আমাদের সাথে যোগাযোগ করুন

শাকসবজি

বেগুন গাছের ডগা ও ফল ছিদ্রকারী পোকা দমনের উপায়

বেগুন গাছের ডগা ও ফল ছিদ্রকারী পোকা দমনের উপায়
বেগুন গাছের ডগা ও ফল ছিদ্রকারী পোকা দমনের উপায়

ডগা ও ফল ছিদ্রকারী পোকা বেগুনের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। এটি কম বয়সী ডগাকে আক্রমণ করে। আক্রান্ত ডগা তাজা ভাব হারাতে থাকে। আক্রান্ত ডগার আকার নষ্ট হয়ে যায়। এমনকি আক্রান্ত বেগুন রান্না করলে এর স্বাদ হয় তেতো। মারাত্মক আক্রমণের ফলে পুরো গাছটিই মরে যেতে পারে। বেগুন গাছ লাগানোর পর থেকে বেগুন তোলা পর্যন্ত ডগা ও ফল ছিদ্রকারী পোকা গাছকে আক্রমণ করে। ডগা ও ফল ছিদ্রকারী পোকার বিভিন্ন স্থানীয় নাম রয়েছে। যেমন- আলমারা, ডগাভাঙা এবং ফল ছিদ্রকারী পোকা।

পূর্ণবয়স্ক পোকা একটি মথ। মথগুলো শেষরাতে ওড়াউড়ি করে। তাই এদেরকে সহজে দেখতে পারবেন না। মথ কম বয়সী ডগার উপরে ডিম পাড়ে। ডিম থেকে কীড়া বের হয়ে ডগায় ঘুরে বেড়ায়। কীড়া ডগা ও ফলের ভেতরে ছিদ্র করে ঢুকে খাবার খায়। এ কারণেই ডগার তাজা ভাব হারিয়ে যায়। কীড়া বড় হয়ে ডগা ও ফল ছিদ্র করে বের হয়ে আসে। এরপর এরা মাটিতে চলে যায় এবং শুকনো, ঝরা পাতার সাথে কোকুন তৈরি করে। এই কোকুনের ভেতর থেকে পূর্ণাঙ্গ মথ বের হয়ে আসে। ডিম দেওয়ার জন্য মেয়ে মথ পুরুষ মথের সাথে মিলিত হয়। একটি মথ সারা জীবনে ২৫০টি পর্যন্ত ডিম দেয়।

বেগুন গাছের ডগা ও ফল ছিদ্রকারী পোকা দমনের উপায়
বেগুন গাছের ডগা ও ফল ছিদ্রকারী পোকা দমনের উপায়

বেগুন গাছের ডগা ও ফল ছিদ্রকারী পোকা নিয়ন্ত্রণের বিভিন্ন উপায় রয়েছে-

১. মানসম্পন্ন বীজ ব্যবহার করুন।
২. নিশ্চিত হয়ে নিন যে, বীজে যেন কোনো রোগ বা ক্ষতিকর কিছু না থাকে।
৩. দিনে অন্তত দু’বার ক্ষেত পরিদর্শন করুন। কারণ এটি খুব দ্রুত বদলে যেতে পারে।
৪. গাছের নিচের দিকের অপেক্ষাকৃত পুরোনো পাতাগুলো সরিয়ে ফেলুন।
৫. ঝরা পাতাগুলো সরিয়ে পুড়িয়ে ফেলুন। যাতে পোকা কোকুন তৈরি করতে না পারে।
৬. কোনো আক্রান্ত গাছ আছে কি-না, তা দেখার জন্য নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করুন।
৭. সতর্কতার সঙ্গে লক্ষ্য করুন, কোনো ডগা শুকিয়ে যাচ্ছে কি-না।
৮. ধারালো ছুরি দিয়ে আক্রান্ত ডগা, ফুল বা ফল কেটে ফেলুন। সেগুলো সরিয়ে মাটির নিচে পুঁতে ফেলুন।
৯. ক্ষেতের ধারে-কাছে আক্রান্ত জিনিসগুলো ফেলবেন না। এতে নতুন মথ জন্ম নিতে পারে।
১০. ক্ষেতের চারপাশে জালের বেড়া দিয়ে মথের প্রবেশ ঠেকাতে পারেন।
১১. অর্ধ সেমি ছিদ্রযুক্ত এবং ৩ মিটার উঁচু জাল ব্যবহার করুন।
১২. মথকে দূরে রাখতে জালটির ছিদ্র ছোট হতে হবে। মথ ৩ মিটারের উপরে উড়তে পারে না।
১৩. সাদা নাইলনের জাল ব্যবহার করুন। সাদা জাল ফসলের উপরে ছায়া দেয় না।
১৪. এতে পাখিরাও বেগুন গাছের ফুল এবং কচি ফল নষ্ট করতে পারে না।
১৫. সূর্য ওঠার আগে খুব সকালে মথগুলো বেগুন গাছের কচি ডগায় উড়ে-উড়ে ডিম পাড়ে।
১৬. খুব সকালে উড়ন্ত মথগুলো দেখে ঝাড়ু দিয়ে পিটিয়ে মেরে ফেলুন।
১৭. ক্ষেতে ফেরোমন ফাঁদ ব্যবহার করতে পারেন। বিভিন্ন পোকার বিভিন্ন গন্ধ বা ফেরোমন থাকে।
১৮. স্থানীয় কৃষি ডিলারের কাছ থেকে বিভিন্ন ধরনের পোকা ধরার ফাঁদ কিনতে পারেন।
১৯. নিশ্চিত হয়ে নিন যে, মথ মারার জন্য আপনি ঠিক ফাঁদটিই কিনেছেন।
২০. ডিলারকে বলুন, আপনি বেগুন গাছের ডগা ও ফল ছিদ্রকারী পোকা মারার ফাঁদ কিনতে চান।
২১. ফাঁদের নিচের দিকে মথেরা ডিটারজেন্ট পানিতে ধরা পড়ে।
২২. ফেরোমন ফাঁদ ১০-১২ মিটার দূরে-দূরে পাতুন।
২৩. প্রতিদিন ফেরোমন ফাঁদ পরখ করুন। দরকার হলে ডিটারজেন্ট পানি রিফিল ও পরিবর্তন করুন।
২৪. স্থাপনের ৪০ দিন পরপর ফেরোমন টোপ বদলান।

