কোন সরকারি সেবা যথাসময়ে পাওয়ার ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষকে যখন সংগ্রাম করতে হয়, তখন ক্ষমতাবান এবং বিত্তবানদের জন্য সেটি বেশ অনায়াসে হয়ে যায়।

অনেকক্ষেত্রে তাদের সশরীরে উপস্থিতও হতে হয় না। রাজনীতিবিদ এবং বিত্তশালী ব্যবসায়ী ছাড়াও ক্ষমতার সাথে সম্পৃক্ত থাকেন সামরিক এবং বেসামরিক কর্মকর্তারা।

সাবেক সচিব শফিক আলম মেহেদির কাছে জানতে চেয়েছিলাম, বিভিন্ন ক্ষেত্রে কেন সরকারি কর্মকর্তাদের জন্য আলাদা ব্যবস্থা করা হয়?

মি: মেহেদি দাবি করেন, সরকারি কাজের প্রয়োজনে কিছু সুবিধা চালু করা হয়েছে। এর বাইরে অন্য কিছু দাবি করার সুযোগ নেই বলে তিনি মন্তব্য করেন।

“আমরা যখন জয়েন্ট সেক্রেটারি হলাম তখন বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে গেলে সেখানে একটা আসন সংরক্ষিত থাকতো। এছাড়া সচিব যখন হলাম তখন একটি ডিপ্লোম্যাটিক পাসপোর্ট পেয়েছি। এটা সরকারি কাজে সুবিধার্থে,” বলেন মি: মেহেদি।

মহামারির সময় ভিআইপি সংস্কৃতি প্রকট হয়েছে

দেশের ভঙ্গুর চিকিৎসা ব্যবস্থাতে এমনিতেই বৈষম্য ছিল। কিন্তু এবার সেটি আরো প্রকট হয়েছে।

মহামারির এই সময়টিও বাংলাদেশের তথাকথিত ভিআইপি সংস্কৃতি বা বিশেষ সুবিধা পাওয়ার সংস্কৃতিতে কোন পরিবর্তন আনতে পারেনি।

ক্ষমতাসীন দলের সাথে সম্পৃক্ত ব্যক্তি, বিত্তশালী ব্যবসায়ীরা সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে চিকিৎসা পাচ্ছেন।

যেখানে সাধারণ মানুষের কোন প্রবেশাধিকার সীমিত। ক্ষমতাসীন দলের সাথে সম্পৃক্ত কাউকে-কাউকে ঢাকার বাইরে থেকে হেলিকপ্টারের মাধ্যমে ঢাকায় এনে চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়েছে।

অবশ্য রোগীর চাপ এতোটাই বেশি যে ক্ষমতার সাতে সম্পৃক্ত সবাই সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে পারেননি।

করোনাভাইরাস মহামারির সময় হাসপাতালে সাধারণ মানুষের জায়গা পেতে বেশ সংগ্রাম করতে হয়েছে।
করোনাভাইরাস মহামারির সময় হাসপাতালে সাধারণ মানুষের জায়গা পেতে বেশ সংগ্রাম করতে হয়েছে।

মানবাধিকার কর্মী নীনা গোস্বামী বলেন, সুযোগ সুবিধা যেখানে খুবই অপ্রতুল সেখানে মহামারির সময় পরিস্থিতির কোন বদল আশা করা যায় না।

” স্বাস্থ্যখাতের অব্যবস্থাপনা যখন সামনে চলে আসছে তখন তাদের মনে একটা ভয় কাজ করে। যারা ক্ষমতার সাথে সম্পৃক্ত থাকে তারা সর্বোচ্চ সুবিধাটা নিতে চায়। সেখানে ইকুয়ালিটির প্রশ্নই আসে না,” বলেন মিস্ গোম্বামী।

“এটা শুধু মহামারির সময় না, ক্ষমতার সাথে সম্পৃক্তরা সবসময় সুবিধা পেয়ে থাকে। আপনি সাধারণ সময়েও দেখবেন যে, কিছু মানুষ চিকিৎসার জন্য হেলিকপ্টারের সুবিধা পায়। আবার বাইরে চলে যাবার জন্যও বিশেষ সুবিধা পায়।”

শুধু হাসপাতালে চিকিৎসা নয়, করোনাভাইরাসের টেস্ট করানোর ক্ষেত্রে বৈষম্য চোখে পড়ে।

অভিযোগ রয়েছে টেস্ট-এর ক্ষেত্রে সরকারি কর্মকর্তারা অগ্রাধিকার পায়।

এছাড়া সাংবাদিক, আইনজীবীসহ বিভিন্ন পেশাজীবী গ্রুপ তাদের সংগঠনের সদস্যদের জন্য আলাদা টেস্ট করার ব্যবস্থা করিয়ে নিয়েছেন।

অন্যদিকে সাধারণ মানুষ করোনাভাইরাসের টেস্ট করানোর জন্য রীতিমতো গলদঘর্ম হচ্ছেন।

ঢাকার একজন বাসিন্দা প্রিয়াঙ্কা ভট্টাচার্য বলেন, করোনাভাইরাস সংক্রমণের সব উপসর্গ থাকা সত্ত্বেও টেস্ট করাতে তাকে দু’সপ্তাহ অপেক্ষা করাতে হয়েছে।

শেষ পর্যন্ত এক আত্মীয়ের পরিচয়ের মাধ্যমে সেটি করানো সম্ভব হয়েছে।

“পরিচিত না থাকলে মনে হয় সম্ভব হতো না,” বলেন মিস্ চক্রবর্তী।

ভিআইপি সংস্কৃতির মূলে রয়েছে রাজনীতি

সরকারি যে কোন সেবা পেতে সাধারণ মানুষকে বহু কষ্ট করতে হয়।
সরকারি যে কোন সেবা পেতে সাধারণ মানুষকে বহু কষ্ট করতে হয়।

বিশ্লেষকরা মনে করেন, তথাকথিত এই ভিআইপি সংস্কৃতির পরিবর্তন করতে পারতো রাজনীতি এবং রাজনীতিবিদরা।

কিন্তু তারাও যেহেতু এই সুবিধা অংশ পায় সেজন্য এটি পরিবর্তনে তাদেরও কোন আগ্রহ নেই।

গত প্রায় ৪০ বছর যাবত রাজনীতির সাথে যুক্ত আছেন নূহ-উল-আলম লেনিন।

এক সময় কমিউনিস্ট পার্টি করলেও দীর্ঘদিন আওয়ামী লীগের সাথে তিনি যুক্ত।

মি: লেলিন মনে করেন, তথাকথিত ভিআইপি সংস্কৃতি টিকিয়ে রাখার ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের আগ্রহই সবচেয়ে বেশি।

তিনি মনে করেন, প্রায় সোয়া ২০০ বছর আগে এই অঞ্চলে ব্রিটিশদের চালু করা জমিদারি প্রথার ধারাবাহিকতায় বর্তমানের ভিআইপি কালচার চালু রয়েছে।

মি: লেনিন বলেন, ” ভিআইপি এবং ভিভিআইপি – এই সিস্টেম অফিসিয়ালি কে করেছে? এটা করেছে রাষ্ট্র। রাষ্ট্র যেহেতু চিরকালই অভিজাত শ্রেণীর হাতে ছিল, সে কারণেই এটা অতীতের ধারাবাহিকতায় চলে এসেছে।

তিনি মনে করেন, ক্ষমতাবানরা নিজেদেরকে অন্যদের চেয়ে আলাদা হিসেবে তুলে ধরতে চান। সেজন্যই ভিআইপি কালচার এখনো লালন করা হচ্ছে।

“ক্ষমতার একটা ক্যারেক্টার থাকে। ক্ষমতা যদি প্রয়োগ করা এবং সে যদি নিজেকে সাধারণ মানুষের চেয়ে আলাদা করতে না পারে, তাহলে সে কিসের ক্ষমতাবান হলো?”

বিশ্লেষকরা বলেন, যেখানে জনসংখ্যার তুলনায় সুযোগ-সুবিধা খুবই অপ্রতুল সেখানে দ্রুত সেবা পেতে তথাকথিত ভিআইপি সংস্কৃতি টিকে থাকবে।

আবার অনেকে মনে করেন, ক্ষমতার সাথে সম্পৃক্তরা যেহেতু আলাদা সুবিধা পান, সেজন্য সিস্টেমের পরিবর্তন করার ক্ষেত্রে তাদের তেমন একটা মনোযোগও দেখা যায়না।

  • সরকারি যে কোন সেবা পেতে সাধারণ মানুষকে বহু কষ্ট করতে হয়।

    সরকারি যে কোন সেবা পেতে সাধারণ মানুষকে বহু কষ্ট করতে হয়।

  • করোনাভাইরাস মহামারির সময় হাসপাতালে সাধারণ মানুষের জায়গা পেতে বেশ সংগ্রাম করতে হয়েছে।

    করোনাভাইরাস মহামারির সময় হাসপাতালে সাধারণ মানুষের জায়গা পেতে বেশ সংগ্রাম করতে হয়েছে।

  • ইয়াসমিন ইতি

    ইয়াসমিন ইতি

  • করোনাভাইরাস সংক্রমণের টেস্ট করাতে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয় সাধারণ মানুষকে।

    করোনাভাইরাস সংক্রমণের টেস্ট করাতে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয় সাধারণ মানুষকে।

  • সরকারি যে কোন সেবা পেতে সাধারণ মানুষকে বহু কষ্ট করতে হয়।
  • করোনাভাইরাস মহামারির সময় হাসপাতালে সাধারণ মানুষের জায়গা পেতে বেশ সংগ্রাম করতে হয়েছে।
  • ইয়াসমিন ইতি
  • করোনাভাইরাস সংক্রমণের টেস্ট করাতে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয় সাধারণ মানুষকে।
বিজ্ঞাপন
মন্তব্য করুন

অনুগ্রহ করে মন্তব্য করতে লগ ইন করুন লগ ইন

Leave a Reply

চীন

করোনা ভাইরাস: কোভিড-১৯ রোগের উৎস চীনের উহানকে ঘিরে যেসব প্রশ্ন এখনো রয়ে গেছে

উহানের উপকণ্ঠে এক গ্রামে ছোট্ট একটি ঘরের ভেতর বয়স্ক এক নারী নিচু গলায় বিড়বিড় করে কিছু বলছেন এবং টেবিল চাপড়াচ্ছেন। তার উল্টো দিকে আরেক নারী কাঁদছেন। ফেব্রুয়ারির গোড়ায় তার ৪৪ বছর বয়স্ক ভাই করোনাভাইরাসে মারা গেছেন। তিনি নিজেকে ক্ষমা করতে পারছেন না।

ভাইয়ের শেষকৃত্যের পর মিজ ওয়াং (যিনি তার পুরো নাম জানাতে চান না) বলেন, তার ভাই ওয়াং ফেই কবর থেকে তাকে বার্তা পাঠিয়েছে। “ফেইফেই বলেছে আমাকে সে দোষী করছে না।”

ছোটবেলা থেকেই ভাইকে তারা ফেইফেই বলে ডাকেন। “আমি জানি ও আমাকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করছে, মৃত্যুটা যাতে আমি মেনে নিতে পারি,” যোগ করলেন তিনি।

মিজ ওয়াং
মিজ ওয়াং

তার ভাই কোভিড ওয়ার্ডে মারা গেছে। কেউ তাকে শেষ দেখাও দেখতে যেতে পারেনি। তার জীবনের শেষ ক’টা দিনের সাক্ষী হয়ে আছে তার পাঠানো কাতর কিছু টেক্সট মেসেজ।”

“আমি অসম্ভব ক্লান্ত,” একটা মেসেজে সে লিখেছিল। “এই রোগে অনেকদিন ধরে ভুগছি।”

তার বোনের অপরাধবোধের মূল কারণটা হল অসু্স্থ ভাইয়ের পাশে থাকতে না পারা।

“হাসপাতালে ভাইয়ের পাশে থাকতে পারিনি। যখন শুনলাম ও আর নেই, তখন ওর মৃত্যুটা মেনে নিতে পারিনি। আমাদের পরিবারে সবার বুক ভেঙে গেছে।”

ভাইয়ের ঠিকমত চিকিৎসা হয়েছিল কি-না জানতে চান মিজ ওয়াং – জানতে চান তার যত্ন নেয়া হয়েছিল কি-না, তাকে বাঁচানোর সব রকম চেষ্টা করা হয়েছিল কি-না।

মিজ ওয়াং-এর ভাই ওয়াং ফেই
মিজ ওয়াং-এর ভাই ওয়াং ফেই

মিজ ওয়াংকে বলে দেয়া হয়েছে বিদেশি সংবাদ মাধ্যমের সাথে কথা না বলতে। সেই নিষেধ অমান্য করে বিবিসির সাথে কথা বলে একটা ঝুঁকি তিনি নিয়েছেন।

আরেক নারী সাক্ষাতকার দেওয়ার জন্য যখন আমাদের গাড়িতে উঠতে যাচ্ছিলেন, তখন সাদা পোশাকের পুলিশ আমাদের পথ রোধ করে প্রশ্ন করেছে।

উহানের পূর্ব লেকের তীরে রাতের অন্ধকারে বিবিসির সাথে কথা বলার সময় আরেক ব্যক্তি জানায় যে তার বাবার মৃত্যু নিয়ে কথা বলার জন্য পুলিশ দু’বার তাকে জেরা করেছে।

যারা করোনাভাইরাসের শিকার হয়েছেন তারা এবং সাংবাদিকরা যখন উহানে করোনাভাইরাসের সূত্রপাত কীভাবে হলো তা নিয়ে প্রশ্ন করেছেন কিংবা জানতে চেয়েছেন যে এই ভাইরাসের বিস্তার আরও কার্যকরভাবে ঠেকানো সম্ভব ছিল কি-না, তখন কাজটা তাদের জন্য সহজ হয়নি।

কিন্তু বিশ্ব জুড়ে এই যে বিপর্যয়, এই যে মহামারি, তার যে উৎপত্তিস্থল তাকে নিয়ে নানা প্রশ্ন এখনও রয়ে গেছে।

জানুয়ারি মাসের মাঝামাঝি ওয়াং ফেই যখন অসুস্থ বোধ করেন, তখন চীনে সরকারিভাবে মৃত্যুর সংখ্যা ছিল মাত্র তিন। আজ পৃথিবী জুড়ে এই ভাইরাসে আক্রান্তের সংখ্যা এক কোটি ১০ লাখ। মৃতের সংখ্যা অন্তত পাঁচ লাখ।

এখন এই ভাইরাসের কারণে বিশ্বব্যাপী অর্থনীতি অবরুদ্ধ, অর্থনৈতিক ধস নেমেছে বিশ্ব জুড়ে।

ভাইরাসের উৎস

উহানেই প্রথম এই করোনাভাইরাস ধরা পড়ে। আবার এই উহানই প্রথম এই ভাইরাস দমনে সচেষ্ট হয়। ফলে অনেকেই মনে করছেন এর উৎস খুঁজতে হবে এই উহানেই।

কীভাবে এবং কোথায় এই ভাইরাসের উৎপত্তি, সে প্রশ্ন এখন চীন ও আমেরিকার মধ্যে প্রচারণা যুদ্ধের একটা বড় হাতিয়ার হয়ে উঠেছে।

আর বারবার ঘুরে ফিরে আসছে যে প্রশ্ন, তা হলো এই ভাইরাসের উৎস কি প্রাকৃতিক – যেটা বেশিরভাগ বিজ্ঞানীই মনে করেন – নাকি কোন ল্যাব থেকে বাইরে বেরিয়ে এসেছে এই ভাইরাস?

