আমাদের সাথে যোগাযোগ করুন

পরিবেশ

ফুলপুরে বাণিজ্যিকভাবে সৌদি খেজুর চাষ

ময়মনসিংহের ফুলপুরে বাণিজ্যিকভাবে সৌদি আরবের খেজুর চাষ শুরু হয়েছে। ২০১৭ সনে ৮টি চারা দিয়ে ফুলপুর বাসস্ট্যান্ড সংলগ্ন পুরাতন ডাকবাংলা রোডে খরিয়া নদীর পাড়ে ১০ শতাংশ জমিতে প্রথম সৌদি খেজুর চাষ শুরু করেন সাহাপুর গ্রামের কৃষক ও ফার্নিচার ব্যবসায়ী মো. আবুল কাশেম (৩৭)। সম্ভাবনাময় এ বাগানের উন্নতি দেখে নিজ গ্রামে আরও ৫৬ শতাংশ জমিতে তিনি আরেকটি খেজুর বাগান করেন। এখন তার ২টি বাগানে আজুয়া, শুক্কারী ও বকরীসহ বিভিন্ন জাতের প্রায় ৩ হাজার খেজুর চারা রয়েছে। প্রথম যে চারাগুলো রোপণ করা হয়েছিল ওইগুলোতে ফলন এসেছে। আশা করা হচ্ছে, কুরবানীর ঈদের আগেই বাণিজ্যিকভাবে বাজারে পাওয়া যাবে কাশেমের বাগানের খেজুর।

কাশেম ভালুকার খেজুর মোতালেবের নিকট থেকে উদ্বুদ্ধ হয়ে শুরু করেন এ বাগান। পরে খেজুর চাষ বিষয়ে ১৮ বছরের অভিজ্ঞ জ্ঞানেন্দ্র বাবু নামে এক ব্যক্তির স্মরণাপন্ন হন তিনি। তার পরামর্শ ও দিক নির্দেশনায় বাগানের পরিধি ও আয়তন আরও বৃদ্ধি করেন তিনি।এক ছেলে ও তিন মেয়ে সন্তানের জনক কাশেম তার ছেলের নামে বাগানের নাম দিয়েছেন ‘আব্দুল্লাহ আন্-নূর সৌদী খেজুর বাগান’। তার বাগানের খেজুর গাছগুলো কলা গাছের ন্যায় একেকটা ২০ থেকে ২৫টা করে চারা দেয়। পুরাতন ডাকবাংলা রোডে ঢুকলে চোখে পড়ে মুগ্ধ হবার মতো সেই অপূর্ব সুন্দর বাগান। বৃহস্পতিবার বাগানটিতে গিয়ে দেখা যায়, ছোট ছোট খেজুর গাছে মোচা বের হচ্ছে। একই গাছের গোড়ায় চতুর্দিকে নতুন চারা জন্ম নিয়েছে। এগুলো কলম কেটে আলাদা করা যায়। প্রতিনিয়ত দর্শনার্থীরা দেখতে আসছে কাশেমের খেজুর বাগান।

শেরপুর রোড মোড়ে কাশেমের একটি ফার্নিচারের দোকান রয়েছে। দোকানে সময় দেওয়ার ফাঁকে কর্মচারীদের সাথে নিজেও খেজুর বাগানের পরিচর্যা করেন তিনি। খরিয়া নদীর পাড়ে উন্মুক্ত ও অত্যন্ত চমৎকার পরিবেশে গড়ে ওঠেছে খেজুর বাগানটি। পরিদর্শনে গিয়ে দেখা যায়, কাশেম নিজেই বাগানে পানি দিচ্ছেন ও আগাছা পরিষ্কার করছেন।

কাশেম জানান, বর্তমানে তার বাগানের চারা বিক্রির উপযুক্ত হয়েছে। তিনি বলেন, এ পর্যায়ে পৌঁছাতে আমার প্রায় ৭-৮ লাখ টাকা খরচ হয়েছে। বীজ আমদানি, শ্রমিক খাটানো, সার গোবর ও খাবার সরবরাহসহ বিভিন্নভাবে আমার এ পরিমাণ খরচ হয়েছে। তবে বর্তমানে বাগান দেখে খুশিই লাগে। আশা করছি, অচিরেই লাভের মুখ দেখতে পারব।

তিনি জানান, তার বাগানে ২০০ থেকে ৫ হাজার টাকা দামের ৩ হাজার চারা রয়েছে। সঠিক দামে বিক্রি করতে পারলে খরচ বাদে কমপক্ষে ১৫ থেকে ২০ লক্ষ টাকা লাভ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। বাগানে ২ জন ব্যক্তির কর্মসংস্থান হয়েছে। সরকারি সহযোগিতা পেলে আমি এর পরিধি বড় করব এবং এতে আরও অনেকের কর্মসংস্থান হবে।

এ বিষয়ে উপজেলা কৃষি অফিসার আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, সৌদি খেজুর উৎপাদনে বাংলাদেশের মাটি খুবই উপযুক্ত। ইতোমধ্যে সীড স্টোর, নরসিংদী, নুহাশ পল্লী সংলগ্ন আলিমপুর, ভালুকা, গাজীপুরের পাশাপাশি ফুলপুরেও এর চাষ শুরু হয়েছে। এটি লাভজনক উচ্চ মূল্যের একটি ফসল। চাষে সফলতা পাওয়া গেলে অর্থনৈতিক উন্নতিসহ পুষ্টি ও খাদ্য ঘাটতি পূরণে সহায়ক হবে। ফুলপুরে গড়ে ওঠা সৌদি খেজুর বাগানে এখনও যাওয়া হয়নি তবে শিগগিরই যাব এবং লাগলে তাদের প্রয়োজনীয় কৃষিসেবা দেওয়া হবে।