পরিবেশ

৪ সবজিতে ক্ষতিকর মাত্রায় রাসায়নিক

বাজারে প্রায় সারা বছরই বেগুন পাওয়া যায়। ফুলকপি শীতকালে পরিণত হলেও এ সবজির আগাম জাত আগস্টেই বাজারে চলে আসে। শিম আর বরবটি অবশ্য আরও মাসখানেক পর আসবে। নিত্য পাতের এ চার সবজিতেই ক্ষতিকর মাত্রায় রাসায়নিক কীটনাশকের উপস্থিতি পেয়েছেন গবেষকেরা। বিশেষ করে দেশের উত্তরাঞ্চলে উৎপাদিত সবজিতে এসব ক্ষতিকর রাসায়নিক পাওয়া গেছে তুলনামূলক বেশি। আম, পেয়ারায়ও ক্ষতিকর মাত্রায় কীটনাশক পাওয়া গেছে। এ ছাড়া পানেও এ ধরনের রাসায়নিক পেয়েছেন গবেষকেরা।

বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বারি) চারটি গবেষণায় এসব তথ্য উঠে এসেছে। তিনটি আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান সাময়িকীতে গত ডিসেম্বর থেকে গত আগস্টের মধ্যে গবেষণার ফলগুলো প্রকাশিত হয়েছে। এ সাময়িকীগুলো হলো জার্নাল অব ফুড কমপোজিশন অ্যান্ড অ্যানালাইসিস, ইন্টারন্যাশনাল জার্নাল অব এনভায়রনমেন্টাল অ্যান্ড অ্যানালিটিক্যাল কেমিস্ট্রি এবং জার্নাল অব দ্য সায়েন্স অব ফুড অ্যান্ড অ্যাগ্রিকালচার। এর মধ্যে জার্নাল অব ফুড কমপোজিশন অ্যান্ড অ্যানালাইসিস প্রকাশ করে এলসেভিয়ের। এ প্রতিষ্ঠান বিজ্ঞান সাময়িকী ল্যানসেটসেলও প্রকাশ করে। আর জার্নাল অব দ্য সায়েন্স অব ফুড অ্যান্ড অ্যাগ্রিকালচার প্রকাশ করে যুক্তরাজ্যের লন্ডনভিত্তিক সোসাইটি অব কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রি।

আজ বিশ্ব খাদ্য দিবস। এ বছর দিবসটির প্রতিপাদ্য, ‘আমাদের কর্মই আমাদের ভবিষ্যৎ, ভালো উৎপাদনে ভালো পুষ্টি, আর ভালো পরিবেশেই উন্নত জীবন।’বিজ্ঞাপনবিজ্ঞাপন

গবেষণায় বিজ্ঞানীরা বেগুন, ফুলকপি, শিম ও বরবটির নমুনার ১১ থেকে ১৪ শতাংশের মধ্যে মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর মাত্রায় রাসায়নিক কীটনাশকের উপস্থিতি পেয়েছেন। এসব গবেষণা করা হয়েছে বারিতে স্থাপিত আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত গবেষণাগারে।

ওই চার গবেষণায় নেতৃত্ব দিয়েছেন বারির কীটতত্ত্ব বিভাগের বালাইনাশক গবেষণা ও পরিবেশ বিষতত্ত্ব শাখার ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মুহাম্মদ দেলোয়ার হোসেন প্রধান। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘রাসায়নিক কীটনাশক ব্যবহারের ক্ষেত্রে কিছু সাধারণ নিয়ম রয়েছে। ফসলে কীটনাশক প্রয়োগের পর একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়, যাতে ফসল সংগ্রহ করলে কীটনাশকের অবশিষ্টাংশের মাত্রা ক্ষতির পর্যায়ের নিচে নেমে আসে। যেমন অর্গানোফসফরাস কীটনাশক ব্যবহারের ১০ থেকে ২০ দিন পর ফসল তুলতে হয়। সিনথেটিক পাইরিথ্রয়েডের ক্ষেত্রে অপেক্ষা করতে হয় চার থেকে সাত দিন। কিন্তু আমাদের দেশের
কৃষকেরা নিয়মগুলো অনুসরণ না করেই ফসল সংগ্রহ করেন।’ তিনি বলেন, গবেষণার জন্য তিনি ও তাঁর দল ভোক্তাদের কাছে ফল ও সবজি বিক্রির আগে নমুনা সংগ্রহ করেছেন।

গবেষণা প্রতিবেদনগুলোয় বলা হয়েছে, সবজি ও ফলের নমুনায় গবেষকেরা সাইপারমেথ্রিন, ক্লোরোপাইরিফস, ডাইমেথয়েট, অ্যাসিফেট ও কুইনালফসের মতো ক্ষতিকর রাসায়নিক পেয়েছেন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এসব রাসায়নিক ক্যানসার, পারকিনসনস, চর্মরোগ, উচ্চ রক্তচাপসহ নানা ধরনের রোগের কারণ হতে পারে। বিশেষ করে শিশু ও বৃদ্ধরা এসব রাসায়নিকযুক্ত খাবার খেলে স্নায়ুরোগে আক্রান্ত হতে পারে। শিশুদের বুদ্ধির বিকাশ ব্যাহত হতে পারে। অন্তঃসত্ত্বা নারীদের ক্ষেত্রে গর্ভের সন্তানের নানা ধরনের সমস্যা হতে পারে।বিজ্ঞাপন

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পুষ্টি ও খাদ্যবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক নাজমা শাহীন প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমাদের এখানে জনপ্রিয় বেশির ভাগ রাসায়নিক কীটনাশক উন্নত বিশ্বে পর্যায়ক্রমে নিষিদ্ধ হচ্ছে। কারণ, এগুলো মানবদেহের জন্য দীর্ঘ মেয়াদে ক্ষতি ডেকে আনছে। এগুলোর ব্যবহারবিধি ঠিকমতো অনুসরণ না হলে দেশে ক্যানসারসহ নানা ধরনের রোগে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা বাড়তে থাকবে।’