মিজ ওয়াংয়ের ভাই গাড়ি চালাতেন। তিনি উহানের বাইরে কদাচিৎ গেছেন। তার ৪৪ বছরের জীবনে চীনের উহান শহরকে তিনি আমূল বদলে যেতে দেখেছেন। চীনের পশ্চাদপদ একটা শিল্পনগরী থেকে উহান আজ আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের রমরমা একটা কেন্দ্র এবং পরিবহনের মূল একটা ঘাঁটি।

কিন্তু এই অসাধারণ উন্নতির শিখরে ওঠা শহর ওয়াং ফেই-এর প্রত্যাশা পূরণ করতে পারল না কেন?

জানুয়ারির শুরুতেই চিকিৎসকরা বুঝতে পেরেছিলেন যে এই ভাইরাস প্রচণ্ডরকম সংক্রামক। তারা তখন থেকেই তাদের হাসপাতালের ভেতর কোয়ারেন্টিন প্রক্রিয়া চালু করে দিয়েছিলেন।

কিন্তু মানুষজনকে এই ভাইরাসের ভয়াবহতা সম্পর্কে সতর্ক করার বদলে কর্তৃপক্ষ তখন স্বাস্থ্যকর্মীদের মুখ বন্ধ করার চেষ্টা করেছিল। চিকিৎসক লী ওয়েনলিয়াং যখন তার সহকর্মীদের এই সংক্রমণ থেকে বাঁচতে সতর্কতা নেওয়ার জন্য হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন, তখন তার মুখ বন্ধ করা হয়েছিল। পুলিশ তাকে দিয়ে স্বীকারোক্তি সই করিয়ে নিয়েছিল।

কর্তৃপক্ষ ১৮ই জানুয়ারি তারিখেও জোর দিয়ে বলেছিল, এই রোগ ছোঁয়াচে নয়।

ওয়াং ফেই যখন অসুস্থ বোধ করে হাসপাতালে যান, তাকে জ্বরের জন্য প্যারাসিটামল দিয়ে বাড়ি পাঠিয়ে দেয়া হয়েছিল। “ওরা বলছে এ রোগ মানুষ থেকে মানুষে ছড়ায় না, কিন্তু দেখছি ডাক্তাররা সবাই মাস্ক পরে আছেন,” তিনি তার বোনকে বলেছিলেন।

তার বোন বলেন, “আমিও তখন বলেছিলাম ‘ভাল হয়ে যাবে’। পেছন ফিরে তাকালে এখন মনে হয়, সরকার তখন আসলেই মানুষকে যথেষ্ট সতর্ক করেনি। এখন মনে হয় আমার ভাইয়ের সঠিক চিকিৎসা সহায়তা দরকার ছিল। সে কারণেই আমার নিজেকে অপরাধী মনে হয়।”

মিজ ওয়াং
মিজ ওয়াং

মি. ওয়াং ওই সময়ে চীনা নতুন বছরের ছুটি কাটানোর সব পরিকল্পনা বাতিল করে দিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার দীর্ঘ লাইনে শামিল হন। কিন্তু ততদিনে রোগীর সংখ্যা অনেক বেড়ে গেছে এবং রোগীর তুলনায় শয্যা কম। ফলে হাসপাতালের বাইরে লম্বা লাইনে সারা দিন কাটিয়ে ক্লান্ত হয়ে ঘরে ফিরতেন ওয়াং ফেই।

“ফেই অন্তরের গভীরে বিশ্বাস করত দেশ ও সরকার তাকে ভালবাসে এবং সরকার তাকে রক্ষা করবে,” বলেন মিজ ওয়াং।

মি. ওয়াং-এর অবস্থার তখন অবনতি হচ্ছে। ৭ই ফেব্রুয়ারি ওই হাসপাতালেই মারা যান ডাক্তার লী ওয়েনলিং, যার বক্তব্য তখন পুলিশ চেপে দিয়েছে। ওয়াং ফেইয়ের মনোবল এ ঘটনায় ভেঙে পড়ে। “একজন চিকিৎসকই যদি বাঁচতে না পারেন, তাহলে আমার বাঁচার কী সম্ভাবনা?” – বোনকে পাঠানো টেক্সটে তিনি লেখেন।

উহানে স্বাস্থ্যকর্মীরা এখনও খোলাখুলি কথা বলতে পারছেন না।

কোভিড-১৯ রোগীদের চিকিৎসার অভিজ্ঞতা নিয়ে একটি হাসপাতালের বাইরে একজন নার্সের সাথে কথা বলেছিলাম। আমাদের সাথে কথা বলে তিনি সাইকেল নিয়ে চলে যাচ্ছিলেন। হঠাৎ দেখলাম পাশের রাস্তা থেকে সাদা পোশাকের দুজন পুলিশ তার পিছু নিল। দেখলাম তাকে থামিয়ে তার সাথে ওই দুজন লোক বেশ উত্তপ্তভাবে কথা বলছে।

আমি এগিয়ে যাবার পর ওরা ওই নার্সকে ছেড়ে দিল। এর কয়েক মিনিট পর তিনি আমাকে ফোন করে বলেন তার সাক্ষাৎকারটা মুছে ফেলতে। তার নিরাপত্তার স্বার্থে সেটা করা ছাড়া আমার কোন বিকল্প ছিল না।

চীনে প্রশাসনের বিরুদ্ধে একটা অভিযোগ অনেকদিনের – সেটা হলো তথ্য নিয়ন্ত্রণ করা।

হাসপাতালে ওয়াং ফেই
হাসপাতালে ওয়াং ফেই

উহান অবশ্য সফলভাবে লকডাউন দিয়ে অবশেষে এই প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণে আনে। কিন্তু এরপর চীনকে আমেরিকাসহ বিভিন্ন মহলের এই অভিযোগের মুখে পড়তে হয় যে প্রাথমিক পর্যায়ে তথ্য গোপন এবং বিলম্বের কারণে এই রোগের প্রাদুর্ভাব বিশ্বজোড়া একটা সংকটে পরিণত হয়েছে।

একটি গবেষণায় বলা হয়, উহান কর্তৃপক্ষ আর এক সপ্তাহ আগে পদক্ষেপ নিলে চীনে আক্রান্তের সংখ্যা শতকরা ৬৬ ভাগ কমতো।

চীনা কর্তৃপক্ষ দেরি করার এবং তথ্য গোপন করার অভিযোগ অস্বীকার করেছে। তারা জোর দিয়ে বলেছে যে অপরিচিত একটা রোগের মোকাবেলায় তাদের প্রতিক্রিয়া দ্রুতই ছিল এবং তারা এটাও জানায় যে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা তাদের এই রোগ মোকাবেলার প্রশংসা করেছে।

চীনা সরকার এমন কথাও বলেছে যে পশ্চিমের সাথে তুলনা করলে তারা অনেক ভালভাবে এই রোগের মোকাবেলা করেছে। এমনকি পশ্চিমের দেশগুলো যেভাবে এই ভাইরাস মোকাবেলা করেছে, তাকে চীন বিশৃঙ্খল এবং বিভ্রান্তিপূর্ণ বলে ঠাট্টাও করেছে।

তবে পশ্চিমের দেশগুলোর বক্তব্য, যেসব দেশের সরকার গণতান্ত্রিক, সেসব দেশে ভাইরাস মোকাবেলায় সরকারের ব্যর্থতা উঠে আসে মুক্ত সংবাদমাধ্যমে, কিন্তু চীনে সংবাদমাধ্যমের সেই স্বাধীনতা নেই। তাই সেখানে সরকারি ভাষ্যের বাইরে কথা বললে রাষ্ট্র তাকে থামিয়ে দিতে পারে।

চীনে সংসদীয় প্রতিনিধি , ঊর্ধ্বতন স্বাস্থ্য কর্মকর্তা, শিক্ষাবিদ এবং চিকিৎসক – সব মিলিয়ে ২০ জনের বেশি ব্যক্তির কাছে সাক্ষাৎকার চেয়েছিলাম, প্রশ্নও পাঠিয়েছিলাম পররাষ্ট্র এবং বিজ্ঞান মন্ত্রণালয় এবং স্বাস্থ্য কমিশনের কাছে । কিন্তু আমাদের অনুরোধে সাড়া পাওয়া যায়নি।

জন সাডওয়ার্থ চীনা নিরাপত্তা কর্মকর্তার মুখোমুখি
জন সাডওয়ার্থ চীনা নিরাপত্তা কর্মকর্তার মুখোমুখি

প্রাণী থেকে মানুষে সংক্রমণ

ওয়াং ফেই থাকতেন খুব বড় একটা বাজারের খুবই কাছে। হুয়ানান সিফুড মার্কেট বলে পরিচিত এই বাজার নামে সামুদ্রিক খাবারের বাজার হলেও, এখানে কখনও-সখনও বন্যপ্রাণী বেচা হতো বলেও জানা যায় – বিশেষ করে যেসব প্রাণী চীনে শৌখিন খাবারের তালিকায় আছে। এই বাজার এখন বন্ধ করে দেয়া হয়েছে।

প্রথমদিকে সন্দেহ করা হয়, এই বাজার থেকেই ভাইরাসের শুরু – যেখানে পশু থেকে মানুষের শরীরে এই ভাইরাসের সংক্রমণ হয়েছে।

এই ভাইরাস, পরে যার নামকরণ হয় সার্স-কোভ-২, সেই ধরনের একটি করোনাভাইরাস, যার উপরের অংশ খোঁচা খোঁচা মুকুটের মত। এ ধরনের ব্যাপক সংখ্যক ভাইরাস দেখা গেছে বাদুড়ের শরীরে।

ধারণা করা হয়, এ ধরনের ভাইরাস মানুষকে সংক্রমিত করতে পারে, বাদুড় থেকে সরাসরি অথবা অন্য কোন পশুর মাধ্যমে – যেখানে দ্বিতীয় প্রাণীটি অন্তর্বর্তীকালীন বাহক হয়।

বাজার
বাজার

নভেম্বর ২০০২-এ চীনে এই ধরনের একটি করোনাভাইরাস প্রাদুর্ভাব ঘটেছিল।

ওই করোনাভাইরাসটির নাম ছিল সার্স কোভ-১, সেটিও দক্ষিণ চীনের একটি বাজার থেকে ছড়ায়।। বাদুড় থেকে বনবিড়ালের হয়ে মানুষের শরীরে ঢোকে এবং বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ওই ভাইরাসে মারা যায় ৭৭৪ জন। তখনও চীনা কর্তৃপক্ষ বেশ কয়েকমাস পর্যন্ত স্বীকার করেনি যে এটা ছড়াচ্ছে।

এবারের করোনাভাইরাস থেকে প্রথম সংক্রমিত হয় মি. ওয়াং যে পাড়ায় থাকতেন সেই পাড়ার কিছু মানুষ। একটি জরিপে দেখা যায়, এদের অর্ধেকই ওই সিফুড বাজারের সাথে সংশ্লিষ্ট ছিলেন।

স্বভাবতই ধরে নেয়া হয়, এবারে ভাইরাসের অন্তর্বর্তীকালীন বাহক ওই বাজারে বিক্রির জন্য নেয়া কোন পশু।

তবে ওই বাজারের ভেতরে বিভিন্ন জায়গা থেকে নেয়া নমুনা পরীক্ষার পর চীন এখন এই তত্ত্ব নাকচ করে দিচ্ছে বলে মনে হচ্ছে। সেখান থেকে নেয়া যেসব প্রাণীর নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে তাতে এই ভাইরাসের উপস্থিতি পাওয়া যায়নি।

চীনা কর্মকর্তারা তাই এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন যে, এই প্রাদুর্ভাবের শুরু সম্ভবত অন্যত্র। ওই জনাকীর্ণ বাজার শুধু এই রোগ একজন মানুষ থেকে আরেকজন মানুষে ছড়াতে সাহায্য করেছে।