পরিবেশ

ড্রাগন ফলের চাষ

>সবুজ পাহাড়ে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে ড্রাগন ফলের চাষ হচ্ছে। গাছে ফল এসেছে। বাগান থেকে ড্রাগন ফল বিক্রি করতে ফল সংগ্রহ করছেন হ্লাশিং মং চৌধুরী। প্রতি কেজি ৫০০ টাকায় বিক্রি হয়। গড়াছড়ি, রাঙামাটি ও চট্টগ্রামে এ ফল রপ্তানি করা হয়। খাগড়াছড়ি মহালছড়ি উপজেলার ধুমনিঘাট এলাকা থেকে তোলা কিছু ছবি।

সম্পূর্ণ খবরটি পড়ুন

পরিবেশ

আপেল কুল

ধানের খেত ও মাছের ঘেরের আইলে চলছে আপেল কুলের আবাদ। তেমন খরচা নেই চাষিদের। রং ধরে কুল পেকে গেলে গাছ থেকে পেড়ে নেওয়া হয়। বাজারে বিক্রি করে বেশ কিছু অর্থ জোটে। চাষির ঘরে আসে আর্থিক স্বাচ্ছন্দ্য। খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলার আপেল কুল নিয়ে এই ছবির গল্প।

সম্পূর্ণ খবরটি পড়ুন

পরিবেশ

এ পদ্ম এল কোত্থেকে?

কথা বলার ক্ষমতা থাকলে কুমিল্লার দক্ষিণ গ্রামের পদ্ম ফুলগুলো হয়তো রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘জন্মকথা’ কবিতার শিশুটির মতোই বলত:  
‘এলেম আমি কোথা থেকে
কোনখানে তুই কুড়িয়ে পেলি আমারে।’

এখন এই বিস্ময় ঘেরা প্রশ্নগুলো করছেন উদ্ভিদবিদ, গবেষকেরা। পদ্মের এ প্রজাতি দেশে তো বটেই, পুরো এশিয়ায় বিরল। উত্তর আমেরিকার একটি প্রজাতির সঙ্গে কিছুটা মিল আছে বটে। তবে ওই পদ্মের সঙ্গেও কিছু ক্ষেত্রে ভিন্নতা পেয়েছেন গবেষকেরা।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিদ্যা বিভাগের চেয়ারম্যান রাখহরি সরকারের কথা, ‘এই নতুন প্রকৃতির পদ্মফুল নিঃসন্দেহে ভিন্নতর। এমন পদ্ম আগে কোথাও পাওয়া যায়নি।

আমাদের উদ্ভিদ জীববৈচিত্র্যে এটি একটি নতুন সংযোজন। এটা কীভাবে এখানে এল তা সত্যিই আশ্চর্যের।’

গত বছরের ৮ সেপ্টেম্বর প্রথম আলোয় পদ্মফুল নিয়ে একটি ছবি ও প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। কুমিল্লার বুড়িচং উপজেলার রাজাপুর ইউনিয়নের দক্ষিণ গ্রামের একটি জলাশয়ের পদ্মের ছবিটিতে দৃষ্টি আকৃষ্ট হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিদ্যা বিভাগের শিক্ষক এবং বিভাগের সঙ্গে কাজ করা গবেষকদের।


এই ‘অন্যরকম’ পদ্মের সন্ধানে ছুটে যান বিভাগের কয়েকজন শিক্ষক ও গবেষক। তাঁরা  ইতিমধ্যে পাঁচবার ওই এলাকায় গেছেন এবং নমুনা সংগ্রহ করেছেন। গবেষণার মাধ্যমে এই বিশেষ পদ্ম ফুলটিকে যথাযথভাবে শনাক্ত করার কাজ এগিয়ে যাচ্ছে।

গবেষকেরা বলেন, বিশ্বে পদ্মের দুই প্রজাতি। এর একটি এশিয়ান পদ্ম  (বৈজ্ঞানিক নাম-নিলাম্বো নুসিফেরা গেয়ার্টনার (Nelumbo nucifera Gaertner)। এশিয়ার বিভিন্ন দেশে এ পদ্ম জন্মে। এর রং হয় সাদা এবং হালকা বা গাঢ় গোলাপি।

গোলাপি ও সাদা বর্ণের পদ্মফুল দেখতে আমরা অভ্যস্ত এবং আমাদের দেশের সর্বত্র এই পদ্মটিই বেশি পাওয়া যায়।

আরেক প্রজাতির পদ্ম হলো আমেরিকান লোটাস বা ইয়োলো লোটাস। (বৈজ্ঞানিক নাম Nelumbo lutea Willd. )। এ প্রজাতির পদ্ম শুধু উত্তর ও মধ্য আমেরিকায় জন্মে।

বুড়িচংয়ে পাওয়া এ পদ্ম আমেরিকান লোটাসের কাছাকাছি, অন্তত রঙের দিক থেকে। কিন্তু বুড়িচংয়ের পদ্মের সঙ্গে আমেরিকান লোটাসের কিছু ক্ষেত্রে ভিন্নতা আছে বলে জানান রাখহরি সরকার। তিনি বলেন, ‘আমেরিকান লোটাসের পাপড়ির সংখ্যা যেখানে ২০ থেকে ২৫টি হয়, সেখানে নতুন এ পদ্মের পাপড়ির সংখ্যা ৭০টির মতো। আবার এর পুংকেশরের গঠনও আমেরিকান লোটাস থেকে আলাদা।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিদ্যা বিভাগের সঙ্গে গবেষণার কাজে আছে বেঙ্গল প্ল্যান্টস রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশন। এর নির্বাহী পরিচালক শিকদার আবুল কাসেম শামসুদ্দীন শুধু পদ্মফুল নিয়ে গবেষণা করছেন পাঁচ বছর ধরে। তিনিও বুড়িচংয়ে যান কয়েক বার। শামসুদ্দিন সিকদার বলেন, সাধারণ পদ্মের সঙ্গে এর আরেক ভিন্নতা হলো এটি আকারে বড়। এর গঠন শৈলী এবং বর্ণ বৈচিত্র্যময়। হালকা হলুদ বর্ণের এমন পদ্ম ইতিপূর্বে কোথাও পাওয়া যায়নি। কাজেই হলুদ বর্ণের পদ্মটি বাংলাদেশে পাওয়া সমস্ত পদ্মফুল থেকে ভিন্নতর এবং উদ্ভিদ জীববৈচিত্র্যের দৃষ্টিতে অত্যন্ত উৎসাহজনক