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশে আগাম জাতের সবজি ও ফল বেশ জনপ্রিয় হচ্ছে। এসব কৃষিপণ্য চাষের সময়ে পোকার আক্রমণও বেশি হয়। এর সহজ সমাধান হিসেবে কৃষকেরা রাসায়নিক কীটনাশক বেশি ব্যবহার করেন।

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কীটতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক খন্দকার শরীফুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, আবহাওয়াগত কারণে বাংলাদেশে বেশি পরিমাণে কীটপতঙ্গ বিস্তার লাভ করে। আর তা দমনে কৃষকেরা রাসায়নিক কীটনাশক বেছে নেন। তিনি ভারতের পাঞ্জাবসহ কয়েকটি রাজ্যের উদাহরণ টেনে বলেন, ওই রাজ্যগুলোয় কৃষকেরা ফসলে অতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহার করেন। ওই রাজ্যগুলোয় মানুষের ক্যানসারে আক্রান্ত হওয়ার হারও তুলনামূলক বেশি। তিনি বলেন, ‘আমাদের দেশে যাতে এ পরিস্থিতির সৃষ্টি না হয়, সেদিকে সতর্ক থেকে ব্যবস্থা নিতে হবে।’

আম ও পেয়ারায়ও ক্ষতিকর কীটনাশক

বারির আরেক গবেষণায় দেখা গেছে, দেশের জনপ্রিয় ফল আম ও পেয়ারায়ও ক্ষতিকর মাত্রায় কীটনাশক পাওয়া গেছে। তবে তা বেগুন, ফুলকপি, শিম ও বরবটির তুলনায় কম। আমের ৪ শতাংশ নমুনায় এবং পেয়ারার ৬ শতাংশ নমুনায় ওই রাসায়নিক পেয়েছেন গবেষকেরা। গবেষণার জন্য ১৪০টি আম ও ১৩০টি পেয়ারার নমুনা সংগ্রহ করে তা বারির গবেষণাগারে পরীক্ষা করা হয়েছে।

দেশের সবচেয়ে বেশি আম উৎপাদনকারী এলাকা রাজশাহী বিভাগ। এ অঞ্চল থেকে সংগৃহীত আমের নমুনার ১৩ শতাংশে ক্ষতিকর কীটনাশকের অবশেষ পাওয়া গেছে। দিনাজপুর ও জামালপুরের আমের ২০ শতাংশ নমুনায় এসব রাসায়নিক পাওয়া গেছে। বগুড়া, কুমিল্লা ও যশোরের আমের ১০ শতাংশ নমুনায় কীটনাশকের অবশেষ পেয়েছেন গবেষকেরা। গাজীপুর ও ঢাকার আমের নমুনার ৫ শতাংশেও ছিল এসব রাসায়নিক। বরিশাল থেকে সংগৃহীত আমের কোনো নমুনায় ক্ষতিকর মাত্রায় কীটনাশক পাওয়া যায়নি।

তবে বরিশালের পেয়ারায় রাসায়নিক পাওয়া গেছে সবচেয়ে বেশি। দেশে উৎপাদিত পেয়ারার ৮০ শতাংশই আসে এ বিভাগ থেকে। গবেষণায় বরিশাল থেকে সংগৃহীত নমুনার ১৩ শতাংশে কীটনাশকের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। জামালপুর, নরসিংদী ও যশোরের পেয়ারার ১০ শতাংশ নমুনায় এসব রাসায়নিক ছিল। তবে ঢাকা, গাজীপুর, কুমিল্লা ও বগুড়ায় উৎপাদিত পেয়ারার নমুনায় রাসায়নিকের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি।

পানের ১১ শতাংশ নমুনায় রাসায়নিক

পানের নমুনার ১১ শতাংশেও একই ধরনের রাসায়নিকের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। পান নিয়ে করা গবেষণাটির জন্য বরিশাল, বগুড়া, ঢাকা, গাজীপুর, জামালপুর, নরসংদী ও রংপুর থেকে মোট ১১০টি নমুনা সংগ্রহ করা হয়।

জানতে চাইলে বারির মহাপরিচালক মো. নাজিরুল ইসলাম বলেন, ফলমূল, শাকসবজিতে বিষাক্ত রাসায়নিক কীটনাশকের বিকল্প হিসেবে জৈব বালাইনাশকের ব্যবহার নিশ্চিত করতে সরকার ইতিমধ্যে কর্মসূচি নিয়েছে। ২৪টি জৈব বালাইনাশকভিত্তিক প্রযুক্তির উদ্ভাবনও করা হয়েছে। এসব প্রযুক্তি কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মাধ্যমে কৃষকপর্যায়ে সফলভাবে ব্যবহার শুরু হয়েছে। আশা করা যায়, ক্ষতিকর বিষাক্ত রাসায়নিক কীটনাশকের ব্যবহার দিনে দিনে কমে আসবে।

আর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. আসাদুল্লাহ প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা রাসায়নিক কীটনাশকের বিকল্প জৈব বালাইনাশক এবং কীটপতঙ্গ দমনের প্রাকৃতিক পদ্ধতি জনপ্রিয় করছি। আর কৃষকেরা এসব বালাইনাশকের ব্যবহার বাড়াচ্ছেন। তবে শুধু সরকারি সংস্থার মাধ্যমে এ ক্ষেত্রে সফল হওয়া কঠিন হবে। কৃষকদেরও সচেতন হতে হবে।’

সম্পূর্ণ খবরটি পড়ুন

পরিবেশ

শীতকালীন টমেটো চাষ করবেন যেভাবে

আমাদের দেশে টমেটো একটি সুস্বাদু সবজি। এটি সালাদ হিসেবে বেশ জনপ্রিয়। টমেটো পুষ্টি গুণে ভরা একটি সবজি। ভিটামিন এ এবং ভিটামিন সি-এর অন্যতম উৎসও বটে এই সবজিটি। এছাড়া এতে আছে বেটা কেরোটিন নামক এক প্রকার ভিটামিন যা রাতকানা রোগ থেকে রক্ষা করে। তাই চিকিৎসকরা সুস্বাস্থ্য রক্ষার জন্য টমেটে খাওয়ার পরামর্শ দেন। তাই আমাদের টমেটোর চাহিদা পূরণের জন্য উদ্যোগী হতে হবে। এবার জেনে নিন শীতকালীন টমেটো চাষ করবেন যেভাবে।