বেশিরভাগ বিজ্ঞানীই বেশ দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন যে, এই সার্স-কোভ-২ ভাইরাস ওই বাজার বা অন্য কোন জায়গা – যেখানে থেকেই শুরু হোক না কেন, তা পশুর মাধ্যমেই মানুষের শরীরে ঢুকেছে। তারা বলছেন, বেশি জনসংখ্যা এবং পশুপাখির স্বাভাবিক বাসস্থানে মানুষের উপস্থিতি বাড়ার কারণে পশুর শরীর থেকে মানুষের শরীরে ভাইরাস ঢোকার ঘটনা ক্রমশ বাড়ছে।

হংকং বিশ্ববিদ্যালয়ের মাইক্রোবায়োলজিস্ট ড. ইয়ুয়েন কোওক-ইয়াং জানুয়ারি মাসে চীনের স্বাস্থ্য কমিশনের তথ্য অনুসন্ধানী একটি দলের সাথে উহানে যান। তিনি এই তত্ত্ব সমর্থন করে বলছেন যে এই ভাইরাসের সূত্রপাত হয়েছে প্রাণী থেকে মানুষের সংক্রমণের মধ্যে দিয়ে।

“আমাকে যদি জিজ্ঞেস করেন, আমি বলব বাজার থেকে এবং যেসব বাজারে বন্যপ্রাণী বিক্রি হয়, সেখান থেকেই এটা আসার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি,” তিনি আমাকে বলেন।

তিনি বলেন, এ কারণেই এধরনের ভাইরাস মহামারি ভবিষ্যতে এড়াতে হলে এই বন্যপ্রাণীর বাজারগুলোকে নজরদারিতে রাখতে হবে। “সংস্কৃতি পাল্টানো সহজ নয়, কিন্তু আমাদের সেটা করতেই হবে।”

মে মাসের মাঝামাঝি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা একটি প্রস্তাব পাশ ক’রে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আহ্বান জানায়, এই ভাইরাসের সম্ভাব্য অন্তর্বর্তীকালীন বাহক কোন্ পশু, তা খুঁজে বের করার জন্য। সম্প্রতি ঘোষণা দেয়া হয়েছে যে এ জন্য তদন্তকারী একটি দল চীনে পাঠানোর জন্য সংস্থাটিকে অনুমতি দেয়া হয়েছে। তবে বিজ্ঞানীরা বলছেন এই খুঁজে বের করার কাজটা খুব সহজ হবে না।

চীনা কর্তৃপক্ষ এ ব্যাপারে কোন কাজ ইতোমধ্যেই শুরু করেছে কি-না এবং করলে তার অগ্রগতি কতটুকু, এ সম্পর্কে বিবিসি জানতে চাইলে চীনা কর্তৃপক্ষ সে বিষয়ে কোন তথ্য দেয়নি।

ভাইরাসের গঠন ও প্রকৃতি

ওয়াং ফেই যখন হাসপাতালে মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ছেন, তখন হুয়ানান সিফুড মার্কেট থেকে মাত্র ৪০ মিনিট গাড়ির দূরত্বে অন্য আরেকটি তত্ত্ব নিয়ে চর্চ্চা শুরু হয়েছিল।

উহান ইনস্টিটিউট অব ভাইরোলজি এখন ষড়যন্ত্র তত্ত্বের একটা বড় কেন্দ্রবিন্দু। এই ল্যাবরেটরি থেকে ভাইরাসটি বেরিয়ে গিয়েছিল কিনা, তা নিয়ে সন্দেহ আর অভিযোগের ঝড় এখনও থামেনি।

সংস্থাটির কংক্রিট আর কাঁচে মোড়া আধুনিক ভবন, গাছপালা আর ছোট্ট এক হ্রদ দিয়ে সাজানো চত্বরটি পাশের রাস্তা থেকে বেশ স্পষ্ট দেখা যায়।

উহান ইনস্টিটিউট অব ভাইরোলজি
উহান ইনস্টিটিউট অব ভাইরোলজি

কঠোর নিরাপত্তার বেড়াজালে ঘেরা চত্বরে আমরা পৌঁছন মাত্র নিরাপত্তা কর্মীরা জানিয়ে দেন এটা খুবই স্পর্শকাতর এলাকা এবং দ্রুত সেখানে পুলিশ পৌঁছে যায়।

বাদুড়ের শরীর থেকে করোনাভাইরাস সংগ্রহ, মজুত রাখা এবং সেগুলো নিয়ে গবেষণার কাজে এই সংস্থা বিশ্বে শীর্ষ স্থানে।

এখানে গবেষকদের প্রধান হলেন তারকা বিজ্ঞানী অধ্যাপক শি ঝেংগলি। করোনাভাইরাস নিয়ে তার জ্ঞানের কারণে এই বিজ্ঞানী তার সহকর্মীদের কাছে পরিচিত “বাদুড় নারী” (ব্যাট ওম্যান) নামে।

এই গবেষকরা বহু বছর ধরে চীনের বিভিন্ন প্রত্যন্ত গুহা থেকে জ্যান্ত বাদুড়ের শরীর থেকে নমুনা সংগ্রহ করে গবেষণা চালাচ্ছেন।

তাদের গবেষণাপত্রে কয়েকশো’ করোনাভাইরাসের উল্লেখ আছে। এসব ভাইরাসের জেনেটিক গঠনের পরিবর্তন, কীভাবে তার থেকে মিশ্র ভাইরাসের জন্ম হয় এবং এসব ভাইরাসের মানুষকে সংক্রমিত করার ও মহামারি ঘটানোর ক্ষমতা – এইসব গবেষণার অংশ।

সার্স কোভ-১ ভাইরাসের জেনেটিক তথ্য উদঘাটন করেছিলেন এই অধ্যাপক শি। ওই ভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের পর থেকে উহানের বিজ্ঞানীরা তার থেকেও আরও মারাত্মক এবং আরও ছোঁয়াচে ভাইরাস ছড়ানোর আশংকা নিয়ে গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছিলেন।

উহানে এই নতুন ভাইরাস ছড়ানোর বিষয়টা জানার মাত্র তিনদিন পর দোসরা জানুয়ারি তিনিই প্রথম এই সার্স-কোভ-২ ভাইরাসের জিনের গঠন উদঘাটন করেন।

দুভার্গ্যজনকভাবে এই সার্স-কোভ-২-এর জেনেটিক গঠন প্রকাশ পাওয়ার পরই ল্যাব থেকে এই ভাইরাস বের হয়ে যাবার তত্ত্ব ছড়াতে শুরু করে।

অধ্যাপক শি-র গবেষণা এবং তারপর আরও কয়েকটি গবেষণা থেকে জানা যায় যে, নতুন ভাইরাসের জিনোমে এমন কিছু একটা আছে যা একই ধরনের জানা অন্যান্য করোনাভাইরাস থেকে আলাদা।

শি ঝেংগলি
শি ঝেংগলি

এই ভাইরাসের প্রোটিনে যে স্পাইক বা চূড়ার মত জিনিস আছে – যেগুলো দেখতে অনেকটা মুকুটের মত – সেগুলো সংক্রমিত বাহকের শরীরের কোষে গিয়ে আটকে যায়। শুধু তাই নয়, শুরু থেকেই এই সার্স-কোভ-২ ব্যাপকভাবে ছোঁয়াচে হয়ে উঠতে পারে।

এই ভাইরাসের যে স্পাইক প্রোটিন, বা চূড়ার মত দেখতে প্রোটিনগুলো, তাতে খুবই আলাদা আরেকটা জিনিস আছে যেটার নাম “ফুরিন ক্লিভেজ সাইট”। এর কারণে এই ভাইরাস মানুষের দেহকোষে খুবই ক্ষিপ্রতার সঙ্গে ঢুকতে পারে, তার নিয়ন্ত্রণ নিতে পারে এবং মানুষের কোষে দ্রুত বাড়তে পারে। অন্য কোন সার্স জাতীয় করোনাভাইরাসের এই ক্ষমতা নেই।

বিভিন্ন কারণে এই ভাইরাসের মারাত্মক ক্ষমতা, তার অস্বাভাবিক ধরন – আর উহানের গবেষণা কেন্দ্র, যার আসল কাজ ভাইরাস গবেষণা, তার কাছে এর প্রথম আত্মপ্রকাশ ঘটায় জন্ম নেয় একটা বিতর্কিত ষড়যন্ত্র তত্ত্ব।

ফেব্রুয়ারির গোড়ায় ল্যাব থেকে দুর্ঘটনাক্রমে ভাইরাস বেরিয়ে যাওয়ার দাবি প্রথম ছড়ায় চীনের ইন্টারনেট সাইটে।

ভিত্তিহীন গুজব ছড়াতে থাকে যে এই করোনাভাইরাস গবেষণাগারে সংক্রমিত প্রাণী থেকে স্থানীয় মানুষের মধ্যে হয়তো ছড়িয়েছে। এমন গুজবও ওঠে যে বন্যপ্রাণী থেকে সংগ্রহ করা কোন প্রাকৃতিক ভাইরাস বা ল্যাবে তৈরি ভাইরাস থেকে হয়তো দুর্ঘটনাবশত সংক্রমিত হয়েছেন উহান গবেষণা কেন্দ্রের কোন বিজ্ঞানী – এবং সেখান থেকেই এর শুরু।

ষড়যন্ত্র তত্ত্ব ছড়িয়ে পড়ে চীনের বাইরেও। বিদেশি সংবাদপত্র এবং ওয়েবসাইটে দাবি করা হয় “জীবাণুঅস্ত্র” হিসাবে ব্যবহারের জন্য তৈরি করা হয়েছে এই ভাইরাস।

কিন্তু ল্যাব থেকে ভাইরাস ছাড়ার তত্ত্ব – পশু দেহের ভাইরাস বা মানুষের তৈরি ভাইরাস, ইচ্ছাকৃতভাবে ছাড়া বা দুর্ঘটনাবশত বের হয়ে পড়া ভাইরাস – কোনটার স্বপক্ষেই নির্ভরযোগ্য কোন প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

ভারতীয় একদল গবেষক এই ভাইরাসের জিনগত গঠন ব্যবহার করে প্রথম একটা ইঙ্গিত দিয়ে বসেন যে ল্যাবে সম্ভবত এই ভাইরাসের জিনের কাঠামোতে বদল ঘটানো হয়েছে।

কিন্তু ভারতীয় ওই গবেষণাপত্র দ্রুত ভুয়া প্রমাণিত হয় এবং তা প্রত্যাহার করে নেয়া হয়।

ফেব্রুয়ারির গোড়ায় শি ঝিংগলি নিজে সামাজিক মাধ্যমে এর উত্তর দিতে বাধ্য হন।

“আমি, শি ঝিংগলি, আমার জীবনের নামে শপথ করে বলছি, আমাদের গবেষণাগারের সাথে এই ভাইরাসের কোন সম্পর্ক নেই,” তিনি লেখেন। তিনি আরও বলেন, যারা এই গুজব ছড়াচ্ছে, তাদের উচিত “তাদের দুর্গন্ধময় মুখ বন্ধ করা”।

সার্স-কোভ-২ ভাইরাসের বেশ কিছু প্রোটিন স্পাইক বা চূড়া আছে যা অনেকটা খোঁচার মত, যার কারণে এই ভাইরাস ‘করোনা’ বা মুকুটের মত দেখতে।

প্রতিটা প্রোটিন স্পাইকে থাকে বেশ কয়েকটি রিসেপটার বাইন্ডিং ডোমেইন (আরবিডি) অর্থাৎ এক সাথে সংযুক্ত গ্রাহকগুচ্ছ।
প্রতিটা প্রোটিন স্পাইকে থাকে বেশ কয়েকটি রিসেপটার বাইন্ডিং ডোমেইন (আরবিডি) অর্থাৎ এক সাথে সংযুক্ত গ্রাহকগুচ্ছ।
আরবিডি মানুষের দেহকোষের যে গ্রাহক এসিই-২, তার গায়ে সেঁটে বসে এবং সংক্রমণ ঘটায়।
আরবিডি মানুষের দেহকোষের যে গ্রাহক এসিই-২, তার গায়ে সেঁটে বসে এবং সংক্রমণ ঘটায়।
সার্স-কোভ-২ প্রোটিন স্পাইকে ফুরিন ক্লিভেজ সাইট নামে একটা অংশ থাকে, যা সংক্রমিত করার ক্ষমতা বাড়িয়ে দেয়।
সার্স-কোভ-২ প্রোটিন স্পাইকে ফুরিন ক্লিভেজ সাইট নামে একটা অংশ থাকে, যা সংক্রমিত করার ক্ষমতা বাড়িয়ে দেয়।
এই মারাত্মক ভাইরাসের শিকার হয়ে হাসপাতালে মি. ওয়াং-এর অবস্থার যখন ক্রমশ অবনতি হচ্ছে - যা এখন বিশ্বের সর্বত্র ডাক্তারদের অতি পরিচিত হয়ে উঠেছে - তখন বোনের কাছে কাতরভাবে টেক্সট করতেন ওয়াং ফেই।
এই মারাত্মক ভাইরাসের শিকার হয়ে হাসপাতালে মি. ওয়াং-এর অবস্থার যখন ক্রমশ অবনতি হচ্ছে – যা এখন বিশ্বের সর্বত্র ডাক্তারদের অতি পরিচিত হয়ে উঠেছে – তখন বোনের কাছে কাতরভাবে টেক্সট করতেন ওয়াং ফেই।
ওয়াং ফেই-এর ফুসফুস জীবাণুর আক্রমণ
ওয়াং ফেই-এর ফুসফুস জীবাণুর আক্রমণ

তখন ওয়াং ফেই-এর ফুসফুস জীবাণুর আক্রমণে ঝাঁঝরা – রক্ত কোষ ও জলীয় পদার্থে ভরে উঠেছে তার ফুসফুস। রক্তে অক্সিজেন ক্রমশ কমছে।

“আমার হৃদস্পন্দন এখন প্রতি মিনিটে ১৬০। আমার রক্তে অক্সিজেনের পরিমাণ মাত্র ৭০। আমি মারা যাচ্ছি।”

"আমার হৃদস্পন্দন এখন প্রতি মিনিটে ১৬০। আমার রক্তে অক্সিজেনের পরিমাণ মাত্র ৭০। আমি মারা যাচ্ছি।"
“আমার হৃদস্পন্দন এখন প্রতি মিনিটে ১৬০। আমার রক্তে অক্সিজেনের পরিমাণ মাত্র ৭০। আমি মারা যাচ্ছি।”
পরদিন তিনি শেষ মেসেজ পাঠান - "প্লিজ আমাকে বাঁচাও, আমি চোখে তারা দেখছি।" এর কয়েক ঘন্টা পর তিনি মারা যান।
পরদিন তিনি শেষ মেসেজ পাঠান – “প্লিজ আমাকে বাঁচাও, আমি চোখে তারা দেখছি।” এর কয়েক ঘন্টা পর তিনি মারা যান।

ভাইরাস নিয়ে বিতণ্ডা

এই ভাইরাস নিয়ে বিতর্কে জড়িয়ে পড়েন আমেরিকান প্রেসিডেন্ট।

একজন সাংবাদিক ৩০শে এপ্রিল তাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন: “আপনি কি এখনও পর্যন্ত কোন প্রমাণ দেখেছেন যাতে আপনি নিশ্চিত যে উহানের ইন্সটিটিউট অব ভাইরোলজিই এই ভাইরাসের উৎস?”