এই পদ্ম এখানে এল কীভাবে সেই প্রশ্নটি এখন গবেষকদের ভাবাচ্ছে। তাঁদের ধারণা, হয়তো অনেক আগে এলাকার কেউ এই পদ্ম যেখানে পাওয়া যায় সেখান থেকে নিয়ে এসেছিলেন। অর্থাৎ কেউ হয়তো উত্তর বা মধ্য আমেরিকার কোনো দেশ থেকে নিয়ে এসেছিলেন। হয়তো দীর্ঘদিনের বিবর্তনে গঠন বৈচিত্র্যের দিক থেকে এ পদ্মে ভিন্নতা এসেছে।

বুড়িচংয়ের দক্ষিণ গ্রামের খুব বয়স্ক ব্যক্তিরা বলছেন, তাঁরা ছোটবেলা থেকে এ পদ্ম দেখছেন। আর এ গ্রামের কোনো ব্যক্তি এখন বা অতীতেও ওসব দেশে গিয়েছিলেন, এর কোনো নজির নেই।

তবে একটি পদ্মের বেঁচে থাকার ক্ষেত্রে দু-তিন শ বছর কোনো বিষয় না, এমনটাই মন্তব্য করেন অধ্যাপক রাখহরি সরকার। তাঁর কথা, পদ্মের বীজ এক হাজার তিন শ বছর পর্যন্ত টিকে থাকতে পারে। তাই কয়েক শ বছর আগে এখানে এ বীজ এলে আশ্চর্য হওয়ার কিছু থাকবে না।

তবে বুড়িচংয়ের পদ্মের উৎপত্তি, এর বিকাশ নিয়ে গবেষকেরা কাজ করে যাচ্ছেন। এ নিয়ে শেষ কথা বলার সময় যে আসেনি, তা তাঁরা জোর দিয়েই বলছেন। শুধু গবেষকেরা একটি বিষয় নিশ্চিত, এ পদ্ম একেবারে নতুন। আর দেশের উদ্ভিদ প্রজাতির পরিবারে এ এক নতুন সংযোজন। সংগত কারণে, এটি গবেষণার একটি নতুন উপাদান।

জলাশয় কমে আসার সঙ্গে সঙ্গে দেশের অনেক এলাকা থেকে পদ্ম হারিয়ে যাচ্ছে। গবেষকদের কথা, বছর আট-দশ বছর আগে যেসব বিলে বা জলাশয়ে পদ্ম ছিল তা এখন পাওয়া যায় না। পদ্ম কেবল জলাশয়ে শোভা বৃদ্ধিকারী ফুল না। এটি অনেক ভেষজ গুণ সম্পন্ন এবং পুষ্টিকর খাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত হয়। বিশেষ করে পদ্মের শিকড় চীন, জাপানসহ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অনেক দেশে স্বীকৃত ও সমাদৃত। এখন বুড়িচংয়ের এ পদ্মের যদি যথাযথ সংরক্ষণ হয়, এর বিস্তার হয় তবে আমাদের প্রকৃতির জন্য এ হবে এক বড় শুভ সংবাদ।

সম্পূর্ণ খবরটি পড়ুন

পরিবেশ

করোনাকালের বসন্ত

সাতসকালে ঘুম থেকে উঠে কাজে দৌড়াতে হয়। এ জন্য মোবাইল ফোনে অ্যালার্ম দিয়ে রাখতে হয়; না হলে দেরি হয়ে যাওয়ার সুযোগ আছে। গত কদিন অবশ্য অ্যালার্মের আগেই টের পেয়ে যাচ্ছি। কারণটা অনুসন্ধান করতে গিয়ে বুঝলাম, বাসার চারপাশের গাছে পাখিদের গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে। শীতকাল আনুষ্ঠানিকভাবে পাততাড়ি গুটিয়ে বিদায় নিয়েছে আগস্টের ৩১-এ। এমনিতে সিডনির আবহাওয়া যেন পাড়ার পাগলাটে খ্যাপা ছেলেটার মতো। একই দিনে কখনো ঠান্ডা, কখনো গরম, কখনো নাতিশীতোষ্ণ আবার কখনো বৃষ্টি; কিন্তু শীতের পর বসন্তের আগমনী বাতাস দিয়ে ঠিক ঠিক জানিয়ে যায় ঋতুরাজ আসছে। সেপ্টেম্বরের ১ তারিখেই প্রকৃতিতে এমন একটা বাতাস এসে সেই বার্তা জানিয়ে গেল, যে বাতাসকে বাংলাদেশের ভাষায় বলে লিলুয়া বাতাস। লিলুয়া বাতাসে মনটা হয় পাগলপারা। মনের মধ্যে একটা অব্যক্ত কাব্যভাব তৈরি হয়; মনে হয় ঘরবাড়ি ছেড়ে বাইরে চলে যাই। হাঁটতে থাকি গন্তব্যহীনভাবে। অকৃপণভাবে মাখতে থাকি এই লিলুয়া বাতাস। অবস্থাদৃষ্টে মনে হয়, যেন প্রেমটা এই বাতাসের সঙ্গেই, তাই অন্য কোনো সঙ্গীর দরকার নেই। অন্য কেউ থাকলে বরং লিলুয়া বাতাসের সঙ্গে এই নীরব কথোপকথনে ছেদ পড়তে পারে। এরপর থেকে তাপমাত্রা বাড়ছে। আজ যেমন জ্যাকেটটা বাসায়ই ফেলে আসলাম লিলুয়া বাতাসের সঙ্গে মাখামাখি ভালোবাসা করব বলে।