শীতকালীন টমেটো চাষের জন্য কার্তিক মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে তৃতীয় সপ্তাহ (অক্টোবরের শেষ সপ্তাহ থেকে নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহ ) পর্যন্ত বীজতলায় বপনের উপযুক্ত সময়। এই সময়ের মধ্যে বীজ বপন করতে হবে।

আমাদের দেশের প্রায় সব ধরনের মাটিতেই টমেটো চাষ করা যায়। তবে বেলে দোঁ-আশ মাটি সবচেয়ে উপযোগী। জমি চাষ শেষ হলে ভূমি হতে ১০-১৫ সে.মি. উঁচু বেড তৈরি করে বেডের চারপাশে ড্রেনের ব্যবস্থা রাখতে হয়। চারা লাগানোর সঙ্গে সঙ্গে পানি দিতে হবে। সারি থেকে সারির দূরত্ব হবে ৫০ সে.মি. এবং চারা হতে চারার দূরত্ব হবে ৫০ সে.মি.।

ভালো জাতের টমেটোর বীজ বপন করতে হবে। এ জাতের মধ্যে রয়েছে বাহার, বিনা টমেটো-৪, বিনা টমেটো-৫, বারি টমেটো-৩, ৪। অন্যদিকে হাইব্রিড এর মধ্যে সবল, মিন্টু ও বারি টমেটো-৫ বেশ ভালো জাতের। এই জাতের টমেটোর বীজের গাছ অধিক ফলন দিচ্ছে।

জমিতে তিন চারটি চাষ ও মই দিয়ে সাধারণভাবে জমি তৈরি করতে হয়। শেষ চাষের আগে নির্ধারিত পরিমাণ গোবর সারের অর্ধেক এবং পুরো টিএসপি সার ছিটিয়ে দিয়ে পুনরায় চাষ ও মই দিয়ে জমি তৈরি করতে হবে। বাকি অর্ধেক গোবর চারা লাগানোর সময় গোড়ায় মাটির সাথে মিশিয়ে দিতে হবে।

ইউরিয়া ও পটাশ সমান দুই ভাগ করে চারা লাগানোর ১৫ দিন এবং ৩৫ দিন পর প্রয়োগ করতে হবে। একর প্রতি ইউরিয়া ৮০-১০০ কেজি, টিএসপি ৬০-৮০ কেজি, এমপি ৬৮-৯২ কেজি, জিপসাম ২০-৩০ কেজি, বোরন ১-২ কেজি এবং ৪ টন গোবর প্রয়োগ করতে হবে।

শুষ্ক মৌসুমে চাষ করলে পানি সেচ দেয়া প্রয়োজন। ফসল ও মাটির অবস্থা বিবেচনা করে তিনবার সেচ দেয়া যেতে পারে।

জমির অবস্থা বুঝে হালকাভাবে ঝরনা দিয়ে গাছে পানি দিতে হবে। চারা লাগানোর পর আগাছা দেখা দিলে নিড়ানি দিয়ে জমির মাটি ঝুরঝুর করে দিতে হবে এবং হালকাভাবে আগাছাগুলো পরিষ্কার করে ফেলতে হবে। ভালো ফলন ও নিখুঁত ফল পেতে টমেটো গাছে ঠেকনা দেয় প্রয়োজন।

পাশাপাশি দুইটি সারির মধ্যে ‘অ’ আকৃতির বাঁশের ফ্রেম তৈরি করে দিলে টমোটোর ফলন বৃদ্ধি পায়। গাছ যাতে অত্যধিক ঝোপালো না হয় সে জন্য প্রয়োজনে অতিরিক্ত ডালপালা ছাঁটাই করা উচিত। প্রথম ও দ্বিতীয় কিস্তির সার প্রয়োগের আগে পার্শ্বকুশি ছাঁটাই করে দিতে হয়। এতে পোকামাকড় ও রোগের আক্রমণ কম হয় এবং ফলের আকার ও ওজন বৃদ্ধি পায়। নিড়ানি দিয়ে জমি আগাছামুক্ত রাখতে হবে।

টমেটোর ভালো ফলনের জন্য রোগ ও পোকামাকড় দমনের দিকেও নজর দিতে হবে। টমেটো ছিদ্রকারী পোকার জন্য ৫ শতাংশ জমিতে সবিক্রন ৪২৫ ইসি ২০ মি.লি. ১০ লিটার পানিতে মিশিয়ে স্প্রে করতে হবে। কোনো কোনো ক্ষেতে কৃমি রোগ, গোড়া পচা রোগ দেখা যায়। সে ক্ষেত্রে জমিতে চারা লাগানোর আগে ফুরাডন-৩ জি দিয়ে মাটি শোধন করে নিলে এ সব রোগের প্রকোপ কমে যায়। ঠিকমত পরিচর্যা করলে হেক্টরপ্রতি প্রায় ৭০- ৯০ টন পর্যন্ত ফলন হতে পারে।

জমি থেকে পাকা ফল তুলে ঘরে ২-৩ দিন রাখতে হবে যাতে ফলগুলো নরম হয়। নরম হওয়ার পর দুই ভাগে কেটে বীজগুলো একটি শুকনো কাচের অথবা প্লাস্টিকের পাত্রে ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টা রেখে দিতে হবে। এরপর বীজগুলো পরিষ্কার পানি দিয়ে ভালোভাবে ধুয়ে রোদে শুকিয়ে কাচ বা প্লাস্টিকের পাত্রে মুখ ভালোভাবে বন্ধ করে সংরক্ষণ করতে হবে।

জাতভেদে চারা লাগানোর ৬০ থেকে ৯০ দিনের মধ্যে পাকা টমেটো সংগ্রহ আরম্ভ করা যায়। টমেটো পাকা ও কাঁচা উভয় অবস্থাতেই সংগ্রহ করা যায়। প্রতি গাছ থেকে সাত থেকে আটবার টমেটো সংগ্রহ করা যায়।