“হ্যাঁ আমি দেখেছি। হ্যাঁ, আমি দেখেছি,” উত্তর দেন ডোনাল্ড ট্রাম্প।

ট্রাম্প
ডোনাল্ড ট্রাম্প

ট্রাম্প প্রশাসনের অন্যরাও তার সাথে গলা মেলান। পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও চীনের বিরুদ্ধে দোষারোপ করে বলেন, “চীনে ল্যাবরেটরিগুলো ঐতিহাসিকভাবে নিচু মানের”।

তবে ল্যাব থেকে ভাইরাস বেরুনোর ব্যাপারে “ব্যাপক তথ্যপ্রমাণ ” হাতে পাবার কথা আমেরিকা বললেও কোন কিছুই তারা দেখাতে পারেনি।

এই ইস্যু নিয়ে আমেরিকা ও চীনের মধ্যে বিতণ্ডাকে প্রেসিডেন্টের আমেরিকান সমালোচকরা দেখেছেন দেশের অভ্যন্তরে তার ব্যর্থতাকে ঢাকার একটা চেষ্টা হিসাবে।

তবে অনেকে আবার এমন কথাও বলেছেন যে ল্যাব থেকে ভাইরাস বেরুনোর তত্ত্বটা একেবারে উড়িয়ে দেবার মত নয়। এই তত্ত্ব শুধু চীনের বেলাতেই নয়, এটা আমেরিকান সরকারের বেলাতেও প্রযোজ্য হতে পারে।

উহানের যে গবেষণাগারে বাদুড়ের করোনাভাইরাস নিয়ে পরীক্ষানিরীক্ষা হচ্ছিল, সেটা শুধু চীনা প্রকল্প ছিল না। এই গবেষণা হচ্ছিল আন্তর্জাতিক পরিসরে। এবং নতুন কোন ভাইরাস থেকে মহামারি ছড়ানোর ক্রমবর্ধমান ঝুঁকি খতিয়ে দেখার জন্য বিশ্বের বিজ্ঞানীরা একযোগে সেখানে কাজ করছিলেন।

কী ধরনের হুমকির মুখে মানুষ পড়তে পারে, তার প্রতিকার কী হতে পারে, কী ধরনের টিকা কার্যকর হতে পারে – এসব নিয়ে গবেষণার অনেক ঝুঁকির দিক থাকতে পারে।

ল্যাবে কাজ করতে গিয়ে গবেষকদের নিজেদের অজ্ঞাতে সংক্রমিত হওয়ার ঝুঁকিও থাকে।

সার্স-কোভ-১ জীবাণু নিয়ে কাজ করার সময় দু’টি এ রকম ঘটনার নজির আছে। ওই গবেষণাগারে ২০০৪ সালে একজন গবেষক কাজ করতে গিয়ে সংক্রমিত হন, তার থেকে সংক্রমিত হয়ে তার মা মারা যান। একজন নার্সও ওই সময় আক্রান্ত হয়েছিলেন এবং তার সংস্পর্শে আসা কয়েকজনকে তিনি সংক্রমিত করেছিলেন।

ডিসেম্বরের শেষে নতুন ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব ছড়ানোর পর অধ্যাপক শি মন্তব্য করেছিলেন, তার মনে প্রথমেই যেটা এসেছিল সেটা হল ‘এই ভাইরাস আমাদের গবেষণাগার থেকে ছড়ালো না তো?’

শি ঝেংগলি

বিতর্ক

তবে আমেরিকার রাজনৈতিক মহল এই ষড়যন্ত্র তত্ত্বকে যতই উস্কে দেওয়ার চেষ্টা করুক না কেন, এই তত্ত্ব খারিজ করে দিয়েছেন অধিকাংশ বিজ্ঞানী।

বৈজ্ঞানিক মহল একমত যে এই ভাইরাসের উৎস প্রাকৃতিক। সার্স-কোভ-২ ভাইরাস এসেছে প্রাণী থেকে এবং প্রাণী দেহ থেকে তা ঢুকেছে মানুষের দেহে ।

এমন ঘটনা আগেও ঘটেছে।

এছাড়াও অধ্যাপক শি ঝেংগলির নিজস্ব গবেষণায় এর পক্ষে একটা গুরুত্বপূর্ণ তথ্যপ্রমাণ রয়েছে।

সায়েন্টিফিক অ্যামেরিকান রিভিউ নামে এক জার্নালে দেয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন, এই মহামারির সাথে তার গবেষণাগারের কোন রকম সংশ্লিষ্টতা যে নেই, তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে তার ল্যাবে ইতোমধ্যেই সংরক্ষিত সব নমুনা এবং পরীক্ষার সব রেকর্ড তিনি “পাগলের মত” ঘাঁটতে শুরু করেন।

একটি মাত্র ভাইরাসের সাথে তিনি নতুন ভাইরাস সার্স-কোভ-২-এর ৯৬ শতাংশ মিল পান, যার নাম তিনি দিয়েছিলেন RaTG13 – যেটি তিনি একটি বাদুড়ের শরীর থেকে সংগ্রহ করেছিলেন ২০১৩ সালে।

তারপরেও দু’টি ভাইরাসের মধ্যে জিনগত অনেকগুলো তফাত ছিল – প্রাকৃতিক বিবর্তনের মাধ্যমে যে পার্থক্যগুলো কাটিয়ে দু’টোর ভাইরাসের একেবারে এক রকম হয়ে উঠতে অন্তত বিশ বছর সময় লাগার কথা।

তিনি বলেন, তার গবেষণাগার থেকে এই ভাইরাস বের হতে হলে, সেখানে হয় খোদ সার্স-কোভ-২ ভাইরাসটি, না হয় একেবারে কাছাকাছি জিনের গঠন আছে এমন ভাইরাস থাকতে হতো।

“সেটা আমার গবেষণাগারে ছিল না – এটা প্রমাণ হবার পর আমার মাথা থেকে বিরাট দুশ্চিন্তা নেমে যায়। আমি কয়েক রাত ঘুমাতে পারিনি, জেগে কাটিয়েছি,” সায়েন্টিফিক অ্যামেরিকানকে বলেন তিনি।

তবে এই ভাইরাস যে ল্যাব থেকে বেরোয়নি, তার পক্ষে সন্দেহাতীত প্রমাণ ছাপা হয় মার্চ মাসে নেচার মেডিসিন নামে চিকিৎসাবিজ্ঞান সাময়িকীতে।

সেখানে উন্নত ধরনের কম্পিউটার পরীক্ষার ফলাফল ও তথ্যপ্রমাণ দিয়ে দেখানো হয় যে এই ভাইরাসের গঠন ও আচরণ এমনই নজিরবিহীন এবং এর কার্যক্ষমতা এতটাই নিখুঁত ও অসাধারণ যে কোন বিজ্ঞানীর পক্ষে ল্যাবে এই ভাইরাস তৈরি করা অসম্ভব।

উহানের গবেষণাগারে এমন কোন ভাইরাস যদি সংরক্ষিত থাকত, যার জিনের গঠন সার্স-কোভ-২-এর খুবই কাছাকাছি, তাহলে হয়ত বা বিজ্ঞানীরা চেষ্টা করলে তার থেকে এই ভাইরাস ল্যাবে তৈরি করতে পারতেন। কিন্তু যে ভাইরাসের অস্তিত্বই নেই, তা তৈরি করা অবাস্তব ও অসম্ভব বলে নেচার মেডিসিনের বিজ্ঞানীরা বলেছেন।

তবে এখনও মুষ্টিমেয় কিছু বিজ্ঞানী মনে করেন এটা একেবারে অসম্ভব নয়। বিজ্ঞানে অনেক কিছুই হঠাৎ করে আবিষ্কার হবার নজিরও আছে বলে তারা মনে করেন।

অন্যদিকে, চীনের ভেতর অনেকে মনে করে এই ভাইরাসের পেছনে আমেরিকার হাত রয়েছে।

“আমার মনে হয় এই ভাইরাস আমেরিকা থেকে এসেছে,” উহানে এক নারী আমাকে বলছিলেন, “রোগের প্রাদুর্ভাব যখন শুরু হয়, তখন আমেরিকান সৈন্যরা উহানে ছিল। তারা চাটার্ড বিমানে প্রথমদিকেই ফিরে গেছে”।

এই ভাইরাস নিয়ে আমেরিকা আর চীনের মধ্যে প্রচারণা যুদ্ধ এবং ভিত্তিহীন অভিযোগ এখনও রমরমা।

আমেরিকার রাটগার্স ইউনিভার্সিটির মাইক্রোবায়োলজিস্ট এবং জীবাণু নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ রিচার্ড এবরাইট বলছেন, ল্যাব থেকে এই ভাইরাস কোনভাবে বেরিয়েছিল কি-না, তা নিশ্চিতভাবে বলার একটাই পথ আছে।

আর তা হলো “একটা গ্রহণযোগ্য তদন্তের জন্য চীনের গবেষণাগার, সেখানকার সংরক্ষিত সব নমুনা, পরীক্ষার সব নথিপত্র, ল্যাবের কর্মী এবং নমুনা সংগ্রহের পদ্ধতি সবকিছু অবাধে পরীক্ষার সুযোগ করে দেয়া।

চীনা কর্তৃপক্ষ কূটনৈতিক চাপের মুখে এই ভাইরাস নিয়ে নিরপেক্ষ তদন্তে রাজি হয়েছে। তবে এই তদন্তের পরিধি কতটা হবে, কারা এতে অংশ নেবে এবং কখন তা হবে, সেটা এখনও স্পষ্ট নয়।

প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং জোর দিয়ে বলেছেন মহামারির প্রকোপ শেষ না হওয়া পর্যন্ত এই তদন্ত চালানো যাবে না।

সম্পূর্ণ খবরটি পড়ুন

দৈনন্দিন

করোনা ভাইরাস: আইসোলেশনে থাকলে যে সাতটি কাজ করবেন

বাংলাদেশে গত ২৪ ঘণ্টাতেই আইসোলেশনে যুক্ত হয়েছেন ৭৯২জন।
বাংলাদেশে গত ২৪ ঘণ্টাতেই আইসোলেশনে যুক্ত হয়েছেন ৭৯২জন।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাব মতে, বাংলাদেশে বর্তমানে করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার উপসর্গ নিয়ে আইসোলেশনের রয়েছেন ১৬ হাজার ৮৫৬ জন।

এর মধ্যে গত ২৪ ঘণ্টাতেই আইসোলেশনে যুক্ত হয়েছেন ৭৯২জন। বাংলাদেশে করোনা ভাইরাস মহামারি শুরুর পর থেকে প্রতিদিনই এতে আক্রান্তের সংখ্যা যেমন বাড়ছে তেমনি আইসোলেশনে যাওয়ার সংখ্যাও বাড়ছে।

কারণ কোভিড-১৯ এর লক্ষণ দেখা দিলেও টেস্ট করার আগ পর্যন্ত নিশ্চিত হওয়া যায় না যে ওই ব্যক্তি আসলেই করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন কিনা। আবার যারা টেস্ট করার পর পজিটিভ বলে শনাক্ত হন তাদেরও আইসোলেশনে থাকতে হয়। যাতে করে তার কাছ থেকে পরিবারের অন্য কেউ বা অপরিচিত কারো মধ্যেও সংক্রমণ ছড়িয়ে না পড়ে।

কোভিড টেস্টে নেগেটিভ না পর্যন্ত আইসোলেশনেই থাকতে হয় লক্ষণ ও উপসর্গ থাকা রোগীদের।

গত ২৬শে জুন থেকে আইসোলেশনে রয়েছেন আতিয়া আনোয়ার। করোনা পজিটিভ রোগীর সংস্পর্শে আসার কারণে টেস্ট করিয়েছেন তিনি। ফলে তারও টেস্টের ফল পজিটিভ এসেছে। তবে হালকা কাশি ছাড়া তার মধ্যে আর কোন উপসর্গ নেই।

এদিকে জ্বর, কাশি, শরীর ব্যথা আর মাথা ব্যথা ভুগেছেন বিপ্লব সিদ্দিকী। তবে কোভিড টেস্ট করাননি তিনি।

আইসোলেশনে থাকার সময় এমন নানা ধরণের উপসর্গ নিয়ে বেশ দুশ্চিন্তায় ভোগেন অনেকে। জানতে চান যে, এসব উপসর্গ থাকলে কী করা উচিত? আইসোলেশনে কিভাবে থাকা উচিত?