অ্যালার্মের আগেই ঘুম ভেঙে যাওয়ার কারণটা বের করেছি। ঠিক তখনই মনে পড়ে গেল বাংলাদেশের বসন্তকালের সবচেয়ে বড় অনুষঙ্গ শিমুল ফুলের কথা, আমাদের স্থানীয় ভাষায় বলে মাদার ফুল। কুষ্টিয়াতে আমাদের শোয়ার ঘরের ঠিক পেছনেই ছিল একটা বেলগাছ আর তার একটু পেছনেই ছিল একটা শিমুলগাছ। বসন্তের এই সময়টাতে বেল ও শিমুলগাছে ফুল ফুটতে শুরু করলে অনেক পাখি সকাল সকাল এসে হাজির হতো আর তাদের কিচিরমিচির শুনে আমাদের ঘুম ভেঙে যেত। বেলফুলের ঘ্রাণ যে একবার নিয়েছে, সে আর জীবনেও ভুলবে না। বেলগাছটাতেও অনেক পাখি বসত। বেল আর শিমুলগাছ একসময় সমান উচ্চতার ছিল কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় বেলগাছের কলেবর খুব একটা না বাড়লেও শিমুলগাছ ছাতার মতো তার ডালপালা ছড়িয়ে চারিদিক ঢেকে দিয়েছিল। আমরা ঘুম থেকে উঠেই শিমুলগাছের তলায় গিয়ে পড়ে থাকা শিমুল ফুলগুলো বেছে বেছে কুড়িয়ে নিতাম, যেগুলোর পুংকেশরগুলো তখনো শক্ত-সমর্থ আছে। ফুলের সেই অংশটাকে যে পুংকেশর বলে, সেটা জেনেছি অনেক পরে আর স্থানীয় ভাষায় আমরা কী বলতাম, সেটা আর এখন মনে নেই। তারপর শুরু হয়ে যেত আমাদের টানাটানি খেলা। আমার হাতের আঙুলে একটা ছোট পুংকেশর আর মেজোর হাতে একটা পুংকেশর। আমারটার সঙ্গে ওরটার ঘাড়ে ঘাড় লাগিয়ে এক টান৷ যার পুংকেশরের মাথাটা খুলে যাবে, সে হেরে যাবে আর বিপরীতজন জিতে যাবে। ছোটজন আমাদের এই খেলার নিবিষ্ট দর্শক। এভাবেই খেলা চলবে যতক্ষণ পর্যন্ত না ভেতর বাড়ি থেকে মায়ের ডাক পড়ছে।

এসব ভাবতে ভাবতেই দাঁত ব্রাশ করে, হাত-মুখ ধুয়ে ত্বরিত গতিতে তৈরি হয়ে নিলাম। বাইরের দরজা খুলতেই লিলুয়া বাতাসে শরীরটা শীতল হয়ে গেল। গাড়ি স্টার্ট দিতেই পাকিস্তানের নব্বইয়ের দশক কাঁপানো ব্যান্ডের ভোকাল আলী আজমতের কণ্ঠে বেজে উঠল ‘ইয়ার বিনা দিল মেরা নাহি লাগতা’ আসলেই দেশে সব ইয়ার ফেলে এসে বিদেশে আর মন লাগে না। আমি তাড়াতাড়ি গানটা বন্ধ করে দিয়ে গাড়ির কাচগুলো নামিয়ে দিলাম, কারণ বাইরে থেকে হাজারো পাখির গুঞ্জন ভেসে আসছে। কিছু দূর যাওয়ার পর পেম্ব্রুক রোড। এই রাস্তা ধরে সোজা পশ্চিম দিকে গেলেই মিন্টো স্টেশন।

সকালের সূর্যটা একেবারে পেছন দিকে ফেলে এগিয়ে যেতে হয় তখন গাড়ির বাম দিকের লুকিং গ্লাসে সূর্যের ছায়া পড়ে। এটাকে আমার কাছে মামা-ভাগনের লুকোচুরি খেলা মনে হয়। আমি মাথাটা সামনে-পেছনে করে সুয্যিমামার প্রতিবিম্বকে পাশ কাটানোর চেষ্টা করি। অবশ্য স্টেশনের পশ্চিম দিকের প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে যখন ট্রেনের জন্য অপেক্ষা করি, তখনই ঠিকই সুয্যিমামার কাছে ধরা পড়ে যাই। স্টেশনে গাড়ি পার্ক করে কিছু দূর হেঁটে গিয়ে প্ল্যাটফর্মে উঠতে হয়। দেখি স্টেশনমাস্টার একটা পিক আপ লাঠি নিয়ে স্টেশনের বেড়ার বাইরে থেকে আবর্জনাগুলো তুলে তুলে একটা বিন ব্যাগে ভরছেন।

মিন্টো স্টেশনে মোট তিনজন স্টেশনমাস্টার কাজ করেন; এঁদের দুজন প্রৌঢ় মহিলা আর একজন মধ্যবয়সী পুরুষ। আমি ওনাদের প্রত্যেককেই চিনি এবং ট্রেন আসার আগ পর্যন্ত ওনাদের সঙ্গে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলাপ করি। পুরুষ ভদ্রলোকের কথা বলার অসুখ আছে। উনি বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কথা বলেন। গত তিন দিন ছুটিতে ছিলেন। আমি জিজ্ঞেস করলাম, কী করে ছুটি কাটালেন?

– আর কি, সেই পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা অভিযান।

গতকাল বলছিলেন, ওনার মেয়ের বিয়ে উপলক্ষে ওনার শ্যালিকা আর ভায়রা এসেছিলেন ভারত থেকে কিন্তু করোনার কারণে আটকা পড়েছিলেন। সৌভাগ্যবশত গত পরশু তাঁরা যেতে পেরেছেন। আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম, ট্রানজিট কোথায় হবে? বললেন, ইরাকে, কারণ এখন নাকি শুধু এমিরেটস এয়ারওয়েজেরই কয়েকটা বিমান চলছে, বাকিদের পুরোপুরি বন্ধ। তা-ও স্টেশনে বিমানে চড়ার আগে অনেক ধরনের চেকআপ করতে হয়েছে।

গতকাল আমি তাঁকে বলেছিলাম, দেখেছেন তাপমাত্রা বাড়ছে। উনি বলেছিলেন, আজকে তো নাকি তাপমাত্রা ৩০ ডিগ্রি হয়ে যাবে।

আমি বলি, তার মানে তো গ্রীষ্মকাল চলেই এল, কী বলেন?