ফলের নিচের দিকে একটু লালচে ভাব দেখা দিলে ফসল সংগ্রহের উপযোগী হয়। জাতভেদে টমেটোর ফলন শতাংশে ৮০ থেকে ১০০ কেজি পর্যন্ত হতে পারে। এভাবে নিয়ম মেনে টমেটো চাষ করলে বেশ ভালো ফলন পাওয়া যাবে।

সম্পূর্ণ খবরটি পড়ুন

শাকসবজি

লাউ চাষে বছরে ৭০ হাজার টাকা আয়

দিগন্ত জোড়া লাউ ক্ষেত। মাচার উপরে সবুজ গাছ তার নিচে ঝুলছে শত শত লাউ। দেখলে চোখজুড়িয়ে যায়। এভাবে ২০ বছর ধরে লাউ চাষ করে সফল হয়েছেন দুলাল খন্দকার (৬৫)। তিনি কুড়িগ্রামের রাজারহাট উপজেলার ছিনাই ইউনিয়নের মীরের বাড়ি গ্রামের বাসিন্দা।

চলমান খরিপ-২ মৌসুমে বসত বাড়ির পাশেই চল্লিশ শতক জমিতে লাউয়ের আবাদ করে আসছেন তিনি। তার ক্ষেতের উৎপাদিত লাউ জেলা থেকে শুরু উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন জেলায় যাচ্ছে।

লাউ চাষি দুলাল খন্দকার বলেন, বিশ বছর আগে অনান্য সবজির পাশাপাশি লাউয়ের আবাদ শুরু করি। তবে অনান্য সবজিতে তেমন লাভের মুখ না দেখলেও লাউ চাষে যথেষ্ট লাভবান হতে শুরু করি। তখন থেকেই লাউ চাষে ঝুঁকে পড়ি। লাউ চাষে আয়ের টাকা দিয়ে পরিবারের সকল সদস্যদের ভরণ-পোষণসহ সংসারের যাবতীয় খরচ বহন করে আসছি।

jagonews24

এছাড়াও লাউ চাষে আয়ের টাকা দিয়ে আমার তিন ছেলেকে লেখাপড়া করিয়েছি। বড় ছেলে ইন্টারমিডিয়েট পাস করে পুলিশে চাকরি করছে। দ্বিতীয় ছেলে ডিগ্রি পাস করে এনজিওতে চাকরি করছে এবং তৃতীয় ছেলে মাস্টার্সে পড়ছে। লাউ চাষে কখনো ক্ষতিগ্রস্ত হইনি। বিশ ধরে লাউ চাষে যথেষ্ট লাভবান হয়েছি। এবারও ৪০ শতক জমিতে লাউ চাষ করেছি।

আমার লাগানো লাউয়ের জাত হলো এসিআই ময়না। ৪০ শতকে জমি তৈরি, সার, সেচ, কীটনাশক, মাচা তৈরিসহ পরিচর্যা খাতে আমার ব্যয় হয়েছে ১০ হাজার টাকা। তাতে প্রতি শতকে ব্যয় হয়েছে ২৫০ টাকা করে। ফলন ভালো হয়েছে। এবার মৌসুমের শুরুতেই আট হাজার টাকার লাউ বিক্রি করেছি। ৪শ টি লাউয়ের প্রতিটি ২০-২৫ টাকা দরে বিক্রি করেছি।

jagonews24

আশা রাখি এবার লাউ বিক্রি করে এক লাখ টাকা আয় করবো। যদি আবহাওয়া অনুকূলে থাকে এবং বাজার দর ভালো থাকে তাহলে লাউ বিক্রি করে ব্যাপক লাভবান হবো।

লাউ চাষি দুলাল খন্দকারের ছোট ছেলে মাস্টার্স পড়ুয়া আশিক খন্দকার (২৪) বলেন, আমি কুড়িগ্রাম সরকারি কলেজে মাস্টার্সে পড়ছি। পড়ালেখার পাশাপাশি আমারমার বয়স যখন ৭-৮ বছর তখন থেকেই বাবার সাথে লাউ ক্ষেতে কাজ করি।

jagonews24

আমাদের লাউয়ের ফলন অত্যন্ত ভালো হয়। আমরা লাউ চাষ করে প্রতি বছর গড়ে ৭০ হাজার টাকা করে আয় করি। লাউ চাষে আয়ের টাকা দিয়েই আমাদের পরিবারের খরচ চলে।

কৃষক দুলাল খন্দকারের ছোট ভাই কৃষক নাজিমুল হক খন্দকার (৪৮) বলেন, আমরা প্রতি বছর আলু ও লাউয়ের চাষ করি। আমার বড় ভাই দীর্ঘদিন থেকে লাউয়ের চাষ করে আসছেন। লাউ চাষে আয়ের টাকা দিয়ে তিনি তার ছেলেদের লেখা-পড়ার খরচ এবং সংসারের ব্যায় বহন করেন। তার লাউ চাষ দেখে মুগ্ধ হয়ে আমিও লাউ চাষের চেষ্টা করতেছি।

jagonews24

কুড়িগ্রাম কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, চলমান মৌসুমে জেলার নয়টি উপজেলার ১ হাজার ১শ ৪৮ হেক্টর জমিতে শাক-সবজি চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারিত ছিল। তবে সে লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে গিয়ে ১ হাজার ১শ ৯৫ হেক্টর জমিতে শাকসবজির চাষ হয়েছে। এতে শাক-সবজির ভালো ফলন হয়েছে।

রাজারহাট উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সম্পা আক্তার জানান, উপজেলায় এ মৌসুমে ৭শ হেক্টর জমিতে শাক-সবজি চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারিত হয়েছে।

jagonews24

তবে এখনও অনেক জমিতে। শাক-সবজি চাষ না করায় লক্ষ্যমাত্রা এখনও পুরোপুরি অর্জিত হয়নি। কিন্তু খরিপ-২ এ চল্লিশ হেক্টর জমিতে লাউয়ের চাষ হওয়ায় লাউয়ের ফলন ভালো হয়েছে।

সম্পূর্ণ খবরটি পড়ুন

বাংলাদেশ

প্রতি একরে ১০০-১২০ টন ডাটা পাওয়া যাবে যে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে

ডাটা বাংলাদেশের অন্যতম গ্রীষ্মকালীন সবজি। ডাটায় পর্যাপ্ত পরিমাণে ভিটামিন-এ, বি,সি,ডি এবং ক্যালসিয়াম ও লৌহ বিদ্যমান। ডাটার কান্ডের চেয়ে পাতা বেশি পুষ্টিকর। খুব কম সবজিতে এত পরিমাণে বিভিন্ন প্রকার ভিটামিন ও খনিজ লবণ থাকে। মাটির বৈশিষ্ট্য ডাটার জন্য উর্বর ও গভীর মাটি প্রয়োজন। সুনিষ্কাশিত অথচ ‘জো’ থাকে এমন মাটিতে এটি সবচেয়ে ভাল জন্মে। উৎপাদন কৌশল বাংলাদেশে ডাটার আবাদ খরা মৌসুমেই করা হয়।

শীত প্রকট ও দীর্ঘস্থায়ী নয় বলে রবি মৌসুমেও এর চাষ সম্ভব, তবে সেই সময় অন্য অনেক সবজি পাওয়া যায়। জমি তৈরি ডাটার জন্য জমি গভীর করে কর্ষণ ও মিহি করে প্রস্তুত করতে হবে। জমিতে বড় ঢেলা থাকবে না। বাংলাদেশে ডাটা প্রধানত কান্ড উৎপাদনের জন্য চাষ করা হয়।

আমাদের বেশি জাতসমূহ কান্ডপ্রধান, এগুলো ডালপালা খুব কম উৎপাদন করে। এসব জাত ৩০ সে.মি. দূরত্বে সারি লাগানো যেতে পারে। চারা গজানোর পর ক্রমান্বয়ে পাতলা করে দিতে হবে। যেন শেষ পর্যন্ত সারিতে পাশাপাশি দুটি গাছ ৮/১২ সে.মি. দূরত্বে থাকে। যেসব জাতের কান্ড অনেক মোটা ও দীর্ঘ হয় এবং দেরিতে ফুল উৎপাদন করে সেগুলো আরও পাতলা করা উচিত। বীজের পরিমাণ ডাটা চাষের জন্য শতাংশ প্রতি ১৫ গ্রাম বীজের প্রয়োজন হয়।

বীজ বপন জমি গভীরভাবে চাষ দিয়ে বড় ঢেলা ভেঙে মাটি ঝুরঝুরে করতে হবে। সারিতে কাঠির সাহায্যে ১.০-১.৫ সে.মি. গভীর লাইন টানতে হবে। লাইনে বীজ বুনে হাত দিয়ে সমান করে দিতে হবে। ছিটিয়ে বুনলে বীজের সঙ্গে সমপরিমাণ ছাই বা পাতলা বালি মিশিয়ে নিলে সমভাবে বীজ পড়বে। বপনের পর হাল্কাভাবে মই দিয়ে বীজ ঢেকে দিতে হবে। জমিতে পর্যাপ্ত রস না থাকলে ঝাঝরি দিয়ে হাল্কা করে পানি ছিটিয়ে দিতে হবে। তাহলে বীজ দ্রুত এবং সমানভাবে গজাবে।

অর্ন্তবতীকালীন পরিচর্যা গাছের স্বাভাবিক বৃদ্ধির জন্য জমিকে আগাছামুক্ত রাখা আবশ্যক। প্রয়োজনমতো জমিতে সেচ না দিলে কান্ড দ্রুত আঁশমুক্ত হয়ে ডাটার গুণগতমান ও ফলন কমে যাবে। মাটির চটা ভেঙে ঝুরঝুরে করে দিলে গাছের বৃদ্ধির সুবিধা এবং গোড়াপচা রোগও রোধ হয়। চারা গজানোর ৭ দিন পর হতে পর্যায়ক্রমে একাধিকবার গাছ পাতলাকরণের কাজ করতে হবে। জাত ভেদে ৫-১০ সে.মি. অন্তর গাছ রেখে বাকি চারা তুলে শাক হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে।

যেহেতু দ্রুত বর্ধনশীল ফসল তাই সঠিক সময়ে ইউরিয়া সার উপরি প্রয়োগ করতে হবে। ফসল তোলা কান্ড প্রধান জাতে ফসল সংগ্রহের কোনো নির্দিষ্ট সময় নেই। গাছে ফুল আসার পূর্ব পর্যন্ত যে কোনো সময় ফসল তোলা যেতে পারে। ফুল আসলেই কান্ড আঁশময় হয়ে যায়। ডাটার কান্ডের মাঝামাঝি ভাঙার চেষ্টা করলে যদি সহজে ভেঙে যায় তাহলে বুঝতে হবে আঁশমুক্ত অবস্থায় আছে।

তখনই সংগ্রহের উপযুক্ত সময় বলে বিবেচিত হয়। জীবনকাল লাল তীর সীড লিমিটেড উদ্ভাবিত জাতসমূহের জীবনকাল বপন থেকে ৪০-৬০ দিন। ফলন ডাটা একটি উচ্চ ফলনশীল সবজি। বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে উন্নত জাতের চাষ করলে প্রতি একরে ১০০-১২০ টন ডাটা পাওয়া সম্ভব।

সম্পূর্ণ খবরটি পড়ুন

পরিবেশ

কাঁকরোলের আধুনিক চাষ পদ্ধতি

কাঁকরোল ( Teasel gourd ) এক ধরনের কুমড়া গোত্রীয় ছোট সবজি যা মূলত গ্রীষ্ম ও বর্ষাকালে বাংলাদেশে চাষ হয়ে থাকে। কাঁকরোল Cucurbitaceae পরিবারের যার ইংরেজি নাম Teasel gourd/spine gourd/kantola এবং বৈজ্ঞানিক নাম Momordica dioica । এর খোসা ছোট ছোট ঘন নরম কাঁটায় ভরা থাকে। ভেতরের শাঁস সাদাটে সবুজ,বিচি নরম ও ছোট। কাঁকরোল গাছের কাঁচা ফল তরকারী, ভাজি বা সিদ্ধ করে ভর্তা হিসেবে খাওয়া হয়। এতে প্রচুর পরিমাণে ক্যালসিয়াম, ফসফরাস, লৌহ, ভিটামিন-বি, শ্বেতসার ও খনিজ পদার্থ ক্যারোটিন আছে। এই সবজির বাজার মূল্যও তুলনামূলক বেশি।