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে কোভিড রোগীদের চিকিৎসা দিচ্ছেন ডা. লুবনা আফরোজ ইভা।

তিনি বলেন, নমুনা পরীক্ষায় পজিটিভ বা নেগেটিভ যাই আসুক না কেন করোনা সংক্রমণের এই সময়টাতে কারো মধ্যে কোভিডের মতো উপসর্গ থাকলে তার অবশ্যই আইসোলেশনে থাকা উচিত।

একই ধরণের তথ্য দিয়েছেন আইইডিসিআর এর একজন উপদেষ্টা ডা. মুশতাক হোসেনও। তিনি বলেন, সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়া ঠেকাতে আইসোলেশনে থাকার বিকল্প নেই।

ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, “কোভিডের উপসর্গ হিসেবে যদি কারো জ্বর থাকে তাহলে সেটি সেরে যাওয়ার পর, কোন ধরণের ওষুধ সেবন ছাড়া যদি তিনি পরপর তিন দিন সুস্থ বোধ করেন, স্বাভাবিক থাকেন তাহলে ধরে নিতে হবে যে তিনি করোনামুক্ত। তার যদি অন্য কোন শারীরিক সমস্যা না থাকে তাহলে তিনি নিশ্চিত হতে পারেন।”

তবে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং বাংলাদেশের স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের গাইডলাইন অনুযায়ী, যদি তার শারীরিক অন্য কোন সমস্যা না থাকে তাকে ১৪ দিন পর করোনামুক্ত হিসেবে গণ্য করা হবে বলেও জানান তিনি।

বাংলাদেশে একটি হাসপাতালের সামনে কোভিড-১৯ পরীক্ষার জন্য অপেক্ষারত লোকেরা
বাংলাদেশে একটি হাসপাতালের সামনে কোভিড-১৯ পরীক্ষার জন্য অপেক্ষারত লোকেরা

১. পুরো দিনের একটি রুটিন তৈরি করুন

আইসোলেশনে থাকার সময় সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর থেকে শুরু করে ঘুমাতে যাওয়ার আগ পর্যন্ত কী কী করবেন তার একটি রুটিন বা তালিকা তৈরি করুন এবং মেনে চলার চেষ্টা করুন।

খাওয়া, ঘুম, শরীর চর্চা, বিনোদন মূলক কাজ কখন কত সময় ধরে করবেন তার আলাদা আলাদা তালিকা তৈরি করা যেতে পারে।

চিকিৎসকরা বলছেন, কোন কাজ যেটি এর আগে সময়ের অভাবে করতে পারেননি সেই কাজ আইসোলেশনের সময়টাতে করতে পারেন। যারা ব্যবসা বা চাকরীর সাথে জড়িত তাদের এমনিতেও বেশ ব্যস্ত থাকতে হয়। তারা সেগুলো গুছিয়ে নিতে পারেন।

বিভিন্ন ধরণের বিনোদনমূলক কাজ যেমন সিনেমা দেখা, বই পড়ার মতো কাজ গুলো করতে পারেন।

ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, আইসোলেশনে থাকা ব্যক্তির যিনি দেখা-শুনা করেন সেই ব্যক্তির সাথে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে এবং মাস্ক ব্যবহার করে যোগাযোগ করা, কথা-বার্তা বলা যেতে পারে।

২. মনোবল শক্ত রাখুন

করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার লক্ষণ প্রকাশ পেলে অনেকেই ঘাবড়ে যান। মনোবল হারিয়ে ফেলেন। তবে চিকিৎসকরা বলছেন, মনোবল না হারালে এবং মানসিকভাবে শক্ত থাকাই এসব লক্ষণ থেকে সেরে ওঠার প্রাথমিক শর্ত।

ডা. লুবনা আফরোজ ইভা এবং ডা. মুশতাক হোসেন উভয়েই বলেন, যারা কোভিডের উপসর্গে ভুগছে এবং তার হাসপাতালে যেতে হয়নি বরং বাসায় থেকে চিকিৎসা নিচ্ছেন, তাহলে বুঝতে হবে যে তার সুস্থ হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। কারণ তার মধ্যে মৃদু সংক্রমণ হয়েছে। তার সংক্রমণ তীব্র নয়।

তিনি বলেন, বাসায় থাকলে যেসব উপসর্গ দেখা দেয় তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে জ্বর, সারা গায়ে ব্যথা, বমি, পাতলা পায়খানা, স্বাদ ও গন্ধ না পাওয়া ইত্যাদি।

“এসময় মানসিকভাবে শক্ত থাকা বা মন ভাল থাকা মানে হচ্ছে স্ট্রেস হচ্ছে না, স্ট্রেস মানে হচ্ছে এটি শরীরের উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। তাই স্ট্রেস থেকে মুক্ত থাকা মানে হচ্ছে সুস্থতার দিকে একটা পয়েন্ট এগিয়ে থাকা।”

চিকিৎসকরা বলছেন, বাংলাদেশে তরুণদের মধ্যে কোভিডে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুহার অনেক কম। একই তথ্য দিচ্ছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সংখ্যাও। সংস্থাটির হিসাবে, বাংলাদেশে কোভিডে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করাদের মধ্যে বেশিরভাগেরই বয়স ৫০ বছরের ঊর্ধ্বে।

অন্যান্যদের মধ্যে আগে থেকেই স্বাস্থ্য জটিলতা না থাকলে তাদেরও সুস্থ হওয়ার হার বেশি। তাই কোভিড হলেই যে কেউ মারা যাবে সেটি চিন্তা না করে মনোবল দৃঢ় রাখতে হবে।

এ বিষয়ে আইইডিসিআর এর উপদেষ্টা ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, আইসোলেশনে থাকার সময় কোভিড সংক্রান্ত খবর না দেখাই ভাল। বরং মন ভাল থাকে এমন সব ইতিবাচক ও বিনোদনধর্মী সংবাদ পড়া ও দেখা উচিত।

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আইসোলেশনে থাকার সময় কোভিড সংক্রান্ত খবর না দেখে বরং মন ভাল থাকে এমন সংবাদ পড়া উচিত।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আইসোলেশনে থাকার সময় কোভিড সংক্রান্ত খবর না দেখে বরং মন ভাল থাকে এমন সংবাদ পড়া উচিত।

৩. পর্যাপ্ত ঘুম ও বিশ্রাম নিতে হবে

চিকিৎসকরা বলছেন, করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ থেকে বাঁচতে এবং শরীরের রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করতে ঘুমের বিকল্প নেই। সেক্ষেত্রে আইসোলেশনের থাকার সময় একজন পূর্ণবয়স্ক মানুষকে ৮ ঘণ্টা ঘুমানো দরকার। সেই সাথে দুপুরে এক ঘণ্টা ঘুমিয়ে নেয়া যেতে পারে।

তবে কোভিডে আক্রান্ত হওয়ার কারণে অনেকেরই শরীর অনেক সময় বেশি দুর্বল হয়ে পড়ে। সেক্ষেত্রে তার বেশি ঘুমানোর দরকার হতে পারে।

“অনেকে অনেক বেশি দুর্বল হয়ে যাচ্ছে, অনেক বেশি কষ্ট পাচ্ছে, বিশেষ করে প্রথম ৬-৭ দিন। সেক্ষেত্রে সে বেশি ঘুমাতে পারে। কোন সমস্যা নেই,” বলেন ডা. লুবনা আফরোজা।

তবে আইসোলেশনে যেহেতু একটি ঘরের মধ্যেই বন্দী থাকতে হয় তাই বিশ্রাম নেয়ার জন্য সারাক্ষণ যাতে বিছানাতেই থাকা না হয় সেদিকেও খেয়াল রাখতে হবে।

রাত এগারোটা থেকে বারটার মধ্যে ঘুমিয়ে পড়ার পরামর্শ দেন চিকিৎসকেরা।

অনেকে সারা রাত জেগে মুভি দেখে সারা দিন ঘুমায়। এটা একেবারেই ঠিক না। বিশেষ করে এই করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার উপসর্গ থাকলে সেটি বেশি ক্ষতিকর।

তিনি বলেন, “আমাদের শরীরে হরমোনাল ব্যালেন্স রক্ষা করার জন্য রাতের ঘুমটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। এই সময়ে তো আরো বেশি।”

আইসোলেশনে থাকার সময় যাদের মনে হয় যে ঘুমের মধ্যে শ্বাস কষ্ট হচ্ছে যার কারণে ঘুম ভেঙ্গে যাচ্ছে তাদের ক্ষেত্রে চিকিৎসকরা বলছেন যে, করোনাভাইরাস নিয়ে আতঙ্কের কারণে অনেক সময় এমনটা মনে হতে পারে।

সেক্ষেত্রে পরামর্শ হিসেবে ডা. লুবনা আফরোজা বলেন, যেকোন এক দিকে বেশিক্ষণ শুয়ে থাকা যাবে না। বার বার ডানে-বামে কাত হয়ে শুতে হবে। মাঝে মাঝে উপুড় হয়েও শুয়ে থাকা ভাল।

তবে কোভিডের উপসর্গ থাকলে চিৎ হয়ে শুয়ে না থাকার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।

তিনি বলেন, “আমরা যখন চিৎ হয়ে ঘুমাই আমাদের শরীর রিল্যাক্স হয়ে যায়। ফলে আমাদের জিহ্বা এবং অন্যান্য মাংসপেশি কিছুটা পিছিয়ে যায়। যার কারণে শ্বাসনালী বন্ধ হয়ে যায় এবং শ্বাসকষ্টের মতো মনে হয় ও ঘুম ভেঙে যায়।”

যারা বয়স্ক এবং মেদবহুল দেহের অধিকারী তাদের ক্ষেত্রে এই জটিলতা দেখা দেয় এবং কোভিডের সময় সেটি আরো ভাল ভাবে বুঝতে পারে। এজন্য বার বার পাশ ফিরে ঘুমানোর পরামর্শ দেয়া হয়।

এ বিষয়ে ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, আইসোলেশন এমন ঘরে নেয়া উচিত যেখানে পর্যাপ্ত আলো-বাতাস আছে এবং বাতাস আসা যাওয়ার ব্যবস্থা আছে। বদ্ধ ঘরে আইসোলেশনে যাওয়া ঠিক নয় বলেও মনে করেন তিনি।

চিকিৎসকরা বলছেন, আমাদের শরীরে হরমোনাল ব্যালেন্স রক্ষা করার জন্য রাতের ঘুমটা খুব গুরুত্বপূর্ণ।
চিকিৎসকরা বলছেন, আমাদের শরীরে হরমোনাল ব্যালেন্স রক্ষা করার জন্য রাতের ঘুমটা খুব গুরুত্বপূর্ণ।

৪. পর্যাপ্ত পুষ্টিকর খাবার খাওয়া

কোভিডে আক্রান্ত হলে সব ধরণের স্বাভাবিক খাবার বেশি বেশি খাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

তারা বলছেন, এ সময় পুষ্টিকর খাবার খেতে হবে যাতে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা সবল হয়।

অনেকে কোভিডের উপসর্গ থাকলে বেশি বেশি গরম পানি, চা, সুপ এবং গরম পানি খাওয়ার পরামর্শ দিয়ে থাকেন।

এ বিষয়ে ডা. লুবনা আফরোজ বলেন, রোগী যে খাবার খেয়ে উপশম বোধ করে এমন সব খাবার তাকে খেতে দেয়া যেতে পারে।

“গলা ব্যথা বা গলায় খুসখুস করলে, ভারী হয়ে থাকলে বা গলায় কিছু জমে আছে এমন অনুভূতি থাকলে গরম পানি খেলে বা গরম পানি দিয়ে গড়গড়া করলে আরাম বোধ হয়। সেটি করা যেতে পারে।”

“তবে এটা মনে করার কোন কারণ নেই যে গরম পানি বা চা খেলেই কোভিড ভাল হয়ে যাবে। এ ধরণের কোন গবেষণা বা প্রমাণ নেই,” বলেন ডা. লুবনা আফরোজ।

করোনা ভাইরাসের উপসর্গ থাকলে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে শক্তিশালী করতে পুষ্টিকর খাবার খাওয়ার পরামর্শ বিশেষজ্ঞদের।
করোনা ভাইরাসের উপসর্গ থাকলে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে শক্তিশালী করতে পুষ্টিকর খাবার খাওয়ার পরামর্শ বিশেষজ্ঞদের।

৫. শারীরিক ব্যায়াম করুন

আইসোলেশনে থাকার সময় রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে শক্তিশালী করতে শরীর চর্চা করা যেতে পারে বলে জানান চিকিৎসকরা।

তবে এ সময় ভারী কোন ব্যায়াম না করার পরামর্শ দিয়েছেন আইইডিসিআর এর উপদেষ্টা ডা. মুশতাক হোসেন।

তিনি বলেন, “শারীরিক অবস্থার সাথে সঙ্গতি রেখে শরীরটাকে সচল রাখার জন্য তাকে হালকা ব্যায়াম করতে হবে। তবে যেহেতু এ সময় জ্বর থাকে তাই ভারী ব্যায়াম এড়িয়ে চলতে হবে।”

এছাড়া ফুসফুসকে সুস্থ ও সবল রাখতে শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যায়াম করারও পরামর্শ দেন বিশেষজ্ঞরা।