উনি বললেন, ঠিক তাই।

এরপর ট্রেন চলে আসায় উনি আমাকে বিদায় দিয়ে নিজের অফিসকক্ষের দিকে হাঁটা ধরলেন। মহিলা দুজনের মুখভঙ্গিটাই এমন থাকে যে কেউই সাহস করে তাঁদের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করেন না। তার মধ্যে একজনকে একদিন আমি ট্রেনে দেখে চিনে ফেলেছিলাম এবং জিজ্ঞেস করেছিলাম, আপনি কি আর মিন্টো স্টেশনে কাজ করেন না? শুনে উনি ভীষণ খুশি হয়েছিলেন এবং বলেছিলেন, আসলে শিফট অনুযায়ী কাজ তো, তাই সব সময় মিন্টোতে দেখা যায় না। সেদিন থেকে ওই ভদ্রমহিলার সঙ্গে দেখা হলেই কুশলবিনিময় করি। আর দ্বিতীয় মহিলার সঙ্গে আজ সকালে দেখা হলো।

আমি বললাম, কী সুন্দর একটা দিন এবং দেখেন তাপমাত্রা বাড়ছে।

ওনার উত্তর, হ্যাঁ, অস্ট্রেলিয়ার বসন্তকালটা আসলেই দারুণ। এরপর তাঁকে শুভকামনা জানিয়ে আমি প্ল্যাটফর্মের দিকে হাঁটা দিই। উনিও আমাকে ফিরতি শুভেচ্ছা জানিয়ে নিজের কাজে মন দেন।

ট্রেনে উঠেই ইউটিউব খুঁজে বসন্তের গান ছেড়ে দিই। গান শুরুই হলো শাহ আবদুল করিমের ‘বসন্ত বাতাসে সইগো’ দিয়ে। এরপর এল একটার পর একটা রবীন্দ্রসংগীত, ‘ওহে গৃহবাসী খোল দ্বার খোল’, ‘ফাগুন হাওয়ায় হাওয়ায় করেছি যে দান’, ‘আজি দখিন দুয়ার খোলা’, ‘আহা আজি এ বসন্তে’সহ আরও অনেক গান। তবে আমি বেছে বেছে দলীয় সংগীতগুলো শুনছিলাম; কারণ এর মধ্য দিয়ে উৎসবের আবহ পাওয়া যাচ্ছিল মনে মনে। করোনার ভয় কাটিয়ে ট্রেন-বাসে ভিড় বাড়ছে। অবশ্য আজকে শুক্রবার বলে ট্রেন অনেকটাই ফাঁকা ছিল

মাসকাট স্টেশনে নেমে বাসে করে অফিসে যেতে হয়। অফিসে যাওয়ার পথেই একটা হ্রদ; তার আগে আরও একটু খোলা জায়গা। সেখানে বেশ কয়েকটা পালতে মাদারগাছ। পালতে মাদারগাছেও বসন্তকালে লাল টকটকে ছোট ছোট ফুল ধরে। পালতে মাদারগাছেও বসন্তকালে লাল টকটকে ছোট ছোট ফুল ধরে। কুষ্টিয়া অঞ্চলে শিমুল ফুলকে বলে মাদার ফুল আর মাদার ফুলের চেয়ে ছোট এই ফুলগুলোকে বলে পালতে মাদার। আর অস্ট্রেলিয়ার বসন্তকালের সিগনেচার ফুল ‘ওয়াটল’ তো আছেই। ওয়াটল দেখতে হুবহু বাংলাদেশের বাবলা ফুলের মতো ছোট ছোট হলুদ বর্ণের এবং গাছের পাতার আকৃতিও একই রকম কিন্তু ওয়াটলগাছে বাংলাদেশের বাবলাগাছের মতো বড় বড় কাঁটা নেই।

ছোটবেলায় আমরা যখন রাখালদের সঙ্গে মাঠে গরু রাখতে যেতাম, তখন রাখালেরা একটা জিনিস শিখিয়ে দিয়েছিল। বাবলাগাছের কচি ডগা চিবিয়ে তারপর পানি খেলে পানি মিষ্টি লাগে। এরপর থেকে পানি খাওয়ার আগে সব সময়ই বাবলার ডগা খুঁজে বেড়াতাম। আমি ইচ্ছে করেই দুটো স্টপেজ আগে বাস থেকে নেমে পড়লাম। বাকি রাস্তা হেঁটে যেতে হবে। মিনিট পনেরোর হাঁটা পথ। ঠিক সময়ে অফিসে পৌঁছে যাব। বাস থেকে নেমে কিছু দূর যাওয়ার পর দেখি পালতে মাদারগাছের ফুলগুলো বাতাসে দুলছে আর হাসছে। আমি প্রথমে পুরো গাছটার এবং পরে কয়েকটা ডালের আলাদা ছবি তুলে নিলাম। আরও কিছু দূর যেতেই দেখা পেলাম ওয়াটলগাছের। ওয়াটল ফুলেরও বেশ কয়েকটা ছবি তুলে নিলাম।