কাঁকরোল লতানো প্রকৃতির গুল্ম জাতীয় গাছ। কাঁকরোলের ক্ষেত্রে স্ত্রী ও পুরুষ ফুল পৃথক গাছে জন্মে থাকে অর্থাৎ স্ত্রী ও পুরুষ গাছ আলাদা। গাছ দেখে সাধারাণত চেনা যায় না কোনটি স্ত্রী ও কোনটি পুরুষ গাছ। ফুল ফোটার পর ফুল দেখে চিনতে হয়। স্ত্রী ফুলের ক্ষেত্রে ফুল মাইকের মতো ফুটে। ফুলের পাপড়ির রং ঘিয়া থেকে সাদাট এবং মাঝখানে খয়েরি রঙের হয়ে থাকে। পুরুষ ফুলের বোটার ওপরে কোনো ফুলের গঠন বা ডিম্বাশয় থাকে না, স্ত্রী ফুলে তা থাকে।

কাঁকরোলের জাতঃ

বাংলাদেশে স্থানীয় জাতের বেশ কিছু কাঁকরোল চাষ করা হয়। জাতগুলোর মধ্যে – আসামি, মণিপুরি, মুকুন্দপুরি, মধুপুরি আলমী, টেম্পু, সবুজ টেম্পু ইত্যাদি অন্যতম।

আসামিঃ
এই জাতের কাঁকরোলের ফলগুলো গোলাকার, খাটো এবং খেতে সুস্বাদু।

মণিপুরিঃ
এই জাতের কাঁকরোলের ফল দেখতে একটু লম্বাটে ও চিকন। তবে ফলন অন্যান্য জাতের তুলনায় বেশি হয়ে থাকে।

কাঁকরোলের চাষ পদ্ধতিঃ

মাটির প্রকৃতিঃ
কাঁকরোল চাষের করার জন্য দোঁআশ ও এটেল দোআঁশ মাটি উত্তম। তবে জৈব সার প্রয়োগ করে অন্য মাটিতেও কাঁকরোল চাষ করা যেতে পারে।

জমি তৈরীঃ
জমিতে ভালোভাবে ৪-৫ টি চাষ ও মই দিয়ে মাটি ঝুরঝুরা করে জমির উপরিভাগ সমান করে নিতে হবে। শেষ চাষের সময় জমিতে প্রয়োজনীয় পরিমাণ সার প্রয়োগ করতে হবে। তারপর চাষকৃত জমিতে প্রয়োজনীয় মাপের বেড তৈরী করে নিতে হবে। জমি অব্যশই আগাছামুক্ত রাখতে হবে।

কাঁকরোলের মোথা বপনের সময়ঃ কাঁকরোলের বীজ বপন বা মোথা রোপণের উত্তম সময় হলো ফেব্রুয়ারী থেকে মে মাস পর্যন্ত।

চারা তৈরিঃ
বীজ থেকে কাঁকরোলের চারা তৈরি করা যায়। কিন্তু তা না করাই ভালো। কেননা বীজ থেকে মাত্র ৫০% চারা গজাতে পারে। তাছাড়া বীজ থেকে গজানো চারার বেশির ভাগ গাছই পুরুষ গাছ হয়ে থাকে। এছাড়াও বীজ থেকে গজানো গাছের ফলন কম হয় এবং জাতের গুনাগুণ ঠিক থাকে না। সেজন্য কন্দ বা মোথা থেকে কাঁকরোলের চারা তৈরি বা বংশবিস্তার করা হয়। গাছের আগা কেটে বালি বা মাটির মধ্যে ছায়া জায়গায় পুঁতে দিলে ১০-১৫ দিনের মধ্যে চারা হয়। কাটিং এর গোড়ায় রুটিং হরমোন লাগিয়ে দিলে দ্রুত শিকড় গজায়। তবে এতো ঝামেলা না করে জমিতে মাদা তৈরি করে সরাসরি কন্দমুল লাগানো উত্তম।

জমিতে বেড বা মাদা তৈরী এবং কন্দমুল রোপণঃ বেড তৈরির ক্ষেত্রে প্রস্থ নিতে হবে ২ মিটার ও জমির দৈঘ্য অনুযায়ী লম্বা করতে হবে। দুই বেডের মাঝে নালার প্রস্থ ও গভীরতা হবে যথাক্রমে ৩০ সেমি এবং ২০ সেমি। প্রতিটি বেডে ২ টি করে সারি রাখতে হবে। বেডে সারি থেকে সারির দূরত্ব হবে ২ মিটার। প্রতিটি সারিতে ৬০x৬০x৬০ সেমি আকারের গর্ত মাদা তৈরী করে নিতে হবে।

মাদায় ৪-৬ সেমি গভীরে কন্দমুল পুঁততে হবে। তারপর মাটি দিয়ে মাদা ঢেকে তার ওপর খড় বিছিয়ে দিতে হবে যাতে মাদার মাটি শুকিয়ে না যায়। প্রয়োজনে ২/১ দিন পর পর ঝাঁঝরি দিয়ে মাদায় সেচ দিতে হবে। রস না থাকলে কন্দ গজাবে ন আর বেশি রস থাকলে কন্দ পচে যাবে। মোথা লাগানোর সময় পুরুষ ও স্ত্রী মোথার অনুপাত ঠিক রেখে লাগাতে হবে। সেজন্য ৯ টি স্ত্রী মোথা লাগানোর পর ১ টি পুরুষ মোথা লাগাতে হবে। পুরুষ গাছে স্ত্রী গাছের তুলনায় দেরিতে ফুল আসে। তাই স্ত্রী গাছের মোথা লাগানোর ১৫-২০ দিন আগে পুরুষ গাছের মোথা লাগাতে হবে।

রোপণ দূরত্বঃ
সারি থেকে সারির দূরত্ব হবে ২ মিটার ও গাছ থেকে গাছের দূরত্ব হবে ২ মিটার। আবার মাদা থেকে মাদার দূরত্ব হবে ২.৫ মিটার।

কাঁকরোল চাষে সার ব্যবস্থাপনাঃ
কাঁকরোল গাছের নিয়মিত বৃদ্ধি ও ভালো ফলন পাওয়ার জন্য নিম্নোক্ত হারে সার প্রয়োগ করতে হবেঃ