৬. রক্তে অক্সিজেনের পরিমাণ পর্যবেক্ষণ

রক্তে অক্সিজেনের পরিমাণ কমে গেলে শ্বাসকষ্ট দেখা দেয়। আর সেটি মারাত্মক পর্যায়ে পৌঁছালে হাসপাতালে ভর্তি করানোর প্রয়োজন হতে পারে। সেকারণে রক্তে অক্সিজেনের পরিমাণ ঠিক আছে কিনা তা পর্যবেক্ষণের পরামর্শ দেন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।

এ বিষয়ে ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, রক্তে অক্সিজেনের পরিমাণ বোঝা যায় পালস অক্সিমিটার নামে যন্ত্রের সাহায্যে।

সম্ভব হলে এই যন্ত্র সংগ্রহ করে অক্সিজেনের পরিমাণ নিয়মিত পর্যবেক্ষণে রাখা যেতে পারে।

মি. হোসেন জানান, “৯০ এর উপরে হলে তা খুবই স্বাভাবিক। এর নিচে একবার বা দুই বার নামতে পারে। কিন্তু এটা অব্যাহতভাবে ৯০ এর নিচে থাকলে বুঝতে হবে যে তার রক্তে অক্সিজেনের মাত্রা কমে গেছে এবং তাকে তখন চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।”

তবে পালস অক্সিমিটার যন্ত্র ছাড়া বোঝাটা বেশ কঠিন। তবে কিছু উপসর্গ খেয়াল করা যেতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে, শ্বাসকষ্ট বেড়ে যাওয়া, অনেক বেশি দুর্বল অনুভব করা। তবে জ্বরের কারণেও অনেক সময় দুর্বলতা বাড়ে। তবে অক্সিজেনের পরিমাণ কমে গেলে দুর্বলতা স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক বেশি হবে।

“স্বাভাবিক অবস্থায় শ্বাসপ্রশ্বাসের গতি থাকে মিনিটে ১২-১৮ টা। কিন্তু ওই সময়ে হয়ে যায় ২৮-৩০,” বলেন ডা. লুবনা আফরোজ।

৭. চিকিৎসকের পরামর্শ নিন

যেহেতু করোনাভাইরাসের এখনো কোন ধরণের প্রতিষেধক বা ওষুধ নেই তাই এর চিকিৎসায় মূলত হয় উপসর্গ ভিত্তিক।

“যাদের জ্বর রয়েছে তাদেরকে জ্বরের ওষুধ দেয়া যেতে পারে, কাশি থাকলে কাশির ওষুধ। জ্বর বেশি হলে এক সাথে দুটো ওষুধ খাওয়া যেতে পারে,” বলেন ডা. লুবনা আফরোজ।

যাদের অন্যান্য স্বাস্থ্য সমস্যা যেমন ডায়াবেটিক বা উচ্চ রক্তচাপ রয়েছে, বয়স বেশি তাদের ক্ষেত্রে এ ধরণের উপসর্গ দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী সতর্কতা নিতে হবে।

ডা. লুবনা আফরোজ বলেন, করোনাভাইরাসে জটিলতাগুলোর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে রক্তে জমাট বেধে যাওয়া। সেক্ষেত্রে সেটি যাতে না হয় তার জন্য চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী প্রয়োজনে ওষুধ খেতে হবে।

সম্পূর্ণ খবরটি পড়ুন

দৈনন্দিন

‘কাজাখস্তানের “অজানা নিউমোনিয়া” করোনাভাইরাসের চেয়েও প্রাণঘাতী’

কাজাখস্তানের সাবেক প্রেসিডেন্ট নুরসুলতান নাজারবায়েভের জন্মদিন পালন করা হয় ধুমধাম করে।
কাজাখস্তানের সাবেক প্রেসিডেন্ট নুরসুলতান নাজারবায়েভের জন্মদিন পালন করা হয় ধুমধাম করে।

কাজাখস্তানে ছড়িয়ে পড়া এক ‘অজানা নিউমোনিয়া’ রোগের ব্যাপারে সেখানকার চীনা দূতাবাস হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছে, এটি কোভিড-১৯ এর চেয়েও বেশি ভয়ংকর।

বার্তা সংস্থা রয়টার্স চীনা দূতাবাসের একটি বিবৃতি উদ্ধৃত করে বলছে, কাজাখস্তানের আটিরাউ, আকটোবে এবং শাইমকেন্ট শহরে জুন মাসের মাঝামাঝি থেকে এই ‘অজানা নিউমোনিয়া’ ছড়াতে শুরু করে।

চীনা দূতাবাসের বিবৃতিতে বলা হয়, এ বছরের প্রথম ছয় মাসে কাজাখস্তানে নিউমোনিয়ায় মারা গেছে ১,৭৭২ জন। এর মধ্যে কেবল জুন মাসেই মারা গেছে ৬২৮ জন।

এতে বলা হয়, “এই নিউমোনিয়ায় মৃত্যুর হার করোনাভাইরাসের কারণে হওয়া নিউমোনিয়ার চেয়ে অনেক বেশি।”

রয়টার্স জানাচ্ছে, এই নিউমোনিয়া কি করোনাভাইরাসেরই কারণেই হচ্ছে নাকি এটি একেবারে ভিন্ন ধরণের কোন করোনাভাইরাস, সেটা ঠিক পরিস্কার নয়।

কাজাখস্তানের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এখন একটি তুলনামূলক সমীক্ষা চালাচ্ছে, কিন্তু কোন উপসংহারে তারা এখনো পৌঁছায়নি।

সাবেক প্রেসিডেন্টের নামে রাজধানীর নতুন নাম রাখা হয়েছে নুর-সুলতান
সাবেক প্রেসিডেন্টের নামে রাজধানীর নতুন নাম রাখা হয়েছে নুর-সুলতান

কাজাখস্তানের একটি সরকারি বার্তা সংস্থা কাজ-ইনফর্মে প্রকাশিত রিপোর্ট অনুযায়ী, জুন মাসে সেখানে নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা গত বছরের তুলনায় প্রায় ২.২ শতাংশ বেশি।

কাজাখস্তানে এ পর্যন্ত ৫০ হাজারের বেশি কোভিড-১৯ সংক্রমণ ধরা পড়েছে। সরকারি হিসেবে মারা গেছে ২৬৪ জন।

বৃহস্পতিবার সেখানে এক দিনে সর্বোচ্চ ১,৯৬২ জনের সংক্রমণ ধরা পড়ে।

এই রহস্যজনক প্রাণঘাতী নিউমোনিয়া নিয়ে চীনের সরকারি গ্লোবাল টাইমস পত্রিকাতেও খবর বেরিয়েছে।

এতে বলা হয়, কাজাখস্তানের চীনা দূতাবাস সেখানে অবস্থানরত চীনা নাগরিকদের এই নিউমোনিয়ার ব্যাপারে সতর্ক করে দিয়েছে।

স্থানীয় গণমাধ্যমের খবর উল্লেখ করে চীনা দূতাবাস বলেছে, এই নিউমোনিয়ায় মৃত্যুর হার কোভিড-১৯ এর তুলনায় অনেক বেশি। গ্লোবাল টাইমস লিখেছে, চীনা দূতাবাসের এই হুঁশিয়ারির ব্যাপারে কাজাখাস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এখনো কোন জবাব দেয়নি।

কিছু চীনা বিশেষজ্ঞ এই নিউমোনিয়া যাতে চীনে ছড়াতে না পারে সেজন্যে এখনই ব্যবস্থা নিতে বলছেন। চীনের উত্তর-পশ্চিমের শিনজিয়াং প্রদেশের সঙ্গে কাজাখাস্তানের সীমান্ত রয়েছে।

প্রেসিডেন্ট কাসিম জমার্ট টোকায়েভ ১৩ জুলাই জাতীয় শোক পালনের ঘোষণা দিয়েছেন।
প্রেসিডেন্ট কাসিম জমার্ট টোকায়েভ ১৩ জুলাই জাতীয় শোক পালনের ঘোষণা দিয়েছেন।

কাজাখস্তানের সরকারি বার্তা সংস্থা কাজ-ইনফর্মে সরকারের স্বাস্থ্যমন্ত্রীকে উদ্ধৃত করে বলা হয়, এই নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা কোভিড-১৯ এ আক্রান্তদের চেয়ে দুই হতে তিনগুন বেশি।

কাজাখাস্তানের এই ‘রহস্যজনক নিউমোনিয়া’ নিয়ে চীনের সোশ্যাল মিডিয়ায় ব্যাপক আলোচনা চলছে।

‘কাজাখাস্তানে অজানা নিউমোনিয়া’ হ্যাশট্যাগের পোস্টগুলো চীনর সাইনা-ওয়েইবু সাইটে ৩৭ কোটি বারের বেশি পড়া হয়েছে।

সরকারের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন

কাজাখস্তানের সরকার যেভাবে করোনাভাইরাস মোকাবেলার চেষ্টা করছে, তা নিয়ে সমালোচনা বাড়ছে।

ক্রমবর্ধমান জন অসন্তোষের মুখে সরকার গতকাল ঘোষণা করেছে যে, আগামী ১৩ই জুলাই কাজাখস্তানে সরকারিভাবে ‍‘শোক দিবস’ পালন করা হবে কোভিড-১৯ রোগে মারা যাওয়া মানুষদের স্মরণে।

প্রেসিডেন্ট কাসিম জমার্ট টোকায়েভ গতকাল টেলিভিশনে জাতির সামনে দেয়া ভাষণে একথা ঘোষণা করেন।

সরকারি পত্রিকা আস্টানা টাইমস জানাচ্ছে, প্রেসিডেন্ট তার ভাষণে স্বীকার করেছেন যে, কাজাখস্তানে শুরুতে লকডাউনের কারণে করোনাভাইরাস সংক্রমণের হার কমে আসলেও দ্বিতীয় দফায় আবার সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ে। এজন্যে তিনি দোষারোপ করেন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সাবেক কর্মকর্তাদের এবং বিভিন্ন শহরের মেয়রদের।

এই করোনাভাইরাস মহামারির মধ্যেই গত ৬ই জুলাই রাজধানী নুর-সুলতানে যেভাবে আতশবাজি পুড়িয়ে উ‌ৎসব করা হয়, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন অনেকে।

কাজাখস্তানের রাজধানীর নতুন নামকরণ করা হয় সাবেক প্রেসিডেন্ট নুরসুলতান নাজারবায়েভের নামে। ৬ই জুলাই তার জন্মবার্ষিকী প্রতিবছর ধুমধাম করে পালন করা হয়। এ বছর ছিল তার ৮০ তম জন্মদিন।

বিভিন্ন গণমাধ্যমে এর আগে খবর বেরিয়েছিল যে নুরসুলতান নাজারবায়েভ নিজেও করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছিলেন।

এরকম ধুমধামের সঙ্গে তার জন্মদিন পালন সম্পর্কে প্রশ্ন তুলে কায়রাত জোলডিবায়ুলাই নামে একজন ফেসবুকে লিখেছেন, “মানুষ যখন মৃত্যুশোক করছে, তখন এরকম আতশবাজি পোড়ানো জনগণের সঙ্গে নির্মম পরিহাস ছাড়া আর কিছু নয়। একটা পুরো জাতির দুঃখের চেয়ে যেন একজন ব্যক্তির মনভালো রাখা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।”

সম্পূর্ণ খবরটি পড়ুন

দৈনন্দিন

করোনা ভাইরাস: ভারত কি বিশ্ব মানচিত্রে পরবর্তী হটস্পট?

ভারতে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ হয়েছে ধীর গতিতে। কিন্তু প্রথম সংক্রমণ শনাক্ত হবার ছয় মাস পর, ভারত এখন রাশিয়াকে টপকে বিশ্বে সবচেয়ে সংক্রমিত দেশগুলোর তালিকায় তৃতীয় স্থানে উঠে এসেছে।

বিশ্বের দ্বিতীয় সবচেয়ে জনবহুল দেশ ভারত। দেশটির জনসংখ্যার বিশাল অংশ বাস করে জনাকীর্ণ শহরগুলোতে।

ভারত করোনাভাইরাসের বিশ্বের একটা হটস্পট হয়ে উঠবে এটা প্রথম থেকেই আশংকা করা হচ্ছিল।

কিন্তু দেশটিতে করোনাভাইরাসের পরিসংখ্যান নিয়ে নানা প্রশ্ন রয়েছে, কারণ ভারতে যথেষ্ট পরীক্ষা হচ্ছে না, এবং দেশটিতে অস্বাভাবিক কম মৃত্যু হারে বিজ্ঞানীরা বিভ্রান্ত।

ভারতে করোনাভাইরাসের বিস্তার নিয়ে যে পাঁচটি বিষয় জানা যাচ্ছে।

১. ভারতে আক্রান্তের সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে

ভারতে সম্প্রতি পরপর বেশ কয়েকদিন আক্রান্তের সংখ্যা চূড়ায় পৌঁছনর রেকর্ড হয়েছে। ভারতে শনাক্ত রোগীর সবোর্চ্চ সংখ্যা ছিল জুন মাসে। কঠোর লকডাউনের পর সবকিছু খুলে দেবার কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই এই উচ্চ হার দেখা যায়।

৮ই জুলাই পর্যন্ত ভারতে নিশ্চিত কোভিড শনাক্তের সংখ্যা ছিল ৭ লাখ ৪২ হাজার ৪১৭।

কিন্তু দেশের জনগোষ্ঠীর মধ্যে সংক্রমণের হারের প্রকৃত চিত্র স্পষ্ট নয়, বলছেন ভাইরোলজিস্ট শাহীদ জামিল।