হেঁটে হেঁটে অফিসের দিকে যাচ্ছি গায়ে বসন্তের লিলুয়া বাতাসের কোমল পরশ মাখতে মাখতে। গত পরশু দিন ছিল পূর্ণিমা। সারা দিন অফিসে বসে বসে পরিকল্পনা করলাম এবারের পূর্ণিমাটা সৈকতে গিয়ে উপভোগ করব। ব্যাপারটা জানার পর গুগল করে আমার বস ‘ব্রাইটন লে স্যান্ডস’ সৈকতটা দেখিয়ে বলল, এখানে পুরো জায়গাটাই সৈকত। এখানে যেতে পারো। যেখানে পার্কিং পাও, সেখানে নেমে পড়লে। আর কাছাকাছি বাচ্চাদের কয়েকটা খেলাধুলারও জায়গা আছে, তাই ওরাও বিরক্ত হবে না। আর সবচেয়ে ভালো ব্যাপার চাঁদটা উঠবে একেবারে জায়গাটার মাঝখানে দিয়ে, তাই পুরো সৌন্দর্যটা দেখতে পাবে। বাসায় ফিরে গিন্নিকে পরিকল্পনার কথা বলতেই বাতিল করে দিলে; কারণ পরের দিন বাচ্চা দুইটারই স্কুল আছে। সকালে ঘুম থেকে উঠে তাদের তৈরি করে কেয়ারে ড্রপ করে গিন্নি অফিসে যায়। ওরা কেয়ার থেকে স্কুলে যায়।

সৈকতে যাওয়ার পরিকল্পনা বাতিল হয়ে যাওয়ায় আমরা পরিকল্পনা করলাম আমাদের মতো করে পূর্ণিমাটা উদযাপন করার। যেহেতু বসন্ত চলে এসেছে, তাই বাইরের তাপমাত্রা সহনীয়। আমরা আমাদের বাসার পেছনের জায়গাটায় বেরিয়ে পড়লাম। তারপর আমরা তিনজন মিলে কিছুক্ষণ লুকোচুরি (আমাদের এলাকার ভাষায় পলানটুক আর অস্ট্রেলিয়ার ভাষায় পিকাবু) খেললাম। ততক্ষণে চাঁদটা বেশ ওপরে উঠে এসেছে। আমাদের পেছনের প্রতিবেশী কেইনদের বাসায় একটা তালের মতো গাছ আছে আমাদের দুজনের জায়গার মাঝের বেড়া বরাবর। আমরা ইচ্ছে করেই তালগাছের ছায়ায় দাঁড়িয়ে চাঁদ মামার সঙ্গে লুকোচুরি খেলি। তালের পাতার আড়ালে কখনো চাঁদ মামা লুকিয়ে পড়েন আবার কখনোবা আমরা বেড়ার আড়ালে লুকিয়ে পড়ি। এভাবে খেলতে খেলতে ক্লান্ত হয়ে আমরা আমাদের বাইরের ঘরে চলে আসি। সেখানে বাচ্চাদের জন্য নানা ধরনের খেলনা রাখা—লুডু থেকে শুরু করে ক্যারম, দাবা, তাস আর আছে বাচ্চাদের অনেক খেলনা। আমি আর আমার মেয়ে তাহিয়া তাস নিয়ে বসলাম। রায়ান পাশে রাখা বিছানায় শুয়ে কিছুক্ষণের মধ্যেই নাক ডাকা শুরু করল। আমি আর তাহিয়া কল ব্রিজ খেললাম বেশ কিছুক্ষণ। তারপর রাত ১০টার দিকে ঘরে ফিরে এলাম।

কর্মব্যস্ত পাঁচ দিনের শেষে সপ্তাহান্তের দুটো দিন কেটে যায় বাচ্চাদের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের সঙ্গী হয়ে। আমাদের বাসার খুব কাছেই একটা পার্ক আছে; পাসফিল্ড পার্ক। নাম পার্ক হলেও কোনো রাইড নেই শুধু মাঠের মাঝ দিয়ে সরু কংক্রিটের রাস্তা বানানো। তার ওপর দিয়ে মানুষ হাঁটাহাঁটি করে আর বাচ্চারা সাইকেল চালায়। ৩০ আগস্ট রোববার ছেলে রায়ানকে নিয়ে সকালবেলা গেলাম পাসফিল্ড পার্কে। আমি একটা গাছের ছায়ায় একটা মরা গাছের ডালের ওপর বসে থাকলাম আর রায়ান সামনের কংক্রিটের চক্রাকার রাস্তা দিয়ে সাইকেল চালাচ্ছিল আর একটু পরপর এসে পানি খেয়ে যাচ্ছিল। বসন্তের আগমনী বার্তা নিয়ে পাশের গাছগুলোতে বিভিন্ন ধরনের পাখি গান গেয়ে যাচ্ছে। একটা পাখির স্বর শোনা যাচ্ছিল অবিরাম। হালকা হিমেল বাতাস উঁচু ঘাসের ডগাগুলোকে দোলা দিয়ে যাচ্ছিল। মনে হচ্ছিল সারা দিন বসে বাতাসের এই আদর মাখি। সবচেয়ে ভালো হতো ঘাসের বিছানায় শুয়ে পড়তে পারলে।

সে সময়ই বেশ কিছু মানুষ এসেছিল তাদের কুকুরকে নিয়ে হাঁটতে। প্রত্যেকে একই কথা বলছে, আজকে একটা দারুণ দিন। এক প্রৌঢ় দম্পতি আমাদের বললেন, বসন্তের আগমনী বার্তা আবহাওয়ায়। রায়ান অবশেষে ক্লান্ত হয়ে এসে আমার পাশে গাছের ডালটায় বসে বিশ্রাম নিল কিছুক্ষণ, তারপর আবারও ফিরে গেল সাইকেল চালাতে। কী এক অদ্ভুত মায়াময় পরিবেশ ছিল চারপাশে। আসলে প্রকৃতি তাঁর বুকে আমাদের জন্য বিশাল ভালোবাসা জমা করে রেখেছে। আমাদের শুধু একটু থেমে সেটা অনুভব করা দরকার।