সার সারেরপরিমাণ(প্রতিহেক্টরে)

১। গোবর ৩-৫ টন
২। ইউরিয়া ১২৫-১৫০ কেজি
৩। টিএসপি ১০০-১২৫ কেজি
৪।এসওপি/এমপি ১০০-১২৫ কেজি
৫।জিপসাম। ৮০-১০০ কেজি

সার প্রয়োগ পদ্ধতি

১) গোবর সার জমির তৈরির সময় ছিটিয়ে পানির সাথে মিশিয়ে দিতে হবে।
২) টিএসপি, এসওপি, জিপসাম চারা লাগানোর ১৫ দিন আগে আকার মাটির সাথে মিশিয়ে দিতে হবে।
৩) ইউরিয়া সার সমান দুভাগ করে মোথা গজানোর পর যথাক্রমে ১৫ ও ৩০দিন পর উপরিপ্রয়োগ করতে হবে।
৪) এসওপি প্রয়োগ করলে এমপি সার প্রয়োগ করতে হবে না।
৫) মাটি অধিক অম্লীয় হলে হেক্টরপ্রতি ৮০-১০০ কেজি ডলোচুন শেষ চাষের

কাঁকরোল চাষে অন্যান্য প্রযুক্তিঃ

অন্তর্বর্তীকালীন পরিচর্যাঃ

মোথা গজানোর পর আগাছা জন্মালে তা দমন করতে হবে।
নালার সাহায্যে জমিতে পানি সেচ দিতে হবে।
অতিরিক্ত পানি নিকাশের ব্যবস্থা রাখতে হবে।
প্রতিদিন ভোরবেলা স্ত্রী ফুলে কৃত্রিম পরাগায়ন করতে হবে।
রোগ ও পোকার আক্রমন দেখা দিলে তা দমনের ব্যবস্থা করতে হবে।
কাঁকরোলের গাছ ১০-১৫ সেমি লম্বা হলে চারার গোড়ায় ১ টি করে কাঠি পুঁতে দিতে হবে।
গাছ ৫০ সেমি লম্বা হলে বাউনির জন্য মাচা তৈরি করে দিতে হবে।
পরাগায়নঃ কাকরোলে প্রাকৃতিকভাবে পরাগায়ন খুব কম হয়। তাই ভালো ফলনের জন্য কাকরোল ফুলের কৃত্রিম পরাগায়ন করতে হয়। ফুলের কৃত্রিম পরাগায়ন পদ্ধতি নিম্নরূপ-

সকাল ৬ টার দিকে সদ্য ফোটা পুরুষ ফুল বোটাসহ কেটে নিয়ে সতেজ রাখার জন্য ফুলগুলোর বোটা পানির ভেতর ডুবিয়ে ছায়াযুক্ত স্থানে রেখে দিতে হবে।
এরপর পুরুষ ফুলের পুংকেশর ঠিক রেখে পাঁপড়িগুলো ছিঁড়ে ফেলতে হবে। এতে কৃত্রিম পরাগায়নের কাজ সহজ হবে।
তারপর স্ত্রীফুলের গর্ভমুন্ডের ওপর পুরুষ ফুলের পুংকেশর বা পরাগধানির রেণু বা হলদে গুড়া খুব আস্তে আস্তে ২-৩ বার স্পর্শ করাতে হবে। এই কাজটি স্ত্রী ফুল ফোটার ১২ ঘণ্টার মধ্যেই করতে হবে। এর ফলে গর্ভমুণ্ডে রেনু আটকে যাবে ও পরাগায়ন হবে। সাবধনতা অবলম্বন করলে ১ টি পুরুষ ফুল দিয়ে ৬-৭ টি স্ত্রী ফুলে কৃত্রিম পরাগায়ন সম্ভব।
রেটুন কাকরোলঃ

শীতের শুরুতেই কাকরোল গাছ মরে যায় এবং পরবর্তী বর্ষা না আসা পর্যন্ত মাটির নিচে মোথা নিষ্ক্রিয় অবস্থায় থাকে, যা থেকে পরের বছর আবার সঠিকভাবে যত্ন নিলে ভালো ফলন পাওয়া যায়। এভাবে কাঁকরোল চাষ করলে বীজের খরচ, রোপণ এবং রোপণ পরবর্তী খরচ অনেকাংশে কমে যায় এবং বেশি লাভবান হওয়া যায়।

ফসল সংগ্রহঃ
কাঁকরোল হলদে সবুজ হলে একটা একটা করে কেটে বা ছিঁড়ে সংগ্রহ করতে হয়। মোথা লাগানোর ৩০-৬০ দিনের মধ্যে স্ত্রী গাছে ফুল ফুটোতে শুরু করে। চারা গজানোর ৬০-৭০ দিন পর কাঁকরোল তোলা শুরু করা যায়। কাঁকরোল গাছে পরাগায়নের ১২-১৫ দিনের মধ্যে কাঁকরোল সংগ্রহের উপযোগী সময়।

জীবনকালঃ
কাঁকরোল গাছের জীবনকাল ১৩০-১৫০ দিন।

ফসল সংগ্রহের সময়ঃ মধ্য জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত কাঁকরোল সংগ্রহের উপযোগী সময়।

ফলনঃ
উপযুক্ত পরিচর্যা নিলে জাতভেদে হেক্টরপ্রতি কাঁকরোলের ২৫ থেকে ৩০ টন পর্যন্ত ফলন পাওয়া যায়। আবার শতক প্রতি ১০০-১২০ কেজি কাঁকরোলের ফলন পাওয়া যায়।

সম্পূর্ণ খবরটি পড়ুন
বিজ্ঞাপন

শীর্ষ সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক: শাইখ সিরাজ
© ২০২১ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। দা এগ্রো নিউজ, ফিশ এক্সপার্ট লিমিটেডের দ্বারা পরিচালিত একটি প্রতিষ্ঠান। ৫১/এ/৩ পশ্চিম রাজাবাজার, পান্থাপথ, ঢাকা -১২০৫
ফোন: ০১৭১২-৭৪২২১৭
ইমেইল: info@theagronews.com, theagronewsbd@gmail.com