মে মাসে ভারত সরকার সাধারণ মানুষের কাছ থেকে ২৬ হাজার নমুনা নেয়, যার মধ্যে ০.৭৩ শতাংশ নমুনায় ভাইরাস পাওয়া যায়। কিছু বিশেষজ্ঞ নমুনার সংখ্যা নিয়ে সন্তুষ্ট নন। কিন্তু ড. জামিলের মত অন্য কিছু বিশেষজ্ঞ বলছেন, সারা দেশ থেকে সংগ্রহ করা এই নমুনাগুলোই দেশব্যাপী একটা সার্বিক চিত্র তৈরি করার একমাত্র ভিত্তি।

“এই নমুনার ফলাফল যদি সারা দেশের জনগোষ্ঠীর ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা হয়, তাহলে বলতে হবে মে মাসের মাঝামাঝি ভারতে মোট সংক্রমিতের সংখ্যা ছিল এক কোটি,” ড. জামিল বলেন।

ভারতে শনাক্ত রোগীর সংখ্যা যেহেতু প্রতি বিশ দিনে বেড়ে দ্বিগুণ হচ্ছে, সেই হিসাব ধরলে এই মুহূর্তে আক্রান্তের সংখ্যা দেশটিতে দাঁড়ায় তিন থেকে চার কোটির মধ্যে।

নিশ্চিত বলে শনাক্ত এবং সত্যিকার সংক্রমিতের মধ্যে হিসাবের যে ফারাক তা প্রত্যেক দেশেই আছে- তবে তা বেশি-কম। এর ফারাক কমানোর একমাত্র পথ হল টেস্টিং। “আপনি যত বেশি টেস্ট করবেন, তত বেশি লোক শনাক্ত হবে।”

ভারতে সাম্প্রতিক কয়েক সপ্তাহে সেটাই হয়েছে- সরকার টেস্ট বাড়িয়ে দিয়েছে এবং আক্রান্তের সংখ্যাও হঠাৎ লাফিয়ে বেড়েছে।

ভারতে ১৩ই মার্চ থেকে মোট টেস্ট হয়েছে এক কোটির বেশি। কিন্তু এর অর্ধেকের বেশি হয়েছে পয়লা জুনের পর।

২.ভারত যথেষ্ট টেস্ট করছে না

ভারতে আক্রান্ত রোগী সংখ্যার হিসাবে খুবই বেশি, কিন্তু মাথা পিছু হিসাবে দেখলে তা অপেক্ষাকৃত কমই। বিশ্বে আক্রান্তের যে সংখ্যা তা মাথা পিছু হিসাবে ভারতের চেয়ে গড়ে তিন গুণ বেশি।

তবে ড. জামিল বলছেন ভারতে আক্রান্তের মাথা পিছু হিসাব কম তার কারণ ভারতে টেস্টের সংখ্যা খুবই কম। অন্য যেসব দেশে মাথা পিছু শনাক্তের হার বেশি, ভারতের সাথে তুলনা করলে দেখা যাবে তারা পরীক্ষা করছে অনেক বেশি।

উপরের চার্টে তুলনামূলক হিসাবে দেখানো হয়েছে যেসব দেশে মাথা পিছু হিসাবে আক্রান্তের সংখ্যা বেশি সেখানে টেস্টিংএর হারও মাথা পিছু হিসাবে বেশি।

ভারতের ক্ষেত্রে মাপের হিসাবে এই আক্রান্তের সংখ্যা প্রায় চোখেই পড়ে না কারণ টেস্টিংয়ের হার সেখানে এতই কম।

এখানে আরেকটা জিনিস গুরুত্বপূর্ণ, সেটা হল কত টেস্ট হচ্ছে শুধু সেটা নয়, কাদের টেস্ট করা হচ্ছে।

প্রথম দিকে ভারত জোর দিয়েছিল শুধু তাদেরই মধ্যে টেস্ট সীমিত রাখতে, যাদের আক্রান্ত হবার ঝুঁকি বেশি এবং তাদের সংস্পর্শে যারা এসেছে। এর বাইরের জনগোষ্ঠীকে তারা টেস্টের আওতায় আনেনি।

সংক্রমণ যখন দ্রুত ছড়াতে শুরু করে তখন টেস্ট এবং ট্রেস আর কাজ করে না, বলছেন হিমাংশু তেয়াগি এবং আদিত্য গোপালন, যারা কোভিড-১৯ এর পরীক্ষা কৌশল নিয়ে কাজ করেছেন। তারা বলছেন এই পর্যায়ে টেস্টিং, ভাইরাসের বিস্তার ঠেকাতে সাহায্য করে, কিন্তু যাদের মধ্যে ভাইরাস থাকলেও শনাক্ত হয়নি, তাদের আর খুঁজে বের করা যায় না।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে ভারতে কাদের পরীক্ষা করা হচ্ছে? বিভিন্ন দেশের মধ্যে তুলনা করার ক্ষেত্রে একটা বড় সমস্যা আছে। কোন কোন দেশ কত লোককে পরীক্ষা করা হচ্ছে সেটার হিসাব দেয়। আবার কোন দেশ হিসাব দেয় তাদের মোট পরীক্ষার সংখ্যা কত। ভারতের হিসাবে থাকে মোট পরীক্ষার সংখ্যা। সেখানে ভারতের ক্ষেত্রে সংখ্যাটা বেশি আসে। কারণ বেশিরভাগ লোককে ভারতে পরীক্ষা করা হয় একাধিকবার।

বিজ্ঞানীরা একজন শনাক্ত ব্যক্তিকে খুঁজে বের করতে কত টেস্ট করা হয়েছে সেটার হিসাবের ওপর জোর দিতে চান।

টেস্টের পরিসর যত ব্যাপক করা যাবে, তত পজিটিভ শনাক্তের হার কমবে। সে কারণে নিউজিল্যান্ড এবং তাইওয়ানে এই হার ১%এর অনেক কম।

ভারতের পজিটিভ রোগীর হার এপ্রিলে ছিল ৩.৮% এখন জুলাইয়ে সেই হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬.৪%। এটা ক্রমশ বাড়ছে। এর কারণ টেস্ট এখন ব্যাপক পরিসরে হচ্ছে না। টেস্ট হচ্ছে শুধু সীমিত পরিসরে উচ্চ ঝুঁকিরএকটা জনগোষ্ঠীর এবং তাদের কন্ট্যাক্টে আসা কিছু লোকের।

৩. ভারতে সুস্থ হয়ে ওঠার হার সন্তোষজনক

তথ্য উপাত্তে দেখা যাচ্ছে যে ভারতে যাদের ভাইরাসের শনাক্ত হচ্ছে তারা সেরে উঠছে দ্রুত। সুস্থ হবার হার মৃত্যু হারের থেকে বেশি।

এটা গুরুত্বপূর্ণ বলছেন ড. জামিল, কারণ এতে বোঝা যায় স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ওপর কতটা চাপ পড়ছে।

বর্তমানে সেরে ওঠার হার শনাক্ত ও মৃত্যু হারের থেকে অনেক উপরে। আর বেশি মানুষের সেরে ওঠার অর্থ স্বাস্থ্য পরিষেবার ওপর বেশি চাপ।

টেস্টিং কম হওয়ার একটা অর্থ হল নতুন সংক্রমণ নথিভুক্ত হচ্ছে কম এবং ধীরে। আর নতুন সংক্রমণ নথিভুক্ত কম হলে স্বভাবতই সুস্থ হওয়ার হার বেড়ে যাবে।

বিশ্বের যেসব দেশে করোনাভাইরাসে আক্রান্তের সংখ্যা বেশি সেসব দেশের তুলনায় ভারতে সুস্থ হয়ে ওঠার গ্রাফের ঊর্ধ্বমুখী চিত্র অনেক ইতিবাচক। এটা ধারণা দেয় যে আমেরিকা ও ব্রাজিলের তুলনায় ভারতে কোভিড রোগীরা সুস্থ হচ্ছে সংখ্যায় বেশি এবং দ্রুত। আমেরিকায় যেখানে এই হার ২৭%, ভারতের ক্ষেত্রে সেই হার ৬০%।

তবে এখানেও তুলনা করার ক্ষেত্রে একটা সমস্যা হল তথ্য সংকলন পদ্ধতি এবং সেরে ওঠার সংজ্ঞা নিয়ে।

ভারতে সুস্থ হয়ে ওঠার তথ্য দেখা হয় যখন কেউ পরীক্ষায় কোভিড শনাক্ত হচ্ছে এবং তার কয়েক সপ্তাহ পর আবার পরীক্ষা করে সে নেগেটিভ হচ্ছে। কিন্তু কোন কোন দেশে যেসব শনাক্ত রোগী হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছে এবং পুরো সুস্থ হচ্ছে শুধু তাদেরই এই পরিসংখ্যানে ধরা হয়।

আরও বলা হচ্ছে ভারতে সুস্থ হয়ে ওঠার পরিসংখ্যান ভাল তার একটা কারণ ভারত মৃত্যুর যে সংখ্যা দিচ্ছে তা অনেক কম।

৪. ভারতে মৃত্যু হার খুবই নিচু

ভারতে কোভিড-১৯এ এ পর্যন্ত মারা গেছে প্রায় ২০,১৬০। সংখ্যা দিয়ে হিসেব করলে ভারতের স্থান আসবে বিশ্ব মানচিত্রে আট নম্বরে। কিন্তু জনসংখ্যার প্রতি দশলাখের হিসাবে এই হার আসলে কম।

“এটা পশ্চিম ইউরোপে মৃত্যুর হারের তুলনায় খুবই নগণ্য,” বলছেন ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের অর্থনীতিবিদ শামিকা রাভি।

তবে ভারতে মৃত্যুর হার নিয়ে অনেক প্রশ্ন রয়েছে। বেশিরভাগ বিশেষজ্ঞ মনে করেন ভারত এই সংখ্যা সম্ভবত কমিয়ে বলছে ।

তবে ড. রাভি মনে করেন সেটা সম্ভব নয়।

“ভারতে মৃত্যুর হার যদি বেশি হতো, কোন তথ্য দিয়ে তা গোপন রাখা সম্ভব হতো না। কারণ ইউরোপ আর ভারতের মধ্যে মৃত্যুর হারের তফাৎটা ব্যাপক।”

ভারতে মৃত্যুর হার ওই এলাকার অন্যান্য দেশের সাথেও সামঞ্জস্যপূর্ণ, যেমন পাকিস্তান বা ইন্দোনেশিয়া।

এর পেছনে নানা তত্ত্ব আছে। যার মধ্যে একটা হল পশ্চিমে যেসব দেশ বেশিরকম আক্রান্ত, সেসব দেশের সাথে তুলনা করলে দেখা যাবে, ওই এলাকার দেশগুলোতে এর থেকে কম শক্তির ভাইরাসে মানুষ আগে আক্রান্ত হয়েছে- ফলে তাদের হয়ত কিছুটা ইমিউনিটি থাকতেও পারে, এবং এসব দেশে জনসংখ্যার একটা বড় অংশ অপেক্ষাকৃত তরুণ।

ড. জামিল বলছেন, “এসব দেশে নানাধরনের জীবাণু এত বেশি যে মানুষের শরীরে যে কোন ভাইরাস প্রতিরোধের শক্তি হয়ত পশ্চিমের মানুষের চেয়ে স্বাভাবিকভাবে বেশি। তবে ভারতে মৃত্যু হার কেন কম তার আসল কারণ আমাদের জানা নেই।”

৫. ভারতের প্রত্যেক রাজ্য আলাদা

যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের মতই করোনাভাইরাসের পরিসংখ্যান ভারতের একেক রাজ্যে একেক রকম।

ভারতের শনাক্ত রোগীর ৬০ শতাংশই দিল্লি, মহারাষ্ট্র এবং তামিল নাডুতে।

ভারতের এক রাজ্যে আক্রান্তের হার যখন কমে, তখন আবার দেখা যায় অন্য রাজ্যে তা ঊর্ধ্বমুখী। দক্ষিণে কর্নাটক এবং তেলেঙ্গানায় আক্রান্ত সম্প্রতি বেড়েছে। দক্ষিণেরই অন্ধ্র প্রদেশে আক্রান্তের সংখ্যা বরাবরই উপরের দিকে

ভারত সরকার এ পর্যন্ত কেন্দ্রীয় পর্যায়ে ভাইরাস মোকাবেলা করেছে এবং বিশেষজ্ঞরা বলছেন সেই কৌশল এখন বদলানো দরকার।

ড. জামিল বলছেন ভারতের উচিত হবে “রাজ্য ভিত্তিক মোকাবেলা কৌশল” নির্ধারণ করা। তিনি মনে করেন প্রতিটা রাজ্যে স্থানীয় ভিত্তিতে তথ্য সংগ্রহ করতে হবে, এবং স্থানীয় বাস্তবতার নিরীখে ভাইরাস মোকাবেলায় পদক্ষেপ নিতে হবে।

তার মতে, আবার দেশ জুড়ে আরেকটা লকডাউন দিলে তা আরও কম ফল দেবে। ।

সম্পূর্ণ খবরটি পড়ুন

দৈনন্দিন

করোনা ভাইরাস পরীক্ষায় অনিয়ম: বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্নতার আশংকা বাংলাদেশের সামনে?