অফিসে ঢুকেই আমাদের উদযাপনের কথা বললাম সহকর্মী মিককে (মাইকেলের ডাকনাম)। শুনে সে বলল, খুব ভালো করেছ। আমরা একটু পরে কফি খেতে বের হব। আবহাওয়ার সঙ্গে মানুষের মনের ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার সম্পর্ক খুবই নিবিড়। কফি আনতে যেতে যেতে মিককে বলছিলাম বাংলাদেশে কীভাবে বসন্ত বরণ করে নেওয়া হয়, তার গল্প। আমি বললাম, বসন্তকে আমরা বলি ঋতুরাজ ‘কিং অব অল সিজনস’। আর বসন্তকে বরণ করে নেওয়ার জন্য আছে আমাদের নানা আয়োজন। আর বসন্তকে নিয়ে কত যে গান-কবিতা রচিত হয়েছে, তার ইয়ত্তা নেই। আর প্রকৃতিতেও পরিবর্তনটা সহজেই চোখে পড়ে। সারা দেশ শিমুলের লাল ফুলে রাঙা হয়ে ওঠে। পাখির দৃষ্টিতে দেখলে মনে হবে কোনো অবুঝ শিশু লাল রং হাতে মেখে একটা সবুজ জমিনে ছিটিয়ে দিয়েছে; ঠিক অস্ট্রেলিয়াতে যেমন পথে প্রান্তরে বেগুনি জ্যাকারান্ডা ফুটে থাকে, আমাদের থাকে শিমুল। শুনে মিক বলল, তোমাদের সংস্কৃতি আসলেই অনেক সমৃদ্ধ। আমি বললাম, বহু ধর্মের, বহু মতের মানুষকে এই সংস্কৃতিটাই তো এক করে রেখেছে। আমাদের ইতিহাসও এই সংস্কৃতিনির্ভর কিন্তু এবার বসন্তকে বরণ করে নেওয়ার জন্য কোনো আয়োজন করা হয়নি করোনার প্রাদুর্ভাবের কারণে। মিক বলল, এইবার তো অস্ট্রেলিয়াতে তীব্র শীত পড়ল।

আমি বললাম, হ্যাঁ, এমনকি শীতকালের শেষের কদিনও ভোরবেলা আমি গাড়ির ওপর থেকে পুরু বরফের আস্তরণ সরিয়েছি। ঠান্ডাটা এতই বেশি ছিল যে পানি ঢেলে বরফ পরিষ্কার করার পর আবার সেই পানিটাই বরফে পরিণত হয়ে যাচ্ছিল। আমি বললাম, তবুও দেখো প্রাকৃতিক নিয়মে বসন্ত কিন্তু ঠিকই চলে এল। আমার কেন জানি মনে হয়, করোনার এই প্রাদুর্ভাব তা সে যতই দীর্ঘ হোক না কেন, একদিন না একদিন ঠিক শেষ হবে এবং আমরা আবারও স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যাব। আমরা আবারও আগের মতো নির্ভাবনায় চলাফেরা করতে পারব, সাগরে, সৈকতে, পাহাড়ে বেড়াতে যেতে পারব, সিনেমা দেখতে হলে যেতে পারব।

মিক তখন বলল, গুড ও ইউ মেট।

সম্পূর্ণ খবরটি পড়ুন

পরিবেশ

গরু-ছাগলেই খাচ্ছে ফুল

  • করোনায় বেচাবিক্রি বন্ধ। পাঁচ মাসে নষ্ট হয়েছে ৪৫০ কোটি টাকার ফুল। তাই প্রণোদনা ঋণ পেতে চান ফুলচাষি ও ব্যবসায়ীরা।
  • করোনার কারণে গত ২৪ মার্চ থেকে গদখালী ফুলের বাজার বন্ধ রয়েছে। আর মে মাসের তৃতীয় সপ্তাহে ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড় আম্পানের তাণ্ডবে তছনছ হয়ে গেছে ফুলখেত।
  • বাংলাদেশ ফ্লাওয়ার সোসাইটি জানায় দেশে করোনার কারণে গত পাঁচ মাসে ৪৫০ কোটি টাকার ফুল নষ্ট হয়েছে।

করোনাভাইরাস ও ঘূর্ণিঝড় আম্পান যশোরের গদখালীর ফুলচাষি ও ব্যবসায়ীদের চরম আর্থিক সংকটের মুখে ঠেলে দিয়েছে। কারণ, মাঠে তেমন ফুল নেই, যাও–বা আছে, তা-ও বিক্রি হচ্ছে না। ফলে গরু-ছাগলকেই খাওয়ানো হচ্ছে ফুল। এখন অবস্থা এতটাই সঙিন যে সংসারের দৈনন্দিন খরচ মেটাতেও হিমশিম খাচ্ছেন ফুলচাষি ও ব্যবসায়ীরা। এর ওপর রয়েছে ব্যাংক ও এনজিওগুলোর ঋণ পরিশোধের চাপ।


করোনার কারণে গত ২৪ মার্চ থেকে গদখালী ফুলের বাজার বন্ধ রয়েছে। আর মে মাসের তৃতীয় সপ্তাহে ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড় আম্পানের তাণ্ডবে তছনছ হয়ে গেছে ফুলখেত, ধ্বংস হয়েছে ফুল ও নার্সারির শত শত শেড।

বাংলাদেশ ফ্লাওয়ার সোসাইটির সভাপতি আবদুর রহিম প্রথম আলোকে বলেন, দেশে করোনার কারণে গত পাঁচ মাসে ৪৫০ কোটি টাকার ফুল নষ্ট হয়েছে। এর মধ্যে শুধু যশোর অঞ্চলেই অন্তত ৩০০ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। এতে এই অঞ্চলের ফুলচাষি ও ব্যবসায়ীরা চরম বিপর্যয়ে পড়েছেন।

আবদুর রহিম বলেন, ‘দেশের প্রায় ৩০ লাখ মানুষের জীবিকা ফুলের চাষ ও ব্যবসার ওপর নির্ভরশীল। ফুলচাষিদের প্রায় ৭০ ভাগ বর্গাচাষি। করোনাভাইরাস ও আম্পানের কারণে এই খাতে যে পরিমাণ ক্ষতি হয়েছে, তা পুষিয়ে নিতে ৫০০ কোটি টাকার কৃষি প্রণোদনা ঋণ প্রয়োজন। ক্ষতিগ্রস্ত বর্গাচাষি ও ফুল ব্যবসায়ীদের সহজ শর্তে ৪ শতাংশ সুদে ঋণ দিতে হবে। তা না হলে এই খাতকে বাঁচানো কঠিন হয়ে পড়বে।