বাংলাদেশে করোনা ভাইরাসের নমুনা পরীক্ষা নিয়ে বড় দুর্নীতির প্রমাণ পেয়েছে র‍্যাব।
বাংলাদেশে করোনা ভাইরাসের নমুনা পরীক্ষা নিয়ে বড় দুর্নীতির প্রমাণ পেয়েছে র‍্যাব।

ঢাকা থেকে নেগেটিভ সনদ নিয়ে যাওয়া যাত্রীদের মধ্যে গন্তব্যে পৌঁছানোর পর পরীক্ষার পর করোনাভাইরাস পজিটিভ যাত্রী পাওয়ায় ঢাকার সাথে ফ্লাইট চলাচল বন্ধের তালিকায় যোগ হয়েছে ইতালি।

এর আগে জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া এবং চীনও ঢাকার সাথে বিমান যোগাযোগ বন্ধ করে দিয়েছিলো একই কারণে।

এর মধ্যে বাংলাদেশের আইন প্রয়োগকারী সংস্থা র‍্যাব তদন্ত করে ঢাকার রিজেন্ট হাসপাতাল থেকে করোনাভাইরাস পরীক্ষার হাজার হাজার ভুয়া রিপোর্ট দেয়ার প্রমাণ পেয়েছে।

এমনকি নমুনা না নিয়ে কিংবা নমুনা নিয়ে ফেলে রেখে টাকার বিনিময়ে মনগড়া রিপোর্ট দেয়ার প্রমাণ পেয়েছে র‍্যাব, যে খবর মূহুর্তেই ছড়িয়েছে সারাবিশ্বে।

বিমান ও পর্যটন সংক্রান্ত ম্যাগাজিন দ্য বাংলাদেশ মনিটরের সম্পাদক কাজী ওয়াহিদুল আলম বলছেন, বাংলাদেশের সাথে যোগাযোগ আছে এমন প্রতিটি দেশ ও এয়ারলাইন্স তীক্ষ্ণ নজর রাখছে করোনা টেস্ট নিয়ে ঢাকায় কি হচ্ছে তার দিকে।

মি. আলম বলছেন, দ্রুত এমন কোনো ব্যবস্থা চালু করতে হবে যাতে বিদেশগামীরা করোনা পরীক্ষা করে সঠিক রিপোর্ট নিয়ে বিমানবন্দরে যেতে পারেন।

“না হলে বড় চাপে পড়তে পারে বাংলাদেশ, কারণ বিমানবন্দরে চার মাসেও কার্যকর স্ক্রীনিং ব্যবস্থা তৈরি হয়নি। আবার টেস্ট নিয়েও দুর্নীতি বা অনিয়ম চলতে থাকলে এভিয়েশনের ক্ষেত্রে বড় ধরণের নিষেধাজ্ঞায় পড়ে যাওয়ার আশংকাও তৈরি হতে পারে,” বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন তিনি।

গত ৭ই জুলাই বাংলাদেশ থেকে যাওয়া সব ফ্লাইট এক সপ্তাহের জন্য নিষিদ্ধ করে ইতালি
গত ৭ই জুলাই বাংলাদেশ থেকে যাওয়া সব ফ্লাইট এক সপ্তাহের জন্য নিষিদ্ধ করে ইতালি

বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার ঝুঁকি?

আটই মার্চ বাংলাদেশে করোনাভাইরাস সংক্রমণের শুরুর পরই বিদেশ থেকে আসা বাংলাদেশীদের কোয়ারেন্টিন করা নিয়ে শোরগোল দেখা দিয়েছিলো যা খবর হয়েছিলো জাতীয় ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে।

এমনকি ইতালি থেকে আসা একটি দলকে কোয়ারেন্টিনের জন্য হজ ক্যাম্পে নিয়েও রাখা যায়নি তাদের অসহযোগিতার কারণে।

পরে ইতালি প্রবাসীদের অনেকের এবং তারা যাদের সংস্পর্শে এসেছিলেন তাদের অনেকে করোনায় আক্রান্ত হবার খবর এসেছে।

এরপর ঢাকায় দুটি প্রতিষ্ঠানের ভুয়া করোনা রিপোর্ট দেবার খবর আবার আলোচনার ঝড় তুলেছে।

এর মধ্যে গত ছয় মাসেও করোনা স্ক্রিনিংয়ের কার্যকর কোনো পন্থা দাঁড় করানো যায়নি ঢাকা বিমানবন্দরে।

পাশাপাশি ঢাকা থেকে নেগেটিভ সনদ দেখিয়ে বিমান যাত্রার পর বিদেশে গিয়ে যাত্রীর করোনাভাইরাস পজিটিভ ধরা পড়ার ঘটনায় আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে আলোচিত হয়েছে।

ইতালিতে এমন যাত্রী পাওয়ার পর সেখানকার কর্তৃপক্ষ ও গণমাধ্যম এমন বাংলাদেশী যাত্রীদের নাম দিয়েছে ‘ভাইরাস বোমা’।

দ্রুত সমস্যা অর্থাৎ নমুনা পরীক্ষা গ্রহণযোগ্য পর্যায়ে নিতে না পারলে আরও অনেক দেশ বিশেষ করে পশ্চিমা বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার আশংকা আছে কিনা, এমন প্রশ্নের জবাবে সাবেক কূটনীতিক নাসিম ফেরদৌস বলছেন, বাংলাদেশ হয়তো বিচ্ছিন্ন হবে না। তবে করোনার ভুয়া সার্টিফিকেট ইস্যুকে শক্ত হাতে ডিল করতে হবে বাংলাদেশকে।

“এটা শুধু বাইরের দেশের ব্যাপার না। নিজেদের জন্যও বড় ব্যাপার। এখন যারা যোগাযোগ বন্ধ করছে সেটা সাময়িক। করোনা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রসহ অনেক বড় দেশই এমন পরিস্থিতি মোকাবেলা করছে। তবে এটা ঠিক যে যেসব অভিবাসীরা ফিরে এসেছিলো তাদের ফিরে যাওয়ার ওপর প্রভাব পড়বে।”

অন্যদিকে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অধ্যাপক রুকসানা কিবরিয়া বলছেন, পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন না হলেও করোনাভাইরাসকে ঘিরে যেসব অনিয়ম হচ্ছে তাতে চাপের মুখে পড়বে বাংলাদেশ।

“তাই দ্রুত রাজনৈতিক উদ্যোগ নিতে হবে। বিমানবন্দরে আগে থেকেই সমস্যা। এখন করোনাভাইরাসকে কেন্দ্র করে সুযোগ নেবার লোক তৈরি হয়েছে। সরকারকে এগুলো ঠেকাতে হবে শক্ত হাতে। আন্তর্জাতিক নিয়ম কানুন সঠিক ভাবে পালন না করলে দেশ বিপদে পড়বে।”

তিনি বলেন, টেস্টিং নিয়ে যে গলদ তা দূর করার বিকল্প নেই। কারণ, আর কোনো দেশই এমন ঝুঁকি নেবেনা। তাই দেশের ভাবমূর্তি ফিরিয়ে আনা ও সম্ভাব্য সংকট থেকে বাঁচতে রাজনৈতিক উদ্যোগ নিয়ে অনিয়ম দুর করতেই হবে।

এভিয়েশন বিষয়ক বিশ্লেষক কাজী ওয়াহিদুল আলম বলছেন, অনেক দেশই করোনার খারাপ পরিস্থিতি মোকাবেলা করে এখন সংক্রমণ কমিয়ে আনার দিকে। তারা কোনোভাবেই চাইবেনা অন্য দেশ থেকে করোনা রোগী গিয়ে তাদের বিপাকে ফেলুক।

“বিশেষ করে ইউরোপের দেশগুলো এসব নিয়ে বেশি উদ্বিগ্ন। তারা আমেরিকা, ব্রিটেনকেও ছেড়ে কথা বলছে না। তাই বাংলাদেশের আরও সতর্ক হবার বিকল্প নেই। পাশাপাশি সারাবিশ্বেই এভিয়েশন ইন্ডাস্ট্রি সংকটে। তারাও চাইবেনা ঢাকায় এসে তারা বিপদে পড়ুক। তাই করোনা টেস্ট হতে হবে প্রশ্ন-মুক্ত ও বিশ্বব্যাপী গ্রহণযোগ্য। নাহলে বড় ধরণের এমবার্গো (নিষেধাজ্ঞার)’র সামনেও পড়তে হতে পারে।”

তিনি বলেন, সরকার ২/৩ টি জায়গা নির্ধারণ করতে পারে বিদেশগামীদের নমুনা পরীক্ষার জন্য। পরীক্ষার পর স্বয়ংক্রিয়ভাবেই সেই রিপোর্ট যাত্রীর পাশাপাশি ইমিগ্রেশন ও বিমান সংস্থার হাতে চলে যাওয়া উচিত।

এটি করলে চলমান ভাবমূর্তি সংকট থেকে বেরিয়ে আসার সুযোগ তৈরি হতে পারে বলে মনে করেন তিনি।

বাংলাদেশে কোভিড১৯ টেস্টের মান নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে ইতালির সংবাদমাধ্যম
বাংলাদেশে কোভিড১৯ টেস্টের মান নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে ইতালির সংবাদমাধ্যম

বিমান যোগাযোগ: ২১শে মার্চ থেকে যা ঘটলো

গত ২১শে মার্চ থেকে চীন ছাড়া বাকী সব গন্তব্যে ঢাকা থেকে ফ্লাইট বন্ধ করা হয় করোনা পরিস্থিতির জের ধরে।

পরে আবার ভাড়া করা বা বিশেষ বিমান চালু হলেও নতুন করে সেটিও বন্ধ করেছে জাপান, কোরিয়া ও ইতালি।

দশই জুন জাপানে বিমানের একটি ফ্লাইটে যাওয়া যাত্রীর শরীরে করোনা ভাইরাস পাওয়া যাওয়ার পর জাপান বিমান যোগাযোগ বন্ধ করে দেয়।

এগারই জুন চীনের চায়না সাউদার্ন এয়ারলাইন্সে এবং একই দিনে দক্ষিণ কোরিয়ায় ঢাকা থেকে যাওয়া একটি বিশেষ ফ্লাইটের যাত্রীর শরীরের করোনা ধরা পড়ে।

আরব আমিরাত বিমান বাংলাদেশকে ফ্লাইট চালুর অনুমতি দিয়ে পরে আবার তা স্থগিত করেছে।

তবে গত ১৫ই জুন থেকে যুক্তরাজ্য ও কাতারের সঙ্গে বিমান চলাচলের নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়া হয়েছে।

যদিও ইতালিতে ৬ই জুলাই ২১ জন যাত্রীর শরীরে করোনা ভাইরাস পাওয়ার পর তুমুল শোরগোল শুরু হয়।

ইতোমধ্যেই এক সপ্তাহের জন্য ফ্লাইট নিষিদ্ধ করেছে ইতালি। এসময় কোনো চার্টার্ড বিমানও বাংলাদেশ থেকে যেতে পারবেনা।

এরপর তুরস্ক কর্তৃপক্ষ ১৫ই জুলাই পর্যন্ত বাংলাদেশের সাথে সব ফ্লাইট যোগাযোগ বন্ধের সিদ্ধান্ত নেয়।

এর মধ্যে টেস্ট নিয়ে ব্যাপক অনিয়মের খবরে আরও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে যে এর মাশুল হিসেবে বিশ্ব থেকে ক্রমশ বাংলাদেশ যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়তে পারে কিনা।

সম্পূর্ণ খবরটি পড়ুন
বিজ্ঞাপন
নিউইয়র্কে ঝড়ের সময় হাডসন নদীর ওপর বজ্রপাতের দৃশ্য। মাঝখানের সবচেয়ে উঁচু দালানটি ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার।

চলতি সপ্তাহের কিছু ছবি যা নিয়ে আলোচনা চলছে বিশ্বজুড়ে

করোনা ভাইরাস: কোভিড-১৯ রোগের উৎস চীনের উহানকে ঘিরে যেসব প্রশ্ন এখনো রয়ে গেছে

বাংলাদেশে গত ২৪ ঘণ্টাতেই আইসোলেশনে যুক্ত হয়েছেন ৭৯২জন।

করোনা ভাইরাস: আইসোলেশনে থাকলে যে সাতটি কাজ করবেন

জাসিন্ডা আরডার্ন

করোনা ভাইরাস: করোনাভাইরাস ঠেকাতে নিউজিল্যান্ড কীভাবে এত সফল হলো?

সাবেক প্রেসিডেন্টের নামে রাজধানীর নতুন নাম রাখা হয়েছে নুর-সুলতান

‘কাজাখস্তানের “অজানা নিউমোনিয়া” করোনাভাইরাসের চেয়েও প্রাণঘাতী’

করোনা ভাইরাস: ভারত কি বিশ্ব মানচিত্রে পরবর্তী হটস্পট?

বাংলাদেশে করোনা ভাইরাসের নমুনা পরীক্ষা নিয়ে বড় দুর্নীতির প্রমাণ পেয়েছে র‍্যাব।

করোনা ভাইরাস পরীক্ষায় অনিয়ম: বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্নতার আশংকা বাংলাদেশের সামনে?

অনলাইনে বিক্রি হচ্ছে নানা আকারের ও দামের গরু

অনলাইনে কোরবানির গরু ক্রয়ে ঝুঁকি কতটা?

হাইয়া সোফিয়ার গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় এবং রাজনৈতিক তাৎপর্য রয়েছে।

৮৬ বছর পর ইস্তাম্বুলের হাইয়া সোফিয়ায় শোনা গেল আজান ধ্বনি

সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট যে হুতি বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে লড়ছে, তারা যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব মেনে নেয়নি

অস্ত্র ব্যবসা: ব্রিটেন সৌদি আরবের কাছে কী পরিমাণ অস্ত্র বিক্রি করে? কেন এই ব্যবসা নিয়ে বিতর্ক?

শীর্ষ সংবাদ

© স্বত্ব দা এগ্রো নিউজ, ফিশ এক্সপার্ট লিমিটেড দ্বারা পরিচালিত - ২০২০
ফোন: ০১৭১২-৭৪২২১৭
ইমেইল: info@theagronews.com