২৫ বছর ধরে ফুলের চাষ করা প্রতিবন্ধী ইমামুল হোসেন-সাজেদা দম্পতি জানান, সংসার ও দুই ছেলেমেয়ের লেখাপড়ার ব্যয় মেটাতে ভেঙে পড়া শেডের টিন বিক্রি করে দিয়েছেন। সাজেদা বেগম বলেন, ‘ঋণের কিস্তির জন্য ব্যাংক ও এনজিওর লোকজন নিয়মিত বাড়িতে আসছেন। কিন্তু কিস্তি পরিশোধ করতে পারছি না। কী খাব আর কী করে ঋণ শোধ করব, ভাবতেই মাথায় যেন আকাশ
ভেঙে পড়ে।’

ঝিকরগাছা উপজেলার পানিসারা গ্রামের মহিদুল ইসলাম বলেন, ‘চার বিঘা জমিতে রজনীগন্ধার চাষ করেছি। বিঘাপ্রতি প্রায় তিন লাখ টাকার ফুল বিক্রি হওয়ার কথা। কিন্তু করোনাভাইরাস ও আম্পান আমাদের পথে বসিয়েছে।’

পানিসারার আরেক চাষি মো. জালাল উদ্দীনের একটি ফুলের দোকানও আছে। তিনি জানান, দিনে ১০০ টাকাও বিক্রি হয় না। অথচ আগে ২-৩ হাজার টাকা বেচাকেনা হতো।

ফুলের দোকানি তারেক রহমান বলেন, ‘আগে দিনে ১০-২০ হাজার টাকার এবং বিশেষ দিনগুলোতে ১ লাখ টাকা পর্যন্ত ফুল বিক্রি করেছি। এখন দিনে সর্বোচ্চ ৭০০ টাকার ফুল বিক্রি হয়। এতে চলছে না।’

১৯৮২ সালে একটি নার্সারির মাধ্যমে ঝিকরগাছা উপজেলার পানিসারা এলাকায় ফুলের চাষ শুরু করেন শের আলী সরদার। দেশে বাণিজ্যিকভাবে ফুল চাষের পথিকৃৎ বলা হয় তাঁকে। তাঁকে দেখে পানিসারা ও গদখালী এলাকায় ৭৫টি গ্রামের প্রায় ১০ হাজার চাষি ফুল চাষে এসেছেন। তিনি বলেন, ‘৪১ বছরের ফুল চাষের জীবনে এমন অবস্থা আমি কখনো দেখিনি।’

পানিসারা গ্রামের আজিজুর সরদার জানান, আগে প্রতি মাসে যেখানে দেড় থেকে পৌনে দুই লাখ টাকার ফুল ও চারা বিক্রি হতো, সেখানে গত পাঁচ মাসে হয়েছে মাত্র ৯৫০ টাকা। ব্যাংকে ১৩ লাখ টাকা এবং দুটি এনজিওতে ৭ লাখ টাকার ঋণ রয়েছে তাঁর। ঋণের কিস্তি দিতে ব্যাংক ও এনজিও থেকে চাপ দিচ্ছে। তিনি ঝড়ে ভেঙে পড়া শেডের ৩০০ পিস টিন ৬০ হাজার টাকায় বিক্রি করে এখন সংসার চালাচ্ছেন। আজিজুরের স্ত্রী তপুরা বেগম বলেন, খুব দুশ্চিন্তা হয়। রাতে ভালো ঘুম হয় না।
শফিকুল ইসলাম নামের একজন বলেন, ‘দুই বিঘা জমিতে জারবেরার চাষ করেছি। করোনায় বিক্রি বন্ধ ও আম্পানে জমি লন্ডভন্ড হওয়ায় ধারদেনায় জর্জরিত হয়ে পড়েছি। এভাবে জীবন চলছে না।’

জানতে চাইলে ঝিকরগাছার কৃষি কর্মকর্তা মাসুদ হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, এই উপজেলার ছয়টি ইউনিয়নে প্রায় ৬২৫ হেক্টর জমিতে বাণিজ্যিকভাবে ফুলের চাষ হচ্ছে। ফুল চাষের সঙ্গে ৭ থেকে ১০ হাজার কৃষক ও প্রায় ১ লাখ শ্রমিক সম্পৃক্ত রয়েছেন।

যশোর শহর থেকে ১৮ কিলোমিটার পশ্চিমে যশোর-বেনাপোল মহাসড়কের পাশে ঝিকরগাছা উপজেলার গদখালী ও আশপাশে গড়ে উঠেছে ফুল চাষ ও পাইকারি বিক্রির বৃহত্তম মোকাম। ফুল সবচেয়ে বেশি কেনাবেচা হয় বিজয় দিবস, একুশে ফেব্রুয়ারি, স্বাধীনতা দিবস, পয়লা ফাল্গুন, বসন্ত দিবস, বিশ্ব ভালোবাসা দিবস, বাংলা নববর্ষ ও দুই ঈদ উপলক্ষে। দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশেও রপ্তানি হচ্ছে এখানকার ফুল।

গদখালী বাজারের দোকানি উজ্জ্বল হোসেন বলেন, ‘আগে অনেক ফুল বিক্রি হতো। এখন ফুল কেনার লোক নেই। এভাবে আর চলতে পারছি না।’

সম্পূর্ণ খবরটি পড়ুন
বিজ্ঞাপন

শীর্ষ সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক: শাইখ সিরাজ
© ২০২০ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। দা এগ্রো নিউজ, ফিশ এক্সপার্ট লিমিটেডের দ্বারা পরিচালিত একটি প্রতিষ্ঠান। ৫১/এ/৩ পশ্চিম রাজাবাজার, পান্থাপথ, ঢাকা -১২০৫
ফোন: ০১৭১২-৭৪২২১৭
ইমেইল: info@theagronews.com, theagronewsbd@gmail.com